ছাদটা বেশ বড়। এখানে শুয়ে উপরে তাকালে অনেকখানি আকাশ ঝম করে ওঠে। ঋতি প্রায়ই রাতের খাবার পরে একবার ছাদে আসে। আর মাদুরটা পেতে শুয়ে পড়ে। চোখ মেলে দেখে আকাশভর্তি তারা কেমন ঝমঝম করে বাজছে! না, আসলে তারারা ঝিকঝিক করে জ্বলছে শুধু, কোনো শব্দ নেই। তবু ঋতির কানে আসে কেমন এক অপূর্ব সঙ্গীত যা আর কেউ শুনতে পায় না।
পুবের দিকে নারকেল বাগান। ওদিকে তাকালে গাছের মাথাগুলো দেখা যায়, সারি বেঁধে দিগন্তের আড়াল রচনা করেছে। সেই গাছের সারি ছাড়িয়ে ঝিকঝিক করে জ্বলে ওঠে নীল সেই তারা। অনেকদিন আগে ঋতির বাবা ওকে চিনিয়ে দিয়েছিলো ঐ তারার নাম অভিজিৎ। আস্তে আস্তে উঠে আসছে অভিজিৎ, এই তো কিছুক্ষণ আগেও ভালো করে দেখাই যাচ্ছিলো না গাছের জন্য, এখন গাছগুলোর মাথা ছাড়িয়ে জ্বলজ্বল করছে খানিক উপরে। আরো উপরে উঠবে। একেবারে মাথার উপরে ঐখানে কখন আসবে? অনেক রাত হয়ে যাবে। একেকদিন ঋতির ইচ্ছে করে সারারাত ছাদে থাকতে, একেবারে তারাটার উদয় থেকে অস্ত অবধি। কিন্তু তা হবার নয়। এই তো মা ডাকতে শুরু করলো বলে!
কেন জীবন এভাবে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরে অজস্র দাবীতে? কেন কয়েকটা নির্জন মুহূর্তকে ধরা যায় না দু'হাতের অঞ্জলিতে? যা হারিয়ে যায় তা কি শুধুই হারিয়ে যায়, কখনো আর তাকে পাওয়া যায় না? সেই যে জনাই গাঁয়ের পাগলী মা অম্বা অপেক্ষায় থাকতো তার সুমনকে যে নিয়েছে সে ফিরিয়ে দেবে চুপি চুপি, গভীর রাত্রে? কখনো কি হারানো প্রিয়মুখ ফিরে আসে না জলের আয়নায়? কোনো অলৌকিক নীলপাখি ওড়া সকালে, কোনো অপার্থিব দ্যুতিময় সন্ধ্যায়?
বিলুপ্ত সেইসব শরৎসকাল মনে রাখিনি
ভুলে গেছি সেইসব আশাভঙ্গের দুঃখসন্ধ্যাও
সেইসব কথা না রাখার বিষাদ, সেইসব অকারণ কাটাকুটি-
টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতিরা-
কিছু মনে রাখিনি, মুছে নিয়েছি লবণজলের ওড়নায়।
সেইসব ছুটি-ঝিকমিক সকাল ছিলো আমাদের,
যাদুকরী রোদ্দুরে নামতা ভুলিয়ে দেওয়া সেইসব সকাল-
আকাশপৃথিবী জোড়া আশ্চর্যময়ী ভালোবাসা-উৎসব
সব হারিয়ে গেছে নি:শেষে, সে বিদায় মনে রাখিনি।
আমাদের গহীনের অরণ্য সব
থেকে যাক সবুজ থেকে সবুজতর হয়ে,
সেইসব মায়াময় নদীরা, মধুমন্তী নদীরা আমাদের-
আরো ছলছল হয়ে বয়ে যাক অলীক নীল সমুদ্রে।
সুপ্রাচীন শীতরাত্রির শনন শনন হাওয়া-
হাওয়া কাটিয়ে দক্ষিণের দিকে উড়ে চলা
কৃষ্ণপক্ষের নক্ষত্রবিলাসী পাখিরা-
ওরা ঠিকই রয়ে গেছে গোপণ আলো-অন্ধকারে।
জালের ফাঁসে বেঁধে রাখা ডানা খুলে একদিন
ওদের সাথী হয়ে আকাশে মিশে যাবার
একবুক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি
নীল নক্ষত্রের পায়ের কাছে।
Monday, August 25, 2014
নীলকলমীলতা
বহুদিন পরে কলম দিয়ে লিখতে গিয়ে চমকে উঠি, কলমটা নীল। আমার সেই কলমটাও নীল রঙের ছিলো। ঐ যে যেটা এক অপার্থিব হলুদ আলোয় ধুয়ে যাওয়া বিকালে অনেক চাঁদিয়াল ঘুড়ি ওড়া আকাশের নিচে আমাকে দিয়েছিলো শরণ্য। এইখানেই তো! এই পাথরেই তো বসেছিলাম আমরা।
কলমটা দিয়ে লিখতাম হাবিজাবি যা খুশি তাই। কাঁচামিঠে গল্প, আনকথা বানকথা গোঁজামিলের কবিতা --- সবকিছু তার শোনা চাই। একটা দিন বাদ যেতে পারতো না, বাদ গেলে তার কী অভিমান!
সে আমায় ডাকতো নীলকলমীলতা। কী যে ছিলো সেই ডাকে! কেমন একটা কাছে থাকার কোমল আনন্দের সঙ্গে সুদূরের গাঢ় বিষাদ অঙ্গাঙ্গী হয়ে জড়িয়ে থাকতো সেই ডাকে। ও কি জানতো আগে থেকেই ভবিষ্যতের কথা?
কেটে গেল কতগুলো বছর। বছরগুলো ঘন আঠালো সরের মতন, নজর চলে না বেশীদূর। বিচ্ছেদের সেই জ্বলন্ত তীব্রতা মিলিয়ে গেছে, রয়ে গেছে কেমন এক জ্বরো ক্লান্তি আর শিরশিরে কাঁপা-কাঁপা স্মৃতি।
আ:, এই হবার ছিলো? একদিন বিপুল বন্যার মতন যা মনপ্রাণকে আলোড়িত করেছিলো আজ তার স্মৃতিমাত্র সার? না এ হতে পারে না, আমাদের চেতনা অশূন্য অমৃতপাত্র, কিছুই হারাবে না, হারাবে না, হারাতে পারে না। শুধু লুকিয়ে আছে সে, একদিন প্রকাশিত হবেই।
শেষ বিকালের আলোয় আজও ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর, একজোড়া টুনটুনি ওড়াউড়ি করছে শিমগাছে, থোকা থোকা রোদ লেগে আছে মস্ত মস্ত শাল মেহগিনি সেগুনের ডালে পাতায়। এমন সব বিকালেই তো আমার কত কিছু শোনানোর থাকতো ওকে!
নদীটা একই রকম আছে, এর স্রোত, তীরের পাথরবালির কারুকাজ, পাড় থেকে ঝুঁকে পড়া গাছগুলো, ঐ যে আলোছায়ার জাফরির মধ্য দিয়ে দৌড়চ্ছে জলধারা-সব, সব একই আছে। এর সুরেলা ছন্দবাঁধা শব্দ, কান পেতে শোনা গানের মতন, তবু ভাষা স্পস্ট হয় না কখনো। কোথায় যেন একজোড়া পাখি ডাকছে, টী হু টী হু টী হু। একটা ডাকে, ডাকে, চুপ করে আর তখন দূর থেকে অন্যটা সাড়া দিয়ে ওঠে। তখনও তো এরকমই পাখিরা ডাকতো সায় মেলানো ডাক। এরা কি সেই পাখিরাই নাকি তাদের নাতিনাতনিরা? কে জানে ক'বছর বাঁচে বনের এই সুরেলা পাখিরা!
নদীর আয়নায় ঝুঁকে পড়ি, আঁজলা ভরে তুলে নিই-
জীবন জীবন আহা জীবন---
দু'দিনের তৃষ্ণা, দু'দিনের ক্ষুধা
দু'দিনের ধূলাখেলা মেলামাঠ নাগরদোলার
দু'পাশে গভীর ঘুমের কবিতা।
এ মাটির কলসে পূর্ণ থেকে পূর্ণ তুলে নিই, পূর্ণ পূর্ণই থেকে যায়। এ যে সেই আশ্চর্য, একই সঙ্গে খুব কাছে আবার খুব দূরে, চলেও আবার চলেও না। সে একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন আবার অবিচ্ছিন্ন। সে চিরসংলগ্ন হয়ে আছে ঐ নীহারিকাপার দূরত্বের বাধা পার হয়ে। এই রহস্যরোমাঞ্চময় গভীর জটিল ধাঁধার মধ্যে জন্মে সামান্য নিজের চেনাটুকু হারানো নিয়ে অভিযোগ করা কি শোভা পায়?
রক্তসন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে, আঁধার ঘনিয়ে এসেছে, আকাশভর্তি তারা ঝমঝম করে বেজে উঠছে। ঐ কোটি কোটি অর্বুদ অর্বুদ বছরের আদরের তারাগুলি আমার। আকাশের বাগানে থোকা থোকা নতুন মুকুলের মতন, কত পুরানো ওরা, তবু কত নতুন! "শান্ত হে মুক্ত হে হে অনন্ত পুণ্য / করুণাঘন ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য। "
কলমটা দিয়ে লিখতাম হাবিজাবি যা খুশি তাই। কাঁচামিঠে গল্প, আনকথা বানকথা গোঁজামিলের কবিতা --- সবকিছু তার শোনা চাই। একটা দিন বাদ যেতে পারতো না, বাদ গেলে তার কী অভিমান!
সে আমায় ডাকতো নীলকলমীলতা। কী যে ছিলো সেই ডাকে! কেমন একটা কাছে থাকার কোমল আনন্দের সঙ্গে সুদূরের গাঢ় বিষাদ অঙ্গাঙ্গী হয়ে জড়িয়ে থাকতো সেই ডাকে। ও কি জানতো আগে থেকেই ভবিষ্যতের কথা?
কেটে গেল কতগুলো বছর। বছরগুলো ঘন আঠালো সরের মতন, নজর চলে না বেশীদূর। বিচ্ছেদের সেই জ্বলন্ত তীব্রতা মিলিয়ে গেছে, রয়ে গেছে কেমন এক জ্বরো ক্লান্তি আর শিরশিরে কাঁপা-কাঁপা স্মৃতি।
আ:, এই হবার ছিলো? একদিন বিপুল বন্যার মতন যা মনপ্রাণকে আলোড়িত করেছিলো আজ তার স্মৃতিমাত্র সার? না এ হতে পারে না, আমাদের চেতনা অশূন্য অমৃতপাত্র, কিছুই হারাবে না, হারাবে না, হারাতে পারে না। শুধু লুকিয়ে আছে সে, একদিন প্রকাশিত হবেই।
শেষ বিকালের আলোয় আজও ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর, একজোড়া টুনটুনি ওড়াউড়ি করছে শিমগাছে, থোকা থোকা রোদ লেগে আছে মস্ত মস্ত শাল মেহগিনি সেগুনের ডালে পাতায়। এমন সব বিকালেই তো আমার কত কিছু শোনানোর থাকতো ওকে!
নদীটা একই রকম আছে, এর স্রোত, তীরের পাথরবালির কারুকাজ, পাড় থেকে ঝুঁকে পড়া গাছগুলো, ঐ যে আলোছায়ার জাফরির মধ্য দিয়ে দৌড়চ্ছে জলধারা-সব, সব একই আছে। এর সুরেলা ছন্দবাঁধা শব্দ, কান পেতে শোনা গানের মতন, তবু ভাষা স্পস্ট হয় না কখনো। কোথায় যেন একজোড়া পাখি ডাকছে, টী হু টী হু টী হু। একটা ডাকে, ডাকে, চুপ করে আর তখন দূর থেকে অন্যটা সাড়া দিয়ে ওঠে। তখনও তো এরকমই পাখিরা ডাকতো সায় মেলানো ডাক। এরা কি সেই পাখিরাই নাকি তাদের নাতিনাতনিরা? কে জানে ক'বছর বাঁচে বনের এই সুরেলা পাখিরা!
নদীর আয়নায় ঝুঁকে পড়ি, আঁজলা ভরে তুলে নিই-
জীবন জীবন আহা জীবন---
দু'দিনের তৃষ্ণা, দু'দিনের ক্ষুধা
দু'দিনের ধূলাখেলা মেলামাঠ নাগরদোলার
দু'পাশে গভীর ঘুমের কবিতা।
এ মাটির কলসে পূর্ণ থেকে পূর্ণ তুলে নিই, পূর্ণ পূর্ণই থেকে যায়। এ যে সেই আশ্চর্য, একই সঙ্গে খুব কাছে আবার খুব দূরে, চলেও আবার চলেও না। সে একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন আবার অবিচ্ছিন্ন। সে চিরসংলগ্ন হয়ে আছে ঐ নীহারিকাপার দূরত্বের বাধা পার হয়ে। এই রহস্যরোমাঞ্চময় গভীর জটিল ধাঁধার মধ্যে জন্মে সামান্য নিজের চেনাটুকু হারানো নিয়ে অভিযোগ করা কি শোভা পায়?
রক্তসন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে, আঁধার ঘনিয়ে এসেছে, আকাশভর্তি তারা ঝমঝম করে বেজে উঠছে। ঐ কোটি কোটি অর্বুদ অর্বুদ বছরের আদরের তারাগুলি আমার। আকাশের বাগানে থোকা থোকা নতুন মুকুলের মতন, কত পুরানো ওরা, তবু কত নতুন! "শান্ত হে মুক্ত হে হে অনন্ত পুণ্য / করুণাঘন ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য। "
টিয়ারোদ্দুর আর অতসী-হাওয়া
আমলকীবনে টিয়া রঙের রোদ্দুর, পাতারা সব কাঁপছে আর কাঁপছে অচেনা হাওয়ায়। এই হাওয়াটাই এই সময়ে আসে প্রত্যেকবার, তবু কখনো একে চেনা হয় না,এ যেন কাকজ্যোৎস্না মাঘরাত্তিরের অচিন পাগলের বাঁশির সুরের মতন। কিছুতেই বুঝে ওঠা যায় না অথচ কখন যেন সব খালি করে নিয়ে চলে যায়।
পথ হারিয়ে গেছে কতবার, তবু শেষ অবধি হারায় নি। সেই ঘরে ফিরে আসার তমাল গাছ, সেই কুটোকাটা ইঁটকাঠপাথরের ঘরগেরস্থি, সেই সব খুনসুটি ঝগড়াঝাঁটি এলোমেলো অর্থহীন দিনের পর দিন।
এর বাইরে থেকে নেই-নেই সেই হাওয়াটা ডাকে কিন্তু, টিয়ারোদ্দুরে হাতছানি দিয়ে দিয়ে। দুপুরজানালা কখন যেন ঘুমের কবিতা হয়ে যায়। তারা-ফুটফুট প্রতিপদের আকাশ-দেওয়ালি মনে পড়ে। কোথাও কোনো দরজা একটা আছে, আছেই। সেটা খোলে কেমন করে?
পথের ধারে ধারে এখানে ওখানে রেশমী নরম সরল গাছ। ওদের পাতাগুলো রোদ্দুরে ঝিলমিল করলে দূর থেকে দেখে ঠিক রেশমচুল সবজে- সবুজ মেয়ের কথা মনে পড়ে। তারই কি বেতের ফলের মতন চোখ? কেজানে! সেই পাগলা কবি হয়তো জানতো, কিন্তু সবাই তো তাকে কী সব আজেবাজে কথা বলে তার মন ভেঙে দিলো! অভিমান করে সে কোথায় যেন চলে গেছে, আর কোনোদিন ফেরে নি।
অতসী-হাওয়ায় গাছেরা কাঁপছে। আকাশ নীলকান্ত আজকে, মালার মতন উড়ছে একদল পায়রা। নাকি পায়রা না, অন্য কোনো পাখি ওরা? কেজানে! কাছের গাছে কিচিমিচি করে একদল নীল পাখি, কেজানে কী পখি!
শিলং পাহাড়ের ছোটোবেলা মনে পড়ে।সেখানে নীল নীল হাউস মার্টিন পাখি থাকতো। সেখানে লাল রঙের পুল ছিলো ছোট্টো ঝোরানদীর উপরে, সেই পুল পার হয়ে ছিলো রঙীন চীনে লন্ঠন ঝোলানো বাতাসবাড়ি। সেই বাড়িতেই থাকতো বুঝি মুন্নিরা? মনে পড়ে না। ভূমিকম্পের সময় সবাই ছুটে বেরিয়ে এলো, মুন্নি ও। কিন্তু তারপরে কী হলো? মুন্নি "মা কই, মাকে দেখতে পাচ্ছি না" বলে আবার বাড়ির ভিতর দৌড়ে গেল?
কচি কচি সরল গাছগুলো জড়িয়ে কেমন লাউডগাসবুজ লতা উঠেছে! তাতে এক দুই তিন চার পাঁচটা নীল ফুল ফুটেছে, নীল তারার মতন। এরা সকালে ফোটে, দুপুর হলে বুজে যায়। রাতে ফেরার পথে দেখি একদম লুকিয়ে গেছে। সরল গাছও তখন ঘুমায়?
লাল নীল সবুজ হলুদ ঘুড়িতে ঘুড়িতে আকাশ ঢেকে যাওয়া বিশ্বকর্মাবিকেল মনে পড়ে, সেটা অনেকদিন পরে। তখন পাহাড় মিলিয়ে গেছে অতীতে, তখন একটু বড়োবেলা।সেদিনও আকাশ এমন নীল ছিলো।
ধানের ক্ষেতে ধানগাছগুলো সবুজ তেজী, ঝিং ঝিং করে হাওয়া বয়ে যায় ধানের ধারালো পাতায় বাজনা তুলে তুলে। ভরা ক্ষেতের উপর দিয়ে ভেসে যায় কাটা ঘুড়িগুলো, ঐ দূরে মাটি যেখানে নত হয়ে পড়া আকাশে মিশে গেছে, সেই দিগন্তের দিকে। তারপরে? তারপরে ওরা কোথায় যায়?
হারিয়ে যায় কত কিছু। হারানো সেইসব পুঁতির মালা, লাল পুঁতি নীল পুঁতি পর পর সাজানো ছিলো যাতে-সন্ধ্যেবেলার মাঠে কোথায় পড়ে গেল ছিঁড়ে, সেই মাঝখানে গোল সোনালি সূর্য আঁকা নীল রেশমী রুমাল---কোথায় উড়ে গেল ঝড়ের হাওয়ায়, গাঢ় খয়েরী রঙের চকচকে প্রথম কলমটা-কোথায় পড়ে গেল, খুঁজে পাওয়া গেল না আর, রবিবারের দুপুরের রেডিওতে "আমার নাম টায়রা", কিছুই আর যার মনে রইলো না নামটুকু ছাড়া-এই সব, সব হারিয়ে গেলো। এইসব হারানো গুলো পালিয়ে যাওয়া নোটন নোটন পায়রাগুলোর মতন ঝোটন বেঁধে বসে আছে ময়ূরনদীর পারের সীতাহার গাছে,সে গাছ ঘিরে পালকের মতন ভাসছে জ্যোৎস্নাপরীরা। একদিন সেখানে যাবার জন্য রুমুদিদি রওনা হবে ভুলুকে নিয়ে, ওর যে পিঠে ডানার কুঁড়ি আছে!
দিন কাটে, রাত শনশন বয়ে যায়। মৌমাছির ডানার গুণগুণ যেন! কাছ থেকে সব কিছু বড় বেশী ঘন, অনেক দূরের স্মৃতিমাঠ থেকে দেখলে তবে বুঝি তবু খানিকটা বোঝা যায় তাকে। মস্ত একটা গোল চাঁদ ঝুলে থাকে, স্বপ্নবাতিঘরের জানালা থেকে দূরের পাহাড়চূড়ায় দেখা যায় কীসের আলো, জ্বলছে নিভছে জ্বলছে নিভছে .......
পথ হারিয়ে গেছে কতবার, তবু শেষ অবধি হারায় নি। সেই ঘরে ফিরে আসার তমাল গাছ, সেই কুটোকাটা ইঁটকাঠপাথরের ঘরগেরস্থি, সেই সব খুনসুটি ঝগড়াঝাঁটি এলোমেলো অর্থহীন দিনের পর দিন।
এর বাইরে থেকে নেই-নেই সেই হাওয়াটা ডাকে কিন্তু, টিয়ারোদ্দুরে হাতছানি দিয়ে দিয়ে। দুপুরজানালা কখন যেন ঘুমের কবিতা হয়ে যায়। তারা-ফুটফুট প্রতিপদের আকাশ-দেওয়ালি মনে পড়ে। কোথাও কোনো দরজা একটা আছে, আছেই। সেটা খোলে কেমন করে?
পথের ধারে ধারে এখানে ওখানে রেশমী নরম সরল গাছ। ওদের পাতাগুলো রোদ্দুরে ঝিলমিল করলে দূর থেকে দেখে ঠিক রেশমচুল সবজে- সবুজ মেয়ের কথা মনে পড়ে। তারই কি বেতের ফলের মতন চোখ? কেজানে! সেই পাগলা কবি হয়তো জানতো, কিন্তু সবাই তো তাকে কী সব আজেবাজে কথা বলে তার মন ভেঙে দিলো! অভিমান করে সে কোথায় যেন চলে গেছে, আর কোনোদিন ফেরে নি।
অতসী-হাওয়ায় গাছেরা কাঁপছে। আকাশ নীলকান্ত আজকে, মালার মতন উড়ছে একদল পায়রা। নাকি পায়রা না, অন্য কোনো পাখি ওরা? কেজানে! কাছের গাছে কিচিমিচি করে একদল নীল পাখি, কেজানে কী পখি!
শিলং পাহাড়ের ছোটোবেলা মনে পড়ে।সেখানে নীল নীল হাউস মার্টিন পাখি থাকতো। সেখানে লাল রঙের পুল ছিলো ছোট্টো ঝোরানদীর উপরে, সেই পুল পার হয়ে ছিলো রঙীন চীনে লন্ঠন ঝোলানো বাতাসবাড়ি। সেই বাড়িতেই থাকতো বুঝি মুন্নিরা? মনে পড়ে না। ভূমিকম্পের সময় সবাই ছুটে বেরিয়ে এলো, মুন্নি ও। কিন্তু তারপরে কী হলো? মুন্নি "মা কই, মাকে দেখতে পাচ্ছি না" বলে আবার বাড়ির ভিতর দৌড়ে গেল?
কচি কচি সরল গাছগুলো জড়িয়ে কেমন লাউডগাসবুজ লতা উঠেছে! তাতে এক দুই তিন চার পাঁচটা নীল ফুল ফুটেছে, নীল তারার মতন। এরা সকালে ফোটে, দুপুর হলে বুজে যায়। রাতে ফেরার পথে দেখি একদম লুকিয়ে গেছে। সরল গাছও তখন ঘুমায়?
লাল নীল সবুজ হলুদ ঘুড়িতে ঘুড়িতে আকাশ ঢেকে যাওয়া বিশ্বকর্মাবিকেল মনে পড়ে, সেটা অনেকদিন পরে। তখন পাহাড় মিলিয়ে গেছে অতীতে, তখন একটু বড়োবেলা।সেদিনও আকাশ এমন নীল ছিলো।
ধানের ক্ষেতে ধানগাছগুলো সবুজ তেজী, ঝিং ঝিং করে হাওয়া বয়ে যায় ধানের ধারালো পাতায় বাজনা তুলে তুলে। ভরা ক্ষেতের উপর দিয়ে ভেসে যায় কাটা ঘুড়িগুলো, ঐ দূরে মাটি যেখানে নত হয়ে পড়া আকাশে মিশে গেছে, সেই দিগন্তের দিকে। তারপরে? তারপরে ওরা কোথায় যায়?
হারিয়ে যায় কত কিছু। হারানো সেইসব পুঁতির মালা, লাল পুঁতি নীল পুঁতি পর পর সাজানো ছিলো যাতে-সন্ধ্যেবেলার মাঠে কোথায় পড়ে গেল ছিঁড়ে, সেই মাঝখানে গোল সোনালি সূর্য আঁকা নীল রেশমী রুমাল---কোথায় উড়ে গেল ঝড়ের হাওয়ায়, গাঢ় খয়েরী রঙের চকচকে প্রথম কলমটা-কোথায় পড়ে গেল, খুঁজে পাওয়া গেল না আর, রবিবারের দুপুরের রেডিওতে "আমার নাম টায়রা", কিছুই আর যার মনে রইলো না নামটুকু ছাড়া-এই সব, সব হারিয়ে গেলো। এইসব হারানো গুলো পালিয়ে যাওয়া নোটন নোটন পায়রাগুলোর মতন ঝোটন বেঁধে বসে আছে ময়ূরনদীর পারের সীতাহার গাছে,সে গাছ ঘিরে পালকের মতন ভাসছে জ্যোৎস্নাপরীরা। একদিন সেখানে যাবার জন্য রুমুদিদি রওনা হবে ভুলুকে নিয়ে, ওর যে পিঠে ডানার কুঁড়ি আছে!
দিন কাটে, রাত শনশন বয়ে যায়। মৌমাছির ডানার গুণগুণ যেন! কাছ থেকে সব কিছু বড় বেশী ঘন, অনেক দূরের স্মৃতিমাঠ থেকে দেখলে তবে বুঝি তবু খানিকটা বোঝা যায় তাকে। মস্ত একটা গোল চাঁদ ঝুলে থাকে, স্বপ্নবাতিঘরের জানালা থেকে দূরের পাহাড়চূড়ায় দেখা যায় কীসের আলো, জ্বলছে নিভছে জ্বলছে নিভছে .......
মহালয়া-ভোর
বহু বছর হলো মহালয়া ভোর দেখা হয় না। না, ভুল বললাম, দিনটা আসে ঠিকই। সেই দিনের ভোরও দেখা হয়, কিন্তু সেই শিউলি-উঠান, রাশি রাশি ফুল ঝরতো যেখানে, সেই শীত শীত আলো-আঁধারিতে ভোর চারটেয় বেজে ওঠা আশ্চর্য আকাশবাণীর কল, সেই গান, "বাজলো তোমার আলোর বেণু", আর সেই সব সুর আর কথার ঝর্ণার মধ্য দিয়ে আলো হয়ে ওঠা সেই শরতের স্বর্ণঝরা ভোর, সেই আশ্চর্য কন্ঠটি বলে যে কিনা বলে উঠতো "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর" অমনি ভিতরে বাহিরে ঘটে যেতো এক ম্যাজিক---সেই মহালয়া-ভোর আর আসে না। বহুকাল থাকি শিউলিবিহীন দেশে। কাশফুল আছে, নদীর তীর আছে, শুভ্র মেঘমালা আছে অপরাজিতানীল আকাশে, কিন্তু শিউলি নাই।
শিউলি নাই, অনুও নাই। আসলে আমিই নাই। মনে পড়ে মহালয়া ভোরে অনুহৃয়া আসতো নিয়ম করে, গেটের পাশে ছিলো সেই চেনা শিউলিগাছটা, আমাদের শিশুকাল থেকে আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই যে বড়ো হয়ে উঠেছিলো। পুজোর ছুটির কত দুপুরখেলা ছিলো ওর ছায়ায়। কমলা বৃন্তের সেই কোমল সাদা ফুলগুলো, রাশি রাশি ঝরে পড়তো, হালকা নরম সৌরভ ছড়িয়ে যেতো বাতাসে। ওরা ফুটতে শুরু করলেই আমাদের সকলের মনে শারদীয়া আসতো। রোদ্দুরে শারদীয়া রঙ লাগতো, মাঠ ভরে যেতো কাশফুলে। " ঢ্যামকুড়কুড় বাদ্যি বাজে ঢাকে পড়লো কাঠি/ যা দিবি মা তাই হবে আজ পরমান্নের বাটি।"
সে শিউলিগাছ হয়তো আজো আছে, হয়তো নেই। আমরা দুজনেই আর সেখানে নেই, ছিটকে কোথায় চলে গেছি দেশকালের স্রোতে।
অন্ধকার বারান্দা পেরিয়ে শিউলি উঠান
সেখানে আবছা ছায়ামায়া-
উঠান পার হয়ে ঘাসে ঢাকা মাঠ,
রাত্রিবাতাসে ঘাসেরা ঘুমিয়ে গেছে।
সব পেরিয়ে আকাশ, তাতে নক্ষত্রের হীরাপান্না।
গত সূর্যাস্তবেলায় যে পাখি উড়ে গেল
তার প্রবাসের অরণ্যের দিকে-
তার চলে যাবার দিকে যেমন চেয়েছিলো
আমার তৃষিত দুইচোখ
এখন তেমনি চেয়ে আছে
অন্ধকারের উপরের ঐ তারাগুলির দিকে।
ছায়াপথের ওড়নার দিকে চেয়ে আমি প্রার্থনা করি
কমলা জ্যেষ্ঠা তারার দিকে চেয়ে আমি প্রার্থনা করি
নীল চিত্রা তারার দিকে চেয়ে আমি প্রার্থনা করি
রাজহংসের পাখা ছাড়িয়ে ছায়াগ্নির দিকে চেয়ে আমি
প্রার্থনা করি-
এ সীমা টুটে যাক-
ঊর্ধ্বে ঐ প্রজাপতিমন্ডলের
ধ্যানমগ্ন ব্রহ্মহৃদয়ে মিলে যাক
এই ক্ষণভঙ্গুর মৃত্তিকাহৃদয়।
শিউলি নাই, অনুও নাই। আসলে আমিই নাই। মনে পড়ে মহালয়া ভোরে অনুহৃয়া আসতো নিয়ম করে, গেটের পাশে ছিলো সেই চেনা শিউলিগাছটা, আমাদের শিশুকাল থেকে আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই যে বড়ো হয়ে উঠেছিলো। পুজোর ছুটির কত দুপুরখেলা ছিলো ওর ছায়ায়। কমলা বৃন্তের সেই কোমল সাদা ফুলগুলো, রাশি রাশি ঝরে পড়তো, হালকা নরম সৌরভ ছড়িয়ে যেতো বাতাসে। ওরা ফুটতে শুরু করলেই আমাদের সকলের মনে শারদীয়া আসতো। রোদ্দুরে শারদীয়া রঙ লাগতো, মাঠ ভরে যেতো কাশফুলে। " ঢ্যামকুড়কুড় বাদ্যি বাজে ঢাকে পড়লো কাঠি/ যা দিবি মা তাই হবে আজ পরমান্নের বাটি।"
সে শিউলিগাছ হয়তো আজো আছে, হয়তো নেই। আমরা দুজনেই আর সেখানে নেই, ছিটকে কোথায় চলে গেছি দেশকালের স্রোতে।
অন্ধকার বারান্দা পেরিয়ে শিউলি উঠান
সেখানে আবছা ছায়ামায়া-
উঠান পার হয়ে ঘাসে ঢাকা মাঠ,
রাত্রিবাতাসে ঘাসেরা ঘুমিয়ে গেছে।
সব পেরিয়ে আকাশ, তাতে নক্ষত্রের হীরাপান্না।
গত সূর্যাস্তবেলায় যে পাখি উড়ে গেল
তার প্রবাসের অরণ্যের দিকে-
তার চলে যাবার দিকে যেমন চেয়েছিলো
আমার তৃষিত দুইচোখ
এখন তেমনি চেয়ে আছে
অন্ধকারের উপরের ঐ তারাগুলির দিকে।
ছায়াপথের ওড়নার দিকে চেয়ে আমি প্রার্থনা করি
কমলা জ্যেষ্ঠা তারার দিকে চেয়ে আমি প্রার্থনা করি
নীল চিত্রা তারার দিকে চেয়ে আমি প্রার্থনা করি
রাজহংসের পাখা ছাড়িয়ে ছায়াগ্নির দিকে চেয়ে আমি
প্রার্থনা করি-
এ সীমা টুটে যাক-
ঊর্ধ্বে ঐ প্রজাপতিমন্ডলের
ধ্যানমগ্ন ব্রহ্মহৃদয়ে মিলে যাক
এই ক্ষণভঙ্গুর মৃত্তিকাহৃদয়।
Friday, August 15, 2014
সূর্যশিশির
১
সূর্যশিশির, সূর্যশিশির, সূর্যশিশির -মাঝে মাঝে কেমন যেন হয় আশমানির। এক একটা শব্দ সারাদিন রিনরিন করে মনের মধ্যে বাজতে থাকে। আজকে যেমন এই সূর্যশিশির! কী সুন্দর কথাটা। অথচ এর মানেটা তেমন কিছু ভালো নয়, একরকমের পতঙ্গভুক উদ্ভিদ, কলসপত্রীর মতন। কলসপত্রী নামটাও কী চমৎকার ! এইসব গাছেদের এরকম সুন্দর নাম দেওয়ার পিছনে মানুষের কি কোনো বিশেষ মানসিকতা আছে?
সূর্যশিশির, সূর্যশিশির, সূর্যশিশির-আশমানি হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে এলো পার্কিং লট, পলিমার-সায়েন্সের বিশাল সুন্দর বিল্ডিংটার পাশ দিয়ে চলার সময় সারিবাঁধা পাইনের দিকে তাকালো, তারপরে পার হলো চওড়া লিংকন রোড-পুরো সময়টা মনের মধ্যে রিনরিন করে বাজছে সূর্যশিশির। আর মনে পড়ছে সূর্য নামটা, সবলে সেই নামটা সে মন থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে, কিন্তু ফিরে আসছে বার বার। কেন মনে পড়ে ঐ নাম? তাহলে আশমানি কি আজও অপেক্ষায় আছে মনে মনে?
অফিসঘরের চাবিটা বার করে সে দরজা খোলে, পিছনে করিডর থেকে পিটারের " গুডমর্নিং, অ্যাশমানি " শুনে মুখ ফিরিয়ে ওর দিকে চেয়ে ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে বলে, " গুডমর্নিং পিটার।"
আগে আগে ওর অ্যাশমানি শুধরে আশমানি করে দিতে অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু পিটারের উচ্চারণ কিছুতেই ঠিক হয় না। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে আশমানির, আর কিছু বলে না। প্রায় সকলেই ওকে অ্যাশমানি ডাকে, সে মানিয়ে নিয়েছে। তবু তো তাকে নাম বদলে ইংলিশ ধরনের নাম নিতে হয় নি, একরকম মন্দের ভালো। চাইনিজদের তো অনেককেই দেখেছে ইংলিশ নাম নিতে, এই তো শেহাই বলে মেয়েটি জেনি হয়ে গেছে, হুয়াংমিং হয়ে গেছে জোয়ানা। আশমানি অনায়াসে অ্যাশলি হয়ে যেতে পারতো, এখানের সবার সুবিধে হতো। কিন্তু নিজের নামটা পর্যন্ত ছাড়তে হলে আর কী রইলো?
যান্ত্রিক দক্ষতায় ইমেলগুলো চেক করে আশমানি। বেশ কিছু দরকারি ফাইল ডাউনলোড করে, কিছু প্রিন্টআউট নেয়। আগের রাতে যে প্রোগ্রামটা রান করতে দেওয়া ছিলো, সেটার প্রোগ্রেস চেক করে। এখনো প্রায় সিকিভাগ বাকি। লাঞ্চের পরে পাওয়া যাবে ভ্যালুগুলো। একদিকে ভালোই, ততক্ষণে ল্যাবে নতুন ডেটা নেওয়া যাবে। কাজগুলো হয়ে গেলে লগাউট করে ল্যাবের দিকে রওনা দেয় সে। এতক্ষণে ডোয়ানা, সারা, রুহান, অব্রিরা নিশ্চয় কাজ শুরু করে দিয়েছে।
ল্যাবে ঢুকে অল্পক্ষণের মধ্যেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে স্যাম্পল বানানো আর অসিলোস্কোপ নিয়ে। একটানা কাজ করে চলে বেশ ক' ঘন্টা। এক এক করে অন্যরা লাঞ্চে গেল, আশমানির খিদে পাচ্ছিলো না।
লাঞ্চ থেকে ফিরে এসে ডোয়ানা বললো, "অ্যাশমানি, আমি ডেটা নিই, তুমি এবারে লাঞ্চে যাও।" ওকে সব বুঝিয়ে দিয়ে আশমানি বললো, "আমি মিনিট কুড়ির মধ্যেই চলে আসছি। "
ল্যাব থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে কাফেটেরিয়ার দিকে আশমানি। চলে আশমানি, কেমন যেন ক্লান্তি সর্বাঙ্গে, সে কী এতক্ষণ না খেয়ে আছে বলে?
কাফেতে দেখা হিন্দোলের সঙ্গে, সে এসেছে লাঞ্চ করতে। আশমানি তো অবাক-খুশি। স্যান্ডউইচ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর স্প্রাইট নিয়ে কাফের একপাশের টেবিলে বসে দু'জন। এত বেলায় কাফে প্রায় ফাঁকাই বলা যায়, দুপুরের খাওয়া আর বাকী নেই কারুর।
হিন্দোল জিজ্ঞেস করে কাজকর্ম কেমন চলছে। আশমানি একটা আধাক্লান্ত হাসি হেসে স্যান্ডউইচে কামড় বসায় আর ঝালের চোটে স্প্রাইটে চুমুক দেয়। সে নিজেই বেশী করে হ্যালোপিনো দিতে বলে আর নিজেই ঝালে হুশহাশ করে। তারপরে সংক্ষেপে বলে নিজের কাজকর্মের কথা। হিন্দোলকেও জিজ্ঞাসা করে তার খবর।
হিন্দোলের সঙ্গে দেশে থাকতেই পরিচয় ছিলো আশমানির। শুধু পরিচয়ই না, ভালোরকম বন্ধুত্ব ও ছিলো। একই কলেজে আশমানি, সুর্য, হিন্দোল- সবাই পড়তো। আলাদা আলাদা বিষয়ে পড়লেও ওদের ক্লোজ গ্রুপ ছিলো একটা। সেই গ্রুপে ছিলো হিয়া, তিষান, আশমানি, সূর্য, হিন্দোল আর উপমা। স্বভাবে কারুর সঙ্গে কারুর মিল ছিলো না, অথচ বন্ধুত্ব গাঢ় ছিলো সেইসময়।
পরবর্তী জীবনে যে যার পথে চলে গেছে, সেই সময়ের পরিকল্পনা কিছুই পরে আর টেঁকে নি। হিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে ওর বাড়ী থেকে ঠিক করে দেওয়া পাত্রের সঙ্গে, অথচ হিয়া চাকরিবাকরি করে স্বাধীন হয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। হিয়ার সঙ্গে প্রেম ছিলো তিষানের। অভিমানী তিষান একটা কথাও না বলে ফরেস্ট সার্ভিসের পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়ে চলে গেছে হিমালয়ের পায়ের কাছে, সকলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করে দিয়েছে।
সূর্য চাকরি নিয়ে থিতু হয়ে গেলো, নিজের শহরেই চাকরি পেয়ে যাওয়ায় বেশ খুশীই ছিলো সে। বাবামায়ের কাছে থাকা জরুরী মনে হয়েছিলো ওর। অথচ কলেজজীবনে সূর্যকেই সবচেয়ে সুদূরের পিয়াসী মনে হতো, সবচেয়ে অ্যাডভেঞ্চারপ্রবণ মনে হতো। সময় মানুষকে কতই না বদলে দেয়! নইলে--থাক। মনে করতে চায় না আশমানি।
হিন্দোল কিছুদিন ভালো চাকরি করেছে বহুজাতিকে। এখন আবার সে পথ পালটিয়ে নেমে পড়েছে ব্যবসায়, এখানে সেই ব্যাপারেই নাকি এসেছে একটা কাজে। হিন্দোলের মধ্যে একটা অস্থিরতা আশমানি লক্ষ করেছে একেবারে প্রথম পরিচয়ের দিন থেকে। কোনো কিছু নিয়েই বেশীদিন আটকে থাকা যেন ওর ধাতে ছিলো না।
আশমানির হঠাৎ খেয়াল হয় সে নিজেও কত বদলে গেছে! তার ক্লোজ গ্রুপের একজন এতদূরে এতদিন পরে এসেছে জেনেও তার তেমন কোনো হেলদোল নেই। অভিমান কি এত তীব্র হয়? হয়তো শুধু অভিমান না, হয়তো বিষাদ, ক্ষোভ, যন্ত্রণাও।
লাঞ্চ সেরে দু'জনে দু'পথে চলে যাবার আগে তুলে নিলো দু'জনের ফোননম্বর। বিদায় জানিয়ে ল্যাবের দিকে দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ আশমানির মনে পড়ে পুরানো দিনে হিন্দোল খুব হাসাতো নানারকম জোকস বলে আর মজার অভিনয় করে। এখন সেই হিন্দোল কত সিরিয়াস হয়ে গেছে! সব মানুষই ক্রমাগত বদলায়, পরিস্থিতি মানুষকে দিনেরাতে সকালেসন্ধ্যায় কেবলই বদলে দিতে থাকে।
তবু কি কিছু থেকে যায় যা অপরিবর্তনীয়? যা অজর, অমর, অক্ষয়? তেমন কিছু কি সে কোনোদিন অনুভব করে কোনো বিরল অবসর-প্রহরে?
দিনের বাকী সময়টা টানা কাজ করছিলো আশমানি, বিকেল পৌনে পাঁচটায় ডোয়ানা এসে বললো তার কাজ আজকের মতন শেষ, আগে আগে চলে যাবে। ডোয়ানার মুখে লেগে আছে লাজুক হাসি, তাতে উত্তেজনার রঙ। তার বয়ফ্রেন্ড আজকে দেখা করতে আসবে, সপ্তাহের এইদিনটাতেই সন্ধ্যাবেলা তারা দেখা করে।
আশমানির খেয়াল হলো দিনটা শুক্রবার, এই সন্ধ্যা মানুষের আনন্দ করার সন্ধ্যা। পরের দু'দিন ছুটি কিনা! হাসিমুখে ডোয়ানাকে বিদায় জানিয়ে সেও কাগজপত্র গোছাতে শুরু করে। যদিও আজকে সন্ধ্যায় তার বিশেষ কোনো প্ল্যান কিছু নেই, কারুর সঙ্গে দেখা করারও নেই, তবু তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে একা কিছুটা সময় বিশ্রাম করতে ইচ্ছে করছে, শুয়ে শুয়ে কিশোরপাঠ্য অ্যাডভেঞ্চারওয়ালা গল্পের বই পড়তে ইচ্ছে করছে সেই কিশোরীবেলায় যেমন পড়তো।
ঘরে পৌঁছে ব্যাগ ট্যাগ সব রেখে আগে তার দীর্ঘ স্নানবিলাস, তারপরে কফি বানানো, টোস্ট বানানো, কফির সঙ্গে মাখন লাগানো টোস্ট খেতে খেতে টিভি দেখা- এই প্ল্যান। খুব নতুন কিছু না, আগের শুক্রসন্ধ্যায়ও তো প্রায় এই করেছে।
স্নান আর খাবার বানানো হয়ে গেলে সে চিঠির বাক্সো দেখতে যায়। খোলে রুটিন কাজের মতন। ভিতরে একটা খাম, উপরে ঠিকানা লেখা। ইংরেজী ক্যাপিটাল লেটারে লেখা ঠিকানা, হাতের লেখাটা পরিচিত ঠেকে। খুব পরিচিত। স্মৃতির ভিতর থেকে উকি দেয় কী যেন একটা, সেটা কি অভিমান? নাকি অন্য কিছু? কোনো স্পন্দিত অপেক্ষা?
খামটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে আশমানি। তারপরে চিঠির খাম না ছিঁড়েই রেখে দেয়। বসার ঘরে সোফার উপরে খাম রেখে কিচেনে যায়, কফি টোস্ট আনতে। অবাক হয়ে লক্ষ করে তার হাত মাঝে মাঝে কাঁপছে।
খাবার নিয়ে গিয়ে বসে বসার ঘরে সোফায়, সামনের নিচু টেবিলে রাখে ওসব। পাশেই খামটা, টোস্টে কামড় দিতে দিতে মাঝে মাঝে চেয়ে দেখে খামটার দিকে, আস্তে আস্তে খাওয়া সারে, আয়েশ করে কফিতে চুমুক দেয়। একসময় সে বুঝতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে আজ সময় নিচ্ছে বেশী। নিজের অজান্তেই প্লেট সরিয়ে রেখে খামটা ছেঁড়ে আশমানি, চিঠির ভাঁজ খোলে।
সূর্য চিরকাল বড় চিঠি লেখে, এই চিঠিও বেশ বড়। তবে আগে অনেক কবিতা টবিতার কোটেশন দিয়ে দিয়ে লিখতো, এই চিঠিতে তা নেই। ওর নিজের বক্তব্যই শুধু। আশমানির কাছে ক্ষমা চেয়েছে সে, সে লিখেছে আশমানির মতন আকাশের উচ্চতার মানুষকে সে মাটির মানুষ হয়ে একদিন চেয়েছিল, আশমানিও রাজী ছিল- সেই নাকি পরম সৌভাগ্য। কিন্তু যা হবার নয়, তা কেমন করে হবে?
আশমানি যদি এই ভুল ভালোবাসায় দু:খ পেয়ে থাকে তাহলে সে যেন এটুকু অন্তত বোঝে যে সূর্যও কম দু:খ পায় নি। মনে মনে সে আশমানিরই রইলো, কিন্তু বাস্তব দুনিয়ায় তো তাকে বাঁচতে হবে, তাই সে বাবামায়ের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করতে চলেছে কিছুদিন পরে। মেয়েটি ভালো, ঘরোয়া, শান্ত। আশমানি যেন ভুল না বোঝে তাকে। আশমানির জন্য তার অনেক শুভকামনা রইল। সাহসী ও হৃদয়বান কোনো মানুষের সঙ্গে একদিন আশমানির মিল হবে, হবেই। সুখী হবে সে, তখন আর তার পুরানোদিনের দু:খ মনে থাকবে না।
চিঠিটা ডানহাতে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে আশমানি, তারপরে নির্জন ঘরের একাকীত্বে খোলাখুলি কান্নায় ডুবে যায় নিশ্চিন্তে। এখানে তাকে দেখে ফেলার কেউ নেই, কারুর সামনে অপ্রস্তুত হবার ভয়ে সমুদ্রসমান কান্না গিলে ফেলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেদিনের মতন ফিরতে হবে না তার।
সূর্য সেদিন ভীরু কাপুরুষের মতন পিছিয়ে গেছিল আশমানিকে তীব্র একলা করে দিয়ে। আশমানির তবু স্বপ্নভঙ্গ হয় নি, সমস্ত অপমানের আঁচড় নিজের উপরে নিয়েও তার ভালোবাসা বেঁচে ছিলো, সে ভেবেছিলো কোনো না কোনোদিন সূর্য তার কাছে আসবেই, সত্য সে বুঝতে পারবেই, অন্ধকারের বেড়া ভেঙে সে আসবেই তার ভালোবাসার কাছে। মানুষের বানানো ধর্ম ও তার ভুল বিভেদবোধ কি কোনোদিন মানবধর্মের চেয়ে বড়ো হয়?
একা ঘরে হৃদয় উজার করে কাঁদছে আশমানি, এ কান্না খানিকটা মুক্তির কান্নাও। আর তার কোনো দায় রইলো না অপেক্ষার, সূর্য নামের মানুষটাকে ভুলে গেলেও কিছু আর আসে যায় না তার।
একসময় কান্না ফুরিয়ে যায়। গভীর এক ক্লান্তির ঘোর নেমে আসে সর্বাঙ্গ জুড়ে। দু'চোখের পাতা আঠার মতন জুড়ে যায় ঘুমে। আহ, এসো ঘুম, এসো সর্বতাপহরণ ঘুম, তুমি এসো।
২
মুঠাফোনটা বাজছে, ঘুমের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে শিথিল হাত বাড়ায় আশমানি। বালিশের পাশেই ফোন, ঘুমঝাপসা চোখ খুলে দেখে হিন্দোলের নম্বর। স্বপ্নভাঙা এলোমেলো মাথার মধ্যে সূর্য, সূযের চিঠি, হিন্দোল সব তালগোল পাকিয়ে যায়।
মুঠাফোন হাতে নিয়ে উঠে বসে আশমানি, দেয়ালে ঘড়িটার দিকে চোখ চলে যায়, না বেশী রাত না, মাত্র সাড়ে নয়। আরো একবার রিংটোন বাজা শেষ হলে ফোন কানে দিয়ে আশমানি সাড়া দেয়।
ওপাশে হিন্দোলের ছটফটে গলা, "কতক্ষণ ধরে করছি, কী করছিলে?"
আশমানি আলগা গলায় বলে, "আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।"
"সরি, সরি। তোমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম। নিশ্চয় খুব ক্লান্ত ছিলে।"
"তা একটু ছিলাম। কোনো দরকার?"
"আগামীকাল কি তোমার কোনো বিশেষ প্রোগ্রাম আছে?"
"কেন বলো তো?"
"আমি ভাবছিলাম যদি কোথাও যাওয়া যায় কাছেপিঠে। মাত্র ঘন্টা দেড়েকের ড্রাইভেই তো চমৎকার সিবীচ। যাবে, আশমানি?"
"এমন হঠাৎ করে বললে হয় নাকি? কালকে সকালে আমার অন্য কাজ আছে।"
হিন্দোলের গলা একটু মুষড়ে গেছে ওদিকে, কিন্তু সে এমন অল্পে ছেড়ে দেবার বান্দা যে নয় আশমানি ভালো জানে। হিন্দোল বলে, " দুপুরের পরে বা বিকালের দিকে রওনা হলে কেমন হয়? রাতের সমুদ্র দিনের চেয়ে বেশী চমৎকার। "
আশমানি হেসে ফেলে, "তুমি যা মানুষ, হয়তো বলবে সারারাত সমুদ্রের পারে ঘোরা আরো চমৎকার।"
খোলা গলায় হিন্দোল হাসছে। একেবারে সেই কলেজবেলার মতন। আশমানির ভিতরে কেমন যেন শিরশির করে উঠছে। মাঝে মাঝে সে ভাবে সেইসব দিনে আসলে কি সে হিন্দোলকেও ....
" আশমানি, না বোলো না, বলো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।"
ওর বলার ভঙ্গীতে আবারও হেসে ফেলে আশমানি, পাগলাটাকে থামানো যাবে না জেনে বলে, "ঠিক আছে, যাবো। "
ফোন রেখে দিয়ে উঠে বসে আশমানি, ঘুমটা কেটে গেছে, ক্লান্তিও। হঠাৎ কিসের যেন একটা অস্বস্তি, কোথায় আশমানি বোঝে না। সে দরজা খুলে করিডরে দাঁড়ায়, দোতলার এই করিডরে অনেক খোলা হাওয়া। এখান থেকে আকাশের অনেকখানি দেখা যায়।
হঠাৎ জলে ভরে যায় তার চোখ, মুছে নেয় জামার হাতায়। ভাবে, কী হবে সেসব পুরানো কথা ভেবে? যে আসছিলো, সে তো ফিরে গেছে। সেদিনের দুর্বল ভীতু আশমানি তাকে আসতে দিতে পারে নি। কোল জুড়ে এলে সে কেমন হতো, সেকথা ভেবে আজ আর কী লাভ? মনে পড়ে সূর্যের সঙ্গে সেইসব মুহূর্তগুলো, নিবিড় ভালোবাসায় বাকী পৃথিবী যখন মিলিয়ে গেছিলো দু'জনের মাঝ থেকে। গেছিলো কি? তাহলে কীকরে পারলো সূর্য ওভাবে সরে যেতে?
সূর্য যদি সেদিন পাশে দাঁড়াতো...যদি আরেকটু সাহস সে করতে পারতো সেদিন ... থাক, যা হয়ে গেছে তাতো হয়েই গেছে! আর তাকে সংশোধনের কোনো উপায় নেই। রাতের বাতাসে দীর্ঘশ্বাস মুক্ত করে দিয়ে আশমানি ঘরে ফিরে আসে।
৩
সন্ধ্যার আকাশ ভরে তারারা জেগে উঠছে। নির্জন দ্বীপের বাতিঘরে আলো জ্বলছে। আশমানি জলের ধারের পাথরে বসে আছে চুপ করে। সমুদ্রের ধারে কী প্রবল হাওয়া! ঐ যে দূরে জলদিগন্ত, পশ্চিমের সেই জলরেখার উপরে আকাশ, সেখানে আশ্চর্য রঙীন সূর্যাস্তের রেশ রয়ে গেছে এখনো।
দিনের আলো যতক্ষণ ছিলো আশমানি কথা বলেছে অনেক। ঝিনুক কুড়িয়ে কুড়িয়ে রেখেছে রুমালে জড়িয়ে। এখন সে চুপ, পাথরের উপরে বসে আছে একেবারে পাথরটারই মতন স্তব্ধ। সমব্যথীর মতন হিন্দোল আশমানির হাত ধরে চুপ করে থাকে।
কতক্ষণ তারা চুপ করে বসে ছিলো হাতে হাত রেখে তা বুঝি জানে শুধু সমুদ্রের হাওয়া, ফিসফিস করে হাওয়া কানে কানে কী সব বলে যায় তারা অনবরত। আকাশের তারারা নির্বিকার, এমন হাসিকান্না আসা যাওয়া হারানো পাওয়া কত দেখেছে ওরা, কতকাল ধরে দেখছে! মানুষের কত আনন্দবেদনার ইতিহাসের পাশ দিয়ে নিজের মতন করে চলে গেছে তাদের অপলক আলো।
আশমানি বলে, " জানো হিন্দোল, সূর্যের চিঠি পেলাম কাল। সে বিয়ে করতে চলেছে। আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। হিন্দোল, ঠিক মানুষকে আমরা চিনতে পারি না কেন? আমরা কেন ভুল মানুষকে ভালোবাসি আর সে ভুলের খেসারত দিতে দিতে জীবনটাই কেটে যায় ? "
হিন্দোলের হাতটা শক্ত করে চাপ দেয় আশমানির হাতে, স্পর্শের বৈদ্যুতি ভাষায় সাহস দিতে চায়, সান্ত্বনা দিতে চায়। আরো কিছু বলতে চায় কিনা কেজানে! আরো একটা ভুলের জালে জড়িয়ে পড়তে ইচ্ছে করে না আশমানির। তার চেয়ে এই তো সে বেশ ভালো আছে, ঝাড়া হাতপা। বিদেশে বিভুঁইয়ে চেনাজানা মানুষদের হাজারো প্রশ্ন থেকে অনেক দূরে-
আশমানি উঠে পড়ে, পোশাক থেকে বালি ঝাড়তে ঝাড়তে বলে," চলো, কাছের কোনো মোটেলে উঠি, এত রাতে এতটা লম্বা ড্রাইভ করে না ফিরে কালকে সকালে ফিরবো না হয়। "
হিন্দোল বলে, " চলো। "
মোটেলটা কাছেই ছিলো, ব্রীজ পার হয়ে দ্বীপ থেকে মূল ভূখন্ডে ঢোকার পরেই খানিক এগিয়ে সুন্দর মোটেল। তারা চেক ইন করলো রাতের জন্য। দুই বেডের ঘর। ছিমছাম সাজানো।
খুব ঘুম পায়, দু'চোখের পাতা জড়িয়ে আসে, সোফা থেকে কোনোরকমে বিছানায় কাছে এসে বালিশে মাথা ঢেলে দেয় আশমানি।
৪
দূরে আকাশ যেখানে নত হয়ে পড়েছে জলে, সেইখান থেকে বেরিয়ে আসে লাল সূর্য, লাল হৃৎপিন্ডের মত, স্পন্দিত আলো ছড়িয়ে পড়ে চরাচরে। কোথা থেকে ভোরের সমুদ্রতীরে এসে পড়ে একলা একটা মেয়ে, আবরণমুক্ত হয়ে এগিয়ে যায় জলের দিকে, অবগাহণপ্রত্যাশায়।
ওর খোলা চুলের ঢালে জড়িয়ে যায় সাদা ফেনা, চিকচিক করে ওঠে ভোরের আলো। স্নান করতে করতে সে হাসছে, দু'হাতের মুঠায় নোনাপানি নিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিতে দিতে সে চেঁচিয়ে বলে, "শোনো, শোনো, আমি আমার নাম দিলাম আকাশ।" একটা চমৎকার নীল মেঘ উড়ে আসে তার মাথার উপরে, টুপটাপ ঝরতে শুরু করে নীল বৃষ্টিকণা।
ঘুম ভাঙে আশমানির, স্নিগ্ধ শান্তি। এই স্বপ্ন তার চেনা, অনেকবার দেখেছে সে। এইটা তার খুব সুন্দর একটা হালকা পালকের মতন স্বপ্ন, একটা অলৌকিক মুক্তির স্বাদ। স্বপ্নের ভিতরের মেয়েটাকে কখনো মনে হয় খুব চেনা, আবার কখনো একদম অচেনা। কখনো মেয়েটা সে নিজেই, আবার কখনো বা তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়মুখ।
ভোর হয়ে গেছে, পুবের জানালার পর্দা সরিয়ে দাঁড়ায় আশমানি। টলটলে জলের ভিতর দিয়ে দেখে উঠে আসছে লাল সূর্য, মেঘগুলো সব কমলা। হিন্দোল গভীর ঘুমে, ওর ঘুমন্ত মুখটা শিশুর মতন, মায়ায় ভরে যায় আশমানির বুকের ভিতরটা। বহুদিনের শুখা জমিনের উপরে সেখানে তখন নেমেছে বৃষ্টি, নীল রঙের বৃষ্টি, ঠিক সেই স্বপ্নটার মতন।
******
সূর্যশিশির, সূর্যশিশির, সূর্যশিশির -মাঝে মাঝে কেমন যেন হয় আশমানির। এক একটা শব্দ সারাদিন রিনরিন করে মনের মধ্যে বাজতে থাকে। আজকে যেমন এই সূর্যশিশির! কী সুন্দর কথাটা। অথচ এর মানেটা তেমন কিছু ভালো নয়, একরকমের পতঙ্গভুক উদ্ভিদ, কলসপত্রীর মতন। কলসপত্রী নামটাও কী চমৎকার ! এইসব গাছেদের এরকম সুন্দর নাম দেওয়ার পিছনে মানুষের কি কোনো বিশেষ মানসিকতা আছে?
সূর্যশিশির, সূর্যশিশির, সূর্যশিশির-আশমানি হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে এলো পার্কিং লট, পলিমার-সায়েন্সের বিশাল সুন্দর বিল্ডিংটার পাশ দিয়ে চলার সময় সারিবাঁধা পাইনের দিকে তাকালো, তারপরে পার হলো চওড়া লিংকন রোড-পুরো সময়টা মনের মধ্যে রিনরিন করে বাজছে সূর্যশিশির। আর মনে পড়ছে সূর্য নামটা, সবলে সেই নামটা সে মন থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে, কিন্তু ফিরে আসছে বার বার। কেন মনে পড়ে ঐ নাম? তাহলে আশমানি কি আজও অপেক্ষায় আছে মনে মনে?
অফিসঘরের চাবিটা বার করে সে দরজা খোলে, পিছনে করিডর থেকে পিটারের " গুডমর্নিং, অ্যাশমানি " শুনে মুখ ফিরিয়ে ওর দিকে চেয়ে ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে বলে, " গুডমর্নিং পিটার।"
আগে আগে ওর অ্যাশমানি শুধরে আশমানি করে দিতে অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু পিটারের উচ্চারণ কিছুতেই ঠিক হয় না। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে আশমানির, আর কিছু বলে না। প্রায় সকলেই ওকে অ্যাশমানি ডাকে, সে মানিয়ে নিয়েছে। তবু তো তাকে নাম বদলে ইংলিশ ধরনের নাম নিতে হয় নি, একরকম মন্দের ভালো। চাইনিজদের তো অনেককেই দেখেছে ইংলিশ নাম নিতে, এই তো শেহাই বলে মেয়েটি জেনি হয়ে গেছে, হুয়াংমিং হয়ে গেছে জোয়ানা। আশমানি অনায়াসে অ্যাশলি হয়ে যেতে পারতো, এখানের সবার সুবিধে হতো। কিন্তু নিজের নামটা পর্যন্ত ছাড়তে হলে আর কী রইলো?
যান্ত্রিক দক্ষতায় ইমেলগুলো চেক করে আশমানি। বেশ কিছু দরকারি ফাইল ডাউনলোড করে, কিছু প্রিন্টআউট নেয়। আগের রাতে যে প্রোগ্রামটা রান করতে দেওয়া ছিলো, সেটার প্রোগ্রেস চেক করে। এখনো প্রায় সিকিভাগ বাকি। লাঞ্চের পরে পাওয়া যাবে ভ্যালুগুলো। একদিকে ভালোই, ততক্ষণে ল্যাবে নতুন ডেটা নেওয়া যাবে। কাজগুলো হয়ে গেলে লগাউট করে ল্যাবের দিকে রওনা দেয় সে। এতক্ষণে ডোয়ানা, সারা, রুহান, অব্রিরা নিশ্চয় কাজ শুরু করে দিয়েছে।
ল্যাবে ঢুকে অল্পক্ষণের মধ্যেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে স্যাম্পল বানানো আর অসিলোস্কোপ নিয়ে। একটানা কাজ করে চলে বেশ ক' ঘন্টা। এক এক করে অন্যরা লাঞ্চে গেল, আশমানির খিদে পাচ্ছিলো না।
লাঞ্চ থেকে ফিরে এসে ডোয়ানা বললো, "অ্যাশমানি, আমি ডেটা নিই, তুমি এবারে লাঞ্চে যাও।" ওকে সব বুঝিয়ে দিয়ে আশমানি বললো, "আমি মিনিট কুড়ির মধ্যেই চলে আসছি। "
ল্যাব থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে কাফেটেরিয়ার দিকে আশমানি। চলে আশমানি, কেমন যেন ক্লান্তি সর্বাঙ্গে, সে কী এতক্ষণ না খেয়ে আছে বলে?
কাফেতে দেখা হিন্দোলের সঙ্গে, সে এসেছে লাঞ্চ করতে। আশমানি তো অবাক-খুশি। স্যান্ডউইচ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর স্প্রাইট নিয়ে কাফের একপাশের টেবিলে বসে দু'জন। এত বেলায় কাফে প্রায় ফাঁকাই বলা যায়, দুপুরের খাওয়া আর বাকী নেই কারুর।
হিন্দোল জিজ্ঞেস করে কাজকর্ম কেমন চলছে। আশমানি একটা আধাক্লান্ত হাসি হেসে স্যান্ডউইচে কামড় বসায় আর ঝালের চোটে স্প্রাইটে চুমুক দেয়। সে নিজেই বেশী করে হ্যালোপিনো দিতে বলে আর নিজেই ঝালে হুশহাশ করে। তারপরে সংক্ষেপে বলে নিজের কাজকর্মের কথা। হিন্দোলকেও জিজ্ঞাসা করে তার খবর।
হিন্দোলের সঙ্গে দেশে থাকতেই পরিচয় ছিলো আশমানির। শুধু পরিচয়ই না, ভালোরকম বন্ধুত্ব ও ছিলো। একই কলেজে আশমানি, সুর্য, হিন্দোল- সবাই পড়তো। আলাদা আলাদা বিষয়ে পড়লেও ওদের ক্লোজ গ্রুপ ছিলো একটা। সেই গ্রুপে ছিলো হিয়া, তিষান, আশমানি, সূর্য, হিন্দোল আর উপমা। স্বভাবে কারুর সঙ্গে কারুর মিল ছিলো না, অথচ বন্ধুত্ব গাঢ় ছিলো সেইসময়।
পরবর্তী জীবনে যে যার পথে চলে গেছে, সেই সময়ের পরিকল্পনা কিছুই পরে আর টেঁকে নি। হিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে ওর বাড়ী থেকে ঠিক করে দেওয়া পাত্রের সঙ্গে, অথচ হিয়া চাকরিবাকরি করে স্বাধীন হয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। হিয়ার সঙ্গে প্রেম ছিলো তিষানের। অভিমানী তিষান একটা কথাও না বলে ফরেস্ট সার্ভিসের পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়ে চলে গেছে হিমালয়ের পায়ের কাছে, সকলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করে দিয়েছে।
সূর্য চাকরি নিয়ে থিতু হয়ে গেলো, নিজের শহরেই চাকরি পেয়ে যাওয়ায় বেশ খুশীই ছিলো সে। বাবামায়ের কাছে থাকা জরুরী মনে হয়েছিলো ওর। অথচ কলেজজীবনে সূর্যকেই সবচেয়ে সুদূরের পিয়াসী মনে হতো, সবচেয়ে অ্যাডভেঞ্চারপ্রবণ মনে হতো। সময় মানুষকে কতই না বদলে দেয়! নইলে--থাক। মনে করতে চায় না আশমানি।
হিন্দোল কিছুদিন ভালো চাকরি করেছে বহুজাতিকে। এখন আবার সে পথ পালটিয়ে নেমে পড়েছে ব্যবসায়, এখানে সেই ব্যাপারেই নাকি এসেছে একটা কাজে। হিন্দোলের মধ্যে একটা অস্থিরতা আশমানি লক্ষ করেছে একেবারে প্রথম পরিচয়ের দিন থেকে। কোনো কিছু নিয়েই বেশীদিন আটকে থাকা যেন ওর ধাতে ছিলো না।
আশমানির হঠাৎ খেয়াল হয় সে নিজেও কত বদলে গেছে! তার ক্লোজ গ্রুপের একজন এতদূরে এতদিন পরে এসেছে জেনেও তার তেমন কোনো হেলদোল নেই। অভিমান কি এত তীব্র হয়? হয়তো শুধু অভিমান না, হয়তো বিষাদ, ক্ষোভ, যন্ত্রণাও।
লাঞ্চ সেরে দু'জনে দু'পথে চলে যাবার আগে তুলে নিলো দু'জনের ফোননম্বর। বিদায় জানিয়ে ল্যাবের দিকে দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ আশমানির মনে পড়ে পুরানো দিনে হিন্দোল খুব হাসাতো নানারকম জোকস বলে আর মজার অভিনয় করে। এখন সেই হিন্দোল কত সিরিয়াস হয়ে গেছে! সব মানুষই ক্রমাগত বদলায়, পরিস্থিতি মানুষকে দিনেরাতে সকালেসন্ধ্যায় কেবলই বদলে দিতে থাকে।
তবু কি কিছু থেকে যায় যা অপরিবর্তনীয়? যা অজর, অমর, অক্ষয়? তেমন কিছু কি সে কোনোদিন অনুভব করে কোনো বিরল অবসর-প্রহরে?
দিনের বাকী সময়টা টানা কাজ করছিলো আশমানি, বিকেল পৌনে পাঁচটায় ডোয়ানা এসে বললো তার কাজ আজকের মতন শেষ, আগে আগে চলে যাবে। ডোয়ানার মুখে লেগে আছে লাজুক হাসি, তাতে উত্তেজনার রঙ। তার বয়ফ্রেন্ড আজকে দেখা করতে আসবে, সপ্তাহের এইদিনটাতেই সন্ধ্যাবেলা তারা দেখা করে।
আশমানির খেয়াল হলো দিনটা শুক্রবার, এই সন্ধ্যা মানুষের আনন্দ করার সন্ধ্যা। পরের দু'দিন ছুটি কিনা! হাসিমুখে ডোয়ানাকে বিদায় জানিয়ে সেও কাগজপত্র গোছাতে শুরু করে। যদিও আজকে সন্ধ্যায় তার বিশেষ কোনো প্ল্যান কিছু নেই, কারুর সঙ্গে দেখা করারও নেই, তবু তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে একা কিছুটা সময় বিশ্রাম করতে ইচ্ছে করছে, শুয়ে শুয়ে কিশোরপাঠ্য অ্যাডভেঞ্চারওয়ালা গল্পের বই পড়তে ইচ্ছে করছে সেই কিশোরীবেলায় যেমন পড়তো।
ঘরে পৌঁছে ব্যাগ ট্যাগ সব রেখে আগে তার দীর্ঘ স্নানবিলাস, তারপরে কফি বানানো, টোস্ট বানানো, কফির সঙ্গে মাখন লাগানো টোস্ট খেতে খেতে টিভি দেখা- এই প্ল্যান। খুব নতুন কিছু না, আগের শুক্রসন্ধ্যায়ও তো প্রায় এই করেছে।
স্নান আর খাবার বানানো হয়ে গেলে সে চিঠির বাক্সো দেখতে যায়। খোলে রুটিন কাজের মতন। ভিতরে একটা খাম, উপরে ঠিকানা লেখা। ইংরেজী ক্যাপিটাল লেটারে লেখা ঠিকানা, হাতের লেখাটা পরিচিত ঠেকে। খুব পরিচিত। স্মৃতির ভিতর থেকে উকি দেয় কী যেন একটা, সেটা কি অভিমান? নাকি অন্য কিছু? কোনো স্পন্দিত অপেক্ষা?
খামটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে আশমানি। তারপরে চিঠির খাম না ছিঁড়েই রেখে দেয়। বসার ঘরে সোফার উপরে খাম রেখে কিচেনে যায়, কফি টোস্ট আনতে। অবাক হয়ে লক্ষ করে তার হাত মাঝে মাঝে কাঁপছে।
খাবার নিয়ে গিয়ে বসে বসার ঘরে সোফায়, সামনের নিচু টেবিলে রাখে ওসব। পাশেই খামটা, টোস্টে কামড় দিতে দিতে মাঝে মাঝে চেয়ে দেখে খামটার দিকে, আস্তে আস্তে খাওয়া সারে, আয়েশ করে কফিতে চুমুক দেয়। একসময় সে বুঝতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে আজ সময় নিচ্ছে বেশী। নিজের অজান্তেই প্লেট সরিয়ে রেখে খামটা ছেঁড়ে আশমানি, চিঠির ভাঁজ খোলে।
সূর্য চিরকাল বড় চিঠি লেখে, এই চিঠিও বেশ বড়। তবে আগে অনেক কবিতা টবিতার কোটেশন দিয়ে দিয়ে লিখতো, এই চিঠিতে তা নেই। ওর নিজের বক্তব্যই শুধু। আশমানির কাছে ক্ষমা চেয়েছে সে, সে লিখেছে আশমানির মতন আকাশের উচ্চতার মানুষকে সে মাটির মানুষ হয়ে একদিন চেয়েছিল, আশমানিও রাজী ছিল- সেই নাকি পরম সৌভাগ্য। কিন্তু যা হবার নয়, তা কেমন করে হবে?
আশমানি যদি এই ভুল ভালোবাসায় দু:খ পেয়ে থাকে তাহলে সে যেন এটুকু অন্তত বোঝে যে সূর্যও কম দু:খ পায় নি। মনে মনে সে আশমানিরই রইলো, কিন্তু বাস্তব দুনিয়ায় তো তাকে বাঁচতে হবে, তাই সে বাবামায়ের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করতে চলেছে কিছুদিন পরে। মেয়েটি ভালো, ঘরোয়া, শান্ত। আশমানি যেন ভুল না বোঝে তাকে। আশমানির জন্য তার অনেক শুভকামনা রইল। সাহসী ও হৃদয়বান কোনো মানুষের সঙ্গে একদিন আশমানির মিল হবে, হবেই। সুখী হবে সে, তখন আর তার পুরানোদিনের দু:খ মনে থাকবে না।
চিঠিটা ডানহাতে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে আশমানি, তারপরে নির্জন ঘরের একাকীত্বে খোলাখুলি কান্নায় ডুবে যায় নিশ্চিন্তে। এখানে তাকে দেখে ফেলার কেউ নেই, কারুর সামনে অপ্রস্তুত হবার ভয়ে সমুদ্রসমান কান্না গিলে ফেলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেদিনের মতন ফিরতে হবে না তার।
সূর্য সেদিন ভীরু কাপুরুষের মতন পিছিয়ে গেছিল আশমানিকে তীব্র একলা করে দিয়ে। আশমানির তবু স্বপ্নভঙ্গ হয় নি, সমস্ত অপমানের আঁচড় নিজের উপরে নিয়েও তার ভালোবাসা বেঁচে ছিলো, সে ভেবেছিলো কোনো না কোনোদিন সূর্য তার কাছে আসবেই, সত্য সে বুঝতে পারবেই, অন্ধকারের বেড়া ভেঙে সে আসবেই তার ভালোবাসার কাছে। মানুষের বানানো ধর্ম ও তার ভুল বিভেদবোধ কি কোনোদিন মানবধর্মের চেয়ে বড়ো হয়?
একা ঘরে হৃদয় উজার করে কাঁদছে আশমানি, এ কান্না খানিকটা মুক্তির কান্নাও। আর তার কোনো দায় রইলো না অপেক্ষার, সূর্য নামের মানুষটাকে ভুলে গেলেও কিছু আর আসে যায় না তার।
একসময় কান্না ফুরিয়ে যায়। গভীর এক ক্লান্তির ঘোর নেমে আসে সর্বাঙ্গ জুড়ে। দু'চোখের পাতা আঠার মতন জুড়ে যায় ঘুমে। আহ, এসো ঘুম, এসো সর্বতাপহরণ ঘুম, তুমি এসো।
২
মুঠাফোনটা বাজছে, ঘুমের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে শিথিল হাত বাড়ায় আশমানি। বালিশের পাশেই ফোন, ঘুমঝাপসা চোখ খুলে দেখে হিন্দোলের নম্বর। স্বপ্নভাঙা এলোমেলো মাথার মধ্যে সূর্য, সূযের চিঠি, হিন্দোল সব তালগোল পাকিয়ে যায়।
মুঠাফোন হাতে নিয়ে উঠে বসে আশমানি, দেয়ালে ঘড়িটার দিকে চোখ চলে যায়, না বেশী রাত না, মাত্র সাড়ে নয়। আরো একবার রিংটোন বাজা শেষ হলে ফোন কানে দিয়ে আশমানি সাড়া দেয়।
ওপাশে হিন্দোলের ছটফটে গলা, "কতক্ষণ ধরে করছি, কী করছিলে?"
আশমানি আলগা গলায় বলে, "আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।"
"সরি, সরি। তোমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম। নিশ্চয় খুব ক্লান্ত ছিলে।"
"তা একটু ছিলাম। কোনো দরকার?"
"আগামীকাল কি তোমার কোনো বিশেষ প্রোগ্রাম আছে?"
"কেন বলো তো?"
"আমি ভাবছিলাম যদি কোথাও যাওয়া যায় কাছেপিঠে। মাত্র ঘন্টা দেড়েকের ড্রাইভেই তো চমৎকার সিবীচ। যাবে, আশমানি?"
"এমন হঠাৎ করে বললে হয় নাকি? কালকে সকালে আমার অন্য কাজ আছে।"
হিন্দোলের গলা একটু মুষড়ে গেছে ওদিকে, কিন্তু সে এমন অল্পে ছেড়ে দেবার বান্দা যে নয় আশমানি ভালো জানে। হিন্দোল বলে, " দুপুরের পরে বা বিকালের দিকে রওনা হলে কেমন হয়? রাতের সমুদ্র দিনের চেয়ে বেশী চমৎকার। "
আশমানি হেসে ফেলে, "তুমি যা মানুষ, হয়তো বলবে সারারাত সমুদ্রের পারে ঘোরা আরো চমৎকার।"
খোলা গলায় হিন্দোল হাসছে। একেবারে সেই কলেজবেলার মতন। আশমানির ভিতরে কেমন যেন শিরশির করে উঠছে। মাঝে মাঝে সে ভাবে সেইসব দিনে আসলে কি সে হিন্দোলকেও ....
" আশমানি, না বোলো না, বলো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।"
ওর বলার ভঙ্গীতে আবারও হেসে ফেলে আশমানি, পাগলাটাকে থামানো যাবে না জেনে বলে, "ঠিক আছে, যাবো। "
ফোন রেখে দিয়ে উঠে বসে আশমানি, ঘুমটা কেটে গেছে, ক্লান্তিও। হঠাৎ কিসের যেন একটা অস্বস্তি, কোথায় আশমানি বোঝে না। সে দরজা খুলে করিডরে দাঁড়ায়, দোতলার এই করিডরে অনেক খোলা হাওয়া। এখান থেকে আকাশের অনেকখানি দেখা যায়।
হঠাৎ জলে ভরে যায় তার চোখ, মুছে নেয় জামার হাতায়। ভাবে, কী হবে সেসব পুরানো কথা ভেবে? যে আসছিলো, সে তো ফিরে গেছে। সেদিনের দুর্বল ভীতু আশমানি তাকে আসতে দিতে পারে নি। কোল জুড়ে এলে সে কেমন হতো, সেকথা ভেবে আজ আর কী লাভ? মনে পড়ে সূর্যের সঙ্গে সেইসব মুহূর্তগুলো, নিবিড় ভালোবাসায় বাকী পৃথিবী যখন মিলিয়ে গেছিলো দু'জনের মাঝ থেকে। গেছিলো কি? তাহলে কীকরে পারলো সূর্য ওভাবে সরে যেতে?
সূর্য যদি সেদিন পাশে দাঁড়াতো...যদি আরেকটু সাহস সে করতে পারতো সেদিন ... থাক, যা হয়ে গেছে তাতো হয়েই গেছে! আর তাকে সংশোধনের কোনো উপায় নেই। রাতের বাতাসে দীর্ঘশ্বাস মুক্ত করে দিয়ে আশমানি ঘরে ফিরে আসে।
৩
সন্ধ্যার আকাশ ভরে তারারা জেগে উঠছে। নির্জন দ্বীপের বাতিঘরে আলো জ্বলছে। আশমানি জলের ধারের পাথরে বসে আছে চুপ করে। সমুদ্রের ধারে কী প্রবল হাওয়া! ঐ যে দূরে জলদিগন্ত, পশ্চিমের সেই জলরেখার উপরে আকাশ, সেখানে আশ্চর্য রঙীন সূর্যাস্তের রেশ রয়ে গেছে এখনো।
দিনের আলো যতক্ষণ ছিলো আশমানি কথা বলেছে অনেক। ঝিনুক কুড়িয়ে কুড়িয়ে রেখেছে রুমালে জড়িয়ে। এখন সে চুপ, পাথরের উপরে বসে আছে একেবারে পাথরটারই মতন স্তব্ধ। সমব্যথীর মতন হিন্দোল আশমানির হাত ধরে চুপ করে থাকে।
কতক্ষণ তারা চুপ করে বসে ছিলো হাতে হাত রেখে তা বুঝি জানে শুধু সমুদ্রের হাওয়া, ফিসফিস করে হাওয়া কানে কানে কী সব বলে যায় তারা অনবরত। আকাশের তারারা নির্বিকার, এমন হাসিকান্না আসা যাওয়া হারানো পাওয়া কত দেখেছে ওরা, কতকাল ধরে দেখছে! মানুষের কত আনন্দবেদনার ইতিহাসের পাশ দিয়ে নিজের মতন করে চলে গেছে তাদের অপলক আলো।
আশমানি বলে, " জানো হিন্দোল, সূর্যের চিঠি পেলাম কাল। সে বিয়ে করতে চলেছে। আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। হিন্দোল, ঠিক মানুষকে আমরা চিনতে পারি না কেন? আমরা কেন ভুল মানুষকে ভালোবাসি আর সে ভুলের খেসারত দিতে দিতে জীবনটাই কেটে যায় ? "
হিন্দোলের হাতটা শক্ত করে চাপ দেয় আশমানির হাতে, স্পর্শের বৈদ্যুতি ভাষায় সাহস দিতে চায়, সান্ত্বনা দিতে চায়। আরো কিছু বলতে চায় কিনা কেজানে! আরো একটা ভুলের জালে জড়িয়ে পড়তে ইচ্ছে করে না আশমানির। তার চেয়ে এই তো সে বেশ ভালো আছে, ঝাড়া হাতপা। বিদেশে বিভুঁইয়ে চেনাজানা মানুষদের হাজারো প্রশ্ন থেকে অনেক দূরে-
আশমানি উঠে পড়ে, পোশাক থেকে বালি ঝাড়তে ঝাড়তে বলে," চলো, কাছের কোনো মোটেলে উঠি, এত রাতে এতটা লম্বা ড্রাইভ করে না ফিরে কালকে সকালে ফিরবো না হয়। "
হিন্দোল বলে, " চলো। "
মোটেলটা কাছেই ছিলো, ব্রীজ পার হয়ে দ্বীপ থেকে মূল ভূখন্ডে ঢোকার পরেই খানিক এগিয়ে সুন্দর মোটেল। তারা চেক ইন করলো রাতের জন্য। দুই বেডের ঘর। ছিমছাম সাজানো।
খুব ঘুম পায়, দু'চোখের পাতা জড়িয়ে আসে, সোফা থেকে কোনোরকমে বিছানায় কাছে এসে বালিশে মাথা ঢেলে দেয় আশমানি।
৪
দূরে আকাশ যেখানে নত হয়ে পড়েছে জলে, সেইখান থেকে বেরিয়ে আসে লাল সূর্য, লাল হৃৎপিন্ডের মত, স্পন্দিত আলো ছড়িয়ে পড়ে চরাচরে। কোথা থেকে ভোরের সমুদ্রতীরে এসে পড়ে একলা একটা মেয়ে, আবরণমুক্ত হয়ে এগিয়ে যায় জলের দিকে, অবগাহণপ্রত্যাশায়।
ওর খোলা চুলের ঢালে জড়িয়ে যায় সাদা ফেনা, চিকচিক করে ওঠে ভোরের আলো। স্নান করতে করতে সে হাসছে, দু'হাতের মুঠায় নোনাপানি নিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিতে দিতে সে চেঁচিয়ে বলে, "শোনো, শোনো, আমি আমার নাম দিলাম আকাশ।" একটা চমৎকার নীল মেঘ উড়ে আসে তার মাথার উপরে, টুপটাপ ঝরতে শুরু করে নীল বৃষ্টিকণা।
ঘুম ভাঙে আশমানির, স্নিগ্ধ শান্তি। এই স্বপ্ন তার চেনা, অনেকবার দেখেছে সে। এইটা তার খুব সুন্দর একটা হালকা পালকের মতন স্বপ্ন, একটা অলৌকিক মুক্তির স্বাদ। স্বপ্নের ভিতরের মেয়েটাকে কখনো মনে হয় খুব চেনা, আবার কখনো একদম অচেনা। কখনো মেয়েটা সে নিজেই, আবার কখনো বা তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়মুখ।
ভোর হয়ে গেছে, পুবের জানালার পর্দা সরিয়ে দাঁড়ায় আশমানি। টলটলে জলের ভিতর দিয়ে দেখে উঠে আসছে লাল সূর্য, মেঘগুলো সব কমলা। হিন্দোল গভীর ঘুমে, ওর ঘুমন্ত মুখটা শিশুর মতন, মায়ায় ভরে যায় আশমানির বুকের ভিতরটা। বহুদিনের শুখা জমিনের উপরে সেখানে তখন নেমেছে বৃষ্টি, নীল রঙের বৃষ্টি, ঠিক সেই স্বপ্নটার মতন।
******
দক্ষিণের ঐ জানালা
বিরাট এক স্পন্দনশীল অন্ধকার আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরেছে, চারিদিকে কালো জল ছলছল করছে। ওর মধ্য দিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে বেরিয়ে আসতে চাইছি আলোয়। তখনও কালো বা আলোর কথা ঠিক বুঝতে পারি না, কিন্তু একটা অদ্ভুত তাড়না আমায় ঠেলা মারে, আমার সদ্য তৈরী হওয়া মগজে কোটি কোটি বছর আগের যে স্মৃতি খোদাই হয়ে আছে, সেই স্মৃতিই আমার পূর্বসংস্কার, সেই আমাকে জানায় আলো আর কালোর গল্প।
কিন্তু কোথায় আলো? অন্ধকারের জরায়ু কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে? সুড়ঙ্গের শেষ কোথায়? কোথায় ঝিকমিক করছে জোরালো আলো? আমি প্রাণপণে সাঁতরাই, ডাইনে বাধা বাঁয়ে বাধা, ঠোক্কর খেতে খেতে এগিয়ে যেতে থাকি প্যাঁচালো সর্পিল পথ ধরে। ঠিক দিকে যাচ্ছি কি? কেজানে!
ঘুম ভেঙে যায়, ঘামে ভিজে গেছে সারা গা। সেই স্বপ্নটা! আবার!!! কেন দেখি এটা বারে বারে?
নিজেকে সামলে নিতে নিতে উঠে বসি সাবধানে, পাশে শেষরাতের অঘোর ঘুমে অচেতন হিন্দোল। ঘরের মধ্যে অদ্ভুতুড়ে নীল আলো, ফ্যানের হাওয়া মশারির চালে হালকা ঢেউ তুলছে। বিছানা ছেড়ে উঠে ব্যালকনির দিকের দরজাটা আলতো করে খুলে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। আহ, বাইরে কী হাওয়া! সেই কতদূর দক্ষিণ সমুদ্র থেকে আসছে। খোলা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে নিতে নিতে চোখ তুলে তাকাই উপরে, আকাশে তারা আর তারা, সেই কোন পুরাকাল থেকে একইভাবে চেয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। কত যুগের কত মানুষের কত আনন্দ কত যন্ত্রণার নীরব সাক্ষী ওরা।
ঘাম শুকিয়ে গেলে ঘরে এসে আবার শুয়ে পড়ি, ঘুমের মধ্যে ডুব দিতেই দৃশ্য বদলে যায়। দেখি, হামাগুঁড়ি দিয়ে অন্ধকার গুহা থেকে বার হচ্ছি। বাইরে এসে দেখি উপরে আকাশ আর পায়ের নিচে রুখু বাদামী পাহাড়ের গা। পাহাড় বেয়ে বেয়ে নেমে আসি, এখানে ওখানে পাথরের খাঁজে পা রেখে, এখানে ওখানে গাছ গাছড়া আঁকড়ে বা শক্ত লতা ধরে ধরে। পথ তো নেই এই পাহাড়ে।
নামতে নামতে নীল সমুদ্রের কথা মনে পড়ে, এই তো মাত্র কয়েকদিন আগেই ছিলাম সমুদ্রে, ভেজা বালির উপরে ঝাঁক ঝাঁক সীগাল আর তাদের অদ্ভুত সুন্দর ডাক। পাহাড় বেয়ে নামতে নামতে করতে করতে হাঁপ ধরে যায়। দেখি পৌঁছেছি পাথরের একটা চাতালের মতন জায়গায়। লাল ফুলওয়ালা একটা লতা দুলছে হাওয়ায়। হাঁপ ধরা শরীরটা নিয়ে কোনোরকমে লতাটার কাছে গিয়ে বসে পড়ি, তারপরে শুয়ে পড়ি। ক্লান্তি, বড্ড ক্লান্তি। আয় ঘুম, আয়।
এইখানে স্বপ্নের ঘুম আর সত্যিকারের ঘুম মিশে যায়, শান্তি শান্তি শান্তি। যখন পরদিন যখন ঘুম ভাঙে তখন দেখি সকালের রোদে ভেসে যায় দুনিয়া। হিন্দোল ঘুম থেকে উঠে পড়েছে আগেই, খুলে দিয়েছে দক্ষিণের ঐ বড় জানালা-
দক্ষিণের ঐ জানালা খুলে দিলেই
একটা ম্যাজিক হয়।
মেঝেতে আছড়ে পড়ে
এক-জানালা আকাশ-
এক-আকাশ রোদ্দুর
আর এক-চুমুক সমুদ্দুর।
আলো এসে ছুঁয়ে দেয়
ছায়ার মায়াবী আঁচল।
দক্ষিণের ঐ খোলা জানালা দিয়ে আমি
উড়িয়ে দিই আমার এই গৃহবদ্ধ পোষা দৃষ্টি,
চলতে ফিরতে ফণীমনসার কাঁটায় রক্তাক্ত
সেই দৃষ্টি হঠাৎ যেন পেয়ে যায়
দু'খানা সবল উজ্জ্বল সোনালী ডানা।
সে অনায়াসে পার হয়ে যায়
চিবোনো চিবোনো সব বাঁকা বাঁকা কথা,
ক্ষুরের মতন ধারালো সব বাধা আর নিষেধ-
পার হয়ে যায় শত শত মাঠ, বন, নদী, গ্রাম, শহর
যেতে যেতে আলতো ছুঁয়ে দেয় পাহাড়ের চূড়া,
একটুখানি খেলে নেয় নীল আকাশের
তুলো-তুলো মেঘেদের সঙ্গে-
আর অক্লান্ত উড়তে থাকে ঐ
আদিগন্ত ছলাৎছল নীল সমুদ্রের দিকে।
কিন্তু কোথায় আলো? অন্ধকারের জরায়ু কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে? সুড়ঙ্গের শেষ কোথায়? কোথায় ঝিকমিক করছে জোরালো আলো? আমি প্রাণপণে সাঁতরাই, ডাইনে বাধা বাঁয়ে বাধা, ঠোক্কর খেতে খেতে এগিয়ে যেতে থাকি প্যাঁচালো সর্পিল পথ ধরে। ঠিক দিকে যাচ্ছি কি? কেজানে!
ঘুম ভেঙে যায়, ঘামে ভিজে গেছে সারা গা। সেই স্বপ্নটা! আবার!!! কেন দেখি এটা বারে বারে?
নিজেকে সামলে নিতে নিতে উঠে বসি সাবধানে, পাশে শেষরাতের অঘোর ঘুমে অচেতন হিন্দোল। ঘরের মধ্যে অদ্ভুতুড়ে নীল আলো, ফ্যানের হাওয়া মশারির চালে হালকা ঢেউ তুলছে। বিছানা ছেড়ে উঠে ব্যালকনির দিকের দরজাটা আলতো করে খুলে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। আহ, বাইরে কী হাওয়া! সেই কতদূর দক্ষিণ সমুদ্র থেকে আসছে। খোলা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে নিতে নিতে চোখ তুলে তাকাই উপরে, আকাশে তারা আর তারা, সেই কোন পুরাকাল থেকে একইভাবে চেয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। কত যুগের কত মানুষের কত আনন্দ কত যন্ত্রণার নীরব সাক্ষী ওরা।
ঘাম শুকিয়ে গেলে ঘরে এসে আবার শুয়ে পড়ি, ঘুমের মধ্যে ডুব দিতেই দৃশ্য বদলে যায়। দেখি, হামাগুঁড়ি দিয়ে অন্ধকার গুহা থেকে বার হচ্ছি। বাইরে এসে দেখি উপরে আকাশ আর পায়ের নিচে রুখু বাদামী পাহাড়ের গা। পাহাড় বেয়ে বেয়ে নেমে আসি, এখানে ওখানে পাথরের খাঁজে পা রেখে, এখানে ওখানে গাছ গাছড়া আঁকড়ে বা শক্ত লতা ধরে ধরে। পথ তো নেই এই পাহাড়ে।
নামতে নামতে নীল সমুদ্রের কথা মনে পড়ে, এই তো মাত্র কয়েকদিন আগেই ছিলাম সমুদ্রে, ভেজা বালির উপরে ঝাঁক ঝাঁক সীগাল আর তাদের অদ্ভুত সুন্দর ডাক। পাহাড় বেয়ে নামতে নামতে করতে করতে হাঁপ ধরে যায়। দেখি পৌঁছেছি পাথরের একটা চাতালের মতন জায়গায়। লাল ফুলওয়ালা একটা লতা দুলছে হাওয়ায়। হাঁপ ধরা শরীরটা নিয়ে কোনোরকমে লতাটার কাছে গিয়ে বসে পড়ি, তারপরে শুয়ে পড়ি। ক্লান্তি, বড্ড ক্লান্তি। আয় ঘুম, আয়।
এইখানে স্বপ্নের ঘুম আর সত্যিকারের ঘুম মিশে যায়, শান্তি শান্তি শান্তি। যখন পরদিন যখন ঘুম ভাঙে তখন দেখি সকালের রোদে ভেসে যায় দুনিয়া। হিন্দোল ঘুম থেকে উঠে পড়েছে আগেই, খুলে দিয়েছে দক্ষিণের ঐ বড় জানালা-
দক্ষিণের ঐ জানালা খুলে দিলেই
একটা ম্যাজিক হয়।
মেঝেতে আছড়ে পড়ে
এক-জানালা আকাশ-
এক-আকাশ রোদ্দুর
আর এক-চুমুক সমুদ্দুর।
আলো এসে ছুঁয়ে দেয়
ছায়ার মায়াবী আঁচল।
দক্ষিণের ঐ খোলা জানালা দিয়ে আমি
উড়িয়ে দিই আমার এই গৃহবদ্ধ পোষা দৃষ্টি,
চলতে ফিরতে ফণীমনসার কাঁটায় রক্তাক্ত
সেই দৃষ্টি হঠাৎ যেন পেয়ে যায়
দু'খানা সবল উজ্জ্বল সোনালী ডানা।
সে অনায়াসে পার হয়ে যায়
চিবোনো চিবোনো সব বাঁকা বাঁকা কথা,
ক্ষুরের মতন ধারালো সব বাধা আর নিষেধ-
পার হয়ে যায় শত শত মাঠ, বন, নদী, গ্রাম, শহর
যেতে যেতে আলতো ছুঁয়ে দেয় পাহাড়ের চূড়া,
একটুখানি খেলে নেয় নীল আকাশের
তুলো-তুলো মেঘেদের সঙ্গে-
আর অক্লান্ত উড়তে থাকে ঐ
আদিগন্ত ছলাৎছল নীল সমুদ্রের দিকে।
আনন্দপুরে
হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাই, দেখি নারকেল গাছের সারি। কান্ড বেয়ে গোলমরিচের লতা উঠেছে। বৃষ্টির কণারা লেগে আছে লতার গায়ে আর পাতাগুলোর উপরে। রোদ্দুর পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে কেমন! ভিজা হাওয়ায় নারকেল গাছগুলো মস্ত মস্ত পাতা নাড়িয়ে খুব আহ্লাদ করছে। ঠিক যেমন বলে দিয়েছিলো প্রীতি।
ছোট্টো হাসি শুনে চমকে তাকাই, দেখি পাশের জঙ্গল থেকে প্রণতি বেরিয়ে আসছে, হাতে নীল রঙের ফুল। আমি বললাম, "আনন্দপুরে যাবে?"
ও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে আরো হাসলো। বললো, "সেখানে গিয়ে রাজেনের রেখে দেয়া রঙতুলি দিয়ে শূন্য কাগজে অনেক ছবি আঁকবো। সে নাকি আজকাল আর ছবি আঁকতে পারে না! এটা কোনো কথা হোলো? সে আবারও আঁকবে। আমিও আঁকবো।আরো নতুন নতুন রঙ বানাবো। নীল রঙ, লাল রঙ, সবুজ-সবই বন থেকে পাওয়া যাবে, কী বলো?"
ওর চোখের মধ্যেই মেঘ-রোদ্দুর-বৃষ্টির ছবি এমনিতেই চিকচিক করছিলো, ছবি না এঁকে ও থাকতে পারবে কেন?
আরো খানিক এগোতেই দেখি মস্ত লম্বা একজন মানুষ মৃদু গান গাইতে গাইতে উল্টোদিক থেকে এগিয়ে আসছে। চিনলাম, ও তো সুমন্ত।
সুমন্ত বললো, " চন্দ্রাবতী নদী পার হবার সময় কই মাছ ধরবো।"
আমি কইলাম "আরে, কীকরে ধরবে? তোমার জাল কই? নয়তো ছিপ? বা নিদেন ছাঁকা দিয়ে মাছ ধরার গামছা?"
ও কইলো, "দেখতেই পাবে। আমি শুধু হাতেই মাছ ধরতে জানি।"
এসে গেল চন্দ্রাবতী। জল এখন গভীর যদিও তবু এই জায়্গায় নদীটা বইছে উঁচু পাথুরে ডাঙার উপর দিয়ে, কিছু কিছু পাথরের মাথা জলের উপর দেখা যাচ্ছে। এখানে জল বড়ো জোর একমানুষ গভীর। হেঁটে পার হওয়া যাবে ঠিকই। ডুবে গেলে সুমন্ত হাত বাড়িয়ে ঠেলে দেবে নাহয় কোনো পাথরের দিকে।
না তেমন ডুবজল ছিলো না, দিব্যি নদী পার হতে গিয়ে আমাদের ভালো করে স্নানও হয়ে গেলো।
পার হয়ে এসে দেখি সুমন্তের পাঞ্জাবির দু'পকেট ভর্তি কইমাছ!!!
কী মোটাসোটা কুস্তীগীরের মতন কইমাছ সে কী বলবো! সত্যি মানুষটা শুধু হাতে কই ধরে ফেলেছে?
সুমন্ত খুব হাসছে আর কবিতা বলছে, বলছে, "ক্যালেন্ডারের পাতা ওড়ে, দোলে এলোমেলো ধোঁয়ার কুন্ডলী" আরো অনেক কিছু বলছিলো, ব্যাপারটা বেশ ধোঁয়াটে বলে কিছুই বিশেষ আর বুঝলাম না। ধোঁয়া দোলে কীকরে সেও এক কূট প্রশ্ন! কিন্তু কবিদের কাছ থেকে কোনো প্রশ্নের জবাব আশা করতে নেই। কবির জবাব বড় ভয়ানক!
নদী পার হয়ে টিলা, এখন গভীর সবুজ। তার উপরে পড়ে আছে ছড়ানো ছিটানো বড়ো বড়ো নুড়ি, এই ভরা বর্ষায় সবুজ শ্যাওলা আর লতায় ঢেকে গেছে।
টিলার উপরে স্মিতমুখে দাঁড়িয়ে আছেন অচ্যুতচরণ, লম্বা সাদা দাড়ি বর্ষার ভিজা হাওয়ায় উড়ছে। উনি মন্ত্রের মতন করে বলছেন, "অখন্ডমন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচর ... " আমাদের দেখে থেমে গিয়ে হেসে অভিনন্দন জানালেন," এই যে উষসী দেখছি। অনেকদিন পরে এবার। তা সঙ্গে এনারা কারা?"
আমি বললাম, "নমস্কার অচ্যুতদা। এনারা আমার দুই বন্ধু-প্রণতি আর সুমন্ত।"
সুমন্ত ততক্ষণে ওর কবিতা বলতে শুরু করে দিয়েছে আর অচ্যুতদা অবাক খুশী হয়ে মুহূর্তের মধ্যে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আলোচনায় জমে গেছেন সুমন্তের সঙ্গে। এখন আমরা কথা কইতে কইতে হাঁটছি অনন্তিকার বাড়ীর দিকে। আর একটু পরেই সে আমাদের দেখতে পাবে।
সুমন্তের ধরা কইমাছ দিয়ে কিছু একটা রান্না করা হবে নিশ্চয়। কাঁচা মরিচ দেওয়া ঝোলও বেশ ভালোই হতে পারে নয়তো শুধু ভাজা।
অচ্যুতদা হঠাৎ কইলেন, "সবচেয়ে বড়ো জাদুকরী কে জানো সুমন্ত? এই বিশ্বপ্রকৃতি। কোনো কথা না বলেই কত আশ্চর্য্য কথা তৈরী করে যাচ্ছে। ঐ যে দ্যাখো পুবের আকাশটা, এই ছিলো রোদ্দুর, এই এখনি মেঘলা হয়ে গেলো, আবার কখন একটু মেঘ ফাঁক হয়ে যাবে, আলো চলকে নামবে। এইরকম করে আমরা কি কোনোদিন কথা কইতে পারি?"
****
ছোট্টো হাসি শুনে চমকে তাকাই, দেখি পাশের জঙ্গল থেকে প্রণতি বেরিয়ে আসছে, হাতে নীল রঙের ফুল। আমি বললাম, "আনন্দপুরে যাবে?"
ও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে আরো হাসলো। বললো, "সেখানে গিয়ে রাজেনের রেখে দেয়া রঙতুলি দিয়ে শূন্য কাগজে অনেক ছবি আঁকবো। সে নাকি আজকাল আর ছবি আঁকতে পারে না! এটা কোনো কথা হোলো? সে আবারও আঁকবে। আমিও আঁকবো।আরো নতুন নতুন রঙ বানাবো। নীল রঙ, লাল রঙ, সবুজ-সবই বন থেকে পাওয়া যাবে, কী বলো?"
ওর চোখের মধ্যেই মেঘ-রোদ্দুর-বৃষ্টির ছবি এমনিতেই চিকচিক করছিলো, ছবি না এঁকে ও থাকতে পারবে কেন?
আরো খানিক এগোতেই দেখি মস্ত লম্বা একজন মানুষ মৃদু গান গাইতে গাইতে উল্টোদিক থেকে এগিয়ে আসছে। চিনলাম, ও তো সুমন্ত।
সুমন্ত বললো, " চন্দ্রাবতী নদী পার হবার সময় কই মাছ ধরবো।"
আমি কইলাম "আরে, কীকরে ধরবে? তোমার জাল কই? নয়তো ছিপ? বা নিদেন ছাঁকা দিয়ে মাছ ধরার গামছা?"
ও কইলো, "দেখতেই পাবে। আমি শুধু হাতেই মাছ ধরতে জানি।"
এসে গেল চন্দ্রাবতী। জল এখন গভীর যদিও তবু এই জায়্গায় নদীটা বইছে উঁচু পাথুরে ডাঙার উপর দিয়ে, কিছু কিছু পাথরের মাথা জলের উপর দেখা যাচ্ছে। এখানে জল বড়ো জোর একমানুষ গভীর। হেঁটে পার হওয়া যাবে ঠিকই। ডুবে গেলে সুমন্ত হাত বাড়িয়ে ঠেলে দেবে নাহয় কোনো পাথরের দিকে।
না তেমন ডুবজল ছিলো না, দিব্যি নদী পার হতে গিয়ে আমাদের ভালো করে স্নানও হয়ে গেলো।
পার হয়ে এসে দেখি সুমন্তের পাঞ্জাবির দু'পকেট ভর্তি কইমাছ!!!
কী মোটাসোটা কুস্তীগীরের মতন কইমাছ সে কী বলবো! সত্যি মানুষটা শুধু হাতে কই ধরে ফেলেছে?
সুমন্ত খুব হাসছে আর কবিতা বলছে, বলছে, "ক্যালেন্ডারের পাতা ওড়ে, দোলে এলোমেলো ধোঁয়ার কুন্ডলী" আরো অনেক কিছু বলছিলো, ব্যাপারটা বেশ ধোঁয়াটে বলে কিছুই বিশেষ আর বুঝলাম না। ধোঁয়া দোলে কীকরে সেও এক কূট প্রশ্ন! কিন্তু কবিদের কাছ থেকে কোনো প্রশ্নের জবাব আশা করতে নেই। কবির জবাব বড় ভয়ানক!
নদী পার হয়ে টিলা, এখন গভীর সবুজ। তার উপরে পড়ে আছে ছড়ানো ছিটানো বড়ো বড়ো নুড়ি, এই ভরা বর্ষায় সবুজ শ্যাওলা আর লতায় ঢেকে গেছে।
টিলার উপরে স্মিতমুখে দাঁড়িয়ে আছেন অচ্যুতচরণ, লম্বা সাদা দাড়ি বর্ষার ভিজা হাওয়ায় উড়ছে। উনি মন্ত্রের মতন করে বলছেন, "অখন্ডমন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচর ... " আমাদের দেখে থেমে গিয়ে হেসে অভিনন্দন জানালেন," এই যে উষসী দেখছি। অনেকদিন পরে এবার। তা সঙ্গে এনারা কারা?"
আমি বললাম, "নমস্কার অচ্যুতদা। এনারা আমার দুই বন্ধু-প্রণতি আর সুমন্ত।"
সুমন্ত ততক্ষণে ওর কবিতা বলতে শুরু করে দিয়েছে আর অচ্যুতদা অবাক খুশী হয়ে মুহূর্তের মধ্যে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আলোচনায় জমে গেছেন সুমন্তের সঙ্গে। এখন আমরা কথা কইতে কইতে হাঁটছি অনন্তিকার বাড়ীর দিকে। আর একটু পরেই সে আমাদের দেখতে পাবে।
সুমন্তের ধরা কইমাছ দিয়ে কিছু একটা রান্না করা হবে নিশ্চয়। কাঁচা মরিচ দেওয়া ঝোলও বেশ ভালোই হতে পারে নয়তো শুধু ভাজা।
অচ্যুতদা হঠাৎ কইলেন, "সবচেয়ে বড়ো জাদুকরী কে জানো সুমন্ত? এই বিশ্বপ্রকৃতি। কোনো কথা না বলেই কত আশ্চর্য্য কথা তৈরী করে যাচ্ছে। ঐ যে দ্যাখো পুবের আকাশটা, এই ছিলো রোদ্দুর, এই এখনি মেঘলা হয়ে গেলো, আবার কখন একটু মেঘ ফাঁক হয়ে যাবে, আলো চলকে নামবে। এইরকম করে আমরা কি কোনোদিন কথা কইতে পারি?"
****
Subscribe to:
Posts (Atom)
