Thursday, July 3, 2014

সবুজঘরের ছাদে

১।

সবুজঘরের ছাদভর্তি সোনালি রোদ্দুরে আচার শুকোতে দিয়ে ঘুরে বেড়ায় রচনা। ভেজা চুল মেলে দিয়েছে পিঠে, ছাদে আচার শুকানোর সঙ্গে সঙ্গে মাথার চুলও শুকায়। লালশাড়ীর আঁচলের প্রান্তটি হাওয়া লেগে ওড়ে, কার্ণিশে চিবুক রেখে দূরের মাঠের দিকে চেয়ে থাকে রচনা। কবেকার ভুলে যাওয়া গানের কলি তার মনে মনে গুণ্‌গুণ্‌ করে ওঠে পথভোলা ভোমরার মত।

শীতের দুপুর হালকা আলস্যে গড়িয়ে যেতে থাকে ফ্যাকাশে বিকালের দিকে, তারও পরে কুয়াশাসন্ধ্যা-যখন কুয়াশার মাঠ পেরিয়ে ঘরে ফিরে আসবে ক্লান্ত সব কাজের মানুষেরা।

২।

গাড়ী চালাতে চালাতে ক্লান্তি ছেয়ে আসে সর্বাঙ্গে অর্চিষ্মানের। নির্জন রাস্তা মরুভূমি চিরে চলে গেছে দূর থেকে দূরে। রিফ্লেকটরগুলো ঝকমক করে গাড়ীর আলোতে, পাশের নি:সীম মরুভূমিতে নক্ষত্রালোকে দেখা যায় আঁকাবাঁকা ক্যাকটাসের দীর্ঘ শীর্ণ দেহগুলো।

মাঝে মাঝে মরুহ্রদ, তাতে টলটলে নক্ষত্রছবি। এরকম স্মৃতি আগে ছিলো না অর্চিষ্মানের। এইভাবে সারারাত গাড়ী চালিয়ে মরু পার হয় নি সে কোনোদিন আগে। ঘুমঘুম মন নিয়ে শান্তভাবে গাড়ী চালাতে চালাতে মনটা অজানা কিসের একটা ভাবনায় ছেয়ে যায় অর্চির।

মনে হয় সে যদি শত শত কিংবা সহস্র বছর আগে অন্য কোনো জন্মে এই মরুর কোনো গাঁয়ে জীবন কাটিয়ে থাকে,তাহলে কি এখন গেলে চিনতে পারবে সেই গাঁ, সেই পাহাড়ের গুহায় আঁকা পূর্বপুরুষের স্মরণচিহ্ন, সেইসব অদ্ভুত ছবি, সেই আশ্চর্য ভাষা, আশ্চর্য বিশ্বাস!

৩।

বৃতি কথা বলে খুব কম, কিসে যেন সবসময় মগ্ন হয়ে থাকে। কেউ ওকে বেশী ঘাঁটায় না, বন্ধুরা জানে বৃতি আত্মমগ্ন শিল্পী। মেয়ে আদিরা একেবারে ওর মায়ের মতন দেখতে, কিন্তু সে খুব কথা বলে। রায়ান মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে মা এত কম কথা বলে আর মেয়ে এত টরটরি হলো কিকরে?

রায়ান যখন বৃতিকে বিয়ে করে তখন আদিরা মাত্র একবছরের, রায়ানের কি যে মিষ্টি লাগতো ওকে দেখতে! অতটুকু বয়সের শিশুর মধ্যে কি আশ্চর্য টান থাকে! রায়ানের নিজের ছেলেটার কথা মনে পড়তো, ওর নাম ছিলো নিকোলাস। মনে পড়তো ওর মা ক্যাথেরিনের কথা। নিকোলাস আর ক্যাথেরিন, নিক আর ক্যাথি। জোর করে সে সরিয়ে দিতে চাইতো মন থেকে--কিন্তু বারান্দার শূন্য দোলনাটা কেবল ভেসে উঠতো স্মৃতিতে-সব ঘর ঘুরে ঘুরে যেখানে এসে বসতো সে বারবার, বুঝতেও পারতো না যে সেখানে সে আসছে!

ডাইরিটা খোলা পড়ে থাকতো কোলের উপরে, নিকোলাসের জন্য লিখছিলো ক্যথেরিন--সে কোনোদিন একপাতার বেশী পড়তে পারে নি, জলে ঝাপসা সব, সে কিছু দেখতে পেতো না। ওভাবেই কি চলে যেতে হয়? সবচেয়ে সুখের সময়ে এভাবে রায়ানকে সর্বহারা করে? পুলিশ ওদের দুজনের দেহ উদ্ধার করেছিলো নদী থেকে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ীসমেত তারা পড়ে গেছিলো। কতবার ভেবেছে রায়ান সে যদি থাকতো! সে যদি ক্যাথেরিনকে বাচ্চা নিয়ে একা না যেতে দিতো! কেন সে সঙ্গে যায় নি, কেন?

৪।

হাল্কা নীল ভোর, খুব মৃদু একটা আভা শুধু দেখা দিয়েছে। এখনও সূর্য উঠতে অনেক দেরি, পুবের আকাশে এখনো লাল রঙই লাগে নি। হাওয়ায় হাল্কা শীত-শীত ভাব। একটা ভোরজাগা পাখি সুরেলা গলায় ডেকে উঠলো, গানের প্রথম আখরটির মতন বাধো-বাধো ডাক।

সুজাতা জেগে গেছিল আগেই, অনেককাল ধরেই শেষরাতে ঘুম ভেঙে যায় তার। সেই স্কুলে থাকার সময় সে রাত জাগতে পারতো না বলে শেষরাতে মা ডেকে দিতো, সে উঠে পড়তে বসতো, সেই অভ্যাস রয়ে গেছে। এখন যদিও আর দরকার নেই অত তাড়াতাড়ি ওঠার, কিন্তু সুজাতার ভালোই লাগে। মনে হয় এই শেষরাত বা প্রথম ভোর, যখন বেশীরভাগ মানুষই ঘুমিয়ে আছে, চারিদিক খুব নির্জন আর শান্তিময়, এই সময়টা তার কাছে একটা গোপন উপহারের মতো, সেই ছোটোবেলার জন্মদিনের সময়কার বালিকা সুজাতা হয়ে সে মোড়ক একটুখানি খুলে চুপিচুপি দেখে নেয় কি আশ্চর্য জিনিস আছে ভিতরে। আরেকটু বেলা বাড়লে যখন একে একে সবাই উঠে পড়ে, আওয়াজ আর তাপ বাড়তে থাকে, তখন সেই লুকিয়ে উপহার দেখে নেবার নিষিদ্ধ রোমাঞ্চকর আনন্দ সে আর পায় না।

এখন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সুজাতা চুপ করে দেখছে একটু একটু করে আকাশের গায়ে আলোর তুলি বুলিয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য শিল্পী, ঐ অনেক উপরের মেঘগুলোয় কেমন আশ্চর্য রঙ! সেই পাখিটা এখন কেমন ছন্দবাঁধা ধ্বনিতে সুরেলা গান গেয়ে যাচ্ছে-সুজাতা কান পেতে শোনার চেষ্টা করে। হঠাৎ আরেকটা পাখি সাড়া দিয়ে ডাক দেয়। দু'জনে মিলে এখন যুগলবন্দী গাইছে তারা। নিজের অজান্তে একটা ছোট্টো শ্বাস পড়ে সুজাতার। আর একেবারে হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় ইমনের মুখ।

৫।

কেউ কি হেমন্তের মধ্যরাত্রির গন্ধ পেয়েছে? ধানের গন্ধ, ক্ষীরের গন্ধ, পিঠার গন্ধ মিলেমিশে থাকতো সেটায়। কুয়াশার গন্ধ পেয়েছে কেউ মাঘপঞ্চমীর সকালে? নিমপাতা আর হলুদের গন্ধ ছিলো তাতে। কেউ কি জৈষ্ঠ্যের মধ্যাহ্নের গন্ধ অনুভব করেছে? আমি শুকনো লঙ্কার গন্ধ পেতাম ওসব দুপুরের রোদে। আষাঢ়ের মেঘমেদুর হয়ে আসা আকাশের গন্ধ নিয়েছে কেউ? কেমন লেগেছে ?

রুমন, শোনো, চন্দনকাঠের যে বাক্সটায় তোমার সব চিঠিগুলো রেখেছি, সেই বাক্সটার গন্ধ অপূর্ব! তোমার চিঠির কাগজেও সুন্দর গন্ধ থাকতো! হাল্কা গোলাপী পাতায় গোলাপের গন্ধ! হাল্কা কমলা ছোপ দেওয়া সাদা রঙের পাতায় শিউলির গন্ধ! সব এখনো আছে। পাতাগুলো পুরানো হয়ে এসেছে, লেখাগুলো ম্লান হয়ে এসেছে, গন্ধ ফিকে হয়ে এসেছে, কিন্তু আছে।

রুমন, যেখানে তুমি চলে গেছ, সেখানে বকুলগাছ আছে? বকুলফুলের গন্ধ পাও আজো তুমি? ফুলের সময়ে বকুলফুল রুমালে জড়িয়ে রেখে দিতাম ছোট্টো ব্যাগটার মধ্যে, মাঝে মাঝে মনে হয় সেই সুরভিসার আজো বুঝি রয়ে গেছে সেখানে।

পৃথিবী ঋতুতে ঋতুতে প্রহরে প্রহরে নতুন নতুন আতর মাখে, প্রত্যেকদিন নতুন, কত আছে কেজানে ...

No comments: