বিরাট এক স্পন্দনশীল অন্ধকার আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরেছে, চারিদিকে কালো জল ছলছল করছে। ওর মধ্য দিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে বেরিয়ে আসতে চাইছি আলোয়। তখনও কালো বা আলোর কথা ঠিক বুঝতে পারি না, কিন্তু একটা অদ্ভুত তাড়না আমায় ঠেলা মারে, আমার সদ্য তৈরী হওয়া মগজে কোটি কোটি বছর আগের যে স্মৃতি খোদাই হয়ে আছে, সেই স্মৃতিই আমার পূর্বসংস্কার, সেই আমাকে জানায় আলো আর কালোর গল্প।
কিন্তু কোথায় আলো? অন্ধকারের জরায়ু কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে? সুড়ঙ্গের শেষ কোথায়? কোথায় ঝিকমিক করছে জোরালো আলো? আমি প্রাণপণে সাঁতরাই, ডাইনে বাধা বাঁয়ে বাধা, ঠোক্কর খেতে খেতে এগিয়ে যেতে থাকি প্যাঁচালো সর্পিল পথ ধরে। ঠিক দিকে যাচ্ছি কি? কেজানে!
ঘুম ভেঙে যায়, ঘামে ভিজে গেছে সারা গা। সেই স্বপ্নটা! আবার!!! কেন দেখি এটা বারে বারে?
নিজেকে সামলে নিতে নিতে উঠে বসি সাবধানে, পাশে শেষরাতের অঘোর ঘুমে অচেতন হিন্দোল। ঘরের মধ্যে অদ্ভুতুড়ে নীল আলো, ফ্যানের হাওয়া মশারির চালে হালকা ঢেউ তুলছে। বিছানা ছেড়ে উঠে ব্যালকনির দিকের দরজাটা আলতো করে খুলে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। আহ, বাইরে কী হাওয়া! সেই কতদূর দক্ষিণ সমুদ্র থেকে আসছে। খোলা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে নিতে নিতে চোখ তুলে তাকাই উপরে, আকাশে তারা আর তারা, সেই কোন পুরাকাল থেকে একইভাবে চেয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। কত যুগের কত মানুষের কত আনন্দ কত যন্ত্রণার নীরব সাক্ষী ওরা।
ঘাম শুকিয়ে গেলে ঘরে এসে আবার শুয়ে পড়ি, ঘুমের মধ্যে ডুব দিতেই দৃশ্য বদলে যায়। দেখি, হামাগুঁড়ি দিয়ে অন্ধকার গুহা থেকে বার হচ্ছি। বাইরে এসে দেখি উপরে আকাশ আর পায়ের নিচে রুখু বাদামী পাহাড়ের গা। পাহাড় বেয়ে বেয়ে নেমে আসি, এখানে ওখানে পাথরের খাঁজে পা রেখে, এখানে ওখানে গাছ গাছড়া আঁকড়ে বা শক্ত লতা ধরে ধরে। পথ তো নেই এই পাহাড়ে।
নামতে নামতে নীল সমুদ্রের কথা মনে পড়ে, এই তো মাত্র কয়েকদিন আগেই ছিলাম সমুদ্রে, ভেজা বালির উপরে ঝাঁক ঝাঁক সীগাল আর তাদের অদ্ভুত সুন্দর ডাক। পাহাড় বেয়ে নামতে নামতে করতে করতে হাঁপ ধরে যায়। দেখি পৌঁছেছি পাথরের একটা চাতালের মতন জায়গায়। লাল ফুলওয়ালা একটা লতা দুলছে হাওয়ায়। হাঁপ ধরা শরীরটা নিয়ে কোনোরকমে লতাটার কাছে গিয়ে বসে পড়ি, তারপরে শুয়ে পড়ি। ক্লান্তি, বড্ড ক্লান্তি। আয় ঘুম, আয়।
এইখানে স্বপ্নের ঘুম আর সত্যিকারের ঘুম মিশে যায়, শান্তি শান্তি শান্তি। যখন পরদিন যখন ঘুম ভাঙে তখন দেখি সকালের রোদে ভেসে যায় দুনিয়া। হিন্দোল ঘুম থেকে উঠে পড়েছে আগেই, খুলে দিয়েছে দক্ষিণের ঐ বড় জানালা-
দক্ষিণের ঐ জানালা খুলে দিলেই
একটা ম্যাজিক হয়।
মেঝেতে আছড়ে পড়ে
এক-জানালা আকাশ-
এক-আকাশ রোদ্দুর
আর এক-চুমুক সমুদ্দুর।
আলো এসে ছুঁয়ে দেয়
ছায়ার মায়াবী আঁচল।
দক্ষিণের ঐ খোলা জানালা দিয়ে আমি
উড়িয়ে দিই আমার এই গৃহবদ্ধ পোষা দৃষ্টি,
চলতে ফিরতে ফণীমনসার কাঁটায় রক্তাক্ত
সেই দৃষ্টি হঠাৎ যেন পেয়ে যায়
দু'খানা সবল উজ্জ্বল সোনালী ডানা।
সে অনায়াসে পার হয়ে যায়
চিবোনো চিবোনো সব বাঁকা বাঁকা কথা,
ক্ষুরের মতন ধারালো সব বাধা আর নিষেধ-
পার হয়ে যায় শত শত মাঠ, বন, নদী, গ্রাম, শহর
যেতে যেতে আলতো ছুঁয়ে দেয় পাহাড়ের চূড়া,
একটুখানি খেলে নেয় নীল আকাশের
তুলো-তুলো মেঘেদের সঙ্গে-
আর অক্লান্ত উড়তে থাকে ঐ
আদিগন্ত ছলাৎছল নীল সমুদ্রের দিকে।
Friday, August 15, 2014
আনন্দপুরে
হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাই, দেখি নারকেল গাছের সারি। কান্ড বেয়ে গোলমরিচের লতা উঠেছে। বৃষ্টির কণারা লেগে আছে লতার গায়ে আর পাতাগুলোর উপরে। রোদ্দুর পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে কেমন! ভিজা হাওয়ায় নারকেল গাছগুলো মস্ত মস্ত পাতা নাড়িয়ে খুব আহ্লাদ করছে। ঠিক যেমন বলে দিয়েছিলো প্রীতি।
ছোট্টো হাসি শুনে চমকে তাকাই, দেখি পাশের জঙ্গল থেকে প্রণতি বেরিয়ে আসছে, হাতে নীল রঙের ফুল। আমি বললাম, "আনন্দপুরে যাবে?"
ও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে আরো হাসলো। বললো, "সেখানে গিয়ে রাজেনের রেখে দেয়া রঙতুলি দিয়ে শূন্য কাগজে অনেক ছবি আঁকবো। সে নাকি আজকাল আর ছবি আঁকতে পারে না! এটা কোনো কথা হোলো? সে আবারও আঁকবে। আমিও আঁকবো।আরো নতুন নতুন রঙ বানাবো। নীল রঙ, লাল রঙ, সবুজ-সবই বন থেকে পাওয়া যাবে, কী বলো?"
ওর চোখের মধ্যেই মেঘ-রোদ্দুর-বৃষ্টির ছবি এমনিতেই চিকচিক করছিলো, ছবি না এঁকে ও থাকতে পারবে কেন?
আরো খানিক এগোতেই দেখি মস্ত লম্বা একজন মানুষ মৃদু গান গাইতে গাইতে উল্টোদিক থেকে এগিয়ে আসছে। চিনলাম, ও তো সুমন্ত।
সুমন্ত বললো, " চন্দ্রাবতী নদী পার হবার সময় কই মাছ ধরবো।"
আমি কইলাম "আরে, কীকরে ধরবে? তোমার জাল কই? নয়তো ছিপ? বা নিদেন ছাঁকা দিয়ে মাছ ধরার গামছা?"
ও কইলো, "দেখতেই পাবে। আমি শুধু হাতেই মাছ ধরতে জানি।"
এসে গেল চন্দ্রাবতী। জল এখন গভীর যদিও তবু এই জায়্গায় নদীটা বইছে উঁচু পাথুরে ডাঙার উপর দিয়ে, কিছু কিছু পাথরের মাথা জলের উপর দেখা যাচ্ছে। এখানে জল বড়ো জোর একমানুষ গভীর। হেঁটে পার হওয়া যাবে ঠিকই। ডুবে গেলে সুমন্ত হাত বাড়িয়ে ঠেলে দেবে নাহয় কোনো পাথরের দিকে।
না তেমন ডুবজল ছিলো না, দিব্যি নদী পার হতে গিয়ে আমাদের ভালো করে স্নানও হয়ে গেলো।
পার হয়ে এসে দেখি সুমন্তের পাঞ্জাবির দু'পকেট ভর্তি কইমাছ!!!
কী মোটাসোটা কুস্তীগীরের মতন কইমাছ সে কী বলবো! সত্যি মানুষটা শুধু হাতে কই ধরে ফেলেছে?
সুমন্ত খুব হাসছে আর কবিতা বলছে, বলছে, "ক্যালেন্ডারের পাতা ওড়ে, দোলে এলোমেলো ধোঁয়ার কুন্ডলী" আরো অনেক কিছু বলছিলো, ব্যাপারটা বেশ ধোঁয়াটে বলে কিছুই বিশেষ আর বুঝলাম না। ধোঁয়া দোলে কীকরে সেও এক কূট প্রশ্ন! কিন্তু কবিদের কাছ থেকে কোনো প্রশ্নের জবাব আশা করতে নেই। কবির জবাব বড় ভয়ানক!
নদী পার হয়ে টিলা, এখন গভীর সবুজ। তার উপরে পড়ে আছে ছড়ানো ছিটানো বড়ো বড়ো নুড়ি, এই ভরা বর্ষায় সবুজ শ্যাওলা আর লতায় ঢেকে গেছে।
টিলার উপরে স্মিতমুখে দাঁড়িয়ে আছেন অচ্যুতচরণ, লম্বা সাদা দাড়ি বর্ষার ভিজা হাওয়ায় উড়ছে। উনি মন্ত্রের মতন করে বলছেন, "অখন্ডমন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচর ... " আমাদের দেখে থেমে গিয়ে হেসে অভিনন্দন জানালেন," এই যে উষসী দেখছি। অনেকদিন পরে এবার। তা সঙ্গে এনারা কারা?"
আমি বললাম, "নমস্কার অচ্যুতদা। এনারা আমার দুই বন্ধু-প্রণতি আর সুমন্ত।"
সুমন্ত ততক্ষণে ওর কবিতা বলতে শুরু করে দিয়েছে আর অচ্যুতদা অবাক খুশী হয়ে মুহূর্তের মধ্যে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আলোচনায় জমে গেছেন সুমন্তের সঙ্গে। এখন আমরা কথা কইতে কইতে হাঁটছি অনন্তিকার বাড়ীর দিকে। আর একটু পরেই সে আমাদের দেখতে পাবে।
সুমন্তের ধরা কইমাছ দিয়ে কিছু একটা রান্না করা হবে নিশ্চয়। কাঁচা মরিচ দেওয়া ঝোলও বেশ ভালোই হতে পারে নয়তো শুধু ভাজা।
অচ্যুতদা হঠাৎ কইলেন, "সবচেয়ে বড়ো জাদুকরী কে জানো সুমন্ত? এই বিশ্বপ্রকৃতি। কোনো কথা না বলেই কত আশ্চর্য্য কথা তৈরী করে যাচ্ছে। ঐ যে দ্যাখো পুবের আকাশটা, এই ছিলো রোদ্দুর, এই এখনি মেঘলা হয়ে গেলো, আবার কখন একটু মেঘ ফাঁক হয়ে যাবে, আলো চলকে নামবে। এইরকম করে আমরা কি কোনোদিন কথা কইতে পারি?"
****
ছোট্টো হাসি শুনে চমকে তাকাই, দেখি পাশের জঙ্গল থেকে প্রণতি বেরিয়ে আসছে, হাতে নীল রঙের ফুল। আমি বললাম, "আনন্দপুরে যাবে?"
ও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে আরো হাসলো। বললো, "সেখানে গিয়ে রাজেনের রেখে দেয়া রঙতুলি দিয়ে শূন্য কাগজে অনেক ছবি আঁকবো। সে নাকি আজকাল আর ছবি আঁকতে পারে না! এটা কোনো কথা হোলো? সে আবারও আঁকবে। আমিও আঁকবো।আরো নতুন নতুন রঙ বানাবো। নীল রঙ, লাল রঙ, সবুজ-সবই বন থেকে পাওয়া যাবে, কী বলো?"
ওর চোখের মধ্যেই মেঘ-রোদ্দুর-বৃষ্টির ছবি এমনিতেই চিকচিক করছিলো, ছবি না এঁকে ও থাকতে পারবে কেন?
আরো খানিক এগোতেই দেখি মস্ত লম্বা একজন মানুষ মৃদু গান গাইতে গাইতে উল্টোদিক থেকে এগিয়ে আসছে। চিনলাম, ও তো সুমন্ত।
সুমন্ত বললো, " চন্দ্রাবতী নদী পার হবার সময় কই মাছ ধরবো।"
আমি কইলাম "আরে, কীকরে ধরবে? তোমার জাল কই? নয়তো ছিপ? বা নিদেন ছাঁকা দিয়ে মাছ ধরার গামছা?"
ও কইলো, "দেখতেই পাবে। আমি শুধু হাতেই মাছ ধরতে জানি।"
এসে গেল চন্দ্রাবতী। জল এখন গভীর যদিও তবু এই জায়্গায় নদীটা বইছে উঁচু পাথুরে ডাঙার উপর দিয়ে, কিছু কিছু পাথরের মাথা জলের উপর দেখা যাচ্ছে। এখানে জল বড়ো জোর একমানুষ গভীর। হেঁটে পার হওয়া যাবে ঠিকই। ডুবে গেলে সুমন্ত হাত বাড়িয়ে ঠেলে দেবে নাহয় কোনো পাথরের দিকে।
না তেমন ডুবজল ছিলো না, দিব্যি নদী পার হতে গিয়ে আমাদের ভালো করে স্নানও হয়ে গেলো।
পার হয়ে এসে দেখি সুমন্তের পাঞ্জাবির দু'পকেট ভর্তি কইমাছ!!!
কী মোটাসোটা কুস্তীগীরের মতন কইমাছ সে কী বলবো! সত্যি মানুষটা শুধু হাতে কই ধরে ফেলেছে?
সুমন্ত খুব হাসছে আর কবিতা বলছে, বলছে, "ক্যালেন্ডারের পাতা ওড়ে, দোলে এলোমেলো ধোঁয়ার কুন্ডলী" আরো অনেক কিছু বলছিলো, ব্যাপারটা বেশ ধোঁয়াটে বলে কিছুই বিশেষ আর বুঝলাম না। ধোঁয়া দোলে কীকরে সেও এক কূট প্রশ্ন! কিন্তু কবিদের কাছ থেকে কোনো প্রশ্নের জবাব আশা করতে নেই। কবির জবাব বড় ভয়ানক!
নদী পার হয়ে টিলা, এখন গভীর সবুজ। তার উপরে পড়ে আছে ছড়ানো ছিটানো বড়ো বড়ো নুড়ি, এই ভরা বর্ষায় সবুজ শ্যাওলা আর লতায় ঢেকে গেছে।
টিলার উপরে স্মিতমুখে দাঁড়িয়ে আছেন অচ্যুতচরণ, লম্বা সাদা দাড়ি বর্ষার ভিজা হাওয়ায় উড়ছে। উনি মন্ত্রের মতন করে বলছেন, "অখন্ডমন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচর ... " আমাদের দেখে থেমে গিয়ে হেসে অভিনন্দন জানালেন," এই যে উষসী দেখছি। অনেকদিন পরে এবার। তা সঙ্গে এনারা কারা?"
আমি বললাম, "নমস্কার অচ্যুতদা। এনারা আমার দুই বন্ধু-প্রণতি আর সুমন্ত।"
সুমন্ত ততক্ষণে ওর কবিতা বলতে শুরু করে দিয়েছে আর অচ্যুতদা অবাক খুশী হয়ে মুহূর্তের মধ্যে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আলোচনায় জমে গেছেন সুমন্তের সঙ্গে। এখন আমরা কথা কইতে কইতে হাঁটছি অনন্তিকার বাড়ীর দিকে। আর একটু পরেই সে আমাদের দেখতে পাবে।
সুমন্তের ধরা কইমাছ দিয়ে কিছু একটা রান্না করা হবে নিশ্চয়। কাঁচা মরিচ দেওয়া ঝোলও বেশ ভালোই হতে পারে নয়তো শুধু ভাজা।
অচ্যুতদা হঠাৎ কইলেন, "সবচেয়ে বড়ো জাদুকরী কে জানো সুমন্ত? এই বিশ্বপ্রকৃতি। কোনো কথা না বলেই কত আশ্চর্য্য কথা তৈরী করে যাচ্ছে। ঐ যে দ্যাখো পুবের আকাশটা, এই ছিলো রোদ্দুর, এই এখনি মেঘলা হয়ে গেলো, আবার কখন একটু মেঘ ফাঁক হয়ে যাবে, আলো চলকে নামবে। এইরকম করে আমরা কি কোনোদিন কথা কইতে পারি?"
****
সেইসব পথেরা
আমাদের সাথে সাথে আমাদের পথেরাও বহুদূর হেঁটে গেছে, পিছনে বিস্মৃতিধূলি, দিগন্তে মেঘ, রঙীন মেঘমালা।
কেউ ঢুকেছে গলির গলি তস্য গলিতে যেখান থেকে আকাশটাকেই মনে হয় ঐ উপরের কোনো সরু নীল গলি। কেবল পাশের বাড়ির তেতলার ব্যালকনিতে যখন এসে পড়ে আশ্বিনের রোদ্দুর,তখন চমকে ওঠে পথের মন- মনে পড়ে এইসময়ে ক্ষেতের আল থেকে সে দেখতো আর শুনতো দিগন্তলীন মাঠ ভরা সবুজ ধানের নাচ আর গান, বাতাসের সঙ্গে যুগলবন্দী। সে কবেকার কথা?
কেউ গেছে চওড়া রাজপথে, যেখানে সাঁ সাঁ করে ছুটছে কেবল হাওয়াই গাড়ি। দিন রাত ছুটছে ওরা, একের পর এক-ওরা কোথায় যায়? কোনো সন্ধ্যাবেলা, যখন কলাবতীফুলের মতন মেঘে সারা আকাশ লাল-তখন সেই রক্তসন্ধ্যার নিচে সে চিৎকার করে ওঠে, এত রক্ত কেন?
কেউ গেছে পাহাড়ে, পর্বতশীর্ষে উঠবার জন্য ঘুরে ঘুরে সর্পিলাকারে চলছে পাকদন্ডীর মতন। পাশ দিয়ে হয়তো পাগলাঝোরা নামছে, হয়তো হাত নেড়ে নেড়ে ডাকছে নাম না জানা ফুলেরা, হয়তো পাখিরা গান গাইছে, সে শুনছে না, সে শুধু উঠছে আর উঠছে। ঐ যে চূড়া মাঝে মাঝে দেখা যায় মাঝে মাঝে মেঘের আড়ালে চলে যায়, সেইদিকে মন রেখে সে শুধু উঠছে আর উঠছে।
কত সূর্য ঝলকানো দিন কত মিহিন চাঁদের রাত চলে যায়, সে থামে না। একদিন হয়তো কোনো বাঁকে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে সে নিচে চেয়ে দেখতে পায় ঝম করে উঠেছে কী বিশাল এক সূর্যধোয়া উপত্যকা! অপার্থিব মন্ত্রের মত কী আশ্চর্য সুন্দর! ওখান থেকেই চলতে শুরু করেছিলো নাকি সে? আগে কেন তবে ঐ সৌন্দর্য সে দেখতে পায় নি? এখন তো আর ওখানে ফেরার উপায় নেই!
কেউ নেমেছে আঁধার পাতালে, সেখানে দমবন্ধ অন্ধকার। তারই মধ্যে মধ্যে কোথাও ঝলকে ওঠে আলো। ও কি আলো নাকি আলেয়া? ও কি মণিরত্নের দীপ্তি নাকি ছুরির ঝলক? বোঝার উপায় নেই। পথে ঘুরে ঘুরে চলে আর চলে, দেয়ালে ঠেকে যাবে নাকি সূর্যের নিচে গিয়ে পৌঁছতে পারবে? সে জানে না, সে বুকের মধ্যে এক আকাশ আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে রেখে চলে আর চলে। শেষ কোথায়?
তারপরে কখনো কোনো অলৌকিক মোড় ঘুরে দূরে চলে যাওয়া সেইসব পথেদের দেখা হয়ে যায়।
কেউ ঢুকেছে গলির গলি তস্য গলিতে যেখান থেকে আকাশটাকেই মনে হয় ঐ উপরের কোনো সরু নীল গলি। কেবল পাশের বাড়ির তেতলার ব্যালকনিতে যখন এসে পড়ে আশ্বিনের রোদ্দুর,তখন চমকে ওঠে পথের মন- মনে পড়ে এইসময়ে ক্ষেতের আল থেকে সে দেখতো আর শুনতো দিগন্তলীন মাঠ ভরা সবুজ ধানের নাচ আর গান, বাতাসের সঙ্গে যুগলবন্দী। সে কবেকার কথা?
কেউ গেছে চওড়া রাজপথে, যেখানে সাঁ সাঁ করে ছুটছে কেবল হাওয়াই গাড়ি। দিন রাত ছুটছে ওরা, একের পর এক-ওরা কোথায় যায়? কোনো সন্ধ্যাবেলা, যখন কলাবতীফুলের মতন মেঘে সারা আকাশ লাল-তখন সেই রক্তসন্ধ্যার নিচে সে চিৎকার করে ওঠে, এত রক্ত কেন?
কেউ গেছে পাহাড়ে, পর্বতশীর্ষে উঠবার জন্য ঘুরে ঘুরে সর্পিলাকারে চলছে পাকদন্ডীর মতন। পাশ দিয়ে হয়তো পাগলাঝোরা নামছে, হয়তো হাত নেড়ে নেড়ে ডাকছে নাম না জানা ফুলেরা, হয়তো পাখিরা গান গাইছে, সে শুনছে না, সে শুধু উঠছে আর উঠছে। ঐ যে চূড়া মাঝে মাঝে দেখা যায় মাঝে মাঝে মেঘের আড়ালে চলে যায়, সেইদিকে মন রেখে সে শুধু উঠছে আর উঠছে।
কত সূর্য ঝলকানো দিন কত মিহিন চাঁদের রাত চলে যায়, সে থামে না। একদিন হয়তো কোনো বাঁকে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে সে নিচে চেয়ে দেখতে পায় ঝম করে উঠেছে কী বিশাল এক সূর্যধোয়া উপত্যকা! অপার্থিব মন্ত্রের মত কী আশ্চর্য সুন্দর! ওখান থেকেই চলতে শুরু করেছিলো নাকি সে? আগে কেন তবে ঐ সৌন্দর্য সে দেখতে পায় নি? এখন তো আর ওখানে ফেরার উপায় নেই!
কেউ নেমেছে আঁধার পাতালে, সেখানে দমবন্ধ অন্ধকার। তারই মধ্যে মধ্যে কোথাও ঝলকে ওঠে আলো। ও কি আলো নাকি আলেয়া? ও কি মণিরত্নের দীপ্তি নাকি ছুরির ঝলক? বোঝার উপায় নেই। পথে ঘুরে ঘুরে চলে আর চলে, দেয়ালে ঠেকে যাবে নাকি সূর্যের নিচে গিয়ে পৌঁছতে পারবে? সে জানে না, সে বুকের মধ্যে এক আকাশ আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে রেখে চলে আর চলে। শেষ কোথায়?
তারপরে কখনো কোনো অলৌকিক মোড় ঘুরে দূরে চলে যাওয়া সেইসব পথেদের দেখা হয়ে যায়।
রাত-যাদুকর
একটুকরো কাগজ উড়ে যাচ্ছে,
তাতে ছিলো না জন্মানো কবিতার কয়েকটা পংক্তি,
সেই মৃত ভ্রূণটিকে বুকে নিয়ে চলে
যাচ্ছে ধাত্রী, ওদের পিছনে সূর্যাস্তের লাল আকাশ।
সেদিকে চেয়ে থাকি জ্বরঝাপসা চোখে,
অন্য এক পৃথিবীর স্বাদ লাগে জিভে।
ফিরোজানীল আকাশে ডানা মেলে দেয় সোনালি ঈগল, ধীর গতিতে ভেসে যায় পাহাড় চূড়ার দিকে। নিচে নদীর তীরে শরবনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধ বক, চেয়ে আছে স্রোতের দিকে, চঞ্চল স্রোতের অশেষ ধারার দিকে। জন্ম-উৎস থেকে মৃত্যুমোহনার দিকে স্রোতের অবিরাম ছুটে চলার দিকে স্থির চেয়ে আছে সে। কালপুরুষের মৃগশীর্ষ সারমেয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পাহারা দিতে দিতে দেখেছিলো দুটো রঙীন প্রজাপতি উড়তে উড়তে খেলছে, খেলাটার নাম " আমায় ধরতে পারে না"।
চুমুক দিলাম পানীয়ে, টকমিষ্টি স্বাদের অদ্ভুত পানীয়-আরেক চুমুক দিলাম, আরেক চুমুক। তারপরে কিছু মনে নেই। কেন আমার পানীয়ে ঘুম মিশিয়ে দিয়েছিলি তুই?
তিন দিন তিন রাত্রি অন্ধকারে ভাসছি-জন্ম মৃত্যু পুনর্জন্ম পুনর্মৃত্যু---স্বপ্নের ভিতরে সব গোল্লা পাকিয়ে যায়, বিশাল এক ভুলভুলাইয়া--- সমস্ত পার্থিব অসন্তোষ ঝরে যাচ্ছে হেমন্তের লালবাদামী পাতাদের মত, রাশি রাশি পাতা, কোটি কোটি পাতা, গাছের শরীর থেকে ঝরে যাচ্ছে কী নির্বিকার বেদনাহীনতায়! মনে পড়ে এক বিপন্ন স্বপ্নের ঋতু, ছিন্ন পালকে রক্তমাখা দিনরাত, তৃণাঞ্চলে ঝরে পড়া টপটপে স্বেদ-স্মৃতি। মরিচগন্ধী গ্রীষ্মের দুপুরের বালি বালি জলতেষ্টা, কপালে গালে শুকিয়ে যাওয়া লবণ। তামাটে আকাশে গলন্ত ধাতুর মতন রৌদ্র, উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে কংক্রীটের বিস্তৃত জঙ্গল-যেখানে লুকোবার কোনো জায়্গা নেই। তবু সেও ঝরে যায়, ঝরাপাতা অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে মনে পড়ে তোদের বাড়ীটার কথা।
সবুজ রঙ ছিলো তোদের বাড়ীটার। সবুজ মাঠ পেরিয়ে সবুজ গাছগাছালির জটলা, তার ভিতর দিয়ে উঁকি ঝুঁকি দিতো তোদের সবুজ বাড়ীর দেওয়াল, জানালা আবার কখনো বা দোতলার একটা গ্রিলমোড়া বারান্দা। রহস্যময় দোতলার বারান্দা। ওখানে তোর নয়নাপিসি বসে থাকতো। চুপ করে চেয়ারে বসে দূর দিগন্তের দিকে চেয়ে আস্তে আস্তে দুলতো, দুর্বোধ্য কথা বলতো, ওঁর পিঠের উপরে ছড়িয়ে থাকতো জটা পড়া চুল, গায়ের কাপড় থাকতো অবিন্যস্ত। নয়নাপিসি পাগল ছিলো, সবাই জানতো। কিন্তু আমার মনে হতো সে যেন রয়ে গেছে অন্য একটা জগতের ভিতরে, যা আমরা কেউ দেখতে পাই না।
রাত্রিবেলার যাদুকর এসে দাঁড়ায় আমার অগ্নিকুন্ডের পাশে-
ওর এক হাতে পাহাড়, আরেক হাতে সমুদ্র-
রক্তলাল পশ্চিমের আকাশের উপরে ওর সিলুয়েট,
মন্ত্রমুগ্ধের মতন চেয়ে চেয়ে দেখি এক এক করে
নক্ষত্র ফুটে উঠছে ওর মাথার চুলে, উত্তরীয়ে, বাহুতে, বুকে-
তাতে ছিলো না জন্মানো কবিতার কয়েকটা পংক্তি,
সেই মৃত ভ্রূণটিকে বুকে নিয়ে চলে
যাচ্ছে ধাত্রী, ওদের পিছনে সূর্যাস্তের লাল আকাশ।
সেদিকে চেয়ে থাকি জ্বরঝাপসা চোখে,
অন্য এক পৃথিবীর স্বাদ লাগে জিভে।
ফিরোজানীল আকাশে ডানা মেলে দেয় সোনালি ঈগল, ধীর গতিতে ভেসে যায় পাহাড় চূড়ার দিকে। নিচে নদীর তীরে শরবনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধ বক, চেয়ে আছে স্রোতের দিকে, চঞ্চল স্রোতের অশেষ ধারার দিকে। জন্ম-উৎস থেকে মৃত্যুমোহনার দিকে স্রোতের অবিরাম ছুটে চলার দিকে স্থির চেয়ে আছে সে। কালপুরুষের মৃগশীর্ষ সারমেয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পাহারা দিতে দিতে দেখেছিলো দুটো রঙীন প্রজাপতি উড়তে উড়তে খেলছে, খেলাটার নাম " আমায় ধরতে পারে না"।
চুমুক দিলাম পানীয়ে, টকমিষ্টি স্বাদের অদ্ভুত পানীয়-আরেক চুমুক দিলাম, আরেক চুমুক। তারপরে কিছু মনে নেই। কেন আমার পানীয়ে ঘুম মিশিয়ে দিয়েছিলি তুই?
তিন দিন তিন রাত্রি অন্ধকারে ভাসছি-জন্ম মৃত্যু পুনর্জন্ম পুনর্মৃত্যু---স্বপ্নের ভিতরে সব গোল্লা পাকিয়ে যায়, বিশাল এক ভুলভুলাইয়া--- সমস্ত পার্থিব অসন্তোষ ঝরে যাচ্ছে হেমন্তের লালবাদামী পাতাদের মত, রাশি রাশি পাতা, কোটি কোটি পাতা, গাছের শরীর থেকে ঝরে যাচ্ছে কী নির্বিকার বেদনাহীনতায়! মনে পড়ে এক বিপন্ন স্বপ্নের ঋতু, ছিন্ন পালকে রক্তমাখা দিনরাত, তৃণাঞ্চলে ঝরে পড়া টপটপে স্বেদ-স্মৃতি। মরিচগন্ধী গ্রীষ্মের দুপুরের বালি বালি জলতেষ্টা, কপালে গালে শুকিয়ে যাওয়া লবণ। তামাটে আকাশে গলন্ত ধাতুর মতন রৌদ্র, উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে কংক্রীটের বিস্তৃত জঙ্গল-যেখানে লুকোবার কোনো জায়্গা নেই। তবু সেও ঝরে যায়, ঝরাপাতা অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে মনে পড়ে তোদের বাড়ীটার কথা।
সবুজ রঙ ছিলো তোদের বাড়ীটার। সবুজ মাঠ পেরিয়ে সবুজ গাছগাছালির জটলা, তার ভিতর দিয়ে উঁকি ঝুঁকি দিতো তোদের সবুজ বাড়ীর দেওয়াল, জানালা আবার কখনো বা দোতলার একটা গ্রিলমোড়া বারান্দা। রহস্যময় দোতলার বারান্দা। ওখানে তোর নয়নাপিসি বসে থাকতো। চুপ করে চেয়ারে বসে দূর দিগন্তের দিকে চেয়ে আস্তে আস্তে দুলতো, দুর্বোধ্য কথা বলতো, ওঁর পিঠের উপরে ছড়িয়ে থাকতো জটা পড়া চুল, গায়ের কাপড় থাকতো অবিন্যস্ত। নয়নাপিসি পাগল ছিলো, সবাই জানতো। কিন্তু আমার মনে হতো সে যেন রয়ে গেছে অন্য একটা জগতের ভিতরে, যা আমরা কেউ দেখতে পাই না।
রাত্রিবেলার যাদুকর এসে দাঁড়ায় আমার অগ্নিকুন্ডের পাশে-
ওর এক হাতে পাহাড়, আরেক হাতে সমুদ্র-
রক্তলাল পশ্চিমের আকাশের উপরে ওর সিলুয়েট,
মন্ত্রমুগ্ধের মতন চেয়ে চেয়ে দেখি এক এক করে
নক্ষত্র ফুটে উঠছে ওর মাথার চুলে, উত্তরীয়ে, বাহুতে, বুকে-
স্পন্দন
মনে করো তুমি চলেছ নদীর উপর দিয়ে, তোমার নৌকা আস্তে আস্তে হেলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে। তুমি দেখছ নদীর পাড়ে বসে আছে একটা অদ্ভুতদর্শন দীর্ঘচঞ্চু পাখি, চুপ করে দেখছে তোমায়। তুমি এগিয়ে চলেছ দু'পাড়ে সবুজ দেখতে দেখতে, এ নদীতে জোয়ার ভাঁটা খেলে, মোহনার খুব কাছে কিনা! তুমি শুনছ বাতাসের শব্দ, এখন শান্ত, কিন্তু কেজানে কখন ঝড় আসে? তুমি চলেছ সমুদ্রের দিকে।
একটা জটিল গ্রন্থি, যেটাকে খুলতে পারলেই সহস্র বছরের যবনিকা উঠবে। বছরগুলো যেন শক্ত হয়ে জমে আছে, গিঁট খোলার মন্ত্রটা উচ্চারিত হলেই সব গলে যেতে থাকবে বসন্তের সূর্যের তাপে গলে যাওয়া বরফের মতন। গলে গিয়ে তখন সব স্বচ্ছ, যার ভিতরে দেখা যাবে নদীর তলদেশের নুড়ি পাথর বালি, জলজ আগাছা, এঁকে বেঁকে স্রোতের মতন সাঁতার কাটতে থাকা রুপোলি মাছের ঝাঁক।
অন্ধকার। রাত্রি নেমে গেছে অনেকক্ষণ। সমুদ্রতীর এখন নির্জন। বালির উপরে অবিরাম আছড়ে পড়ার ঢেউয়ের শব্দ শুধু। ঝাউবনের মধ্যে শোঁ শোঁ করছে হাওয়া।এগিয়ে আসা ঢেউগুলো কেমন জ্বলজ্বল করে, রাত্রির সৈকতে কেমন একটা চাপা আলো। সমুদ্র থেকে বা আকাশ থেকে আসে ঐ আলো।
বিকেলে তুমি দেখেছিলে বালির উপরে পদচিহ্ন, মানুষের, পাখির, কাঁকড়ার। এসব চিহ্ন মুছে যায় একেকটা বড়সড় ঢেউ আসলেই। কিন্তু তোমার মনে পড়ে পাথরের মধ্যে অক্ষয় হয়ে থাকা মিলিয়ন বছরের পদচিহ্ন, বিপুল সরীসৃপরা যা রেখে গেছে। চিহ্ন রয়ে গেছে, তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে সবাই। হয়তো তারা ফিরে এসেছে অন্যরূপে, কেজানে! পৃথিবীর ভাঙা গড়া চলছিল তখন। কী বিপুল ধ্বংস! তার পরে জেগে ওঠে কী বিপুল সৃষ্টি। ঠিকই ভোর হয়, দীর্ঘ রাত্রি শেষে ভোর হয়। জীবন থেমে থাকে না।
তুমি বসেছ এখন আগুনের সামনে, বন্ধুদের সঙ্গে। আগুন ঘিরে গোল হয়ে বসেছ তোমরা সবাই। এখন কালপুরুষ আকাশের প্রায় মাঝখানে, তাকে অনুসরণ করছে তার হরিণমাথা কুকুর, লুব্ধক। তুমি তুলে নাও তোমার পানীয়, চুমুক দাও, একবার, দুইবার। অনুভব করো উষ্ণতা, তোমার ভিতরে এক অদ্ভুত উষ্ণতা। তুমি মাছভাজায় কামড় বসাও, অনুভব করো স্বাদ গন্ধ আর তারও বেশী কিছু। তোমার মনে পড়ে একটা দিন, বহুদিন আগের এক ডুবসাঁতার। নদীটার নাম যেন কী ছিল? চন্দ্রাবতী না?
রাত্রি বহে যায় শান্ত নদীর মত
আকাশে ভেসে থাকা ঘুমেলা চাঁদ
স্বপ্নের ঘোরে এলোমেলো কথা বলে,
জ্যোৎস্নারঙের কথা সব।
এই কি অমরত্বের টুকরোটাকরা?
অনন্তের বৃষ্টিবিন্দু?
সোনালী অগ্নিশিখা লাফিয়ে ওঠে অজস্র সোনালী ফুলের মতন
আলো আর ছায়া হাত ধরাধরি করে নাচছে-
শত শত নীল পদ্মের পাপড়ি খুলে যায় কোথায় যেন
দরজা খোলার শব্দ হয়-
দূর আকাশের প্রান্ত থেকে এসে পৌঁছায় প্রথম সূর্যের আলো-
ভোর হয়ে যায়।
এই কি অমরত্বের স্পর্শ?
এই কি অনন্তের তুষারকণা?
তোমার উষ্ণতা আমাকে ঘিরে ধরে তুলোর পোশাকের মতন,
আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি-
দেখতে দেখতে তলিয়ে যাই গভীরে,
সেখানে দেখতে পাই তোমার রক্তিম হৃদয়,
তার মধ্যে জ্বলছে উজ্জ্বল লাল আগুন
সৃষ্টির শুরু থেকে জ্বলছে অনির্বাণ।
এই কি অমরত্বের স্পন্দন?
এই কি অনন্তের কথামালা?
*******
একটা জটিল গ্রন্থি, যেটাকে খুলতে পারলেই সহস্র বছরের যবনিকা উঠবে। বছরগুলো যেন শক্ত হয়ে জমে আছে, গিঁট খোলার মন্ত্রটা উচ্চারিত হলেই সব গলে যেতে থাকবে বসন্তের সূর্যের তাপে গলে যাওয়া বরফের মতন। গলে গিয়ে তখন সব স্বচ্ছ, যার ভিতরে দেখা যাবে নদীর তলদেশের নুড়ি পাথর বালি, জলজ আগাছা, এঁকে বেঁকে স্রোতের মতন সাঁতার কাটতে থাকা রুপোলি মাছের ঝাঁক।
অন্ধকার। রাত্রি নেমে গেছে অনেকক্ষণ। সমুদ্রতীর এখন নির্জন। বালির উপরে অবিরাম আছড়ে পড়ার ঢেউয়ের শব্দ শুধু। ঝাউবনের মধ্যে শোঁ শোঁ করছে হাওয়া।এগিয়ে আসা ঢেউগুলো কেমন জ্বলজ্বল করে, রাত্রির সৈকতে কেমন একটা চাপা আলো। সমুদ্র থেকে বা আকাশ থেকে আসে ঐ আলো।
বিকেলে তুমি দেখেছিলে বালির উপরে পদচিহ্ন, মানুষের, পাখির, কাঁকড়ার। এসব চিহ্ন মুছে যায় একেকটা বড়সড় ঢেউ আসলেই। কিন্তু তোমার মনে পড়ে পাথরের মধ্যে অক্ষয় হয়ে থাকা মিলিয়ন বছরের পদচিহ্ন, বিপুল সরীসৃপরা যা রেখে গেছে। চিহ্ন রয়ে গেছে, তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে সবাই। হয়তো তারা ফিরে এসেছে অন্যরূপে, কেজানে! পৃথিবীর ভাঙা গড়া চলছিল তখন। কী বিপুল ধ্বংস! তার পরে জেগে ওঠে কী বিপুল সৃষ্টি। ঠিকই ভোর হয়, দীর্ঘ রাত্রি শেষে ভোর হয়। জীবন থেমে থাকে না।
তুমি বসেছ এখন আগুনের সামনে, বন্ধুদের সঙ্গে। আগুন ঘিরে গোল হয়ে বসেছ তোমরা সবাই। এখন কালপুরুষ আকাশের প্রায় মাঝখানে, তাকে অনুসরণ করছে তার হরিণমাথা কুকুর, লুব্ধক। তুমি তুলে নাও তোমার পানীয়, চুমুক দাও, একবার, দুইবার। অনুভব করো উষ্ণতা, তোমার ভিতরে এক অদ্ভুত উষ্ণতা। তুমি মাছভাজায় কামড় বসাও, অনুভব করো স্বাদ গন্ধ আর তারও বেশী কিছু। তোমার মনে পড়ে একটা দিন, বহুদিন আগের এক ডুবসাঁতার। নদীটার নাম যেন কী ছিল? চন্দ্রাবতী না?
রাত্রি বহে যায় শান্ত নদীর মত
আকাশে ভেসে থাকা ঘুমেলা চাঁদ
স্বপ্নের ঘোরে এলোমেলো কথা বলে,
জ্যোৎস্নারঙের কথা সব।
এই কি অমরত্বের টুকরোটাকরা?
অনন্তের বৃষ্টিবিন্দু?
সোনালী অগ্নিশিখা লাফিয়ে ওঠে অজস্র সোনালী ফুলের মতন
আলো আর ছায়া হাত ধরাধরি করে নাচছে-
শত শত নীল পদ্মের পাপড়ি খুলে যায় কোথায় যেন
দরজা খোলার শব্দ হয়-
দূর আকাশের প্রান্ত থেকে এসে পৌঁছায় প্রথম সূর্যের আলো-
ভোর হয়ে যায়।
এই কি অমরত্বের স্পর্শ?
এই কি অনন্তের তুষারকণা?
তোমার উষ্ণতা আমাকে ঘিরে ধরে তুলোর পোশাকের মতন,
আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি-
দেখতে দেখতে তলিয়ে যাই গভীরে,
সেখানে দেখতে পাই তোমার রক্তিম হৃদয়,
তার মধ্যে জ্বলছে উজ্জ্বল লাল আগুন
সৃষ্টির শুরু থেকে জ্বলছে অনির্বাণ।
এই কি অমরত্বের স্পন্দন?
এই কি অনন্তের কথামালা?
*******
Tuesday, August 12, 2014
The Tree
The day dawned with the color of pearl-
One little bird began her long flight
After kissing on the brown heart
Of her beloved tree.
The tree remained silent
He knew he'll have to wait for a long time
For her to return.
He'll have to endure many snowy days of
Cold, harsh, unforgiving winter.
Then, his beloved little bird will come back
In a golden morning of spring
With the message of new life-
The tree will bloom with flowers of pure joy.
One little bird began her long flight
After kissing on the brown heart
Of her beloved tree.
The tree remained silent
He knew he'll have to wait for a long time
For her to return.
He'll have to endure many snowy days of
Cold, harsh, unforgiving winter.
Then, his beloved little bird will come back
In a golden morning of spring
With the message of new life-
The tree will bloom with flowers of pure joy.
When?
To save from the merciless fire
I buried my heart deep down
Many feet under the stony ground.
I buried it into the sunless, moonless, airless darkness
Where the all destroying fire couldn’t touch it.
Years passed and the fire died down
I wanted to get my heart back
I reached for it into that dark depth
But I didn’t find that living, breathing heart.
It became a hard stone in those long years-
I washed it with my tears to soften it
Still it remained a dead weight.
When will she wake up?
I buried my heart deep down
Many feet under the stony ground.
I buried it into the sunless, moonless, airless darkness
Where the all destroying fire couldn’t touch it.
Years passed and the fire died down
I wanted to get my heart back
I reached for it into that dark depth
But I didn’t find that living, breathing heart.
It became a hard stone in those long years-
I washed it with my tears to soften it
Still it remained a dead weight.
When will she wake up?
Subscribe to:
Posts (Atom)
