Monday, November 11, 2013

উৎস-পৃথিবী(2)

রাত্রিশেষের হাওয়ায় কেঁপে উঠলেন রোহিতাশ্ব। বাতায়নপথে চেয়ে দেখলেন অরণ্যশীর্ষে ঢলে পড়েছে কৃষ্ণপক্ষের ক্ষীণ চাঁদ। হেমন্ত শেষ হয়ে এলো, রিক্ত ধানক্ষেতে হু হু করে বেড়ায় হাওয়া।

রোহিতাশ্ব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁসের পালকের কলমটি নামালেন। উঠে দাঁড়ালেন, উত্তরীয়টা একটু ভালো করে জড়ালেন। বাতায়নবর্তী হয়ে দৃষ্টি মেলে দিলেন দূরে। ক্ষীণ জ্যোৎস্না আর কুয়াশা মিশে আদিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত অদ্ভুত অলীক দেখাচ্ছে। যেন অপার্থিব!

পাঁচ বছর হয়ে গেল। এইরকম এক হেমন্তে সদানীরা ছেড়ে গেছে তাকে। শ্রুতি আর স্মৃতি --এই দুই যমজ কন্যাকে রেখে। ওরা তখন তিন বছরের শিশু। কে ভেবেছিল ঐভাবে মাত্র তিনদিনের অসুখে পূর্ণযুবতী সদানীরা এই অনেক ভালোবাসার সংসার সন্তান স্বপ্ন -সব ছেড়ে চলে যাবে? এই সন্তান দুটি জখন গর্ভে এলো তখন কী তীব্র আনন্দে জ্বলজ্বলে হয়ে উঠছিল সদানীরা, এরা যখন জন্মালো তখন তাদের কী সুখ, কী অনাস্বাদিত বাৎসল্যের প্রথম অমৃত অনুভূতি! এইসব হঠাৎ করে ছেড়ে দিয়ে তাকে এত নির্মমভাবে একা করে দিয়ে চলে গেল নীরা!

রোহিতাশ্ব পাশের ঘরে ভেজানো দরজাটার দিকে তাকান, তারপরে আস্তে আস্তে সেদিকে যান, দরজা আস্তে করে ঠেলা দিতেই খুলে যায়। ঘরে ঢোকেন। মেয়ে দুটি ওদের ঠাকুমার পাশ ঘেঁষে শুয়ে আছে বিছানায়। তিনজনেই ওরা গভীর ঘুমে মগ্ন, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দোময় শব্দ শোনা যায়। ঘুমের মধ্যে শ্রুতি পাশ ফেরে, গায়ের চাদর খানিকটা সরে যায়, এলোমেলো ফুরফুরে রেশমীচুলে ঘেরা কচিমুখটি দেখা যায়, পাতলা রাঙা ঠোঁট দুটো অল্প ফাঁক, কচি দু'খানা দাঁত দেখা যাচ্ছে। রোহিতাশ্বের বুকের ভিতরে ছলছল করে, আস্তে করে পাশে বসে মেয়ের গায়ের চাদর ঠিক করে দেন। ঘুমের মধ্যে আদর করতে নেই, নইলে ওর কপালে একটা চুমু খেতে খুব ইচ্ছে করছিল রোহিতাশ্বের। মেয়ের কপালের থেকে চুলগুলো যত্ন করে সরিয়ে মাথায় হাত হাল্কা করে বুলিয়ে সরে এলেন তিনি। লোকে বলে শ্রুতি আর স্মৃতি ওদের মায়ের মুখ পেয়েছে, মায়ের চেহারা পেয়েছে।

রোহিতাশ্বকে নতুন স্ত্রী গ্রহণ করতে অনেকেই পরামর্শ দেন, এমনকি রোহিতাশ্বের মা ও। কিন্তু তিনি মনস্থির করতে পারেন না। হয়তো আর কিছু বছর পরে সত্যি করেই নতুন বিবাহ করতে হবে তাকে, কিন্তু এখন এই কচি মেয়ে দুটি সৎমায়ের হাতে পড়ুক, এ তিনি চান না। অনেকে বলে যে সব সৎ মা যে খারাপ হয়, তা কে বললো? কোনো কোনো সৎ মা এত ভালো হয় যে সতীনের সন্তানদের যত্ন করে নিজের সন্তানের মতন। কিন্তু রোহিতাশ্ব জানেন তেমন সৎ মা বিরল ব্যাপার।

মেয়েদের ঘর থেকে নিজের লেখার ঘরে ফিরে এলেন রোহিতাশ্ব, ফিরেই চমকে উঠে থমকে গেলেন। কুশাসনটির কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবতী, আগে কখনো একে দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না তিনি। এর পোষাক ও মুখ অদৃষ্টপূর্ব। মেয়েটি শান্ত মুখে কৌতূহলী দৃষ্টি তুলে চেয়ে আছে রোহিতাশ্বের দিকে। এ কী আশ্চর্য কান্ড! জাদু নাকি অন্যকিছু? ইনি কে? কোথা থেকে এলেন? স্বর্গ থেকে আসা কোনো দেবদূতী?

রোহিতাশ্ব নিজের জায়্গায় অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, গলা শুকিয়ে আসছে তৃষ্ণা। চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে। যুবতী এক পা এগিয়ে এসে খুব কষ্ট করে করে শব্দ মনে করে করে কথা বলার মতন করে বলল, "আপনি রোহিতাশ্ব, না? প্রসিদ্ধ ভিষক? বর্তমানে আয়ুর্বেদ সম্পর্কে গ্রন্থ লিখছেন? "

রোহিতাশ্ব কিছু বলতে পারলেন না, দেখলেন মেয়েটির মুখে সদানীরার মুখ জ্বলজ্বল করছে। তিনি অচেতন হয়ে পড়ে গেলেন ভূমিতে।

স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠে অদীনা। এই স্বপন সে দেখছে বেশ কিছুদিন। ডক্টর হপকিন্সের কাছে সে গিয়েছিল হিন্দোলের সঙ্গে, ডাক্তার ভদ্রলোক আগেও ওর চিকিৎসা করেছেন। নতুন নতুন সমস্যাগুলো সব শুনে তিনি কিছু ওষুধ দিলেন আর রিল্যাক্স করার কিছু টেকনিক শেখালেন। দিনে একবার আর রাত্রে আরেকবার মনকে সম্পূর্ণ চিন্তাশূন্য করে দেহকে শিথিল করে ফেলতে হবে। এখন হিন্দোল আর অদীনার শোবার ঘর আলাদা, অদীনাকে কোনোভাবে ডিস্ট্র্যাক্ট করা চলবে না বলে ডাক্তারের পরামর্শেই হিন্দোল এই ব্যবস্থা করেছে।

দেহমন শিথিল করে মনকে চিন্তামুক্ত করার চেষ্টায় প্রথম কিছুদিন একেবারেই সাফল্য পায়নি অদীনা। যত মনকে চিন্তাশূন্য করতে যায় তত দেওয়ালির সময়ের শ্যামাপোকার মতন পিল পিল করে চিন্তাভাবনা, সুখ দুঃখের স্মৃতি সব উড়ে আসে। জটলা পাকায়, সব ঘুলিয়ে দেয়। বেশ কিছুদিনের প্রবল চেষ্টার পরে এখন অদীনা মনকে চিন্তাশূন্য করে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। আর ঘুমোলে সে ধারাবাহিকভাবে রোহিতাশ্বের জীবনের ঘটনাক্রম দেখতে পায়, একদম জীবন্ত স্বপ্ন, স্পষ্ট সব দেখতে পায় সে।

ঘুম ভেঙে সে খুব অবাক হয় প্রতিবারই। কে রোহিতাশ্ব? কেন সে তাকে স্বপ্নে দেখে? গতজন্ম সে বিশ্বাস করে না সচেতনভাবে, তাই এটাকে বিগত কোনো জন্মের কথাও সে ভাবতে পারছে না। তাহলে এর ব্যখ্যা কী? হয়তো ডক্টর হপকিন্স কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। কিন্তু অদীনা ঠিক করতে পারছে না সে কীভাবে ডাক্তারকে এসব বলবে অথবা আদৌ বলবে কিনা! ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়ে অদীনা।

সকালে ওকে ডেকে তোলে হিন্দোল, হাতে গরম ধোঁয়াওঠা সাদা টার্কিশ তোয়ালে। অদীনার হাতে সেটা দেয় হিন্দোল, অদীনা গরম তোয়ালে মুখের উপরে হাল্কা চেপে ধরে ঘুম থেকে বেরিয়ে আসে, এই গরম ভাপটুকু আর কোমল স্পর্শটুকু ভারী আরামদায়ক। তারপরে মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে একেবারে স্নান সেরে বেরোবে অদীনা। হিন্দোলের আগেই সেসব হয়ে গেছে, সে তখন ব্রেকফাস্ট বানায়।

অদীনার ভালো লাগে এই যত্ন, আবার মাঝে মাঝে কেমন অপরাধী অপরাধী মনে হয় নিজেকে। যেন দাম না দিয়ে এত যত্ন চুরি করে নিচ্ছে সে। অদীনার এমন কী আছে যে এইভাবে জীবনপাত করে ওকে যত্ন করছে হিন্দোল? নিজের সম্পর্কে উদাসীন অদীনার চোখে পড়ে না আয়নার ভিতরের সুন্দরী যুবতীর দিকে, তার বুদ্ধিদীপ্ত জ্বলজ্বলে চোখের দিকে, সুন্দর পদ্মকলির মতন আঙুলগুলোর দিকে, রেশমের ঝর্ণার মতন একঢাল সুন্দর চুলের দিকে। আনমনে গুনগুন করতে করতে স্নান করে অদীনা, ফেনা করে সাবান মাখে, চুলে শ্যাম্পু ঘষে আস্তে আস্তে, শাওয়ারের জলধারার নিচে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে ভারী আরামে ভাবতে থাকে স্বপ্নে দেখা যমজ মেয়ে দুটির কথা। আহা, মাত্র তিন বছর বয়স থেকে ওরা মা ছাড়া। কী হলো ওদের তারপরে? ঠিক যেন একটা ধারাবাহিক গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়েছে অদীনা।

(চলবে)

Friday, November 8, 2013

উৎস-পৃথিবী(1)

অদীনা চুপ করে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে থাকে। বাইরে রোদ-ঝকমকে নিঃশব্দ দুপুর। চেয়ে থাকতে থাকতে তার মনে পড়ে অনেক অনেক আগের এমন এক দুপুরবেলা। মনে পড়ে নানা শব্দ। দুপুরজাগা রোদ্দুরের মধ্যে মিশে থাকতো সেইসব প্রিয় শব্দমালা। "হরে-এ-এ- ক মাল পাঁচসিকা"র ফেরিওয়ালা, "শিল খোটাও" ওলা, টিন আর লোহা ওয়ালার শব্দ। আরো থাকতো নিঃশব্দ কাগজকুড়ানি মেয়ে, যার রুখু বাদামীচুলে খেলা করতো শুকনো শীতহাওয়া।

উলের ডিজাইনের মতন গালওলা সাদা থান পরা বুড়ী, চুলগুলো পাকা, সঙ্গে কচি একটি পুঁচকে মেয়ে,সজনে গাছের ছায়ায় মাদুর--বুড়ী আর কুচোয় পাশাপাশি শুয়ে আছে। বুড়ী গল্প করে টুয়াইয়ের, সাতভাই আর তাদের একমাত্র বোন টুয়াই। সাতভাই বাণিজ্যে যায়, টুয়াই কী করে? সত্যি তো, টুয়াই তারপরে কী করলো?

হারিয়ে গেছে শব্দেরা,ফেরিওয়ালার ম্যাজিকঝুড়ি। রুখু দুপুরে বুড়ী ফেরিওয়ালা ডাকলে ঐ ঢাকনিটা সরালেই যে ঝুড়ির ভিতর থেকে উঁকি দিতো টিপ,মালা, চুড়ি,পুতুল, খেলনা কত কী। সে ফেরিওয়ালা একা একা একা একা মিশে গেছে কুয়াশায়। হয়তো সে এখনো কোনো দূরের গ্রহে অমনি আমকাঁঠালের ছায়ার পাশ দিয়ে হাঁক দেয় "হরে-এ-এ-এক মাল পাঁচসিকা।" গোলাপীমুখ বাচ্চারা ছুটে আসে, সঙ্গে আসে বুড়ী দিদা। এপারে মেয়েটির ঠোঁট ফুলে ওঠে, অভিমানে।

এইখানে দৃশ্য বদলে যায়। স্মৃতির পর্দায় অদীনা দেখতে পায় ভূপেনকে। ভূপেন তখন সদ্য কলেজ পাশ করা ছোকরাটি, নিজের গ্রামে ফিরে খুবই স্মৃতিকাতর। সে গ্রাম তখন অন্য দেশ, তবু সব চেনাজানা জায়গা,অনেক চেনামুখ। ভূপেন তার পুরানো স্কুলে দেখা করতে গেল। তাকে পেয়ে পুরানো শিক্ষক খুব খুশি, বললেন, "দ্যাখো ভূপেন, ধর্মের ক্লাস হয় এখন এখানে, সকলকে পরস্পরের ধর্ম জানানোর জন্য, তো ইসলাম ধর্মের ক্লাস তো আরেকজন নেয়,তুমি বরং কদিন হিন্দু ধর্মের ক্লাস নাও।"

ভূপেনের দিব্যি লাগলো, হিন্দুমুসলিম পাশাপাশিই ছিলো, কিন্তু পরস্পরের ধর্ম সম্পর্কে বিশেষ জানতো না। এরকম একটা মিউচুয়াল ব্যাপার হলে খুবই ভালো। ভূপেন মহাভারতের গল্প পড়াতে আরম্ভ করলো। তো একদিন প্রশ্ন করেছে, "বলো তো মহাভারতের সেই বিরাট যুদ্ধ কোথায় হয়েছিলো?"

একজন ছাত্র পড়িমড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বলে " জানি সার জানি সার। ক্রুদ্ধক্ষেত্রের যুদ্ধ! " ক্লাসজুড়ে তুমুল হাসির হররা।

সব গুলিয়ে যাচ্ছে অদীনার, কেন যে গুলিয়ে যাচ্ছে কে জানে। কোথা থেকে কোথায়,কোন্‌ শুকনো দুপুর থেকে কোন্‌ নদীতীরের জল-ছলছল কাহিনিতে!

টেবিলজুড়ে রোল খুলে মেলে দেওয়া ম্যাপের দাগগুলোর উপরে হাত বোলায় অদীনা, হাতে আলাদা লাগে না তো,দাগও লাগে না,কিন্তু চোখে দেখা যায় দাগ,তেড়াবেঁকা সোজা লম্বা পাথালি লাইন আর লাইন। সীমান্ত। কাঁটাতার। কই? হাতে ফুটে গেলো? অনেকদিন আগের সূচ ফুটে যাওয়া চিহ্নে এখনো বাদামী দাগ,শুকিয়ে গেছে কবে,তবু দাগখানা রয়ে গেছে। মিছিমিছি দাগ,মিছিমিছি। টেবিল ছেড়ে সে চলে যায় খাটে,সেলাই করতে বসে ছেঁড়া কামিজ, খচাং করে সূচ বেঁধে,রক্তবিন্দুটা ঠিক জ্বলজ্বলে একটা ক্ষুদ্র চুনীর মতো লাগে ল্যাম্পের নীচে। ব্যথা। আগুনলাগার মতন জ্বালাকরে আঙুলটায়, চুনীসমেত আঙুলডগা মুখে ঢুকিয়ে দেয় অদীনা।

ভর সন্ধেবেলার বুড়ীর গল্প, তাদের ছেড়ে আসা দেশের গল্প, নদী, মাঠ, ভাঁটফুল,পানের বরজ, বরজে বাঘ, নদীতে জোয়ারভাঁটা, খলখল করে স্রোতের জলে স্নান। কুমীরে ধরার আগেই উঠে বৌ দুটির উঠে পড়া ঘাট থেকে,পিছে কুমীরের জল তোলপাড়, এক বৌ আরেককে কয়, "ভাগ্যে তোমার তাড়াতাড়ি ছিলো হইরার মা, না হইলে আজ কী হইতো!"

এমনি সব গল্প, ঝাঁকে ঝাঁকে চারামাছ নদীতে বর্ষায়,লোকে গোটা দলটাকে ধরে ফেলছে, ছোটো মেয়েটির কি কান্না,ওদের মায়ের কষ্ট হবে ওদের মায়ের কষ্ট হবে। জেলে জেলেনীরা শুনে হাসে, তাদের চকচকে কালো চোখে আর রোদেপোড়ামুখে সস্নেহ হাসি, পৃথিবীর সুখ ও দুঃখ তাদের চেনা, অভিঘাতগুলো পুরানো হয়ে গেছে। নতুন কুঁড়িটি এখনো চেনে না সেসব, তারা ব্যস্ত হয় না, একদিন ঠিক হয়ে যাবে সবই।

দু'খানা অদ্ভুৎ শব্দ করা মাছ সারারাত ক্যাঁকর ক্যাঁকর করছে ডুলায়, বালিকা পা টিপে টিপে ওঠে উঁকি মেরে দ্যাখে। কচ্ছপের বিরাট খোলায় রাখা জল,যেন চৌবাচ্চা,সেই জলে পা ধুয়ে ছেলেপুলে দাওয়ায় উঠলো।

নদীপারের গাঁটিতে ফিরেছে গাঁয়ের মেয়ে, নাইয়র এসেছে, সঙ্গে ছোট্টো তার বছর চারেকের মেয়েটি। বিকালে যাত্রাপালা হচ্ছে, প্রহ্লাদের গল্প। দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর ছেলে প্রহলাদ। দৈত্যরাজ হরির নাম শুনলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন, এদিকে তার ছেলে প্রহলাদ দারুণ হরিভক্ত। রাজা বহু চেষ্টায় ছেলেকে বাগে আনতে না পেরে অবশেষে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছেন। বিষ খাওয়ানো, হাতী দিয়ে মাড়ানোর চেষ্টা, জলে ফেলা, আগুনে দেয়া কিছুতেই কিছু হয় না! ভীষণ উত্তেজক গল্প, অভিনয় চলছে, চোখ বড়ো বড়ো করে কচি মেয়েটা দেখছে। যখন রাজার নির্দেশে রাজপুত্তুর প্রহ্লাদকে কাটতে গেছে জল্লাদ , মেয়েটা তখন আর থাকতে না পেরে চিৎকার করে উঠেছে," টুনিমামাগো, দাওডা( দা'টা ) ধরেন।" দর্শকের মধ্যে হাসির হররা পড়ে গেলো।

তারপর? সময় বয়ে যায় নদীর ধারা যেন। ছলছলে নদীটির পারের গ্রামটি থেকে দল বেঁধে মানুষ চলে যাচ্ছে, পাড়া কে পাড়া ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। জামাকাপড়ের গাঁটরি তাদের কাঁধে, শিশুদের হাত ধরা বড়োদের শিরাতোলা কেজো হাতে। কোথায় যেন কোন্‌ স্টীমার ঘাটা, কোন্‌ চেনা স্রোত ছেড়ে কোন্‌ অচেনা ঘাটের দিকে যাযাবর মানুষের দলের চলে যাওয়া।

সোনালী রূপালী মেঘালী রোদালী এমনি সব গল্প,ছিন্নমূল মানুষের দেশ খুঁজে বেড়াবার গল্প, স্বপ্নের মধ্যে নীলকন্ঠ পাখিটি ওড়ে আর ওড়ে!

গল্পের মধ্যে বারে বারে অদ্ভুৎ এক ঝড়ের গন্ধ এসে পড়ে,আশ্বিনের ঝড়, যেই ঝড়ে বাড়ীঘর পড়ে গেছিলো ওদের, গোটা গ্রামে একটি দুটি ছাড়া খাড়া বাড়ী ছিলো না। বাড়ীর তিনজন লোক,কাকা আর দুই দাদা নদীতে, গ্রামের আরো কত লোক নদীতে, নৌকায়, কখন ওরা ফিরবে, কি হলো ওদের,ঘাটে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে করে দ্যাখে বৌরামায়েরামেয়েরা--- গোটা গ্রামে অজস্র গাছ উৎপাটিত, রাস্তা গাছে ভর্তি।

লোকে ধারালো দা হাতে গাছ কাটতে কাটতে পথ করে নিয়ে যাচ্ছে ঘাটে, পরদিন ঝকমকে রোদ,লোকে ভেজা সব শুকিয়ে নিচ্ছে, গ্রামের একটিমাত্র খাড়া বাড়ীটিতে,বাড়ীটি ধনীবাড়ী,পাকা দালান, সেখান থেকে সকলের জন্য খাবার দেওয়া হচ্ছে। বেলায় খবর এলো দাদারা আর কাকা ফিরছে। বাড়ীঘর পড়ে গেছে দেখে কাকার কি আফশোস, "আমি থাকলে দাঁতে কামড়াইয়া বাড়ী খাড়া রাখতাম!"

তারপরে ওরা তাদের নদীতে ঝড়ের অভিজ্ঞতার কথা বলে, কেমন একটা ছোটো সরু খাঁড়ির মধ্যে নৌকা ঢুকিয়ে খোলা নদীতে ঝড়ের হাতে পড়া থেকে বেঁচেছিলো, কেমন হাতের কাছে যা পেয়েছে যে তাই দিয়ে জল সেঁচেছে।

কাগজপত্র বের করে সবার বয়স হিসেব করা হলো, যাতে মনে থাকে ছাব্বিশ সনের ঝড়ের সময় বয়স কতো ছিলো। সার্টিফিকেট ইত্যাদির তো বালাই নেই কারুর,ঐভাবেই লোকে হিসেব রাখে। অদীনার মনে পড়ে যায় সেই মঙ্গোপার্কের আফ্রিকা ভ্রমণ, সেখানে লোকে বছরের হিসাব রাখে বড়ো বড়ো ঘটনা দিয়ে, অমুক যুদ্ধের বছর,তমুক ঝড়ের বছর। সাদা লোক আসবার বছর।

দেশকালের তুমুল দূরত্বে, নির্জন কোনো এক গ্রীষ্মসন্ধ্যার বিরল অবসরে, রক্তলাল আকাশের দিকে চেয়ে মনে হয় এই এত সাংঘাতিক যান্ত্রিক সমাজেও হয়তো ঐভাবে ছাড়া আসলে অন্য কোনোভাবেই সময়ের হিসেব রাখা যায় না। সহস্র বিস্মৃতির ঘোলা জলের একাকারতার মধ্যে হঠাৎ বিঁধে যাওয়া অন্যরকমের কিছু মোচড় না থাকলে কেমন করে আলাদা করা যায় কোন্‌টা আগে, কোন্‌টা পরে? আজ থেকে সহস্র বৎসর পরে আমাদের এই সময়কে এই বিরাট বিরাট গোটা গোটা দশ কি কুড়ি কি তিরিশ প্রজন্মকে হয়তো তারা বলবে অ্যাটম ভাঙার যুগ!!! বা অন্য কিছু! ক'জন মানুষের মুখ বেঁচে থাকবে ইতিহাসে,এই কোটি কোটি মানুষের মধ্যে? যার মুখ বেঁচে থাকবে সেও কি সত্যি সত্যি একটা মানুষ? অনেক মানুষের সুপারইম্পোজিশান নয়? একজন করে কি কোনোদিন থাকতে পারে?

যে আর্কিমিদিসকে আমরা চিনি ইতিহাসের ধূলা সরিয়ে,সেই বৃদ্ধ জ্ঞানী কি আসলে সত্যি সত্যি সমুদ্রতীরে বালিখেলা সেই মানুষটি? যে ইমহোটেপকে আমরা চিনি আরো আরো অনেক গভীর দূরে,ইজিপ্টের অনেক গপ্পোকথা লেজেন্ড মিথের ধূলা সরিয়ে, সে কি একটা মানুষ? যে সলোমনকে খুঁজে পাই বাইবেলে, সেও কি একজন মাত্র? যে গৌতমবুদ্ধকে পাই, সেই কি মাত্র একজন?

আফ্রিকার গ্রামের সেই সরল শিশুবৃদ্ধযুবকদের সহজ বিশ্বাসে চমকে ওঠে অদীনা বিস্ময়ে ,কোথায় কতদূরের বাংলার গ্রামের বিশ্বাসের সঙ্গে তার মিল দেখে চমকে ওঠে এই অর্বাচীন অতিথিবিশ্বে, এইখানেও হয়তো অমনি বিশ্বাস ছিলো, অমনি সহজ সরল প্রকৃতিসাযুজ্যে এই কালোবাদামীপৃথুলশীর্ণেরা হয়তো মিলে ছিলো একদিন। কিন্তু কে বলবে সেসব? তারা তো আর নেই। ধবল কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেছে কোথায়। মিলিয়ে গেছে তাঁদের স্মৃতি গল্পকথা বিশ্বাস ধর্ম ভালোবাসা ঘৃণা সব সব। একদিন ইতিহসের চক্রাবর্তে হয়তো স্বপ্নের মতো দেখা দেবে আবার, খুঁড়ে খুঁড়ে ধূলা সরিয়ে তাদের উদ্ধার করবে পুনর্জাতরা।

জলে ভেজা শ্রান্ত পথিক শ্বেতাঙ্গ লোকটি আশ্রয় পেয়েছিলো গ্রামের কালো মা ও মেয়ের কুটিরে। তারা তাঁকে শুকনো কাপড় দিয়ে,খাবার তৈরী করতে করতে গান গাইছিলো,"ঝড় বইছে বৃষ্টি পড়ছে আর বেচারা সাদা লোকটি শ্রান্ত অবশ হয়ে আমাদের উঠানের গাছতলায় বসেছে। ওর যে মা নেই, ওকে দুধ এনে দেবে কে? ওর যে স্ত্রী নেই,ওকে ময়দা পিষে দেবে কে? আহা বেচারা সাদা লোকটিকে দয়া করো।"

ঐ আদিম গ্রামের আদিবাসীরা এই প্রেমধর্ম কোথা থেকে পেলো? এমন সহজ সরল নিঃশ্বাসের মতন?

ঘূর্নীধূলির মতন এরপরে এসে পড়লো সভ্যতা,মেরে কেটে শেষ করলো সব, এ কেমন সভ্যতা? যারা মরে গেলো,তারা কি গেলোই ? এক্কেবারেই গেলো? কোথাও কি রইলো না আর? কোনো সন্ধেবেলার ভুতের গল্পে? কোনো জনারের ক্ষেতের গল্পে? কোনো উপকথায়?

কোথায় তারা? মরুপার হয়ে চলে যাচ্ছে জলের কলসী কাঁখে ঠোঁট ফোলানো গাঢ় বাদামী ঐ তরুণী,কে সে? ও ই কি ওর সবল বাদামী হাতে গড়েছিলো উচ্চশীর্ষ প্রস্তরমন্দির? ঐ কি ছিলো বিদেশী জাহাজে উঠে পড়া অ্যাডভেঞ্চারেস? ও ই নিজের হাতে নিজের শিশুদের গলা টিপে মুক্তি দিয়েছিলো? ও ই কি শরবনের মধ্যে পাওয়া অন্য বিদেশী জাতের শিশুটিকে প্রতিপালন করেছিলো যে কথা বলতে শিখে ওকে মা বলতো?

ও ই কি অমরত্বের বাসনায় নীল সাপটি তুলে নিলো উষ্ণবুকের উপরে? হৃদপিন্ডের এত কাছে যে কিছুতেই যাতে মিস না হয়ে যায় বিষ! মরুকুয়াশায় বিলীন হয়ে যাওয়া হাজার হাজার স্মৃতির মধ্য থেকে অকলঙ্ক অক্ষয় হয়ে চক্রাবর্তের মতন ফিরে ফিরে এলো সেই মন্দিরের অলীক মুহূর্ত?

ওরই চিকন শ্যামলবরণ রাজা কি একদিন হারিয়ে গেলো মরুতে? সঙ্গে হারিয়ে গেলো সব গান, সব সুর, সব আলো? ছিঁড়ে যাওয়া নদী, কুটি কুটি ভূমিখন্ড, আটকে পড়া জল, পানা শ্যাওলা, দাম দলঘাস--- সে কোথায় খুঁজে পাবে সেই প্রিয়কে আবার? কোন্‌ কলার মান্দাসে ভেসে ভেসে সে আবার যাবে কোন্‌ নেতাধোপানীর ঘাটে? যেখান থেকে পাওয়া গেল স্বর্গপথের খোঁজ? সেই পথ দিয়ে ফিরে আসে কি ভুলে যাওয়া প্রিয়তম? কিন্তু, কোথায়? কই? সে তো কবে থেকে ভেলা বেয়ে চলছেই চলছেই ! কোথাও গিয়ে তো পৌঁছায় না!

"অদীনা, অদীনা " হিন্দোল ডাকছে ওর কাঁধে হাত রেখে, সে মুখে তুললো। উদ্বিগ্ন হয়ে চেয়ে আছে হিন্দোল, "কী হয়েছে অদীনা? কতক্ষণ ধরে ডাকছিলাম ওঘর থেকে,শুনতে পাও নি?"

অদীনা ঘোর কাটিয়ে বর্তমানে ল্যান্ড করার প্রবল চেষ্টায় অস্থির বোধ করে, কী করে হিন্দোলকে বলবে? কী করে বোঝাবে? এ কি কথায় বোঝাবার মতন কিছু? মুহূর্তে কি করে পার হয়ে আসবে এত এত সময়খন্ড,এত বিপুল দেশ, এত বিরাট ঢেউ?

হিন্দোল অদীনাকে জড়িয়ে ধরে টেনে তোলে, বলে,"চলো, যাবে না? রেডি হও নি কেন এখনো? আজকে যে বিতান-বৃতি রা নেমন্তন্ন করেছে,যাবে না? "

ভুলে যাওয়া ভাষা মনে করার মতন ঠোক্কর খেয়ে খেয়ে অদীনা বলে,"হ্যাঁ হ্যাঁ, চুড়িদারটা ...একজায়গায় একটু সেলাই খুলে গেছে... ঐখানটা রিফু করছিলাম... হাতে সূচ ফুটে গেল।" হাসে অদীনা, লাল ছোটো ক্ষতবিন্দু হাতের আঙুলের ডগায়,হিন্দোল নিজের হাতে ওর হাত নিয়ে দেখে।

হিন্দোল বলে, "শাড়ী পরো না! চুড়িদার তো পরোই। আজকে শাড়ী পরো, চন্দন রঙের সিল্ক শাড়ী, জড়িপাড়, ঐটা।"

অদীনা সম্মত হয়ে চলে যায়।

******



"বাতাসের পাতলা স্তর সরাতে সরাতে / বেরিয়ে পড়ে জল আর জল/ তারও নীচে, অনেক নীচে মাটি।

আকাশের ময়দানে নীল তুলো ফুঁড়ে,/সোনালী স্বপ্ন ঘষা দূরে /হোমা পাখি-ছানাদের পা হাঁটি হাঁটি।

মেঘ তুলো জল হাওয়া পার হতে হতে/ম্যাজিকের দেশ জুড়ে রাত/রূপশালী ধান আর কুশ কুটিকাটি।"

শীতল ভয়ের একটা স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নীচ থেকে উপরে উঠে আসে অদীনার। মনে হয় অসংখ্য আরশোলা শুঁড় নেড়ে ঘুরছে সারা মেঝে জুড়ে, উড়তে শুরু করলো, একটা, দুটো তারপরে অসংখ্য। সব ঢেকে যাচ্ছে বাদামী রঙে। আরশোলা নাকি পঙ্গপাল? পঙ্গপাল এসেছিলো একবার অদীনার ছোটোবেলা তাদের গাঁয়ে, সূর্য ঢেকে গেছিলো তাদের পাখায়,বিরাট মেঘের মতন এসে পড়েছিলো ক্ষেতের উপরে,সব সবুজ সাফ করে দিয়েছিলো কয়েক ঘন্টায়।

স্বপ্নঘুমজল ছিঁড়ে ঘামে ভিজে উঠে পড়ে অদীনা। বসে থাকে বিছানায় উঠে,গলা শুকিয়ে কাঠ,ঘামে ভিজে যাচ্ছে সর্বাঙ্গ, ঘামে রাতপোশাক সেঁটে গেছে গলায় পিঠে। স্বপ্নে ও চিৎকার করেছিলো গলা চিরে, কিন্তু একটুও শব্দ হয় নি, পাশে হিন্দোল এখনো গভীর সুষুপ্তিতে। ঐ আর্ত চিৎকারের শব্দ বাইরে এলে এই রাত্রির শান্তি ছিঁড়ে খুঁড়ে একাকার হয়ে যেতো।

কাঁচের জানলার বাইরে আকাশ, ঝিমুনো চাঁদ, হাল্কা হাওয়া, গাছের ডাল,সাদা প্যাঁচা সব একই আছে।

অদীনা চুপ করে বসে থাকে বিছানায়, নামতেও পারবে না এখন। আরেকটু ধাতস্থ না হয়ে। এখনো মনে হচ্ছে মেঝে জুড়ে কিলবিল করছে অসংখ্য আরশোলা। সেই অল্প ফাট ধরা সিমেন্টের মেঝে তাদের, সেই পুরানো বাড়ী, বারান্দার বাইরে কমলজবার ঝাড়। আরেকটু দূরে সন্ধ্যামলতী,লাল সাদা হলদে রঙের। একটা বুলবুলি বাসা করেছিলো সেই ঝাড়ে।

ওহ, সেতো বহুকাল আগের গল্প, তখন অদীনা সাত কি আট। কেন মেঝেটাকে বর্তমানে দেখতে পায় না অদীনা? পুরো শোবার ঘরটাই নরম গোলাপী কার্পেটে ঢাকা, হিন্দোলের এই রঙ পছন্দ বলে ওরা ঐ হাল্কা গোলাপী রঙের কাগজ নিয়ে গেছিলো বাজারে,রঙ মিলিয়ে কিনেছিলো। আগে এখানে হাল্কা ক্রীম রঙের কার্পেট ছিলো ঘরগুলোতে,সে রঙও তো ভালোই লাগতো অদীনার, কিন্তু হিন্দোল ছেলেমানুষের মতন বায়না করে বললো গোলাপী করতে হবে। তাই গোলাপী।

হিন্দোলের মাথার চুলগুলোর উপরে আলতো হাত রাখে অদীনা, কী ছেলেমানুষ, কী ভালো, কী সরল ছেলেটা! অদীনার চোখে জল আসে, ও কি ঠকাচ্ছে হিন্দোলকে? কতকিছুই তো হিন্দোলকে বলেনি, এখনো বলে না। অথচ হিন্দোল ওকে সবটুকু দিয়ে ভালোবাসে। সত্যি কি? কতদিনই বা চেনে ও হিন্দোলকে? মাত্র বছর খানেকের প্রেমের পরেই একসঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলো, সেও হয়ে গেলো দু'বছর প্রায়। বিয়ে করার কথা ভাবে নি, বিয়ে তো শুধু রিচুয়াল, আসল তো মন!

সেই মন কি পুরোটা খুলে দেখাতে পেরেছে ও? এত জল এত জল, খুলে দিলে ভেসে যাবে হিন্দোল, ডুবে যাবে।ভয় হয় অদীনার। তাই ঐ অশ্রুসমুদ্র গোপণ করে রেখেছে বুকের ভিতরে। সঙ্গে গোপণ করেছে সব কাঁটাগুলিও। কিন্তু আজকে বড্ড কাঁদতে ইচ্ছে করছে অদীনার, সব চেপে রাখা কান্না, শৈশবের ভয় পাওয়া কান্না, প্রথম কিশোরীবেলার অভিমান,শত শত দুঃখের বুটি বুটি জল উঠে আসে,সব কিছু ভাসিয়ে দিয়ে, ডুবিয়ে দিয়ে শেষ কান্না প্রাণ ভরে কেঁদে চলে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু হিন্দোল? ওকে ও ছেড়ে যাবে?

উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দেয় অদীনা, না না, জয় করতে হবে এই দুর্বলতা, দুর্লভ মানবজীবন, একে মাঝপথে শেষ করে দেওয়া অপরাধ, এতখানি পথ পার হয়ে এসে এখন এভাবে .... ঐ তো দুয়ারে মলিনমুখ রাজভিখারী, সেতো শুধু এসে দাঁড়িয়ে থাকে,কিছু বলে না, হাতও বাড়ায় না,পাতে না অঞ্জলি, শুধু ঐ অপরূপ করুণ দু'খানা চোখ মেলে অদীনার দিকে তাকিয়ে থাকে।

অদীনা জানে,ও কী চায়।ও চায় সর্বস্বধন। ও চায় সেই স্বপ্ন যা তিলে তিলে অসহ্য বেদনার পুলকে রূপ পায়।যার কিছু থাকে সম্মুখে বাস্তবে আঁকা, কিছু থাকে অনুভবে, যার কিছুটা বোঝা যায় কিছুটা যায় না। ওকে তো কবেই অদীনা বলেছিলো পণ তার জীবনসর্বস্ব। কিন্তু সে বলেছে জীবন তুচ্ছ,সবাই দিতে পারে। হায়, আর কী আছে ওগো রাজা? আর কী তুমি চাও এই দীনহীনা ভিখারিনীর কাছে?

আকাশ জুড়ে ফুটে ওঠে সোনালী ধূমকেতু, বিশাল তার উজ্জ্বল লেজ কালো আকাশে ছড়ানো, হাল্কা লেজের মধ্য দিয়ে ওপাশের তারাদের দেখা যায়। অদীনার স্বপ্নেই শুধু আছে এই ধূমকেতু, আলোক দূষণ পার হয়ে ওর চোখ সেদিন খুঁজে পায় নি ভবঘুরে জ্যোতিষ্কটিকে। তবু সে চোখ বুজে দেখতে পায় দীর্ঘকেশ এক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন আকাশের পটভূমিতে, বাইরে নীলপ্রভ আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ডে শুধু সুগঠন সিলুয়েটটি দেখা যায়। মুখ দেখা যায় না,চোখ দেখা যায় না। শুধু দেখা যায় তাঁর অলক্ষ্য হাতে তারার রাখী।

হাল্কা ভয়ের সঙ্গে অচেনা সুখে কাঁপতে কাঁপতে নিজে মুখ হিন্দোলের রেশমী চুলের মধ্যে গুঁজে দেয় অদীনা। ঘুমের ঘোরে পাশ ফেরে হিন্দোল, হাত বাড়িয়ে অদীনারা গলা কোমল করে জড়িয়ে ধরে ঘুমের থেকে বেরিয়ে আসে। আস্তে করে বলে, "অদীন, কী হলো? ভয় লাগছে নাকি? আবার ভয়ে স্বপ্ন দেখেছ?"

অদীনা বলে, "না না, সেরকম কিছু না। হঠাৎ কেন জানি ঘুমে ভেঙে গেল। কেমন অসোয়াস্তি হল।"

চোখ পুরো খুলে হিন্দোল বলে, "কালকে তোমায় ডক্টর হপকিন্সের কাছে নিয়ে যাবোই। বুঝলে? আর কোনো অজুহাত শুনছি না। এখনো তোমার আরশোলা ভয় যায় নি। এটা না সারালে হবে না, শুধু শুধু রোগ পুষে রাখা কোনো কাজের কথা না। "

অদীনা কুঁকড়ে যায় হিন্দোলের হাতের নিচে, হিন্দোল তাহলে ওকে সত্যি করেই অসুস্থ মনে করে? আজকে ঘুমের মধ্যে কন্ট্রোল নেই, মুখ ফসকে বলে ফেলেছে। অন্যসময় তো বলে মেডিকেল কন্ডিশন, পার্সোনালিটি ট্রেইট! আজকে জানা গেল সত্যিটা।

বুকের মধ্যেটায় তীক্ষ্ণ ব্যথা টের পায় অদীনা, দু'চোখে উষ্ণ জল ভরে ওঠে। কিন্তু সে সেই জল ঝরতে দেয় না, চোখের জল চোখের ভিতরে ফিরে দেয়। খুব সাবধানে হিন্দোলের হাত ছাড়িয়ে নিজের মাথা নিয়ে আসে নিজের বালিশের উপরে, আহ, কেন সে শুধু শু ওকে বিরক্ত করতে গেল! এখন তো সত্যিই আর ভয় করছে না! এখন তো মেঝেটা গোলাপী কার্পেটে মোড়াই লাগছে। তাহলে তখন কেন--

না, এই মিছিমিছি ভয়কে জয় করতেই হবে, ঠিকই বলে হিন্দোল, ভালো ভেবেই বলে। নাহ, কাল সে যাবে ডক্টর হপকিন্সের কাছে, সব খুলে বলবে।

চোখে বোজে অদীনা, আহ, শিথিল হয়ে আসছে দেহ, এখন ঘন ঘুমের আঠায় জুড়ে যাবে সব। শান্তি শান্তি শান্তি।

আধোঘুমে হিন্দোলের মুখ সে অনুভব করে সিঁথির উপরে, সে বলছে, "রাগ করলে অদীন? উঁ? রাগ করলে? আমি কিছু ভেবে বলিনি, এমনি বলেছি। অসুখ না, অসুখ কেন হবে? কিন্তু তুমি কষ্ট পাচ্ছ, তা থেকে সেরে উঠবে।"

অদীনা সায় দিয়ে বলে, "হ্যাঁ, যাবো কালকে। এখন ঘুমাই? এখন আর ভয় করছে না, এখন ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাই, হিন্দোল?"

আস্তে আস্তে হিন্দোল বিলি কেটে দেয় অদীনার মাথার রেশমী নরম চুলে। অদীনা ডুবে যেতে থাকে ঘুমের জলে। ডুবে যেতে থাকে অবর্ণনীয় সুখের অনুভূতির মধ্যেও।

(চলবে)

Saturday, November 2, 2013

উৎস-সমুদ্র

১। সমুদ্রের তীর ধরে হেঁটে যাই, গভীর নীল ঢেউয়ে জ্বলজ্বল করে কীসের যেন দীপ্তি। আর, আবহসঙ্গীতের মতন অবিরল ঢেউপতনের শব্দ। আসে আর যায়, ওঠে আর পড়ে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতন, বিরতি নেই, ক্লান্তি নেই, অনন্ত কাল উঠছে আর পড়ছে।

বাতিঘরের আলো এসে পড়ে চোখে, দূরে বাঁকের কাছে মিনারের মতন বাতিঘর। নগ্ন নির্জন একটি উত্তোলিত হাতের মতন আকাশে উঁচিয়ে আছে, মুঠোতে আলো। আলো ঘুরে যায়, দূর সমুদ্রের জল আলোকিত হয়ে উঠে, চকমকে আলো দূর থেকে দূরে কুয়াশা হয়ে মিলিয়ে যায়। কাছের ডুবো পাহাড়টি কালচে স্তূপের মতন দেখায় রাত্রির রহস্যভরা আলোয়। অথচ এই শিলাটি দিনের বেলায় কত অন্যরকম। সবুজ একটি পাহাড়, বর্ষার জলে সবুজতর। ছোটো কুন্ডে খেলা করে রঙীন মাছেরা। কত লতাপল্লব, কত শঙ্খকঙ্কণ।

বাতিঘরের আলো আরো ঘোরে আরো দূরের দিকে আলো ফেলে, এইবারে এদিকে শুধু নক্ষত্রের আলো। আবিল আলোর চেয়ে একদম অন্যরকম, শুদ্ধ পরমজ্যোতির মতন, তিরতিরে রহস্যময়।

অগভীর জলে নেমে পড়ে হেঁটে যাই সবুজে ঢাকা শিলাটির দিকে, ওখানে যেন কিছু আছে, কিছু আহ্বান, কিছু নির্দেশ। খালি পা জলের ছোঁয়া পেয়ে খুশী হয়ে ওঠে, সে খুশী উঠে আসে মেরুশিরা বেয়ে উপরে। সালোয়ারের পায়ের গোছের কাছটা ভিজে গেলো। আহা, ও তো কত তৃষ্ণার্ত ছিলো এতক্ষণ! শিরশিরে জল শ্যাওলা জলজলতা সাবধানে পেরিয়ে আসি। এইবারে চড়াই বেয়ে উপরে উঠতে হবে।

উঠতে উঠতে একটু হাঁপ ধরে, নিঃশ্বাস ঘনতর হয়, ঢালে গা এলিয়ে বসে পড়ি। তাড়া তো নেই কিছু। অদ্ভুত একটা অনুভূতি উঠে আসে তলপেট থেকে। সেখানে হাত রাখি, তিরতিরে কম্পন। সে এখন ঐ জলের মাছেদের মতন ছোট্টো, অমনই প্রায় দেখতেও। ওর লেজের ছোট্টো ছোট্টো খুশি-খুশি ঝাপটা আমাকে বিস্মৃত বহু বহু পূর্ব জন্মে নিয়ে যায়।

তীক্ষ্ণ শিসধ্বনির মতন সজোর শক্তিশালী শব্দ তরঙ্গের আহবান এসে লাগতো মহাসমুদ্রের বিশাল বিস্তার পেরিয়ে। পৃথিবীজোড়া যোগাযোগব্যবস্থা ছিলো আমাদের, এইসব ছোট্টো ছোট্টো চিপভরা সেলফোন আর মস্ত মস্ত উঁচু টাওয়ার তৈরীর বহু বহু যুগ আগেই। হাতডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে সাঁতরে যেতাম, ঠিক ও যেদিক থেকে আসতো তার উল্টোদিকে। এ খেলাটা আমাদের খুব পছন্দের ছিলো। ওর মসৃণ সুন্দর গা আর মিটমিটে দু'খানা চোখ...

আমরা সাঁতরাতে সাঁতরাতে পার হয়ে যাচ্ছিলাম ছায়াবৃত্ত, দিন থেকে রাত্রির মধ্যে ঢুকে পড়ছিলাম। সন্ধ্যার সমুদ্রজোড়া অগণিত তিমিদের গান। অদ্ভুৎ সংকেতধ্বনির মতন। তীক্ষ্ণ অথচ কী সুরময়!

সে কাছিয়ে এসেছিলো আরেকটু, ঘন হয়ে সাঁতরাতে সাঁতরাতে সহসা ঠোক্কর লাগিয়েছিলো হাতডানার নীচে। আরো ঘন রাত্রির মধ্যে ঢুকে যেতে যেতে সন্ধ্যাভ্রচ্ছটা মিলিয়ে এলো, আকাশ জুড়ে তারাদের জ্যোতি আবেষ্টনীর মধ্যে অর্ধনিদ্রামগ্ন দুখানা জলচর জীব আমরা সাঁতরাচ্ছিলাম, ক্রমে আমাদের গতি ধীর থেকে ধীরতর হয়ে গেছিলো।

ঘুমেলা রাত্রি সমুদ্র কিন্তু অক্লান্ত গান গেয়ে যাচ্ছিলো, যেমন গায়। তীব্র আবেশে আমরা ঘন হচ্ছিলাম, ভেসে যেতে যেতে।

২। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম এবারে, বিশ্রাম নেওয়া হয়ে গেছে। এইবারে উঠতে পারবো মনে হচ্ছে। উঠতে উঠতে আরো আরো দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। ঘূর্ণমান বাতিঘরের আলো এসে পড়ছে চোখ মুখ ও চুলের অন্ধকারে।

পায়ের গোছের কাছ থেকে শিরশিরে একটা পুলকবেদনা উঠে আসে। সামনে অল্প ঝুঁকে পড়ে উঠতে থাকি আস্তে আস্তে। উপমের গলা শুনতে পাই, অল্প রাগী অল্প খুশি বেশ কিছুটা উদ্ধত গলার স্বর উপমের। শেষ কবে শুনেছিলাম? মাসখানেক আগে? ও ফোন করেছিলো ওর নেভাল বেস থেকে। খুব সকাল ছিলো তখন। সারা পাড়া ঘুমিয়ে। আমিও বিছানা ছাড়িনি তখনো। বালিশের পাশে সেলফোনটা সুন্দর সুরে ডেকেছিলো। ঐ রিঙ-টোন উপমেরই পছন্দ।

আহ, কেন এখানে এসেছি এই এত রাতে? কেন রাতসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে? আমি নিজে নাকি ঐ ভেতরের ও আমাকে টেনে আনে এখানে? উপম যখন কাছে ছিলো, দু'জনে আসতাম প্রত্যেক বিকেলে। হাত ধরাধরি করে উঠতাম বাচ্চা বাচ্চা দু'খানা ছেলেমেয়ের মতন। উপরে পৌঁছে আমাদের খোলা গলার হাসি সমুদ্রবাতাসে উড়ে যেতো সূর্যাস্তলোকের দিকে, ঐ দূর পশ্চিমে যেখানে সমুদ্র রাঙা হয়ে থাকতো সন্ধ্যারঙে।

সহসা উপমের জন্য মনকেমন করতে থাকে। কিন্তু ওকে ফোন করা যাবে না, বারণ। কেবল ওই ফোন করতে পারে আমায়। কী করছে এখন উপম? প্রচন্ড রোদে ছোটাছুটি করে কাজ করছে? কাজের ফাঁকে কফি খাচ্ছে? আমার কথা ভাবছে? ওর সময়ের সঙ্গে আমার সময়ের প্রায় ঘন্টা এগারোর তফাৎ।

সময়ের কথা ভাবতেই আবার বসে পড়ি, এবারে একটা অবশ করা ক্লান্তি আমার দেহ ঢেকে দিতে থাকে। খুব ঘুম পাচ্ছে, প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। হঠাৎ কী হলো?

ঘুরে যায় দিন ও রাত্রি, গ্রীষ্ম শীত, নক্ষত্ররাশি পাক খায় খগোলকে। প্রতিদিন প্রতিরাতে একটু একটু করে সরে যায়।বদলে যায় ঋতু।কাল মাপার পথ দেখিয়ে দেয়। নইলে ... নইলে কেমন করেই বা বুঝতাম পেরিয়ে গেলো মাস, যদি না ভরভরন্ত চাঁদ বারে বারে ক্ষয়ে গিয়ে বারে বারে পূর্ণ হতো? সূর্য সরে না যেতো রাশি থেকে রাশিতে? প্রচেতা নক্ষত্রধারা কল্প থেকে কল্পান্তে নতুন ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলে না উঠতো? পর্যাবৃত্ত গতি না থাকলে সময়ের কী অর্থ হতো?

কেমন করে, কোন্‌ পথে এলাম এখানে? চোখ মেলে দেখেছিলাম এই আশ্চর্য অচেনা উপত্যকা! চারিদিকে সবুজনীলসাদা পাহাড়ের দল ঘিরে রেখেছে গোল উপত্যকাটি। একদিকে শুধু একটু ফাঁকা, ঘোর কালো গভীর গিরিখাত সেদিকে। বইছে ঘূর্ণীজল, আর রয়েছে প্রায় চিরস্থায়ী কুয়াশা সেখানে। ওদিকেই নাকি পৃথিবীর শেষ, তারপরে স্বর্গের দেবতাদের দেশ। উপত্যকাবাসী উপজাতিটির বাদামী রঙের মানুষগুলোর ঘোর বিশ্বাস এই। প্রতি বছর সুদিনের শুরুতে তাই দেবতাকে পশু উৎসর্গ করা হয় ঐ গিরিখাতে পশুগুলিকে ছেড়ে দিয়ে। ঘূর্ণীজল আর কুয়াশা পেরিয়ে একদিন নাকি ওরা পৌঁছে যাবে দেবতাদের কাছে।

উপজাতির মধ্যে মড়ক লেগেছে, শিশু-পুরুষ-মেয়েদের সংখ্যা কমে গেছে, বৃদ্ধা যাদুকরী দিলারা তাই খুব চিন্তিত। সে রোজ একটানা ক্লান্ত সাপখেলানো সুরে সমস্ত সন্ধ্যা ও রাত্রির অর্ধেক জুড়ে অদৃশ্য দেবতার কাছে প্রার্থনা জানায় যেন তিনি অনেক মানুষ পাঠান, জন্ম যেন মৃত্যুকে ছাপিয়ে যায়। মহামারীর কোনো ওষুধ কি পাওয়া যাবে না অরণ্যে? সে নিজে মরে যাবার আগেই কি কোনোভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না? বহুকাল আগেও তো একবার লেগেছিলো মড়ক, কিন্তু পাওয়া গেলো জরিবুটি খুঁজে। নিজের নির্জন গিরিবাস থেকে উল্টোদিকের সবুজ পাহাড়টির দিকে তাকায় দিলারা, ওখানে সর্পযাদুকর তিহুক...

দিলারার জরাজীর্ণ জরায়ুতে নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে না ফোঁটা কুঁড়িরা, দিলারা আর তিহুকের না জন্মানো শিশুরা... তারা হয়তো নিয়ে আসতে পারতো প্রতিষেধক, ঐ বোকা যাদুকর কিছুতেই হারিয়ে দিতে পারলো না দিলারাকে। এখন অর সময় নেই, তিহুক হয়তো এখন সত্যি সত্যি হারিয়ে দেবে দিলারাকে, কিন্তু দিলারা... তার প্লাবনজল শুকিয়ে গেছে কবে, পড়ে অছে ফুটিফাটা মাটি শুধু।

বড়ো হয়ে গেছে তার বেঁচে থাকা সন্তানেরা, গুনতি করা যায় না এত ছেলেমেয়ে, তাদের নিজেদের এখন ছেলেমেয়েভরা সংসার। হঠাৎ সেইসব কলকাকলিভরা সুখসংসারে কোথা থেকে এসে পড়েছে মৃত্যুর করাল ডানার অমোঘ ছায়া।

তিহুক কিন্তু একা, এত অজস্র বৎসর ধরে একা একা, কঠোর কুমার। কেন? কেন তিহুক আর কাউকে নিলো না?

দিলারা লঘু হস্তস্পর্শে চমকে ওঠে, পিছনে ফেরে, তারার আলোয় স্পষ্ট দেখতে পায় তীক্ষ্ণচক্ষু যাদুকরী, তার অগ্নিহীন গুহার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তিহুক। দিলারা উঠে দাঁড়ায়, বলে, " যাদুকর! কী বললো তোমার গণনা? পাওয়া যাবে জরিবুটি? ঠেকানো যাবে মড়ক?"

তিহুকের চোখ দু'খানা জ্বলজ্বল করে অন্ধকারে, লুব্ধক তারার আলোয়- ফিসফিস করে সে বলে, "কেন জিজ্ঞেস করছো দিলারা? এ জাত মরবে। নিঃশেষ হয়ে যাবে। পাপে ভরে গেছে এই দুনিয়া, এদের মরে যাওয়াই ভালো। তারপরে ফের নতুন সৃষ্টি..."

দিলারার গলা কাঁপে, "তিহুক! এসব কী বলছো? এরা সব মরে যাবে? আমার ছেলেমেয়েরা..."

তিহুক অত্যন্ত তিক্ত গলায় বলে, "স্বার্থপর মানুষ কেবল নিজেরটা বাঁচাতে চায়। কিন্তু ঈশ্বর সেকথা ভাবেন না। তার কী এসে যায় ক'টা মানুষ মরলে? "

"তিহুক! তুমি জানো ওষুধ। এই মহামারীর ওষুধ। জেনেও বলবে না কেন? "

দিলারা দু'হাতে মুখ ঢাকে। তিহুক এগিয়ে গিয়ে ওর বাহু চেপে ধরে নির্মম ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, "প্রতিশোধ! দিলারা, প্রতিশোধ!"

দিলারা শিথিল হয়ে গেছে তিহুকের স্পর্শে, এই প্রথম তিহুক ওকে সত্যি সত্যি স্পর্শ করেছে। তিহুকের বলিষ্ঠ দুটো হাতের মধ্যে নিষ্পেষিত হয়ে যাচ্ছে দিলারার শীর্ণ বাহুদ্বয়। দু'হাতে মুখ ঢেকে তিরতির করে কাঁপছে সে। সে শিহরিত হচ্ছে নিবিড় বেদনার পুলকে, বুকে তীব্র ব্যথা, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। ও ফিরে যেতে চায় ওর তারুণ্যে ওর, প্রথম পুষ্পাঞ্জলি হারিয়ে গেছে সময়ের কোন্‌ আড়ালে, স্মৃতিতেও নেই কে প্রথম নিয়েছিলো ওকে। অথবা ও নিয়েছিলো কাকে। কিন্তু কেউ কেউ কেউ দিতে পারেনি এই অনুভূতি, কেউ না। মনে হলো যেন এতকাল পশুর মতন সঙ্গম করে গেছে সে, আরো অসংখ্য পশুর মতন অনুভূতিহীন। অথচ সে জানতো মানুষটি আছে কোথাও, কাছে অথবা দূরে। বড়ো দেরি হয়ে গেলো।

কম্পিত দু'হাতে তিহুকের গলা জড়িয়ে ধরে ওর মুখের কাছে মুখ এনে কাঁদতে কাঁদতে দিলারা বলে, "বোকা বোকা বোকা। প্রকান্ড একটা বোকা তুমি তিহুক। কেন কেন কেন তুমি সেদিন পরাজয় মেনে নিয়ে চলে গেলে? কেন ফিরে এলে না? কেন আর একবার বললে না?"

তৃষ্ণার্তের মতন দিলারার মুখে মুখ রাখে তিহুক। চোখ বন্ধ করে সুখের প্রতিটি পলাতক মুহূর্তকে স্মৃতিতে গেঁথে গেঁথে রাখে দিলারা। দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে রাখে তিহুককে। তারপরে মুখ গুঁজে দেয় ওর বুকে, আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভিজিয়ে দিতে থাকে ওর বুক।

উপত্যকাঘেরা পাহাড়ের গিরিখাতে তখন প্রবেশ করছিলো বহিরাগতেরা। নতুন দেশের নতুন মানুষেরা। তাদের পরনে পশুচর্ম বা গাছের ছাল নয়, কাপড়! তাদের মুখ নরম, তাদের রঙ হাল্কা বাদামী, তাদের চুলে আলো ঠিকরে পড়ে।

সেই অদ্ভুত কালরাত্রির শেষে তিহুক পর্বতশৃঙ্গ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলো। ওর শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়ে যাবার পরে আর ওর একবিন্দু বাঁচার ইচ্ছে ছিলো না মৃত্যুভয়ভীত সেই উপত্যকায়।

দিলারা কিন্তু পারেনি, আশা তাকে সবলে পিছনে টেনে রাখলো। উড়ে যাওয়া শরীরের উপরে-নীচে নীল শূন্যতার সঙ্গমের অসহ্য রতিসুখের অতি কাছ থেকে ফিরে এলো দিলারা। দৃঢ়হস্ত আশা তার দুই কানে ফিসফিসিয়ে বলছিলো তখনো তার বাকী আছে জীবনের কিছু ঋণ।

চোখে মেললাম, ঘুমিয়ে গেছিলাম এই সমুদ্রশিলায়। দূরের বাতিঘর দূর সমুদ্রে আলো ফেলছে, ঐ পুবে কৃষ্ণপক্ষের খন্ডচন্দ্র উঠে আসছে। এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম? শিরশিরে নোনা সমুদ্রবাতাস মুখে ছোঁয়া দিয়ে গেলো।

উঠে এলাম চূড়ায়, অনেক দূর পর্যন্ত দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলাম, ঐ দিগন্তের আড়ালে কোথায় কতদূরে ফটফটে দিনের আলোয় হয়তো কাজে ব্যস্ত আমার উপম।

নোনতা অশ্রুতে ভরে গেলো চোখ। কেন ওকে কাছে পেতে এত ইচ্ছে করছে? আমার দু'খানা হাত অবলম্বহীন শ্বেতকপোতীর মতন খুঁজছে ওর হাতের উষ্ণ আশ্রয়নীড়!

উপরে তাকালাম, মাথার উপরে জ্বলজ্বল করছে চিত্রা তারা। এই তারাকে নাকি চীনদেশে বলে দীর্ঘ আয়ুর দেবতা। শাউ শিং। বনের মতন সবুজ পোশাক পরা একমুখ মেঘের মতন সাদা দাড়ি শাউশিংএর। মুখে লেগে আছে হাসি। ওঁর গল্পটি ভারী সুন্দর। জীবনদেবতা শাউশিং আর রাত্রিনীল পোশাক পরা মৃত্যুদেবতা পিতাউ পৃথিবীর সমস্ত জাতকজাতিকাদের জীবন নিয়ে দাবা খেলেন।সেই খেলার ফলাফল অনুযায়ী মানুষের আয়ু ঠিক হয়। একজন স্বল্পায়ু তরুণ একবার মৃত্যুর মাত্র কিছু দিন আগে বনে শিকার করতে গিয়ে পথ হারিয়ে গভীর অরণ্যে ক্রীড়ারত দুই বৃদ্ধের দেখা পান। তাঁরাই ছিলেন শাউশিং আর পিতাউ।তরুণের কাকুতি মিনতিতে গলে গিয়ে এনারা ওর আয়ু ১৯ থেকে উল্টিয়ে ৯১ করে দেন !

হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রশ্ন মনে জাগলো। আচ্ছা, যে আসছে সে কেমন হবে? সুন্দর? সুস্থসবল? দীর্ঘায়ু?

৩। গ্রীষ্মের চাঁদের আলোয় চকচক করছিলো আগন্তুকদের মুখ। চুল আর চোখ। বহুদূরের গ্রীষ্মদগ্ধ অনাবৃষ্টিপীড়িত তৃণভূমি থেকে সবুজতর ভূমির সন্ধানে ওরা এসে ঢুকেছিলো ঐ পাহাড়ের মালায় ঘেরা উপত্যকাটিতে। সঙ্গে ওদের অনেক পশু ছিলো, তৃণভোজী পালিত পশু,যারা ওদের খাদ্য ও আবরণ জোগায়। আর ছিলো পালিত কিছু মাংসাশী পশু যারা পাহারা দিয়ে রক্ষা করে পশুধন। হাতে ছিলো দীর্ঘ বর্শা, কাঁধে তীরভরা তূণ ও ধনুক। পরনে হাল্কা কাপড়।ওরা ছিলো সতর্ক ও সদাপ্রস্তুত। নিজেদের তাঁবু টাবু খাটিয়ে চারিদিকে আগুন জ্বেলে পাহারা বন্দোবস্ত করে তবে ওরা নিদ্রা গেল।

উপত্যকার মড়কলাগা হতাবশিষ্ট উপজাতিটি ওদের তেমন কোনো বাধাই দিতে পারেনি। ওদের কাছে ভালো ভালো ভেষজ ছিলো, মহামারীর প্রতিষেধক। ওরা রোগগ্রস্ত এই অসহায় মানুষদেরও চিকিৎসা করলো, ক্রীতদাস পাবে বলে।

উপত্যকাবাসী এদের বিশ্বাস ছিলো হাল্কা বাদামী উজ্জ্বলচক্ষু ঐ মানুষেরা আকাশ থেকে আসা মানুষ। নইলে ওদের মুখ এত নরম কেন? ওদের রঙ এত ফর্সা কেন? কেন ওদের কারু কারু চোখে আকাশের রঙ?

তাই মহামারী দূর করে ওরা যখন পুরোপুরি দখল নিয়ে বসেছে, শিশু পরিণতবয়স্ক নির্বিশেষে এদের প্রায় সকলকেই দাসদাসীতে পরিণত করেছে, অত্যাচার করে তীব্র জয়ের আনন্দ পয়েছে, তখনো এই সরল বিশ্বাসীরা ওদের আকাশের মানুষ ভেবে গেছে। চাবুক খেয়েও বিশ্বাসে চিড় ধরেনি, দু'হাত দিয়ে রক্ত মুছতে মুছতে নীরবে চলে গেছে কাজ করতে।

প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিলো এক তীব্র গ্রীষ্মবেলায়, উপত্যকার গাঢ় বাদামী একটি তরুণ এক শীর্ণ বৃদ্ধকে প্রহারোদ্যত প্রভুর হাতের চাবুক কেড়ে নিয়ে বলেছিলো, "কেন মারছো বুড়ো মানুষকে? ও মরে যাবে মারলে। ওর বদলে আমায় মারো।"

কেড়ে নেওয়া চাবুকটা প্রভুর হাতে দিয়ে নিজের পিঠের অল্পছিন্ন আবরণ মুক্ত করে দিয়ে বলেছিলো, " এসো, শুরু করো। ও বেচারাকে ছেড়ে দাও।" ছেলেটার পিঠ শুকনো চাবুকদাগে ভর্তি ছিলো, কোনো কোনোটা আধাশুকনো।

অত্যন্ত অবাক হয়ে প্রভু জিজ্ঞেস করেছিলো," এই বুড়ো তোমার কেউ হয়, তোমার আত্মীয়? ওকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে মার খেতে চাইছো?"

ছেলেটা মাথা নেড়ে বললো, " না, আমার আত্মীয় না। না, তাই বা কীকরে বলি? আমাদেরই তো একজন।"

আর, বুড়ো মানুষটি যে শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে গেল, সে এত অবাক হয়েছিলো যে কোনো কথাই বলতে পারেনি, খুব অবাক হয়ে তাকিয়েছিলো শুধু।

প্রভুর হাত থেকে খসে পড়ে গেছিলো চাবুকটা, ছেলেটার হাত ধরে সে বলেছিলো," তোমাকে রোজ দেখি কাজ করতে, কিন্তু তোমার নাম তো জানিনা। কী বলে ডাকবো?"

তরুণ এরকম আশাই করেনি, অবাক হয়ে বলেছিলো," আমার নাম? আমার নাম তিন্দুক। কিন্তু ফেলে দিলে যে ওটা! মারবে না?"

"না,না, তোমায়...কেন শুধু শুধু... কিছু দোষ নেই তো তোমার... কিছু মনে না করো যদি, আমার ঘরে আসবে? এই এত দুপুর, এত গরম, নিশ্চয় তেষ্টা পেয়েছে তোমার। জল আর একটু খাবার দেবো তোমায়। তোমার কথা একটু শুনবো, আসবে?"

তিন্দুক একটু হাসলো, বললো," চলো। আমার কথা কী আর শুনবে? কিছুই তেমন নেই। তবু চলো। সত্যি বড্ড তেষ্টা পেয়েছিলো।"

তিন্দুকের হাত ধরে প্রভু নিজের তাঁবুতে নিয়ে যান। জল আর মিষ্টি দেন। তিন্দুক আগে জলটুকু খেয়ে এমন করে ধন্যবাদ দেয় যে প্রভু বিস্মিত, এতটা সভ্য ব্যবহার যেন তিনি ক্রীতদাসের কাছ থেকে আশাই করেননি!

শান্তমুখ দুঃখী ছেলেটি তার ক্রীতদাস, এটা মনে হতেই কেমন যেন লাগে ওনার। "তিন্দুক, কে কে আছে তোমার বাড়ীতে?"

তিন্দুক মাথা নীচু করে থাকে, কিছু বলে না। হঠাৎ প্রভুর ঘাড়ের রোঁয়া খাড়া হয়ে ওঠে, এই ছেলেটা তার অধীনস্থ, একে তিনি এইবারে যা খুশী করতে পারেন এটা মনে হতেই।

তিনি ওর বাহুর কাছটা জোরে চেপে ধরে বলেন,"কথার উত্তর দাও না কেন? শাস্তি পেতে চাও?" অন্য হাতে চাবুক উঠে আসে।

চাবুক খেতে খেতে শিথিল হয়ে গড়িয়ে পড়ে যায় তিন্দুক, দুর্বল বিষন্ন গলায় বলে, "আমার কেউ নেই, একলা থাকি, তাই কিছু বলিনি। কী বলবো? মাঝে মাঝে তোমার লোকেরা খুব মারে, খুব বেশী কেটে গেলে বুড়ী দিলারার কাছে যাই। ও দয়া করে ওষুধ দেয়। তাড়াতাড়ি ঘা সেরে যায়, ওর ওষুধ ভালো।"

প্রভু ওকে ধরে তোলেন, "তোমার কেউ নেই? তোমার মা বাবা ভাই বোন?"

শুকনো গলায় তিন্দুক খাবি খেয়ে খেয়ে বলে," কেউ নেই। বাড়ীতে একলা গিয়ে পড়ে থাকি মেঝেতে, অন্যেরা বাড়ীতে গিয়ে খাবার পায়, আমি বাইরে থেকেই খেয়ে দেয়ে বাড়ী গিয়ে শুধু ঘুমাই। কতদিন কিছু খাইও না। এখানে মহামারী অসুখের সময় আমি অরণ্যে শিকারে গেছিলাম, ফিরে এসে ... ফিরে এসে দেখি সবাই .... ঘুমিয়ে গেছে একদম চিরদিনের জন্য।মাটি খুঁড়ে সমাধি দিয়েছিলাম।" তিন্দুক ডানহাত তুলে চোখ মোছে।

অত্যাচারী লোকটি তিন্দুকের কপালে হাত বুলিয়ে বলেন," আমি জানতাম না। তোমার কষ্ট হলো। মাফ করো। উত্তর দিচ্ছ না দেখে রাগ হলো। "

"না, ঠিক আছে। তাতে কী হয়েছে? " তিন্দুক কেমন অদ্ভুত অভিমানী গলায় বলে।

লোকটি তিন্দুককে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, "আমার এখানে থাকো। কেউ নেই বললে তোমার। আমার এই এত তাঁবু, এত পশু, এত দাসদাসী, স্ত্রী আছেন বেশ ক'জন, কন্যারা আছে,কিন্তু কোনো ছেলে নেই আমার। তুমি থাকবে আমার সঙ্গে? তোমায় খুব ভালো লেগেছে আমার, তোমার খুব সাহস আর অনেক শক্তি। তোমার মনটি অতুলনীয়। এর আগে আমি কাউকে দেখিনি অন্যকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে বিপন্ন করে। তুমি প্রথম।"

তিন্দুক কিন্তু কুঁকড়ে যায়, বলে," আমার আচার-বিচার যে অন্যরকম। তোমার এখানে থাকলে হয়তো তা পালন করা সম্ভব হবে না। তুমি হয়তো রেগে যাবে, ব্যঙ্গ করবে। আমি যে অসভ্য ক্রীতদাস, তাই আমার দূরে থাকাই তো ভালো।"

খুব ব্যথিত হয়ে প্রভু বললেন, "কেন ব্যঙ্গ করবো? তুমি স্বাধীনভাবে তোমার আচার-বিচার পালন করবে। "

কুঁকড়ে গিয়ে তিন্দুক বলে," তুমি যদি চাও, আমি কাজের পরে এসে তোমার সেবা করবো। কিন্তু সারারাত থাকতে বোলো না। জানি, তোমরা আমাদের অসভ্য বলো, আমাদের ভালো চোখে দেখো না। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমরা আর কারুর ক্ষতি করিনা।"

তিন্দুক কিছুতেই রাতে থাকতে রাজী হয় না। প্রভুও জোর করতে পারেন না, ভালোবেসে ফেলেছেন যে! তাকে কি আর জোর করা যায়?

৪। ঘুম ভেঙে গেল। সকালের নরম রাঙা আলো পড়েছে জানালা দিয়ে দেয়ালে। চৌকো আলোকিত অংশটায় কী যে খুশী!

টুং টুং করে বেজে ওঠে বালিশের পাশে রাখা মুঠাফোন, কানে তুলে নিই চট করে। ওপারে উপম! ও কীকরে জানলো কাল রাতে মনখারাপ করেছিলো ওর জন্য?

বেশ অনেকক্ষণ কথা হলো। ওর ছুটি পেতে আরো মাস পাঁচেক। ততদিনে নতুন মানুষটির পৃথিবীর আলো দেখার সময় হয়ে যাবে।

নদীর ধারার মতন বয়ে যায় কাল। আমাদের ঘড়িতে অবিরত টিকটিকটিক টিক.... ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ে উড়ে ঋতু বদলে যেতে থাকে।

এখন অতদূর হাঁটতে রীতিমতন কষ্ট হয় এতখানি ভার নিয়ে। তবু প্রত্যেক বিকেলে না গিয়ে পারিনে। ছোট্টো ছোট্টো ধাক্কায় ভেতরের সে ঠেলতে থাকে আমায়। ও কী করে বোঝে? ও কি দেখতে পায় সমুদ্র? ওর অন্যরকম বিশ্বে ? কেমন সমুদ্রগর্জন শোনে ও?

কাপড় সরিয়ে হাত রাখি সাবধানে। তিরতির করছে। ওটা কি ওর হৃদপিন্ড? মুখ? হাতের মুঠি?

উপম এলো অবশেষে। এতদিনের তৃষ্ণায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা পরস্পরের উপরে। ওষ্ঠাধর ছিঁড়ে যেতে লাগলো তীব্র আগ্রাসী চুম্বনে, তীব্র কান্নার ঝড়ে বেসমাল হয়ে পড়লাম, বুকের উপরে ওর হাত চেপে রেখে কাঁদতে লাগলাম।

পেটের উপরে কান রেখে ঘুমিয়ে পড়লো বেচারা উপম। খুব খুব ক্লান্তি এসে গ্রাস করে ফেললো আমাকেও। গাঢ়তর পর্দার মতন ঢেকে দিলো চেতনা।

তিন্দুক আর রুশার বিবাহ। সে এক অদ্ভুত বিবাহ। তিন্দুক রুশাকে নিয়ে পালাচ্ছিলো। রুশা ওর বস্ত্রের মধ্যে লুকানো লৌহ অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলো তিন্দুকের বুকে। রক্তে ভেসে যেতে যেতেও তিন্দুকের দৌড়ের গতি কমলো না।

অবশেষে পাহাড়ে পৌঁছে রুশাকে নামিয়ে তিন্দুক দু'হাত ভরে গোলা আবীরের মতন রক্ত রুশার সোনালী চুলে মাখিয়ে দিয়ে অচেতন হয়ে পড়ে গেলো। বাকশক্তিহীন হয়ে বসে রইলো রুশা। অস্তগামী চাঁদের আলোয় ওর নীল চোখে জল চকচক করে উঠলো।

সমুদ্রের ভীমকল্লোলে জেগে উঠলাম আমি আর উপম একই সঙ্গে। এমন ভয়াবহ গর্জন আগে আর শুনিনি। উপম আমাকে দুইবাহুতে তুলে নিয়ে বললো, "উর্বী, পালাতে হবে, সমুদ্র ছুটে আসছে। উঁচু জায়গায় ছুটে পালাতে হবে। এসব ডুবে যাবে এখনি।"

অর্ধ চেতনায় সমুদ্রদুলুনির মধ্যে ওর গলা জড়িয়ে রাখি দুই হাতে। ভেতরে অনুভব করি তীব্র ধাক্কা, সে ছটফট করছে। ভয়ে নাকি উত্তেজনায়?

আমরা উঁচু পাথুরে টিলায় এসে পৌঁছই। প্রলয় তরঙ্গ আছড়ে পড়ছে পাড়ে পাড়ে, দূর থেকে অদ্ভুত শব্দ সমষ্টি এসে পৌঁছচ্ছে ক্লান্ত চেতনায়।

টিলার সবচেয়ে উঁচু অংশে একটি শক্ত গুল্মের নীচে উপম শুইয়ে দিলো আমায়। নিজেও ক্লান্ত হয়ে এলিয়ে পড়লো পাশে।

দিলারার গুহায় সকাল হচ্ছে। রুশা আর তিন্দুক সেখানে পৌঁছেছে হাত ধরাধরি করে। তিন্দুকের চোখেমুখে ঝর্ণার জলের ঝাপটা দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছিলো রুশা। উদয়োন্মুখ ঊষার আলোয় গুহার বাইরে বেরিয়ে এসে দিলারা দেখলো রুশার টলটলে চোখে আকাশ। আকাশের কন্যা সে, ঐ দিগন্তকুহেলীর পারে একদিন নেমেছিলো পৃথিবীকে ভালোবেসে।

দু'জনকে বিবাহ দেবার সময় দিলারা রুশার মুখখানি দুইহাতে ধরে বলে, "তুমি সত্যি আকাশ থেকে এসেছ?"

রুশা মাথা নাড়ে, বলে, "না,না, দূরের দেশ থেকে।"

দিলারা বলে, "তাহলে তোমার চোখে কেন আকাশ? আমার চোখে তো নেই?"

রুশা অস্ফুটে কী যেন বললো, দিলারা শুনতে পায় না।

ঘুম ভেঙে গেলো। উপম নারকেল পেড়ে এনেছে টিলার ওধারের গাছ থেকে। পাথরের ফলা দিয়ে খোসা ছাড়িয়ে পাথরে ঠুকে ঠুকে ভেঙে জল দিলো মুখে। আহ, শান্তি। এত তৃষ্ণার্ত ছিলাম বুঝতে পারিনি।

চারিদিক জলে জলময়। মাঝেখানে দ্বীপের মতন একটু জায়গার উপরে আমরা দু'জন। পৃথিবী জুড়ে কী অবস্থা? কিছুই জানিনা, কোনো খবরই নেই।

পরস্পরের হাতে হাত রেখে শুয়ে থাকি দু'জন। সহসা জল ভাঙার শব্দ, সে বাইরে আসতে চাইছে। তীব্র যন্ত্রনায় দেহ ছিঁড়ে যেতে থাকে, দু'হাতে এত শক্ত করে উপমের হাত ধরি যে ওর হাত নীল হয়ে ওঠে। "উর্বী উর্বী, প্লীজ, বি স্টেডি। কোনো ভয় নেই। "

দিনের আলো মিলিয়ে আসে যন্ত্রনার প্রহরগুলির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে। নিশ্চেতনার পর্দা এসে সন্ধ্যার মতো অবশ করে দেয়।

নদীর কিনারে দিলারার জটাবাঁধা চুল পলি মেখে জলে দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছে রুশা। ঝিনুক দিয়ে কেটে দিচ্ছে নখ। অবাক হয়ে দেখছে দিলারা, তার সম্মুখে আকাশের কন্যা! এত আলো ঐ আকাশনীল দু'চোখে।

"কেন আমায় সত্যি করে বলো না রুশা, তুমি কি আকাশ থেকে এসেছ? কেমন সে জায়গা?"

রুশা হাসে, সে দিলারাকে বিশ্বাস করাতে পারেনা।

"দিলারা তোমার চোখেও তো আকাশ! তুমি কি আকাশ থেকে এসেছ?"

বিষন্ন দুঃখীর মতন দিলারা বলে, "কই আমার চোখে আকাশ? আমার চোখ তো কালো, তোমার মতন নীল তো নয়!"

দৃশ্যটা মিলিয়ে যায়। তারপরে দেখি শেষরাত্রের অন্ধকারে ঘুমন্ত দিলারাকে ঠেলে তুলছে রুশা, "দিলারা, দিলারা, ওঠো ওঠো। "

-"কী হলো?" চমকে জেগে ওঠে দিলারা।

রুশা ওকে গুহার বাইরে এনে কোটি তারায় ভরা আকাশের নীচে দাঁড় করিয়ে বলে, "কে বলেছে তোমার চোখে আকাশ নেই? এবারে বলো তুমি কোথা থেকে এসেছ।"

দিলারা তারার আলোয় স্বপ্নকন্যার সম্মুখে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট অনুভব করে তার ও তিহুকের অনাগত শিশুরা খিলখিল করে খেলে বেড়াচ্ছে তিন্দুক রুশার উঠানে, তাদের চোখে টলটলে আকাশ।

মন্ত্র পড়ে রুশাকে সর্বস্ব সমর্পণ করে দিলারা ঘুমিয়ে পড়ে, তার কাজ শেষ হয়ে গেছে।

ভোররাত্রে নিশ্চেতনা কেটে যায়। তীব্র চিৎকারে আঁধার ভেদ করে বেরিয়ে আসে ভবিষ্যতের পৃথিবী, তার চোখে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে আকাশ। ধবল দুগ্ধধারে ঢেকে যেতে থাকে পাথর, গুল্মকান্ড ও মাটি। সন্তানের তৃষ্ণার্ত মুখ এসে থামে দুগ্ধধারায়।

প্রলয় পরের পৃথিবীতে হে উপম, বহন করে নিয়ে যাও এই আত্মা, এই যুগাতীত রহস্য, এই কাল ভেদ করে আসা মৃত্যুঞ্জয়ী ধারা। উর্বীর ব্যবহৃত জড়দেহ শুয়ে থাক এখানেই, এই গুল্মছায়ায়, সমুদ্রকিনারের পাহাড়ে।

মধুর বাতাস প্রবাহিত হোক, সমুদ্র মধুক্ষরণ করুক, মধুর হোক পৃথিবীর ধূলি। রাত্রি মধুর হোক, মধুময়ী হোক সন্ধ্যা উষা.....

(শেষ)

Saturday, October 26, 2013

হেমন্তদিনের পথযাত্রা

সে অনেকদিন আগের কথা। আমাদের দীর্ঘ পথযাত্রা শুরু হয়েছিলো এক অক্টোবরের শেষদিনের দুপুরে। মোবাইলে আবার সব সবক'জনে মিলে "রোড ট্রিইইইইপ" বলে একজনকে শোনানো হচ্ছিলো আর উনি মোবাইলের মধ্য থেকে অভূতপূর্ব শব্দ শুনে হাসছিলেন।

যাইহোক, পালা করে চালানো হবে ঠিক হয়েছিলো আর যদ্দূর যাওয়া যায় গিয়ে গভীর রাতে কোনো সরাইয়ে ওঠার কথা ছিলো। হাজার মাইলের পথযাত্রা, একটানা তো সম্ভব না। থামতেই হবে। কিন্তু প্ল্যান অনুযায়ী কিছু হলো না, বিকালে এক ইটালিয়ান রেস্তরাঁয় খেতে থামা হলো, সেখানে বেশ অনেকটা সময় লেগে গেলো এক সঙ্গী একটু অসুস্থ হয়ে পড়ায়।

পরে রাত্রে গাড়ী চলছে, যিনি চালাচ্ছেন তার ঘুম এসে যাচ্ছে, পাশ দিয়ে দৈত্যের মতন সব ট্রাক... ভয়ে উদ্বেগে বাকীরা অস্থির। রাত একটায় থামা হলো পথের ধারের কম্ফর্ট ইন এ। দোতলায় দুই ঘর মিললো,সব কজনে দুই ঘরে ভাগ হয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়া, সকালে উঠে ফের নতুন করে পথে, হিট দ্য রোড এগেইন...

এসব দীর্ঘ যাত্রায় অডিও-বই খুব ভালো জিনিস, যন্ত্রের মধ্য থেকে শান্ত ধীরগতি গলাটি পড়ে যায় গল্প, শুনতে শুনতে চালাতে থাকে চালক, শুনতে থাকে অরোহীরা, পথের একঘেয়েমি কেটে যায়। সেই বেতালের গপ্পো শুনতে শুনতে রাজা বিক্রমের পথচলার মতন, তবে গল্পের শেষে প্রশ্ন নেই, এইটা অনেক সুবিধে।

বনপাহাড়ের ভিতর দিয়ে কেটে বেরিয়ে গেছে আন্তঃরাজ্যমহাসড়ক। চারিপাশে ছড়ানো হেমন্ত সৌন্দর্য্য। পাহাড়ের গা ভরে সমস্ত গাছপালার পাতাগুলো রঙীন হয়ে গেছে-লাল, বাদামী, কমলা, হলুদ-ঝরে যাবার আগে ওরা এত রঙীন হয়ে যায়, তারপরে গাছেরা ন্যাড়া বৈরাগী হয়ে যাবে গোটা শীতকালের জন্য, এ ক্ষণিক রাঙাবাস খসে যাবে ধারালো শীতবাতাসে, তারপরে নামবে তুষার। এখন এই অপূর্ব ফল-কালারের উপরে ঝলমল করছে হেমন্তের সোনালী রোদ,নেশা ধরানো সৌন্দর্য্য। মনে পড়ে যায় এই সময়েই তো আমার দেশে ধানের উপরে কোমল উজল রোদ ছড়িয়ে গেছে দূর কতদূর...

এরপরে তো ধান পাকবে, ধানকাটা হবে, তুলে আঁটি বেধে নিয়ে যাবে, গাঁয়ের পথ ভরে যাবে ধান্যসুবাসে...

দেখতে দেখতে পাহাড়নদীর পাশ দিয়ে ভুটাক্ষেতের দেশে চলে আসি আমরা। যে ছোট্টো শান্ত শহরটিতে আমরা অতিথি, সেখানে গিয়ে মুগ্ধ। বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সমস্ত গাছেরা ফল কালারে সেজেছে, অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য। ছবিতে এর শতাংশে একাংশও ফুটবে না, তবু ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক। বহমান সময়ধরাকে দু'হাতের অঞ্জলিতে একটুখানি ধরে রাখার চেষ্টা। চিরবৃদ্ধ অথচ চিরতরুণ কাল হাসে মানবশিশুদের ব্যর্থ এ চেষ্টা দেখে।

গিয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেছিলো, হোস্ট ভদ্রলোক নিয়ে গেলেন ডিনারে। এঁরই ষাটতম জন্মদিন উপলক্ষ্যে কনফারেন্স, আয়োজন করছেন প্রাক্তন ছাত্রশিষ্যেরা।

ডিনারের জন্য বুক করা ছিলো ঝর্ণাধারার কাছ ঘেঁষে হোটেল, ঝর্ণার উপরে মুখ বাড়ানো একটি ঘর, চারিধারে স্বচ্ছ কাঁচ আবরণী ঘেরা, সেখানেই আয়েশ করে বসে অতিথিদের খাদ্যপানীয়ের ব্যবস্থা।তখন সূর্য পশ্চিমে একদম দিগন্তে ঢলে গেছে, আলো আঁধারি জলধারার উঁচু পাড়ির উপরে একটি গাছ হেমন্তে সোনালী হয়ে যাওয়া পত্রসম্ভার নিয়ে ঝরঝর করে কাঁপছে সন্ধ্যার বাতাসে---কী অপূর্ব অনুভবী দৃশ্য। পৃথিবী কী আশ্চর্য সুন্দরী! ঋতুতে ঋতুতে প্রহরে প্রহরে কী অপরূপ তার সাজবদল রঙবদল সুরভিবদল সুরবদল। অবন ঠাকুরের ছবিকলমখানি থাকলে হয়তো বর্ণনা করতে পারতাম, কিন্তু আমার ছবিহীন এই রুখু কলমে সে বর্ণনা অসম্ভব।

তবু কেন লিখি? কেন এই অস্থির আকাঙ্ক্ষা? মনে হয় আকাশ-বাতাস জল-পাহাড়-গাছপালা-মানুষজন সব কিছু নিয়ে সমস্ত দৃশ্যখানি নকশীকাঁথার মতন মুড়ে উপহার পাঠিয়ে দিই সেই প্রিয়জনকে যে প্রান্তটুকু ছুঁয়েই বুঝে ফেলবে গোটাগুটি সবটাই, যা দেখা যায় তাও যা না দেখা যায় তাও-যা কিছু রয়েছে আঁকা আর যা কিছু পাওয়া গেলো অনুভবে-তার এতটুকুও বাদ যাবে না ওর বুঝতে। কিন্তু সেতো হবার নয়, এ যে জলচারী মীনের আকাশ ছোঁয়ার সাধ! তাই বুঝি দেখতে গিয়ে সব ঝাপসা হয়ে যায় নোনতা অশ্রুতে?

দু'দিন থাকা হলো সেখানে, সদ্যপরিচিত মানুষগুলোর আন্তরিক আতিথেয়তা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পৃথিবীতে কত ঋণ থেকে যায়, কোনো কোনো ঋণে ঋণী থেকেই সুখ। "তুমি যে তুমিই ওগো, সেই তব ঋণ..."

ফেরার পথ আবার সেই অপরূপ সৌন্দর্য্যের মধ্য দিয়ে-পথে বেরুলেই কেমন একটা লাগে, বোধহয় সেই বিস্মৃত পূর্বজদের যাযাবর রক্ত বুকের মধ্যে কোলাহল করে ওঠে, সেই যে এক কবি বলেছিলো- "তারাই যথার্থ যাত্রী যারা চলে যায়

কেবল যাবারই জন্য-

হাল্কা মন, বেলুনের মতন

নিশিত নিয়তি ফেলে একবার ফিরে না তাকায়

কেন তা জানে না,তবু চলো চলো বলে অবিরত

তাদের বাসনা পায় মেঘপুঞ্জে উজ্জ্বল বিন্যাস

স্বপ্নে হানা দিয়ে যায় সৈনিকেরে যেমন কামান

অপরিবর্তনীয় দেশ, মহাশূন্যে ইন্দ্রিয়বিলাস

যার নাম কখনো জানে নি কোনো মানবসন্তান..."

বনপাহাড়ীর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ যাত্রায় বারে বারে ফিরে আসে কবেকার এই লাইনগুলো, উড়ন্ত রঙীন পালকের মতন ভেসে যায় যেন, আকাশে তখন রঙীন মেঘ, বেলা ঢলে এলো, আরেকটু পরেই রাতবাতিরা জ্বলে জ্বলে উঠবে। রাত্রির সরাই এ বিশ্রামের পরে আবার পরদিন সকালে চলা শুরু, একসময় এসে গেল চেনা শহর, ক্লান্ত আমরা ফিরে যাবো যে যার নীড়ে।

কিন্তু পথ ফুরাবে না, সে অনিঃশেষ বয়ে গেছে, এক সূর্যোদয় থেকে নতুন সূর্যোদয়ের দিকে, দেশ থেকে দেশান্তরে, কাল থেকে কালান্তরে ... সেই পথযাত্রার আনন্দতিলক কি পড়বে এসে এই কপালে, পরিব্রজনপ্রিয় পা দু'টি যে পথের ডাকে খুশী হয়ে ওঠে?

"এই পথ যদি না শেষ হয়..."

Thursday, October 24, 2013

অশূন্য অমৃত

টুকরো টুকরো দ্বীপেরা ছড়িয়ে আছে। অসেতুসম্ভব সব দ্বীপেরা। মাঝে বয়ে গেছে বিচ্ছেদের আর বিষাদের নোনাপানি। অবিশ্বাস আর বেদনার নীল সমুদ্র। একদিন এইরকমই এক দ্বীপে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। মাঝে মাঝে গতজন্মস্মৃতির মতন মনে পড়ে বহুদিন আগে আমরা একটা মহাদেশে থাকতাম।

দিনগুলো কেমন ছিলো তখন? সোনালী, রূপালী, মেঘলা, রোদ্দুরে ঝলসানো, শুভ্র মেঘের ওড়না ওড়া সোনারঙের দিন--সবই ছিলো। নানারকম সব দিন। টুংটাং রুনরুন ঝমঝম করে তাদের নিজস্ব বাজনা বাজিয়ে চলে গেছে সেইসব দিনেরা। নিজের নিজের রঙে রাঙিয়ে দিয়ে গেছে স্মৃতিবেদনার অশূন্য অমৃতপাত্র।

তখন আমরা একটা মহাদেশে থাকতাম, ভাগ করে নিতাম সুখদুঃখের খুদকুঁড়ো। তখন আমরা একে অন্যের কথা মন দিয়ে শুনতাম, বুঝতাম ও। একইসঙ্গে বেরোতাম জল আনতে, ফল পাড়তে, মাটি চষতে। আমাদের আয়না ছিলো না, একে অন্যের চোখের আয়নায় নিজেদের দেখে নিতাম। কখনও বা স্বচ্ছ জলে নিজেদের মুখ দেখতাম বনফুলের মালা চূড়ায় পরে। তখন সবকিছু এত ঘোলা হয়ে যায় নি। তখন বাতাস অনেক নির্মল ছিলো, তখন জল অনেক জীবনময়ী ছিলো। তখন সব অন্নই পরমান্ন ছিলো।

দিনেরা চলে গেছে তাদের নিজের নিয়মে। গেছে কিন্তু সব এত ভেঙে দিয়ে গেল কেন? এত ভেঙে দিতেই কি চেয়েছিলো তারা? জগতের নিয়মই কী এই? মহাদেশ ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে যাবে টুকরো টুকরো দ্বীপ হয়ে? আর সেতু ও থাকবে না দ্বীপ থেকে দ্বীপে যাবার ? তবে প্লেট টেকটনিকের পন্ডিতেরা যে ভিন্ন কথা বলে? তারা যে বলে সব মিলেমিশে আবার এক হবে? সে কবে? কত কল্পকল্পান্ত পরে? কত অতল অন্ধকার পার হয়ে?

আমার অসেতু দ্বীপে বেলা পড়ে আসে, সূর্য নামে পাটে। সন্ধ্যার কমলা মেঘেরা রঙ হারাতে থাকে আস্তে আস্তে। শীতশিহরিত শীর্ণ নদীটি পার হয়ে ফিরে যাই আগুন-ওম্‌ ভরা গুহায়, ঘুমের মধ্যে সমর্পণ করি নিজেকে। স্বপ্নে ফিরে আসে পুরানো সব কথারা আবার। অবচেতনের জল সরিয়ে সরিয়ে ভেসে ওঠা মাছেরা-শত শত রুই, কাতলা, হাঙর, কুমীর, ডলফিন, তিমি, সিন্ধুঘোটকেরা।

বেশীদিন আগের কথা ও তো না! এরই মধ্যে গতজন্মস্মৃতির মতন সুদূর হয়ে গেলো সব? এত দ্রুত বিশ্বাস ভেঙে যায়? যেতে পারে? এত দ্রুত বন্ধুদের মুখ মুখোশের মতন খসে পড়ে? বেরিয়ে আসে আদিম হিংস্র জোটবদ্ধ আক্রমণকারীদের মুখ? ন্যায়-নীতি সব জলাঞ্জলি যায় এত সহজে? দলছুটকে সবাই মিলে পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে হত্যা করে দলবদ্ধেরা? একজনও থাকে না সেই যূথচ্যুতের পাশে দাঁড়াবার মতন? তার ন্যায্য কথা সব চাপা পড়ে যায় সম্মিলিত জান্তব চিৎকারে?

তবু নাকি বিশ্বাস হারাতে নেই, তবু নাকি আশা রাখতে হয়। সুপ্রাচীন পিতামহ মনে করিয়ে দিয়েছিলেন খুব কঠিন সময়ে। বারে বারে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তাই ঝড়ের রাতে কালির মতন কালো অন্ধকারে ছোটো ডিঙাখানি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম সব ছেড়ে, নইলে হয়তো বিশ্বাসটুকুও বাঁচাতে পারতাম না। ঝড়ের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে ক্লান্ত ডিঙাখান আমায় এখানে এনে আছড়ে ফেলেছিলো। পরদিন চেতনা ফিরে পেয়ে দেখেছিলাম পুবে ফরসা হয়ে আসছে, ছোট্টো দ্বীপে ভোর হচ্ছে।

তারপরে কেটে গেলো কতকাল,সে যে কতকাল! ভাঙা ডিঙা মেরামত করে এদিক ওদিক ভেসে ভেসে বেড়াই, টুকরো টুকরো দ্বীপগুলোর পাশ দিয়ে ভেসে যাই। আশায় থাকি হয়তো দেখবো কোনো "সবুজ ঘাসের দেশ" কোনো "দারুচিনি দ্বীপের ভিতর।" হয়তো দেখবো কোনো শান্ত বিশ্বাসের আদিগন্ত ভূমি, সোনার ফসল দুলছে যেখানে। বনফুলের মালা চূড়ায় পরে মেলায় যাচ্ছে তারা সবাই মিলে, বন্ধু বলে হাত বাড়াতে দ্বিধা নেই যাদের। আমার আশার তরী নিয়ে ঘুরে বেড়াই ঘাটে আঘাটায়, কিজানি কোথায় আছে সেই সাধের ভূমি!

মাঝে মাঝে কোথা থেকে জানি ভেসে আসে অদ্ভুত সুন্দর এক সুর, সে সুরে অসীম করুণা, বোধাতীত গরিমা। বুঝি বা নক্ষত্রের অক্ষরে তার স্বরলিপি লেখা! আমার ক্লান্ত আশা শক্তি ফিরে পায় সেই সুরে। সারাদিন ঘুরে ফিরে এসে যখন বসি তারাফোটা আকাশের নিচে, তখন কোনো অলীক নীলপাখির মতন কানে কানে কে বলে যায়, "আছে, আছে, আছে।"

আশার ডানায় ভর করে পাড়ি দিয়ে চলি অসেতুসম্ভব সময়ের সমুদ্র। আলোকের দূত বলে," পার আছে, পার আছে।" আমি পরম বিশ্বাসে তার হাতে হাত রেখে বলি, "জানি।"

*****

ইচ্ছে-বাতাস

কারা যেন কানের কাছে ফিসফিস করে ওঠে, শুনতে পাই অনেক গলার স্বর-- কোনোটা হাল্কা কচি স্বর, কোনোটা গম্ভীর জোরালো, কোনোটা মেয়েলী কোমল স্বর-প্রায় গানের মতন সুরেলা, কোনোটা দানা-দানা পুরুষালী স্বর, কোনোটা তীক্ষ্ণ চড়া স্বর, কোনোটা তরুপত্রে বাতাসের মর্মরের মতন নরম স্বর। ওরা বলে, "বলবে না আমাদের কথা?"

কাগজের উপরে কলম সরে সরে যেতে থাকে, অক্ষরের পর অক্ষর, শব্দের পর শব্দেরা উঠে আসতে থাকে, সেসব ঐ স্বরগুলোর গল্প। একসময় দেখি তাদের গল্পের একেকটা অংশ কখন পুরো বা অর্ধেক ফুটে উঠেছে কাগজের উপরে। তখন ঐ কুঁড়ির মতন ক্ষুদে ক্ষুদে শব্দগুলো কথা বলতে থাকে, অন্ধকার থেকে আলোর ফুলের মতন ফুটে উঠতে চায় তারা, তাই...

ইচ্ছে-বাতাস উড়ছে আমার বেভুল বাগান পথের বাঁকে

জাঁকজমকের উড়নতুবড়ি জ্বলতে জ্বলতে পুড়তে থাকে।

এই দ্যাখো এই তুলির টানে লেবুরঙের সকাল আঁকি-

এই দ্যাখো এই শিশির ফোঁটায় রাত্রিবিষাদ লুকিয়ে রাখি।

এই দ্যাখো সব মুছে দিলাম ঝড়বিকালের এক ঝাপটে

ঐ দ্যাখো সেই কাচপোকা টিপ বন্ধ ঘরের ঐ কপাটে।

কথার শেষে চুপকথামন একলা হয়ে উদাসচোখে

সাঁঝদিঘিটির আয়্নাজলে মুখ দেখতে অবাক ঝোঁকে।

আলতো হাতে দরজা ঠেলি সেই আমাদের সবুজ বাড়ি

মধ্যরাতের মেলগাড়িতে তারায় তারায় অবাক পাড়ি।

*******

সেইসব বসন্তদিন

সে অনেকদিন আগের কথা। দূর দক্ষিণের এক ছোট্টো সবুজ শহরে তখন থাকতাম। আপনদেশের মাঠের থেকে শিকড়সমেত উপড়ে নেওয়া একলা একটা গাছের মতন গিয়ে সেখানে যখন প্রথম নামলাম, তখন ঘোর শীত। গাছপালা বেশীরভাগই পাতাহীন বিবর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু চিরসবুজ পাইনেরা সবুজ করে রেখেছে শহরের আকাশরেখা। তারপরে প্রকৃতির অনিবার্য নিয়মে সূর্য সরে গেল উত্তরে, হয়তো কোনো দূর কাননের কুন্দকলি করুণ চোখে শেষ চাওয়া চেয়ে নিয়ে ঝরে গেল ধূলায়। শীত বিদায় নিল পুরোপুরি। কিশলয়বর্ণ জয়পতাকায় দিকদিগন্ত আচ্ছন্ন করে এসে পড়লো ঋতুরাজ বসন্ত।

বসন্ত এসে গেল, কিন্তু আমাদের রুটিনবাঁধা কাজকর্ম-নেটওয়ার্ক-ডেডলাইন-দূরভাষ-বাড়ী-আপিস দিয়ে আঁট করে বাঁধা জীবনে কিন্তু বিশেষ পরিবর্তন হল না। হরেক রকম ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি আর কম্পুটারে ঠাসা সব ঘর। গভীর রাতে সব বড়ো বড়ো আলো যখন নিভে যায়, তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সবুজ আলো জ্বলে নেভে জ্বলে নেভে জ্বলে নেভে। অন্ধকার ঘরে ভারী অদ্ভুত লাগে, আমার এক বন্ধু এদের ইলেকট্রনিক ফায়ারফ্লাই বলে। বৈদ্যুতিন জোনাকি। জ্বলে জ্বলে উঠে সবুজ আলো ছড়ায়।

চুপ করে শুয়ে থাকি রাত্রির ঘুমের জন্য, ঘুমের জলে ডুবে যাবার আগে বহুদূরে ফেলে আসা ঘরবাড়ী মাঠ বাগান ঝোপঝাড় সব মনে পড়ে, সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি জ্বলতো সন্ধ্যার পরের থেকে শুরু করে গভীর রাত্রি পর্যন্ত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উড়ন্ত আলো। মনে হতো আহা ওরা কেন সবাই একরঙের আলো দেয়? কেন কেউ নীল আলো, কেউ সবুজ আলো, কেউ বেগুনী আলো, কেউ লাল আলো দেয় না? ঘরের ওই সবুজ আলো দেওয়া বৈদ্যুতিজোনাকিরা জ্বলতো নিভতো জ্বলতো নিভতো, আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিতো।

মাঠবনবাগান তখন সবুজে সবুজ, ফুলে ফুলে ছয়লাপ চারিদিক। ঘাসফুলেদের বেগুনীহলদে পেরিয়ে গোলাপী আজেলিয়ার ঝাড়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়তো সোনালীরোদ। আজেলিয়ার ফুল গোলাপী, কমলা, লাল, সাদা-নানা রঙের হয়। আমার দোপাটির কথা মনে পড়তো, "তোমার নীলদোপাটি চোখ, তোমার শ্বেতদোপাটি হাসি..."। দক্ষিণের জোরালো হাওয়ায় আজেলিয়া ঝোপেরা এলোমেলো হয়ে হাসতো, ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে উড়তে থাকতো, রেণু ঝরতো পথের ধূলায়। পথের দু'পাশে ওক গাছেরা অজস্র নতুন সবুজ পাতায় ভরে গেছে তখন, শুধু তাই না, গাছ ভরে মঞ্জরী ধরেছে, রাস্তা ভরে গেছে সেই ঝরা মঞ্জরীতে।

স্প্রিং ব্রেকের ছুটি শুরু হলো তারপর, সপ্তাহখানেকের কিছু বেশী (আগের সপ্তাহের শনিরবি ধরে নিয়ে নয়দিন)। ব্রেকের আগের সেই শুক্রবারে যখন সব শুনশান হয়ে এলো, ধৈর্যশীল বাহনেরা যখন মালিকদের নিয়ে সব পাড়ি দিলো উত্তরে দক্ষিণে পুবে পশ্চিমে, খুব ইচ্ছে হলো বন্ধুকে নিয়ে হারিয়ে যাই নতুন বসন্তের সবুজ জঙ্গলে, তাঁবু খাটিয়ে রাত্রিযাপন করি, মধ্যরাত্রে ঘুম ভেঙে উঠে বেরিয়ে আসি বনজ্যোৎস্নায়, দেখি কথা কয়ে ওঠে কিনা রহস্যময় বনস্থলীর কোনো আত্মা, যেমন কইতো বহু বহু বছর আগে, যখন এদেশে শ্বেতকায়রা প্রবেশ করেনি, গোটা ভূখন্ড ছিলো লালমানুষদের, যারা পৃথিবীকে তাদের মা বলে জানতো, তারা শুনতে পেতো পাতার কুঁড়ি খোলার শব্দ, তারা শুনতে পেতো জলের ঘূর্ণীর শব্দ, তারা দেখতে পেতো অনেক অনেক দূর, বৃষ্টির পরে কেমন পরিষ্কার হয়ে যায় আকাশবাতাস-অনুভব করতো তারা। আমি কতকাল পরে এসেছি এখানে, ওরা তো আর নেই এখানে, হয়তো আছে কোনো রিজার্ভে, হয়তো ভুলে গেছে সবকিছু।

লালমানুষদের এখন সবাই বলে" ইন্ডিয়ান", আমিও আরেক ইন্ডিয়ান, বহুদূরের ইন্ডিয়া বলে দেশটির মানুষ, আমাদের বলে এশিয়ান, নেটীভ আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের থেকে আলাদা করার জন্য। কী অদ্ভুত, না? কলম্বাসের ভুলই "সত্য" হয়ে গেলো, সে কিনা ভেবেছিলো ইউরোপের থেকে ক্রমাগত পশ্চিমের দিকে জাহাজ চালিয়ে এসে ইন্ডিয়াতে পৌঁছেছে, কারণ পৃথিবী যে গোলকাকার! তীরে নেমে সে অধিবাসীদের ইন্ডিয়ান বলে স্থির করলো। বোঝো কান্ড! পৃথিবী যে কত বড়ো গোলক, হয়তো ঠিকঠাক জানতো না ওরা, জানলে হয়তো টাকাকড়ি যোগাড় করে পাড়ি দিতে পারতো না। পশ্চিমের পথে পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছাতে ওদের আরো বহুদিন চলতে হতো, ততদিনে সব ফুরিয়ে যেতো, খাবারদাবার, জল, সব। ঝড়টড় হলে তো আরো সোনায় সোহাগা। মাঝে বিরাট ঐ মহাদেশ না থাকলে কী হতো কেজানে!

উনি তো ইতিহাসে ঢুকে গেলেন, কিন্তু ওঁর ভুলটিও ইতিহাসে ঢুকে গেলো, আদি-অধিবাসীরা হয়ে গেলো ইন্ডিয়ান। কী গেরো! দ্বীপগুলো হয়ে গেলো ইন্ডিজ, পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বলে কোনোভাবে একটা রফা করেছে, কিন্তু এই লালমানুষদের বেলায় তাও করেনি। "রেড ইন্ডিয়ান" কথাটা শুনলে এরা ভুরু কপালে তুলে তাকায়! আবার জিজ্ঞেস করে,"হোয়াই আর ইউ সেইং রেড?"

যাকগে, হচ্ছিলো সেই বসন্তের ছুটিতে বেড়ানোর প্ল্যানের কথা। আমরা প্ল্যান করতে থাকি ক্যাম্পিং এর, নানারকম প্রস্তাব উঠতে থাকে,পড়তে থাকে, কখনো একমত হয়ে জোরালো হয়, কখনো দ্বিমত হয়ে ভেঙে পড়ে। প্ল্যান করে ক্লান্ত তৃপ্ত মনে চলে যাই যে যার বাড়ী।

*******

"বিজন ঘরে, নিশীথ রাতে আসবে যদি

আমি তাইতে কি ভয় মানি?

জানি বন্ধু জানি---

তোমার আছে তো হাতখানি...."

এয়ারকন্ডিশনারের হাল্কা চাপা শব্দের গুম গুম শোঁ শোঁ, অসংখ্য সবুজ জ্বলানেভা আলোর মধ্যে অনুভব করি তাকে, যে ছিলো অনেক অনেক অনেক দিন আগে, যে আছে এখনো, যে থাকবে আরো অনেক অনেক দিন পরেও। সে জানে আমাদের লক্ষ লক্ষ বছরের অতীত, জানে আমাদের কৃপণ বর্তমান, প্রতি মুহূর্তে পালিয়ে যাওয়া ক্ষণগুলির জন্য আমাদের দুঃখ ও অশ্রুকণিকা, জানে আমাদের প্রসারিত অনন্তস্পর্শী ভবিষ্যৎ। সভ্যতার এই পরতের পর পরত খোলসগুলো আমাদের ঢেকে রেখেছে পোশাকের মতন, ঘরের মতন, যানবাহনের মতন, ডেডলাইনের মতন,আরো আরো অনেক ছোটো-বড়ো কনস্ট্রেইন্ট আমাদের চোখের সামনের জিনিস চোখের থেকে মুছে দিয়েছে। আমাদের ব্যথিত আত্মা যখন কেঁদে ওঠে সেইসব হারানো জিনিসগুলোর জন্য, হারানো সম্পর্কগুলোর জন্য, তখন কোনো আশ্চর্য কৌশলে সে ছুঁয়ে ফেলে আমাদের ভিতরমন, আমাদের আত্মা, এমন করে ছোঁয় যেন ছিলোই সে আমাদের একদম ভেতরে, কোনো খোলোস না পেরিয়েই কেমন করে যেন পৌঁছে গেছে সেখানে।ঐ সেই ফ্ল্যাটল্যান্ডের উপর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ত্রিমাত্রিক আপেল যেমন সোজাসুজি পৌঁছে গেছিলো বৃত্তের কেন্দ্রে, পরিধি না পার হয়েই! ঠিক তেমনি করে।

নানা কারণে ক্যাম্পিং হলো না, এমনিই আমরা ঘুরতে গেলাম বাইসিক্ল ট্রেইল ধরে, বসন্তের সবুজ গাছগাছালি, সুরমুখর পাখপাখালি আমাদের অভ্যর্থনা করলো নীরবে সরবে। হরবোলা পাখির ডাক শুনতে শুনতে আমার হারানো দুপুরগুলো মনে পড়ছিল, মনে পড়ছিল শালিক চড়ুই কাক কোকিল সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে আমার দেশেও, উষ্ণদিনের মোহন আলোর ঝর্ণাধারা যখন চরাচর ধুইয়ে দেয় তখন তা তো ওদের ভিতর বাহিরও ধুইয়ে দিয়েছে। আমরা মানুষেরাই শুধু এত এত জালের পর জালে আটকানো।

অর্ধেক দিন ধরে ঘুরে ঘুরে বেশ ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত হয়ে শেষে গড়িয়ে-যাওয়া দুপুরে আমরা বিশ্রাম নিতে আর আহার গ্রহণ করতে বসি স্টেট পার্কের কৃত্রিম সরোবরের ধারে, পল্লবিত ওয়াটার ওকের ছায়ায়। আকাশ সেদিন এক্কেবারে নীল, দূরে চিল পাক খায়, হ্রদের জলে সরু পাতলা মোটরচালিত নৌকায় লোকেরা জলবিহার করছে, নৌকার অতি দ্রুতগতি আর পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে উল্টোমুখে বেরিয়ে যাওয়া হাওয়ার স্পর্শ নিশ্চয় ওদের খুব আনন্দ দিচ্ছে, ওরা চিৎকার করছে খুশীতে।

সকাল বেলাতেই দোকান থেকে খাবার দাবার কেনা হয়েছিলো, সেই সেদ্ধ টার্কীর ফালি আর চীজের ফালি মাঝখানে দেওয়া দুই স্লাইস পাউরুটিই অমৃত মনে হয়। ক্ষুধাই হলো সুধা, যদিও দেশের লুচি-আলুরদমের কথা মনে পড়ে যায়। সে যেন গতজন্মের স্বাদ, এত মধুর সেই স্মৃতি।

কচি সবুজ ঘাসের উপরে কাত শুয়ে পড়ি, ঘাসের সুড়সুড়ি লাগে কানে, বেশ লাগে।

"তোমার দেশ এত সুন্দর!" মুগ্ধ হয়ে বন্ধুকে বলি।

সে ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি বলে,"না না, এর চেয়ে অনেক অনেক সুন্দর জায়গা আছে, আছে রেড উডের বন, ওখানে পাঁচ হাজার বছরের পুরানো গাছ আছে, গত গ্রীষ্মে গেছিলাম, সে এক অদ্ভুত জিনিস। তুমি ঐ গাছ ছুঁলে মনে হবে টাইম মেশিনে চড়ে চলে গেছো সেই তত হাজার বছর আগে...মিশরে তখন পিরামিডগুলো তৈরী হচ্ছে।"

আমি হেসে ফেলি, পাছে এই দুটো গাছপালা ঘাসফুল পাখপাখালি দেখে একেই দেশের সেরা সৌন্দর্য ভেবে বসি, এই ভয়ে কেমন ব্যস্ত হয়ে আশ্চর্য সুন্দর জায়গার কথা বলছে! আরে, বিখ্যাত জায়গা তো আছেই, আশ্চর্য সব জিনিস তো আছেই পৃথিবীতে, কিন্তু তার জন্য এই হাতের ছোঁয়ার মধ্যের, এই বুকের কাছের, এই চোখের সম্মুখের অপরূপ আশ্চর্য সৌন্দর্য কি বৃথা হয়ে গেলো? অপরূপ এই জগৎ, জগতের প্রতিটি কোণাতেই অফুরন্ত আনন্দের উৎস লুকিয়ে আছে। নিজেদের বাঁধা জালগুলো ছিন্ন করতে পারলেই রূপকথার সোনার পালক আপনিই উড়ে এসে পড়ে হাতে, মাথায়, চোখেমুখে।

আমরা গল্প করতে থাকি, কোথা থেকে কোথায় চলে যায় গল্পের বিষয়বস্তু, ছোটোবেলার কথা, সেকেন্ডারি ইস্কুলের কথা, নানাসময়ের বেড়ানোর গল্প, এখনকার কাজের কথা ---সব মিলেমিশে জগাখিচুড়ী হয়ে যায় গল্পের মধ্যে।

বেলা পড়ে আসে, ঢলে পড়া সূর্যের কিরণে কোমলতা, পশ্চিমের মেঘগুলি আরেকটু পরেই অরুণরঙে রাঙা হয়ে সন্ধ্যাকে মায়াবতী করে তুলবে। আমরা ঘরে ফিরতে থাকি, ক্লান্ত দেহে, তৃপ্ত হৃদয়ে। একটি মুক্তির দিনের স্মৃতি অবিনশ্বর হয়ে থাকে মনের মণিকোঠায়।