1.
সূর্যশিশির, সূর্যশিশির, সূর্যশিশির -মাঝে মাঝে কেমন হয় যেন হয় আশমানির। এক একটা শব্দ সারাদিন রিনরিন করে মনের মধ্যে বাজতে থাকে। আজকে যেমন এই সূর্যশিশির! কি সুন্দর কথাটা। অথচ এর মানেটা তেমন কিছু ভালো নয়, একরকমের পতঙ্গভুক উদ্ভিদ, কলসপত্রীর মতন। কলসপত্রী নামটাও কী চমৎকার ! এইসব গাছেদের এরকম সুন্দর নাম দেওয়ার পিছনে মানুষের কি কোনো বিশেষ মানসিকতা আছে?
সূর্যশিশির, সূর্যশিশির, সূর্যশিশির-আশমানি হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে এলো পার্কিং লট, পলিমার-সায়েন্সের বিশাল সুন্দর বিল্ডিংটার পাশ দিয়ে চলার সময় সারিবাঁধা পাইনের দিকে চাইলো , তারপরে ক্রস করলো চওড়া লিংকন রোড-পুরো সময়টা মনের মধ্যে রিনরিন করে বাজছে সূর্যশিশির। গ্রীন হাউসের সামনে এসে হঠাৎ ওর মনে হলো, "আরে ফোন করার কথা ছিলো তো! এখন কি পাওয়া যাবে?"
মুঠাফোন বের করে ফোন করতে করতেই কুয়াশা কেটে একঝলক রোদ পায়ের কাছে, হালকা একটু হাওয়া, আকাশে এক ফালি নীলও। রিং হচ্ছে, কেউ একজন ধরেছে, কথা বলছে। আশমানি অল্প কেঁপে যাওয়া গলায় বললো," হ্যালো, সূর্য আছে? ”
2.
সবাই যখন ব্যস্ত থাকে নানা কাজে, তখনই কি কুঁড়িরা ফুল হয়ে ফুটে যায়? টুপ টুপ করে তারাগুলো কি তখন নেমে পড়ে সমুদ্দুরে?কেউ যখন দ্যাখে না ওদের? ছোট্টো মিমি চুপ করে ভাবে করবীগাছের তলায় দাঁড়িয়ে, এখান থেকে কতদূর দেখা যায়!
ঝুরিনামা বটের পাশ দিয়ে মাটির রাস্তা, একটু এগোলেই রমাদিদের বাড়ি, তারপরে জোড়া মাঠ পেরিয়ে জোড়া পুকুর, তারপরে ঝুনিদিদের বাড়ী। ঝুনিদিদের পাশেই অনুদের বাড়ী, ওর ভালোনাম অনুব্রতা।
ঐ তো ওরা গানের ক্লাসে চলে যাচ্ছে খাতা নিয়ে, শনিবারের বিকেলমাঠ একলা পড়ে আছে চুপ, কেউ খেলবে না চু-কিৎকিৎ, বুড়ী বসন্তী, কাকজোড়া, নামপাতাপাতি বা বানানো কোনো খেলা আজ এখানে। তাই বুঝি মাঠের মনখারাপ? মিমির চোখে শিশির জমে ওঠে, সে একা একা খেলতে যেতে পারে না। সে দাঁড়িয়ে থাকে করবীতলায়, কেউ যদি ফিরে আসে? কারুর যদি গানের ক্লাস আজ না হয়?
3.
"কালপুরুষ চেনা খুব সোজা। ওই যে দ্যাখ তিনখানা তারা জ্বলজ্বল করছে একলাইনে, কালপুরুষের কোমরবন্ধ ওটা।" বসন্তের সন্ধ্যা, বাতাস বইছে ধীরে। ভারী মধুর এইসময়টা। আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আশমানিকে তারা চেনায় হিন্দোল।
অবাক হয়ে জ্বলজ্বলে কালপুরুষের দিকে চেয়ে থাকে আশমানি, সামনে অন্তহীন ঢেউ আসে ঢেউ যায়। অতলান্তিক মহাসাগরের ঢেউ। নতুন খইয়ের মতন অগনন তারা ছড়ানো নির্মল বাসন্তী সন্ধ্যায় কী এক তরঙ্গ এসে লাগে তার প্রাণের গভীর গোপণ নিশীথবীণায়, সেখানে মঞ্জরিত স্বর্ণপলাশের নিচে কে যেন বসে আছে স্তব্ধ অপেক্ষায় তার জন্য।
কে সে? অন্ধকারে তার মুখ দেখা যায় না। এই কি সেই গানের মানুষ-"ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন/তলাতল খুঁজলে পাতাল পাবিরে সেই কৃষ্ণধন" ? সেই? আশমানি ঠিক বুঝতে পারে না। দু'চোখ জলে ভরে ওঠে তার! কেন সে এমন? সাথীদের সাথে থেকেও এত একা? তীব্র দলছুট হৃদয় তার নির্জন বনে অশ্বত্থগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। যেন এখুনি কোথা থেকে উড়ে আসবে লোককথার সেই অলৌকিক নীলপাখি, একটি পালক এসে পড়বে তার সামনে।
4.
"সময় আমাদের ঘিরে রাখে মৃদু বৃষ্টির মতন
অশেষ সময়
সুখদুখমন্থন সময়
মেঘপালকের মতন ঘরের মতন উড়ে যায় জীবন----"
কথাগুলো গুণ গুণ করতে করতে আশমানি মনে করতে চেষ্টা করে কার লেখা লাইনগুলো। মনে পড়ে, পড়ে, পড়ে না। ছাদের উপরে স্নিগ্ধ ঠান্ডা রাত, ঘুমেলা চোখে এসে লাগে তারাদের বিস্ময়, কতকাল হয়ে গেলো সে দেখছে ওদের, অথচ পুরানো হয় না, একই প্রথমদিনের ঝিমঝিম শিরশিরানি চারিয়ে যায় ওর চোখের ভিতর দিয়ে আরো ঘন গহণে।
"বাণী নাহি তবু কানে কানে/কী যে শুনি----" কে গাইতো? আশমানির গলায় সুর নেই, ওকে গেয়ে শোনাতো অন্য কেউ। কে সে? কোথায় সে? কবে গাইতো? তাকে মনে পড়ে না কেন আশমানির? কী অদ্ভুত! সে স্পষ্ট শুনছে সে গাইছে, সুন্দর সুরময় কন্ঠ ছড়িয়ে পড়ছে ওই মেঘপালকের ঘর পর্যন্ত-
"আকাশ জুড়ে শুনিনু ঐ বাজে
তোমারি নাম সকল তারার মাঝে
সে নামখানি নেমে এলো ভুঁয়ে
কখন আমার ললাট গেলো ছুঁয়ে---",
অথচ মুখ মনে পড়ে না, চোখ মনে পড়ে না, নাম মনে পড়ে না!সে যেন শুধু সুর, শুধু গান। তারাগুলি যেন ঘিরে এসেছে গান শুনতে।
5.
চারিদিকে জল, ছলছল জল। এই দ্বীপ খুব ছোটো। যেকোনো দিকে একটুখানি গেলেই নীল সমুদ্র। অথৈ সমুদ্র। গোলমরিচের লতাজড়ানো নারিকেলকান্ডে ঠেস দিয়ে বসে থাকে সে। তার কী যেন একটা করার ছিলো, কিছুতেই মনে পড়ে না। কী তার নাম সেও মনে নেই। সে কোথা থেকে এলো এখানে সেও সে জানে না। আনমনে সে লতায় হাত রাখে, ভাবে কী যেন একটা করার ছিলো! মনে পড়ে না কেন?
সে ভাবে কী নাম না খুঁজে নিজেই নিজেকে একটা নাম দিয়ে দিলে কেমন হয়? মনে হতেই উঠে দাঁড়ায় সে, চলতে থাকে, জলরেখার একদম কাছে এসে থামে। হেসে ওঠে অকারণে।
দূরে আকাশ যেখানে নত হয়ে পড়েছে জলে, সেইখান থেকে বেরিয়ে আসে লাল সূর্য, লাল হৃৎপিন্ডের মত, স্পন্দিত আলো ছড়িয়ে পড়ে চরাচরে। প্রথম মানবীর মতন একলা মেয়েটি আবার হেসে ওঠে, আবরণমুক্ত হয়ে এগিয়ে যায় জলের দিকে, অবগাহণপ্রত্যাশায়।
ওর খোলা চুলের ঢালে জড়িয়ে যায় সাদা ফেনা, চিকচিক করে ওঠে ভোরের আলো। স্নান করতে করতে সে হাসছে, তার কিচ্ছু মনে নেই সে কে, অথচ মনে আছে আকাশ, জল, সূর্য, আগুন, মাটি, বালি, ঝিনুক। দু'হাতের মুঠায় নোনাপানি নিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিতে দিতে সে চেঁচিয়ে বলে, "শোনো শোনো তোমরা শোনো, আমি আমার নাম দিলাম আকাশ।"
Sunday, August 23, 2009
Monday, July 13, 2009
ঊষাসন্ততি
আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথটার উপর দিয়ে সাবধানে গুহার সামনের পাথুরে চাতালে উঠে এলাম। মস্ত সেই ধূসর পাথরটা! দুখন্ড হয়ে ভেঙে আছে। পাথরটার সামনে গিয়ে বসে পড়লাম, ঝুঁকে পড়ে আমার লোমশ হাত বাড়ালাম ওটার দিকে। এখনো ওটার গায়ে লালচে-বাদামী দাগগুলো জেগে আছে। কুশ আর খুমানের গতকালের লড়াইয়ের চিহ্ন!
আমি ওদের যুদ্ধের সাক্ষী। আবছাভাবে মনে করতে পারি খুমানকে কুশ এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো, খুমান হুমড়ি খেয়ে পড়লো পাথরটায়। কুশের পাথরের হাতুড়ী খুমানের মাথা গুঁড়িয়ে দিতে লাফিয়ে উঠল, ঠিক সময়ে খুমান মাথা সরিয়ে নিল, পাথর দুখন্ড হয়ে গেল হাতুড়ীর ঘায়ে। কী অদ্ভুত সেই পাথরভাঙার আওয়াজ! তারপরে কি হলো? কখন খুমান মরে গেল? নাকি সে পালিয়ে গেল?
আমাদের স্মৃতিশক্তি অল্প, খুব স্পষ্ট করে সবকিছু মনে করতে পারি না আমরা। কোনো কিছু হারানোর দু:খে দীর্ঘ শোক করার ক্ষমতা নেই আমাদের, আমাদের দুর্বল স্মৃতি দ্রুত সব ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছি।
কখনও কখনও আমরা শান্ত হয়ে দল বাঁধতে পারি, দলপতির নির্দেশে একসঙ্গে মিলে কাজ করতে পারি। কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে আমাদের কেউ বিদ্রোহী হয়ে সব উলটপালট করে দিতে পারে। এরকম প্রায়ই হয়, বিদ্রোহী হয় অরণ্যে পালায়, নয় দলপতির হাতে মরে। কদাচিৎ জিতেও যায়, তখন সে নতুন দলপতি হয়।
আমাদের আবেগ তীব্র আর দ্রুত। পশুর মতন আমরা চিৎকার করি, লাফাই ঝাঁপাই, হাসি কাঁদি, মাটিতে গড়াগড়ি দিই। আমাদের বন্য আবেগ দেখাই একেবারে খোলাখুলি। আমাদের দয়া-করুণা এখনো জাগে নি ভালো করে, আমরা অনায়াসে দেখি রক্তাক্ত আহত মৃতপ্রায় শত্রু মাটিতে পড়ে কাতরায় আর বিজয়ী তীব্র হিংস্র আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচে আর শত্রুকে খোঁচা দেয়।
আমাদের প্রাণ পোষ মানেনি, কেউ জানে না কে হবে পরবর্তী বিদ্রোহী। হয়তো আমাদের স্বল্পস্থায়ী স্মৃতি ও এর জন্য কিছুটা দায়ী। আমরা নিজেদের অবাধ্য হবার পরিণতি কি হবে ভেবে ভয় পাবো কি, মনেই তো রাখতে পারিনা যে কারুর কোনো ভয়ানক পরিণতি হয়েছিল! কিন্তু আমরা বদলাচ্ছি, আস্তে আস্তে, দিনে রাতে বাদলাচ্ছি। সরু চাঁদের রাত থেকে গোলচাঁদের রাত ঘুরে ঘুরে আসে, আমরা বদলে যেতে থাকি। আমাদের দীর্ঘ স্মৃতি পরিস্ফুট হতে থাকে।
ভাঙা পাথরের লালচে বাদামী দাগে হাত রাখি। খুমানের রক্তের দাগ! আমার সারা শরীর কেমন ঝিনঝিন করে ওঠে। কি হলো? ভিতরে একটা অদ্ভুত কষ্ট, যেন ছোটো ছোটো নুড়িপাথর গুলতি থেকে ছিটকে ছিটকে এসে লাগছে! আমি চুপ করে বসে থাকি। এমন তো আগে কখনো হয় নি! ঊপত্যকার নদীটার উথলে উথলে ওঠা ফেনাফেনা ঢেউগুলো যেন আমার বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে ঠেলা দিচ্ছে! অজানা বেদনা। অচেনা চিনচিনে বেদনা। কোথায় এর শুরু? কোথায় এর শেষ? সবকিছুর কি শুরু কোথায় আর শেষ কোথায় তা জানা যায়?
যেমন আমাদের নদীটা! শুনিয়া নদী। ওর শুরু আর শেষ তো আমরা কেউ জানিনা! শুনিয়া অজানা দেশ থেকে এসে আমাদের উপত্যকায় ঢুকেছে আবার কোথায় কোন্ অজানায় চলে গেছে কেজানে! আমরা শুধু দেখি যেদিকে জমি উঁচু, ঘন সবুজ অরণ্যের আড়ালে সেদিকে কোথায় লুকিয়ে আছে সব ধূসর সিংহেরা, খড়গনাসা গন্ডারেরা, চকরবকরা চিতাবাঘেরা-সেইদিক থেকেই কলকল করতে করতে আমাদের জমিনে ঢুকেছে শুনিয়া। আর যেদিকে মাটি নিচু, এবড়োখেবড়ো ছোটো বড় পাথর যেদিকে ছড়িয়ে আছে-ওরা আসলে পাথর না, আগের মানুষদের ঘুমন্ত আত্মা- তাদের ঘিরে সবুজ ঝোপে নীল আর হলুদরঙের ফুল ফোটে আর ফড়িং উড়ে উড়ে আসে-সেইসব পাথরের পাশ দিয়ে নামতে নামতে ঝাঁপ দিয়ে ঝর্ণা হয়ে নিচে অন্ধকারে কোথায় পড়েছে শুনিয়া! ওদিকে আমাদের যাওয়া বারণ, ওদিকে মানুষের জগতের শেষ, আত্মার জগৎ শুরু।
শুনিয়া শুধু নদীই না, আমাদের মাতৃকাদেবী। সেই তো আমাদের জল দেয়, কে না জানে জল না থাকলে আমাদের জীবন বাঁচে না। আমরা শুনিয়াকে পূজা করি, ফুল-পাতা দিয়ে পূজা করি, রক্ত দিয়ে পূজা করি। আমাদের মেয়েরা যখন মা হয়, শুনিয়ার জলেই তো ধুয়ে দেওয়া হয় মা ও শিশুকে। আমাদের শিশুরা যখন বড় হয়, শুনিয়ার কিনারেই তো খেলা করে তারা! আমরা জানি, শুনিয়ার জল আসলে মায়ের দুধ! আমরা কল্পনা করি, মস্ত মস্ত জটাওয়ালা কুঁচকানো মুখের যাদুকর-যাদুকরীরা আমাদের কল্পনা করতে শিখিয়েছে, শুনিয়া আসলে দেখতে মানুষের মতন কিন্তু পিঠে মস্ত সাদা উজল দুটি ডানা, প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে শুনিয়া তার আসল রূপে এসে আমাদের দেখে যায়। আমি দেখার জন্য কতদিন শেষরাত্রে এসে শুনিয়ার পারে বসে থেকেছি। কিন্তু কিছু দেখিনি। যাদুকর-যাদুকরীদের ছাড়া হয়তো সে দেখা দেয় না।
আমাদের উপত্যকা পাহাড়ে ঘেরা, চারিদিকে সবুজনীলবাদামী পাহাড় আর ঘন অরণ্যে ঘেরা সবুজ ভূমিটুকুই আমাদের জগৎ। এর বাইরে কি আছে আমরা জানি না। বুড়ো যাদুকর নিষাত বলতো বাইরে আছে দেবতা আর দৈত্যদের দেশ, দৈত্যরা বিরাট বিরাট চেহারার, তাদের দেহ লম্বা লম্বা কালো লোমে ভরা, তারা খুবই শক্তিশালী আর বদখত। আর দেবতারা ভারী সুন্দর, তাদের ঝলমলে ডানা আছে, তারা উড়ে বেড়ায়। শুনিয়া তো দেবতাদের মেয়ে, তাই তার ডানা আছে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি অনেককাল আগে বিদ্রোহী খুম্বা যখন দলপতি তিমান্থের সঙ্গে ঝগড়া করে অরণ্যে পালিয়ে গেল, তখন সে কোথায় গিয়ে পড়েছিল? দেবতাদের দেশে নাকি দৈত্যদের দেশে?
পাথুরে চাতালের প্রান্তে এসে দাঁড়াই। এত উঁচু থেকে কতখানি দেখা যায় একসঙ্গে! ঐ যে মস্ত ওকুমে গাছটা, ওরই নিচে বসে তো আমাদের উপদেশ দিতো নিষাত! নিষাত মরে গেলে ওকে মাটির গভীরে শুইয়ে দেওয়া হলো তো ঐ গাছেরই কাছে! নিষাত মরে কোথায় গেল, দেবতাদের দেশে?
ওকুমে গাছের কাছ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেলে দিই খোলা সবুজ জমিনের উপরে, শুনিয়ার জলধারা চিকচিক করছে সবুজের মধ্যে। দেখতে পাই একদল ছেলেমেয়ে খেলছে নদীর পারে, আমার আবছা মনে পড়ে আমি আর খুমান, তখন আমরা ছোটো, আমরা ও খেলতাম। আরো কতজন ছিল, কুশ....
তীরবিদ্ধের মতন ঘুরে তাকাই, এই গুহা কাল অবধি খুমানের ছিল, এখন কুশের। কুশ এখন আমাদের নতুন দলপতি। কাল খুমানকে হত্যা করে সে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে! খুমান কি সত্যি মরে গেছে? আর কোনোদিন সে ফিরবে না? আমি চোখ কুঁচকে আকাশের দিকে তাকাই, শকুন উড়ছে। সবই কি খেয়ে ফেলবে ওরা? কাল খুমান ছিল সাহসী, শক্তিশালী যুবক, আমাদের যূথের যূথপতি, আজ তার চিহ্ন কোথাও নেই! যন্ত্রণায় আমি তীরবিদ্ধের মতন ছিটকে উঠি, কোথা থেকে আসে এ যন্ত্রণা? কোনো তীর তো কেউ ছোঁড়েনি, লাল রক্ত তো বেরিয়ে আসছে না! তবু কিসের এ বেদনা?
কুশ এগিয়ে এলো, তার সবল বাহু ঘিরে ধরলো আমায়। খুমানের সবই এখন তার, প্রাক্তন সঙ্গিনীও তার। আমি স্থির হয়ে থাকি, বাধা দিয়ে কি হবে? কুশের নেতৃত্ব সবাই মেনে নিয়েছে, তাকে বাধা দেওয়া বিদ্রোহের সামিল। তবু ইচ্ছে করলেই আমি পারি, ছিটকে উঠে দাঁড়াতে পারি, পাথর দিয়ে লড়াই করতে পারি, হারিয়ে যেতে পারি অরণ্যে বা একেবারেই হারিয়ে গিয়ে খুমানের কাছে উপস্থিত হতে পারি। তাই কি? মরে গেলে কোথায় যাবো? খুমানের কাছে ? নাকি শুনিয়ার কাছে ? নাকি লোমশ দৈত্যদের দেশে?
দুর্বল আর ক্লান্ত লাগে, আদিম বন্য বিদ্রোহিনী ঘুমিয়ে পড়ে। কুশ প্রাণপণে চেষ্টা করে চলে উপভোগের, আমি লুটিয়ে পড়ে থাকি খুমানের কোমল রোমভরা বুকে। খুমান মরে নি, সে মরতে পারে না, সে ফিরে আসবে। অসহ্যরকমের দাপাদাপি শেষ হলে ক্লান্ত কুশ ঘুমিয়ে পড়ে, আমি এলিয়ে পড়ে থাকি আধাঘুমে আধা জাগনে। মনে পড়ে শেষরাতের শুনিয়ার কলকল শব্দ, সে কবে, কবে? খুমান আমায় ওখানে দেখে অবাক হয়ে বলেছিল, " তিবা, তুমি এখানে এসে বসে আছো এত রাতে?" কবে, সে কবে?
উষ্ণ লবণজল আমার গাল ভিজিয়ে দিতে থাকে, খুমান খুমান খুমান, তুমি কোথায় তুমি কোথায়? আমি বুঝতে পারি না, খুমান সাড়া দেয় আমার ভিতরে, হালকা কোমল একটা ধাক্কা। খুমান নতুন জন্ম নিয়ে ফিরে আসবে, শুধু সে না, আমিও তার সঙ্গে নতুন হয়ে জন্মাবো। জীবনের ভিতরে জীবন গড়ে ওঠার সেই তীব্র বেদনার আনন্দ আমায় ঘিরে ফেলে শুনিয়ার জলের মত।
***
"কি হলো, ট্রিণা?" যেন বহুযুগ পার হয়ে গলাটা ভেসে এলো। সত্যিই বহুযুগ পার হয়ে। অ্যডামের গলা। আমার কাঁধে হাত রেখে অ্যাডাম ঝাঁকানি দিয়ে আবার বললো, "তোমার কি হলো ট্রিণা?" অ্যাডাম তৃণা বলতে পারে না, বলে ট্রিণা।
ধাক্কা খেয়ে জেগে উঠলাম জাগরস্বপ্ন ভেঙে। স্বপ্ন? আমার চোখের সামনে যে বহুশত শতাব্দী পূর্বের জীবন অভিনীত হচ্ছিল, তা কি শুধুই আমার স্বপ্ন?
"আরে আমাদের আজকের ফিল্ডওয়ার্ক এখুনি শুরু করতে হবে। নিচে সবাই অপেক্ষা করছে! তুমি ঠিক আছো তো? "
আমার চোখ তখনো ঝাপসা, মাথা তখনো স্বপ্নটলমল। আমি দু'হাতের পাতা দিয়ে চোখের উপরে হালকা ঘষা দিই, উঠে দাঁড়াই। জিনসের প্যান্টের হাঁটুর কাছে ধূলা, ঝাড়তে ঝাড়তে বলি, "আমি একদম ঠিক আছি অ্যাডাম। ধন্যবাদ। চলো, কাজ শুরু করি।"
আমরা কাজ শুরু করলাম। আমরা, একবিংশ শতকের দুই মানবমানবী অ্যাডাম ও তৃণা, সেই বহুপুরাতন ঊষাযুগের সন্ততিদের জীবনরহস্য সন্ধানে উৎখনন শুরু করলাম। কী গভীর গোপণ সূত্রে আমরা যে তাদের সঙ্গে যুক্ত, সেই রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টায়। সে কঠোর বৈজ্ঞানিক নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া, সেখানে স্বপ্নের উৎপাত বরদাস্ত করা হয় না। খুব সাবধানে আমি লুকিয়ে ফেলি দীর্ঘশ্বাস, কেউ যেন কিছু না বুঝতে পারে।
শুধু দু'খন্ড হয়ে ভাঙা পাথরটি আমার দিকে চেয়ে থাকে, গুহার সামনের চাতালে একই জায়গায় সেটি পড়ে আছে, একইরকম ভাঙা। শুধু সেটার গায়ে লালচেবাদামী দাগগুলো আর নেই, কবেই সে দাগ বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে।
(শেষ)
আমি ওদের যুদ্ধের সাক্ষী। আবছাভাবে মনে করতে পারি খুমানকে কুশ এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো, খুমান হুমড়ি খেয়ে পড়লো পাথরটায়। কুশের পাথরের হাতুড়ী খুমানের মাথা গুঁড়িয়ে দিতে লাফিয়ে উঠল, ঠিক সময়ে খুমান মাথা সরিয়ে নিল, পাথর দুখন্ড হয়ে গেল হাতুড়ীর ঘায়ে। কী অদ্ভুত সেই পাথরভাঙার আওয়াজ! তারপরে কি হলো? কখন খুমান মরে গেল? নাকি সে পালিয়ে গেল?
আমাদের স্মৃতিশক্তি অল্প, খুব স্পষ্ট করে সবকিছু মনে করতে পারি না আমরা। কোনো কিছু হারানোর দু:খে দীর্ঘ শোক করার ক্ষমতা নেই আমাদের, আমাদের দুর্বল স্মৃতি দ্রুত সব ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছি।
কখনও কখনও আমরা শান্ত হয়ে দল বাঁধতে পারি, দলপতির নির্দেশে একসঙ্গে মিলে কাজ করতে পারি। কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে আমাদের কেউ বিদ্রোহী হয়ে সব উলটপালট করে দিতে পারে। এরকম প্রায়ই হয়, বিদ্রোহী হয় অরণ্যে পালায়, নয় দলপতির হাতে মরে। কদাচিৎ জিতেও যায়, তখন সে নতুন দলপতি হয়।
আমাদের আবেগ তীব্র আর দ্রুত। পশুর মতন আমরা চিৎকার করি, লাফাই ঝাঁপাই, হাসি কাঁদি, মাটিতে গড়াগড়ি দিই। আমাদের বন্য আবেগ দেখাই একেবারে খোলাখুলি। আমাদের দয়া-করুণা এখনো জাগে নি ভালো করে, আমরা অনায়াসে দেখি রক্তাক্ত আহত মৃতপ্রায় শত্রু মাটিতে পড়ে কাতরায় আর বিজয়ী তীব্র হিংস্র আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচে আর শত্রুকে খোঁচা দেয়।
আমাদের প্রাণ পোষ মানেনি, কেউ জানে না কে হবে পরবর্তী বিদ্রোহী। হয়তো আমাদের স্বল্পস্থায়ী স্মৃতি ও এর জন্য কিছুটা দায়ী। আমরা নিজেদের অবাধ্য হবার পরিণতি কি হবে ভেবে ভয় পাবো কি, মনেই তো রাখতে পারিনা যে কারুর কোনো ভয়ানক পরিণতি হয়েছিল! কিন্তু আমরা বদলাচ্ছি, আস্তে আস্তে, দিনে রাতে বাদলাচ্ছি। সরু চাঁদের রাত থেকে গোলচাঁদের রাত ঘুরে ঘুরে আসে, আমরা বদলে যেতে থাকি। আমাদের দীর্ঘ স্মৃতি পরিস্ফুট হতে থাকে।
ভাঙা পাথরের লালচে বাদামী দাগে হাত রাখি। খুমানের রক্তের দাগ! আমার সারা শরীর কেমন ঝিনঝিন করে ওঠে। কি হলো? ভিতরে একটা অদ্ভুত কষ্ট, যেন ছোটো ছোটো নুড়িপাথর গুলতি থেকে ছিটকে ছিটকে এসে লাগছে! আমি চুপ করে বসে থাকি। এমন তো আগে কখনো হয় নি! ঊপত্যকার নদীটার উথলে উথলে ওঠা ফেনাফেনা ঢেউগুলো যেন আমার বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে ঠেলা দিচ্ছে! অজানা বেদনা। অচেনা চিনচিনে বেদনা। কোথায় এর শুরু? কোথায় এর শেষ? সবকিছুর কি শুরু কোথায় আর শেষ কোথায় তা জানা যায়?
যেমন আমাদের নদীটা! শুনিয়া নদী। ওর শুরু আর শেষ তো আমরা কেউ জানিনা! শুনিয়া অজানা দেশ থেকে এসে আমাদের উপত্যকায় ঢুকেছে আবার কোথায় কোন্ অজানায় চলে গেছে কেজানে! আমরা শুধু দেখি যেদিকে জমি উঁচু, ঘন সবুজ অরণ্যের আড়ালে সেদিকে কোথায় লুকিয়ে আছে সব ধূসর সিংহেরা, খড়গনাসা গন্ডারেরা, চকরবকরা চিতাবাঘেরা-সেইদিক থেকেই কলকল করতে করতে আমাদের জমিনে ঢুকেছে শুনিয়া। আর যেদিকে মাটি নিচু, এবড়োখেবড়ো ছোটো বড় পাথর যেদিকে ছড়িয়ে আছে-ওরা আসলে পাথর না, আগের মানুষদের ঘুমন্ত আত্মা- তাদের ঘিরে সবুজ ঝোপে নীল আর হলুদরঙের ফুল ফোটে আর ফড়িং উড়ে উড়ে আসে-সেইসব পাথরের পাশ দিয়ে নামতে নামতে ঝাঁপ দিয়ে ঝর্ণা হয়ে নিচে অন্ধকারে কোথায় পড়েছে শুনিয়া! ওদিকে আমাদের যাওয়া বারণ, ওদিকে মানুষের জগতের শেষ, আত্মার জগৎ শুরু।
শুনিয়া শুধু নদীই না, আমাদের মাতৃকাদেবী। সেই তো আমাদের জল দেয়, কে না জানে জল না থাকলে আমাদের জীবন বাঁচে না। আমরা শুনিয়াকে পূজা করি, ফুল-পাতা দিয়ে পূজা করি, রক্ত দিয়ে পূজা করি। আমাদের মেয়েরা যখন মা হয়, শুনিয়ার জলেই তো ধুয়ে দেওয়া হয় মা ও শিশুকে। আমাদের শিশুরা যখন বড় হয়, শুনিয়ার কিনারেই তো খেলা করে তারা! আমরা জানি, শুনিয়ার জল আসলে মায়ের দুধ! আমরা কল্পনা করি, মস্ত মস্ত জটাওয়ালা কুঁচকানো মুখের যাদুকর-যাদুকরীরা আমাদের কল্পনা করতে শিখিয়েছে, শুনিয়া আসলে দেখতে মানুষের মতন কিন্তু পিঠে মস্ত সাদা উজল দুটি ডানা, প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে শুনিয়া তার আসল রূপে এসে আমাদের দেখে যায়। আমি দেখার জন্য কতদিন শেষরাত্রে এসে শুনিয়ার পারে বসে থেকেছি। কিন্তু কিছু দেখিনি। যাদুকর-যাদুকরীদের ছাড়া হয়তো সে দেখা দেয় না।
আমাদের উপত্যকা পাহাড়ে ঘেরা, চারিদিকে সবুজনীলবাদামী পাহাড় আর ঘন অরণ্যে ঘেরা সবুজ ভূমিটুকুই আমাদের জগৎ। এর বাইরে কি আছে আমরা জানি না। বুড়ো যাদুকর নিষাত বলতো বাইরে আছে দেবতা আর দৈত্যদের দেশ, দৈত্যরা বিরাট বিরাট চেহারার, তাদের দেহ লম্বা লম্বা কালো লোমে ভরা, তারা খুবই শক্তিশালী আর বদখত। আর দেবতারা ভারী সুন্দর, তাদের ঝলমলে ডানা আছে, তারা উড়ে বেড়ায়। শুনিয়া তো দেবতাদের মেয়ে, তাই তার ডানা আছে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি অনেককাল আগে বিদ্রোহী খুম্বা যখন দলপতি তিমান্থের সঙ্গে ঝগড়া করে অরণ্যে পালিয়ে গেল, তখন সে কোথায় গিয়ে পড়েছিল? দেবতাদের দেশে নাকি দৈত্যদের দেশে?
পাথুরে চাতালের প্রান্তে এসে দাঁড়াই। এত উঁচু থেকে কতখানি দেখা যায় একসঙ্গে! ঐ যে মস্ত ওকুমে গাছটা, ওরই নিচে বসে তো আমাদের উপদেশ দিতো নিষাত! নিষাত মরে গেলে ওকে মাটির গভীরে শুইয়ে দেওয়া হলো তো ঐ গাছেরই কাছে! নিষাত মরে কোথায় গেল, দেবতাদের দেশে?
ওকুমে গাছের কাছ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেলে দিই খোলা সবুজ জমিনের উপরে, শুনিয়ার জলধারা চিকচিক করছে সবুজের মধ্যে। দেখতে পাই একদল ছেলেমেয়ে খেলছে নদীর পারে, আমার আবছা মনে পড়ে আমি আর খুমান, তখন আমরা ছোটো, আমরা ও খেলতাম। আরো কতজন ছিল, কুশ....
তীরবিদ্ধের মতন ঘুরে তাকাই, এই গুহা কাল অবধি খুমানের ছিল, এখন কুশের। কুশ এখন আমাদের নতুন দলপতি। কাল খুমানকে হত্যা করে সে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে! খুমান কি সত্যি মরে গেছে? আর কোনোদিন সে ফিরবে না? আমি চোখ কুঁচকে আকাশের দিকে তাকাই, শকুন উড়ছে। সবই কি খেয়ে ফেলবে ওরা? কাল খুমান ছিল সাহসী, শক্তিশালী যুবক, আমাদের যূথের যূথপতি, আজ তার চিহ্ন কোথাও নেই! যন্ত্রণায় আমি তীরবিদ্ধের মতন ছিটকে উঠি, কোথা থেকে আসে এ যন্ত্রণা? কোনো তীর তো কেউ ছোঁড়েনি, লাল রক্ত তো বেরিয়ে আসছে না! তবু কিসের এ বেদনা?
কুশ এগিয়ে এলো, তার সবল বাহু ঘিরে ধরলো আমায়। খুমানের সবই এখন তার, প্রাক্তন সঙ্গিনীও তার। আমি স্থির হয়ে থাকি, বাধা দিয়ে কি হবে? কুশের নেতৃত্ব সবাই মেনে নিয়েছে, তাকে বাধা দেওয়া বিদ্রোহের সামিল। তবু ইচ্ছে করলেই আমি পারি, ছিটকে উঠে দাঁড়াতে পারি, পাথর দিয়ে লড়াই করতে পারি, হারিয়ে যেতে পারি অরণ্যে বা একেবারেই হারিয়ে গিয়ে খুমানের কাছে উপস্থিত হতে পারি। তাই কি? মরে গেলে কোথায় যাবো? খুমানের কাছে ? নাকি শুনিয়ার কাছে ? নাকি লোমশ দৈত্যদের দেশে?
দুর্বল আর ক্লান্ত লাগে, আদিম বন্য বিদ্রোহিনী ঘুমিয়ে পড়ে। কুশ প্রাণপণে চেষ্টা করে চলে উপভোগের, আমি লুটিয়ে পড়ে থাকি খুমানের কোমল রোমভরা বুকে। খুমান মরে নি, সে মরতে পারে না, সে ফিরে আসবে। অসহ্যরকমের দাপাদাপি শেষ হলে ক্লান্ত কুশ ঘুমিয়ে পড়ে, আমি এলিয়ে পড়ে থাকি আধাঘুমে আধা জাগনে। মনে পড়ে শেষরাতের শুনিয়ার কলকল শব্দ, সে কবে, কবে? খুমান আমায় ওখানে দেখে অবাক হয়ে বলেছিল, " তিবা, তুমি এখানে এসে বসে আছো এত রাতে?" কবে, সে কবে?
উষ্ণ লবণজল আমার গাল ভিজিয়ে দিতে থাকে, খুমান খুমান খুমান, তুমি কোথায় তুমি কোথায়? আমি বুঝতে পারি না, খুমান সাড়া দেয় আমার ভিতরে, হালকা কোমল একটা ধাক্কা। খুমান নতুন জন্ম নিয়ে ফিরে আসবে, শুধু সে না, আমিও তার সঙ্গে নতুন হয়ে জন্মাবো। জীবনের ভিতরে জীবন গড়ে ওঠার সেই তীব্র বেদনার আনন্দ আমায় ঘিরে ফেলে শুনিয়ার জলের মত।
***
"কি হলো, ট্রিণা?" যেন বহুযুগ পার হয়ে গলাটা ভেসে এলো। সত্যিই বহুযুগ পার হয়ে। অ্যডামের গলা। আমার কাঁধে হাত রেখে অ্যাডাম ঝাঁকানি দিয়ে আবার বললো, "তোমার কি হলো ট্রিণা?" অ্যাডাম তৃণা বলতে পারে না, বলে ট্রিণা।
ধাক্কা খেয়ে জেগে উঠলাম জাগরস্বপ্ন ভেঙে। স্বপ্ন? আমার চোখের সামনে যে বহুশত শতাব্দী পূর্বের জীবন অভিনীত হচ্ছিল, তা কি শুধুই আমার স্বপ্ন?
"আরে আমাদের আজকের ফিল্ডওয়ার্ক এখুনি শুরু করতে হবে। নিচে সবাই অপেক্ষা করছে! তুমি ঠিক আছো তো? "
আমার চোখ তখনো ঝাপসা, মাথা তখনো স্বপ্নটলমল। আমি দু'হাতের পাতা দিয়ে চোখের উপরে হালকা ঘষা দিই, উঠে দাঁড়াই। জিনসের প্যান্টের হাঁটুর কাছে ধূলা, ঝাড়তে ঝাড়তে বলি, "আমি একদম ঠিক আছি অ্যাডাম। ধন্যবাদ। চলো, কাজ শুরু করি।"
আমরা কাজ শুরু করলাম। আমরা, একবিংশ শতকের দুই মানবমানবী অ্যাডাম ও তৃণা, সেই বহুপুরাতন ঊষাযুগের সন্ততিদের জীবনরহস্য সন্ধানে উৎখনন শুরু করলাম। কী গভীর গোপণ সূত্রে আমরা যে তাদের সঙ্গে যুক্ত, সেই রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টায়। সে কঠোর বৈজ্ঞানিক নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া, সেখানে স্বপ্নের উৎপাত বরদাস্ত করা হয় না। খুব সাবধানে আমি লুকিয়ে ফেলি দীর্ঘশ্বাস, কেউ যেন কিছু না বুঝতে পারে।
শুধু দু'খন্ড হয়ে ভাঙা পাথরটি আমার দিকে চেয়ে থাকে, গুহার সামনের চাতালে একই জায়গায় সেটি পড়ে আছে, একইরকম ভাঙা। শুধু সেটার গায়ে লালচেবাদামী দাগগুলো আর নেই, কবেই সে দাগ বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে।
(শেষ)
হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ
সময়ের স্রোতে নিত্য আলোড়িত হতে হতে কত দূরের মানুষ কাছে আসে, আলো হয়ে যায় মনের ঘর। আবার কত কাছের মানুষ দূরে চলে যায়, বেদনার মতো বাজে চলে যাওয়া। কিন্তু আসলেই কি চলে যায় তারা? বাহিরে যে চলে গেলো, তার অশ্রুঝলোমলো মুখখানি ধরা থাকে স্মৃতিতে। বেদনার অর্ঘ্যে তার চিরদিনের অভিষেক। তাকে মুছবে কে?
"ভুলে যা" "ভুলে যা" "ভুলে যা" বললেই কি কিছু ভোলা যায়? কোন্ বহুদূরের পাহাড়ের চূড়া থেকে উৎপন্ন হয়ে, কত মাঠবন পার হয়ে, কোন্ সুখউঠানের পাশ দিয়ে কলকলিয়ে, কোন্ দুখপাথরের গায়ে জলহাত বুলিয়ে বুলিয়ে বয়ে যেতে থাকা জলছলছল নদীকে কি উৎসে ফিরে যা বললেই সে ফিরতে পারে?
ভুলে যাওয়া যায় না কিছুই। মনের স্তরে স্তরে আলোআঁধারির খেলা, ধাপে ধাপে নেমে গেছে সিঁড়ি, ও ও ও ই কত নিচে, শেষ দেখা যায় না। ধাপে ধাপে উঠেও গেছে সিঁড়ি, ও ও ও ও কত উপরে, ঝকমকে নীল যেখানে গভীর মধ্যরাত্রিনীলে মিলিয়ে গিয়ে তারার মণিকণায় হেসে উঠেছে, সেই দিকে, উপরের দিকেও শেষ দেখা যায় না। এই সব সিঁড়িরা কত সব রহস্যপুরীতে গিয়ে থেমেছে, কেজানে!
জীবনানন্দ চিরকাল সেই গভীর রহস্যলোকের গল্প বলেছে আমায়, মহীনের ঘোড়ারা সেখানে কার্তিকের জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে ঘাস খেয়ে চলেছে, সেখানে বিলুপ্ত নগরীর মর্মরপ্রাসাদে আজও অপেক্ষায় আছে মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেম, ধানসিঁড়ি তীরে চেনা কাশফুলমাঠ ফিরিয়ে আনে গতজন্মস্মৃতি, হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ লেগে থাকে, হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ লেগে থাকে.....
হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ
ভিক্ষাপাত্র ধুয়ে নিয়ে বহে গেছে জল
স্মৃতিতে ক্ষুদের গন্ধ তবু লেগে থাকে,
কুয়াশার মাঠশেষে বাঁশপাতাবনে
যেমন মায়াবী চাঁদ একা জেগে থাকে।
বাসনার ধূলাবালি ধুয়ে নেবো ভেবে
নির্বাসনস্নানে নামি নীবারার স্রোতে,
আকাঙ্ক্ষা-পাখিরা তবু ঝাপটায় ডানা
দুইচোখে জলছবি ছায়াতে আলোতে।
ভেবেছি তো নি:শেষে ভুলে যাবো সব
আগুনের শিখা জ্বেলে করেছি শপথ,
তপ্ত হাওয়ায় তবু উড়ে আসে বালি
ছুঁয়ে যায় শিলাঢাকা হৃদয়ের পথ।
এখনো সে পুরাতন জল বয়ে চলে
এখনো জমে নি সব কঠিন বরফে-
এখনো তো পাখামেলা মেঘ ভালোবেসে
আলো লিখে যায় গান অচেনা হরফে।
ভিক্ষাপাত্র ধুয়ে নিয়ে বহে গেছে জল
হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ তবু লেগে থাকে.....
হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ তবু লেগে থাকে.....
***
"ভুলে যা" "ভুলে যা" "ভুলে যা" বললেই কি কিছু ভোলা যায়? কোন্ বহুদূরের পাহাড়ের চূড়া থেকে উৎপন্ন হয়ে, কত মাঠবন পার হয়ে, কোন্ সুখউঠানের পাশ দিয়ে কলকলিয়ে, কোন্ দুখপাথরের গায়ে জলহাত বুলিয়ে বুলিয়ে বয়ে যেতে থাকা জলছলছল নদীকে কি উৎসে ফিরে যা বললেই সে ফিরতে পারে?
ভুলে যাওয়া যায় না কিছুই। মনের স্তরে স্তরে আলোআঁধারির খেলা, ধাপে ধাপে নেমে গেছে সিঁড়ি, ও ও ও ই কত নিচে, শেষ দেখা যায় না। ধাপে ধাপে উঠেও গেছে সিঁড়ি, ও ও ও ও কত উপরে, ঝকমকে নীল যেখানে গভীর মধ্যরাত্রিনীলে মিলিয়ে গিয়ে তারার মণিকণায় হেসে উঠেছে, সেই দিকে, উপরের দিকেও শেষ দেখা যায় না। এই সব সিঁড়িরা কত সব রহস্যপুরীতে গিয়ে থেমেছে, কেজানে!
জীবনানন্দ চিরকাল সেই গভীর রহস্যলোকের গল্প বলেছে আমায়, মহীনের ঘোড়ারা সেখানে কার্তিকের জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে ঘাস খেয়ে চলেছে, সেখানে বিলুপ্ত নগরীর মর্মরপ্রাসাদে আজও অপেক্ষায় আছে মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেম, ধানসিঁড়ি তীরে চেনা কাশফুলমাঠ ফিরিয়ে আনে গতজন্মস্মৃতি, হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ লেগে থাকে, হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ লেগে থাকে.....
হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ
ভিক্ষাপাত্র ধুয়ে নিয়ে বহে গেছে জল
স্মৃতিতে ক্ষুদের গন্ধ তবু লেগে থাকে,
কুয়াশার মাঠশেষে বাঁশপাতাবনে
যেমন মায়াবী চাঁদ একা জেগে থাকে।
বাসনার ধূলাবালি ধুয়ে নেবো ভেবে
নির্বাসনস্নানে নামি নীবারার স্রোতে,
আকাঙ্ক্ষা-পাখিরা তবু ঝাপটায় ডানা
দুইচোখে জলছবি ছায়াতে আলোতে।
ভেবেছি তো নি:শেষে ভুলে যাবো সব
আগুনের শিখা জ্বেলে করেছি শপথ,
তপ্ত হাওয়ায় তবু উড়ে আসে বালি
ছুঁয়ে যায় শিলাঢাকা হৃদয়ের পথ।
এখনো সে পুরাতন জল বয়ে চলে
এখনো জমে নি সব কঠিন বরফে-
এখনো তো পাখামেলা মেঘ ভালোবেসে
আলো লিখে যায় গান অচেনা হরফে।
ভিক্ষাপাত্র ধুয়ে নিয়ে বহে গেছে জল
হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ তবু লেগে থাকে.....
হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ তবু লেগে থাকে.....
***
Friday, June 19, 2009
অগ্নিজাতক
1
অগ্নি ছিলো সূর্যে, আকাশে বিদ্যুতে, জীবন্ত আগ্নেয়শৈলের জ্বালামুখে, অরণ্যে দাবানলে ও সমুদ্রে বাড়বানলে। কিন্তু সে ছিলো না হিমকন্থা প্রস্তরগুহায়, ছিলো না বৃক্ষচারী প্রায়মানবের সন্নিধানে। তীব্র শীতপ্রবল উত্তরী অক্ষের দেশে ছিলো কুয়াশা, ছিলো নিষ্ঠুর তুষারঝঞ্ঝা ও হিমজমাট প্রান্তর। হিমকন্থা প্রায়মানবেরা অগ্নিকে আহ্বান করেছিলো ভাষাহীন চিত্কৃত প্রার্থনায়।
সুদূরে দক্ষিণ সমুদ্রের দেশের ধীবরী, তরল অন্ধকার ছড়িয়ে আসা সন্ধ্যায়, সাগরবেলায় চেয়ে আছে পশ্চিমে, সেখানে জল লোহিতবর্ণ হয়ে ছলচ্ছল করছে। ঐ তীব্র লোহিত বর্ণ, জননী গর্ভোত্সারিত রক্তধারার মত জীবন্ত মনে হয়। ঐ অমৃতের সমুদ্রে অবগাহন করেই কিনা সূর্য প্রতিদিন নবজাত হন!
হে দ্যুলোকের দেবগণ, ঐ দিক দিগন্তরে ছড়ানো অসংখ্য দ্বীপমালার কোনটিতে হবে আমার গন্তব্য? কোথায় আছে সেই লোহিত সমুদ্রের দুয়ার? অনন্ত জীবনের ঝর্ণা?
অনুকূল সমুদ্রস্রোতে তরী নিয়ে এসে পড়ে ধীবরেরা,তাদের জালে মত্সের ও কূর্মের ভীড়। সমুদ্রবেলায় দ্রুত বন্টনের শেষে ওদের ফিরে যেতে হবে ঘরে।
এখানে পর্বতসানুতেও বেলা পড়ে আসছে, নদীতীরের বালুচর স্বর্ণপ্রভ। শিকারজীবীরা দিনের শেষজল পান করে ফিরে যাবে মৌচাকের মতন গুহাসমূহে। ইন্দ্রনীলপ্রভ মেঘ ঘনায় এ উপত্যকা জুড়ে, সন্ধ্যা-আকাশ বয়ে আনছে কি অদ্ভুত অনাস্বাদিত বার্তা। কিছু একটা ঘটতে চলেছে, এই হলুদ বালুচরবর্তী ভাষাহীন প্রায়মানবেরা অনূভূতি দিয়ে বোঝে, কিন্তু স্পষ্ট করে বুঝতে পারে না সেটা কি।
নারী ও পুরুষ ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গুহামুখে, শিশুরাও উন্মুখ। সিংহের মতন সুকেশর মেঘেরা আকাশে খেলা করে বেড়ায়, শোঁ শোঁ ঝড়ো বাতাসে উড়তে থাকে শুষ্ক পত্রসম্ভার। দক্ষিণ পশ্চিমে ঝলসে ওঠে বিদ্যুৎ। আকাশের অগ্নিদেবতা। পাবক-অভিলাষী মানবকের জন্য এইবারে তিনি আসবেন, আসবেন এইখানে, এইখানে, এইখানে।
স্বেদবিজড়িত চকিত নিদ্রাভঙ্গে চমকে উঠি, কে আমার হাত ধরে আছে? এইহাতের উপর এইমাত্র ছিলো তপ্ত অগ্নিস্পর্শ, চরিতার্থকামা নারীর মরচক্ষুতে স্পষ্ট হয়েছিলো পাবকের নখবিলিখন। সে কোথায় গেল? এইখানে এইখানে এইখানেই তো ছিলো,এইমাত্র, এই মুহূর্তেই।
প্রৌঢ় হয়ে আসা সঙ্গীর বলিরেখাময় মুখে আর রূপ নাই, পরিণতিও নাই। কালের অমোঘ হস্তাবলেপে মুহূর্তে মুহূর্তে ক্ষয়ে যাই আমরা, ঝরে যাই, ক্ষয়ে যায় আমাদের সব স্বপ্ন ও যন্ত্রণা। সব তাপ নিভে আসে আস্তে আস্তে।
বিছানা বালিশে মেঝেতে শয্যায় ছড়িয়ে পড়ে থাকে আমাদের অগণিত মর্ষনজাত ও ধর্ষণজাত সন্তানেরা। নানা আকৃতির ও চেহারার নর ও নারীরা। ঘুমন্ত ও আধাঘুমন্ত। কেউ কেউ জাগ্রতও। কেউ শুয়ে থাকে শিথিল একটি দীর্ঘ দন্ডের মতন, কেউ গুটিয়ে গোল হয়ে গর্ভস্থ শিশুর মতন, কেউ এলোমেলো একগোছা খড়ের মতন।
কিন্তু ঐ অনন্ত অগ্নি? ঐ অন্তহীন জ্বালামুখ? কোথায় প্রচ্ছন্ন হয়ে আছো ছদ্মবেশী? কোথায় কিসের আবরণে ঢেকেছ লেলিহজিহ্বা তোমার? কামার্তা মানবীকে এইমাত্র লেহন করে গেছ যা দ্বারা?
2
একটি উচ্চ ঢিবির মতো এখানে। ক্লান্ত যোদ্ধা সেই ঢিবিতে উঠলেন। কেন যে এখনো ভারী অস্ত্রটি তিনি সঙ্গেই নিয়ে যাচ্ছেন কে জানে! কোনোক্রমে টানতে টানতে তিনি ঢিবির উল্টাদিক দিয়ে নেমে গেলেন। তারপরে প্রায় ছুটতে লাগলেন। আ:, এত তৃষ্ণা কেন? কেন এখনো এইসব বোধগুলি তাকে ছেড়ে যায় না?
উপত্যকা অতর্কিতে নেমে গেছে নীচে। সেখানে টলটল করছে হ্রদের জল। ক্লান্ত তৃষ্ণার্ত যোদ্ধা তাকিয়ে থাকেন সেইদিকে। তারপরে প্রথমে তার অস্ত্রটি ফেলে দেন জলের কিনারে, পরে নিজে নেমে আসেন পাথরে সাবধানে পা রেখে। তারপরে জলের মধ্যে প্রায় লুটিয়ে পড়ে আকন্ঠ পান করেন সেই ঠান্ডা, স্নিগ্ধ জল। আ:।
বৌ ষট্ বৌ ষট্ বৌ ষট্ --অসংখ্য ঘোড়ার পায়ের শব্দ পাই, ধূসর ও গৈরিক প্রান্তর জুড়ে তাদের হিল্লোলিত দেহভঙ্গী, শস্যময় হরিত্ দুধমধুর দেশের দিকে আরোহীদের যাত্রা, তাদের জ্বলজ্বলে কঠিন চক্ষে বিপুল তৃষ্ণা। অল্পস্তন্যে পৃথিবী তাদের ক্ষুধার্ত করে রেখেছে। তাই তারা খুঁড়ে নিয়ে আসবে পাতালের ধনরত্ন, আকাশের রৌদ্রজল, বাতাসের গতি ও প্রাণের লাবণ্য। বিপুল প্রস্তরস্তূপ অতি জটিল ও সূক্ষ্ণ হিসাবের দ্বারা একটির উপর আরেকটি চাপিয়ে মন্দির তৈরী হবে মরুবালুরাশির উপরে, কৃত্রিম পর্বতের মতন এর উচ্চশীর্ষ ভেদ করে যাবে আকাশে ভাসমান মেঘসমূহ।
3
কত নক্ষত্র নিভিয়া গিয়াছে, কত নক্ষত্র জ্বলিয়াছে নূতন! পৃথিবীর প্রেমনত চক্ষে দূর দূরান্তের আলো এসে লাগে, ক্রমশ আরো আরো কল্পপূর্বের আলো, যখন পৃথিবী ছিলো না, সূর্য ছিলো না, বিপুলা আকাশগঙ্গা ছায়াপথ স্বপ্নবৎ লুকাইয়া ছিলো কোন্ জটিল গণিতের গোলোকধাঁধায়, সেই আদিযুগের আলো এসে পরশ করিয়া যায় পৃথিবীকে। সেই আদি অগ্নির তাপ ফুরাইয়া যায় নাই, রহিয়া গিয়াছে আজও।
হে পাবক, হে পবিত্র অগ্নি, জাতবেদা হুতাশন, আমার জন্মমরণ চরিতার্থ করিয়া বাজিয়া ওঠো,ঐ ফুলের আগুন যে নীল দিগন্তে মিলাইয়া গিয়াছে, ঐ তীব্র আকাংক্ষার সন্তানেরা যে প্রশান্ত সমুদ্রের কিনারে নামিয়া গিয়াছে তটপঙ্ক অতিক্রম করিতে করিতে, সেইখানে একই বিন্দুতে যখন তুমি আমি ও এই মহাজগৎ একীভূত হইয়া ছিলো, সেইখানে, ঠিক সেইখানে। এতটুকুও কি সরিয়াছে সেই ব্রাহ্মবিন্দু ও সেই অনাদ্যন্ত ব্রাহ্মমুহূর্ত? অনি:শেষ ও অনবরত অনাবৃত অথচ চিরকাল দূরে সরিয়া যায়?
জ্বলুক জ্বলুক তোমার দীপ্তিঢালা সুধা, ঐ শিখায় ধন্য হৌক এই নশ্বরতার সমস্ত আর্তি বেদনা দু:খ ও সুখ। এসো, সর্বাঙ্গ লেহন করো, চির চরিতার্থ হৌক এই পৃথিবীবদ্ধ হিয়া।
আমারা একে অপরে নিহিত ছিলাম আদি অগ্নির স্বপ্নে, তখনো সে তাপ তীব্রভাবে অস্তিত্ববান, প্রথম তিন মিনিটের সমস্ত আলোড়ন বিদারণ শরণ ও বিশরণ এর পরে সৃষ্টিমুখী মথিত সমুদ্রের মতন শান্ত ও পরিপ্লুত।
সুবোধ্য দুর্বোধ্যতার সীমা পেরিয়ে যাও ধ্যানের মধ্যে, হে শুদ্ধশীল। দেখতে পাচ্ছ কি নীল স্নিগ্ধতা? বুঝতে পারছ কি সীমাহীন অন্তহীন রাত্রির গভীর প্রসন্ন মণিময় আহ্বান? পদ্মের পাপড়িগুলি অদৃশ্য, নিহিত মণিগুলি ঝলমল করছে জ্যোতিকণিকার মতন। "ওম্ মণিপদ্মে হুম।"
গভীর স্বরে বেজে উঠছে সুরেলা ঘন্টা, পার্বত্য বিহারটির হৃদয়োত্সারিত মন্ত্রাঞ্জলির মতন। শুদ্ধশীল, এসো আমরা ওখানে যাই। এখন ঊষালগ্ন, ভারী পবিত্র এখন সবকিছু, প্রকৃতি এখন গায়ত্রীগান গাইছে।
ঐ দ্যাখো উচ্চশীর্ষ সরল গাছগুলি পর্বতগাত্রে, উর্ধমুখ মৌন। গভীর ধ্যানরাত্রির শেষে চক্ষু মেলে উদয়দিগন্তের দিকে চেয়ে আছে। ভূলোক ভূবলোক ও স্বর্লোকে আলোর শঙ্খ বাজছে, শুনতে পাচ্ছ কি?
হে বরেণ্য সবিতা, সেই আলোর রথ আসুক এইখানে এইখানে এইখানে। ঠিক এই হৃদয়ের মাঝখানটিতে, এই চেতনার পদ্মকোষে, এই মর্মরিত মন-অরণ্যের লুক্কায়িত বৃক্ষবাটিকায়।
4
সেই মাতৃস্বরূপা স্তন্যদায়িনী তটিনী। তীরবর্তী হলুদ বালুচরে, সেই পর্বত কন্দরবাসী মানবের ত্রস্ত অস্তিত্বের সম্মুখে তিনি এসেছিলেন। আজও যেমন আসেন, মুহূর্তে মুহূর্তে। অনভিজ্ঞ অপ্রস্তুত প্রায়মানবের সম্মুখে অতর্কিতে এসেছিলেন তিনি।
বজ্রপাতে জ্বলে উঠলো শুষ্কমৃত বৃক্ষ। অট্টহাস্যে আকাশ কাঁপিয়ে দিলো তীব্র রক্তরঙ অনল। লেলিহজিহ্বা পাবক আকাশ লেহন করতে উঠলো। শুদ্ধশীল, আমরা এগিয়ে গেলাম। অগণিত সময়খন্ডকে পার হতে হতে। উত্তপ্ত হলকা আমাদের ললাট নেত্র নাসা মুখ বাহু হদৃয় উদর জননেন্দ্রিয় উরু ও চরণ স্পর্শ করে করে থামতে বললো, সহজাত ভয়ানুভূতি আমাদের পায়ে পায়ে বাধার মত জড়িয়ে যেতে লাগলো, কিন্তু আমরা তথাপি থামলাম না। অগণিত অতীত-আত্মা কানফাটানো অভিশাপে জর্জরিত করতে লাগলো আমাদের শ্রবণাতীত শ্রবনেন্দ্রিয়, কিন্তু তাও আমরা থামলাম না। ঐ পাবকশিখা হয় আমাদের দগ্ধ করে দিক, নাহয় আমরা ওকে নিয়ে আসি আমাদের প্রাণের দক্ষিণ বাতায়নে। অগণিত দৈত্যদানব বাধা দিলো, অসংখ্য আমরা মরে মরে ছাই হয়ে যেতে লাগলাম। ভস্মসাৎ হয়ে যেতে লাগলাম । ফের জন্ম নিয়ে এগিয়ে গেলাম। আমাদের হাতের শুদ্ধ বৃক্ষশাখায় তাকে আনবোই আনবোই আনবোই আমরা।
সে এলো, দক্ষিণাগ্নি হয়ে জ্বলে উঠলো অগ্নিমন্দিরে, যজ্ঞস্থলীতে। আমরা সমিধ ও ঘৃত দ্বারা উপাসনা অব্যহত রাখলাম। সে প্রদীপ হয়ে দূর করে দিলো অন্ধকার, প্রথমে বাইরের, ক্রমে ধীরে ধীরে অভ্যন্তরের।
কিন্তু শুদ্ধশীল, শেষ পর্যন্ত এ কোথায় এলাম? মঞ্জরিত বোধি দেখতে প্রার্থনা করেছিলাম আমরা,আলোর তরু, পরম আলো।
তাই কি দেখলাম? হে আলোর ঈশ্বর, এ কি দেখলাম?
দিগন্ত হইতে দিগন্ত পর্যন্ত মহা বালুরাশি। মহাবিস্তৃত মরুভূ। এই মরুতে শ্বেতবালুকা। এই নির্জন মরুতেই আমাদের অগ্নিবৃক্ষ পাতাল ও গভীর অতল হইতে উত্থিত হইয়া সপ্তস্বর্গ লেহিতে জিহ্বা প্রসারিত করিল। রোষরক্তিম প্রলয়মেঘের ছত্রাককুন্ডলী দেখিয়া আমাদের চেতনা স্থবির হইয়া গেলো। অসহনীয় উত্তপে মরুবালুকা স্ফটিক হইয়া গেলো।
সুদূর অতীতের সেই প্রথমাগ্নির পবিত্রলগ্নে যে অন্ধকার জলীয় দানব আমাদের অগ্নিসম্মুখে ভয়হীন হইতে দেখিয়া অভিশাপ দিয়াছিলো, প্রচন্ড নিষ্ঠুর বাধা দিয়াছিলো, সে উচ্চন্ড হাসিতে হাসিতে সহসা কান্নায় শতধা হইয়া গেলো। মিহিন বৃষ্টি নামিলো আকাশ হইতে।
জ্বলিয়া উঠিলো প্রলয় অগ্নিবৃক্ষ বারে বারে,উত্তরে দক্ষিণে, পুবে পশ্চিমে। অসংখ্য সমুদ্রবেলা স্ফটিক হইয়া গেলো। অসংখ্য মরু অপেক্ষা করিতে লাগিলো স্ফটিক হইবে বলিয়া।
অনন্ত জীবনের ঝর্ণার রক্তিম উত্স আবিষ্কার করিতে চাহিয়াছিলো যে ধীবরী, তাহার পথ নির্দেশক নক্ষত্র শত টুকরায় ভাঙিয়া জলরাশির নিম্নে ডুবিয়া গেলো। অগ্নিবৃক্ষ থামিলো না, ক্রমশ আরো আরো সবুজ গ্রাস করিতে লাগিলো ক্ষুধার্ত ব্যয়ত আননে। বারে বারে তাহার নির্মম করোটিচিহ্নিত পতাকা জ্বলিয়া উঠিলো সাগরে ভূধরে দ্বীপে দ্বীপান্তরে।
5
শুদ্ধশীল, সুদূর কপোতকূট গিরিবাস হইতে কবে অসিবে সেই শ্বেতপক্ষী, ডানায় নতুন আলো লইয়া? আমাদের মুক্ত করিবে অন্তহীন মৃত্যু হইতে?
পর্বতারোহণে ক্লান্তি আমার দু'পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে শৈবালের মতন। শুদ্ধশীল হাত বাড়িয়ে আমার হাতটি ধরলেন। ঘন্টার শব্দ শান্ত হয়ে গিয়েছে, পর্বতে নতুন সূর্যের অলো ঝলমল করছে। একটি অফুরান চুম্বনের মধ্যে মিলে যেতে যেতে আমরা অনুভব করলাম, অগ্নি, জল, মৃত্তিকা,শিলারাশি, অনিল ও ব্যোম, বিঘূর্নিত মথিত আলোড়িত হতে হতেও এক এক একই।
অভ্যন্তরে সেই শুদ্ধ অগ্নির তাপ অনুভবই আমাদের শেষ সসংজ্ঞ স্মৃতি।
অগ্নি ছিলো সূর্যে, আকাশে বিদ্যুতে, জীবন্ত আগ্নেয়শৈলের জ্বালামুখে, অরণ্যে দাবানলে ও সমুদ্রে বাড়বানলে। কিন্তু সে ছিলো না হিমকন্থা প্রস্তরগুহায়, ছিলো না বৃক্ষচারী প্রায়মানবের সন্নিধানে। তীব্র শীতপ্রবল উত্তরী অক্ষের দেশে ছিলো কুয়াশা, ছিলো নিষ্ঠুর তুষারঝঞ্ঝা ও হিমজমাট প্রান্তর। হিমকন্থা প্রায়মানবেরা অগ্নিকে আহ্বান করেছিলো ভাষাহীন চিত্কৃত প্রার্থনায়।
সুদূরে দক্ষিণ সমুদ্রের দেশের ধীবরী, তরল অন্ধকার ছড়িয়ে আসা সন্ধ্যায়, সাগরবেলায় চেয়ে আছে পশ্চিমে, সেখানে জল লোহিতবর্ণ হয়ে ছলচ্ছল করছে। ঐ তীব্র লোহিত বর্ণ, জননী গর্ভোত্সারিত রক্তধারার মত জীবন্ত মনে হয়। ঐ অমৃতের সমুদ্রে অবগাহন করেই কিনা সূর্য প্রতিদিন নবজাত হন!
হে দ্যুলোকের দেবগণ, ঐ দিক দিগন্তরে ছড়ানো অসংখ্য দ্বীপমালার কোনটিতে হবে আমার গন্তব্য? কোথায় আছে সেই লোহিত সমুদ্রের দুয়ার? অনন্ত জীবনের ঝর্ণা?
অনুকূল সমুদ্রস্রোতে তরী নিয়ে এসে পড়ে ধীবরেরা,তাদের জালে মত্সের ও কূর্মের ভীড়। সমুদ্রবেলায় দ্রুত বন্টনের শেষে ওদের ফিরে যেতে হবে ঘরে।
এখানে পর্বতসানুতেও বেলা পড়ে আসছে, নদীতীরের বালুচর স্বর্ণপ্রভ। শিকারজীবীরা দিনের শেষজল পান করে ফিরে যাবে মৌচাকের মতন গুহাসমূহে। ইন্দ্রনীলপ্রভ মেঘ ঘনায় এ উপত্যকা জুড়ে, সন্ধ্যা-আকাশ বয়ে আনছে কি অদ্ভুত অনাস্বাদিত বার্তা। কিছু একটা ঘটতে চলেছে, এই হলুদ বালুচরবর্তী ভাষাহীন প্রায়মানবেরা অনূভূতি দিয়ে বোঝে, কিন্তু স্পষ্ট করে বুঝতে পারে না সেটা কি।
নারী ও পুরুষ ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গুহামুখে, শিশুরাও উন্মুখ। সিংহের মতন সুকেশর মেঘেরা আকাশে খেলা করে বেড়ায়, শোঁ শোঁ ঝড়ো বাতাসে উড়তে থাকে শুষ্ক পত্রসম্ভার। দক্ষিণ পশ্চিমে ঝলসে ওঠে বিদ্যুৎ। আকাশের অগ্নিদেবতা। পাবক-অভিলাষী মানবকের জন্য এইবারে তিনি আসবেন, আসবেন এইখানে, এইখানে, এইখানে।
স্বেদবিজড়িত চকিত নিদ্রাভঙ্গে চমকে উঠি, কে আমার হাত ধরে আছে? এইহাতের উপর এইমাত্র ছিলো তপ্ত অগ্নিস্পর্শ, চরিতার্থকামা নারীর মরচক্ষুতে স্পষ্ট হয়েছিলো পাবকের নখবিলিখন। সে কোথায় গেল? এইখানে এইখানে এইখানেই তো ছিলো,এইমাত্র, এই মুহূর্তেই।
প্রৌঢ় হয়ে আসা সঙ্গীর বলিরেখাময় মুখে আর রূপ নাই, পরিণতিও নাই। কালের অমোঘ হস্তাবলেপে মুহূর্তে মুহূর্তে ক্ষয়ে যাই আমরা, ঝরে যাই, ক্ষয়ে যায় আমাদের সব স্বপ্ন ও যন্ত্রণা। সব তাপ নিভে আসে আস্তে আস্তে।
বিছানা বালিশে মেঝেতে শয্যায় ছড়িয়ে পড়ে থাকে আমাদের অগণিত মর্ষনজাত ও ধর্ষণজাত সন্তানেরা। নানা আকৃতির ও চেহারার নর ও নারীরা। ঘুমন্ত ও আধাঘুমন্ত। কেউ কেউ জাগ্রতও। কেউ শুয়ে থাকে শিথিল একটি দীর্ঘ দন্ডের মতন, কেউ গুটিয়ে গোল হয়ে গর্ভস্থ শিশুর মতন, কেউ এলোমেলো একগোছা খড়ের মতন।
কিন্তু ঐ অনন্ত অগ্নি? ঐ অন্তহীন জ্বালামুখ? কোথায় প্রচ্ছন্ন হয়ে আছো ছদ্মবেশী? কোথায় কিসের আবরণে ঢেকেছ লেলিহজিহ্বা তোমার? কামার্তা মানবীকে এইমাত্র লেহন করে গেছ যা দ্বারা?
2
একটি উচ্চ ঢিবির মতো এখানে। ক্লান্ত যোদ্ধা সেই ঢিবিতে উঠলেন। কেন যে এখনো ভারী অস্ত্রটি তিনি সঙ্গেই নিয়ে যাচ্ছেন কে জানে! কোনোক্রমে টানতে টানতে তিনি ঢিবির উল্টাদিক দিয়ে নেমে গেলেন। তারপরে প্রায় ছুটতে লাগলেন। আ:, এত তৃষ্ণা কেন? কেন এখনো এইসব বোধগুলি তাকে ছেড়ে যায় না?
উপত্যকা অতর্কিতে নেমে গেছে নীচে। সেখানে টলটল করছে হ্রদের জল। ক্লান্ত তৃষ্ণার্ত যোদ্ধা তাকিয়ে থাকেন সেইদিকে। তারপরে প্রথমে তার অস্ত্রটি ফেলে দেন জলের কিনারে, পরে নিজে নেমে আসেন পাথরে সাবধানে পা রেখে। তারপরে জলের মধ্যে প্রায় লুটিয়ে পড়ে আকন্ঠ পান করেন সেই ঠান্ডা, স্নিগ্ধ জল। আ:।
বৌ ষট্ বৌ ষট্ বৌ ষট্ --অসংখ্য ঘোড়ার পায়ের শব্দ পাই, ধূসর ও গৈরিক প্রান্তর জুড়ে তাদের হিল্লোলিত দেহভঙ্গী, শস্যময় হরিত্ দুধমধুর দেশের দিকে আরোহীদের যাত্রা, তাদের জ্বলজ্বলে কঠিন চক্ষে বিপুল তৃষ্ণা। অল্পস্তন্যে পৃথিবী তাদের ক্ষুধার্ত করে রেখেছে। তাই তারা খুঁড়ে নিয়ে আসবে পাতালের ধনরত্ন, আকাশের রৌদ্রজল, বাতাসের গতি ও প্রাণের লাবণ্য। বিপুল প্রস্তরস্তূপ অতি জটিল ও সূক্ষ্ণ হিসাবের দ্বারা একটির উপর আরেকটি চাপিয়ে মন্দির তৈরী হবে মরুবালুরাশির উপরে, কৃত্রিম পর্বতের মতন এর উচ্চশীর্ষ ভেদ করে যাবে আকাশে ভাসমান মেঘসমূহ।
3
কত নক্ষত্র নিভিয়া গিয়াছে, কত নক্ষত্র জ্বলিয়াছে নূতন! পৃথিবীর প্রেমনত চক্ষে দূর দূরান্তের আলো এসে লাগে, ক্রমশ আরো আরো কল্পপূর্বের আলো, যখন পৃথিবী ছিলো না, সূর্য ছিলো না, বিপুলা আকাশগঙ্গা ছায়াপথ স্বপ্নবৎ লুকাইয়া ছিলো কোন্ জটিল গণিতের গোলোকধাঁধায়, সেই আদিযুগের আলো এসে পরশ করিয়া যায় পৃথিবীকে। সেই আদি অগ্নির তাপ ফুরাইয়া যায় নাই, রহিয়া গিয়াছে আজও।
হে পাবক, হে পবিত্র অগ্নি, জাতবেদা হুতাশন, আমার জন্মমরণ চরিতার্থ করিয়া বাজিয়া ওঠো,ঐ ফুলের আগুন যে নীল দিগন্তে মিলাইয়া গিয়াছে, ঐ তীব্র আকাংক্ষার সন্তানেরা যে প্রশান্ত সমুদ্রের কিনারে নামিয়া গিয়াছে তটপঙ্ক অতিক্রম করিতে করিতে, সেইখানে একই বিন্দুতে যখন তুমি আমি ও এই মহাজগৎ একীভূত হইয়া ছিলো, সেইখানে, ঠিক সেইখানে। এতটুকুও কি সরিয়াছে সেই ব্রাহ্মবিন্দু ও সেই অনাদ্যন্ত ব্রাহ্মমুহূর্ত? অনি:শেষ ও অনবরত অনাবৃত অথচ চিরকাল দূরে সরিয়া যায়?
জ্বলুক জ্বলুক তোমার দীপ্তিঢালা সুধা, ঐ শিখায় ধন্য হৌক এই নশ্বরতার সমস্ত আর্তি বেদনা দু:খ ও সুখ। এসো, সর্বাঙ্গ লেহন করো, চির চরিতার্থ হৌক এই পৃথিবীবদ্ধ হিয়া।
আমারা একে অপরে নিহিত ছিলাম আদি অগ্নির স্বপ্নে, তখনো সে তাপ তীব্রভাবে অস্তিত্ববান, প্রথম তিন মিনিটের সমস্ত আলোড়ন বিদারণ শরণ ও বিশরণ এর পরে সৃষ্টিমুখী মথিত সমুদ্রের মতন শান্ত ও পরিপ্লুত।
সুবোধ্য দুর্বোধ্যতার সীমা পেরিয়ে যাও ধ্যানের মধ্যে, হে শুদ্ধশীল। দেখতে পাচ্ছ কি নীল স্নিগ্ধতা? বুঝতে পারছ কি সীমাহীন অন্তহীন রাত্রির গভীর প্রসন্ন মণিময় আহ্বান? পদ্মের পাপড়িগুলি অদৃশ্য, নিহিত মণিগুলি ঝলমল করছে জ্যোতিকণিকার মতন। "ওম্ মণিপদ্মে হুম।"
গভীর স্বরে বেজে উঠছে সুরেলা ঘন্টা, পার্বত্য বিহারটির হৃদয়োত্সারিত মন্ত্রাঞ্জলির মতন। শুদ্ধশীল, এসো আমরা ওখানে যাই। এখন ঊষালগ্ন, ভারী পবিত্র এখন সবকিছু, প্রকৃতি এখন গায়ত্রীগান গাইছে।
ঐ দ্যাখো উচ্চশীর্ষ সরল গাছগুলি পর্বতগাত্রে, উর্ধমুখ মৌন। গভীর ধ্যানরাত্রির শেষে চক্ষু মেলে উদয়দিগন্তের দিকে চেয়ে আছে। ভূলোক ভূবলোক ও স্বর্লোকে আলোর শঙ্খ বাজছে, শুনতে পাচ্ছ কি?
হে বরেণ্য সবিতা, সেই আলোর রথ আসুক এইখানে এইখানে এইখানে। ঠিক এই হৃদয়ের মাঝখানটিতে, এই চেতনার পদ্মকোষে, এই মর্মরিত মন-অরণ্যের লুক্কায়িত বৃক্ষবাটিকায়।
4
সেই মাতৃস্বরূপা স্তন্যদায়িনী তটিনী। তীরবর্তী হলুদ বালুচরে, সেই পর্বত কন্দরবাসী মানবের ত্রস্ত অস্তিত্বের সম্মুখে তিনি এসেছিলেন। আজও যেমন আসেন, মুহূর্তে মুহূর্তে। অনভিজ্ঞ অপ্রস্তুত প্রায়মানবের সম্মুখে অতর্কিতে এসেছিলেন তিনি।
বজ্রপাতে জ্বলে উঠলো শুষ্কমৃত বৃক্ষ। অট্টহাস্যে আকাশ কাঁপিয়ে দিলো তীব্র রক্তরঙ অনল। লেলিহজিহ্বা পাবক আকাশ লেহন করতে উঠলো। শুদ্ধশীল, আমরা এগিয়ে গেলাম। অগণিত সময়খন্ডকে পার হতে হতে। উত্তপ্ত হলকা আমাদের ললাট নেত্র নাসা মুখ বাহু হদৃয় উদর জননেন্দ্রিয় উরু ও চরণ স্পর্শ করে করে থামতে বললো, সহজাত ভয়ানুভূতি আমাদের পায়ে পায়ে বাধার মত জড়িয়ে যেতে লাগলো, কিন্তু আমরা তথাপি থামলাম না। অগণিত অতীত-আত্মা কানফাটানো অভিশাপে জর্জরিত করতে লাগলো আমাদের শ্রবণাতীত শ্রবনেন্দ্রিয়, কিন্তু তাও আমরা থামলাম না। ঐ পাবকশিখা হয় আমাদের দগ্ধ করে দিক, নাহয় আমরা ওকে নিয়ে আসি আমাদের প্রাণের দক্ষিণ বাতায়নে। অগণিত দৈত্যদানব বাধা দিলো, অসংখ্য আমরা মরে মরে ছাই হয়ে যেতে লাগলাম। ভস্মসাৎ হয়ে যেতে লাগলাম । ফের জন্ম নিয়ে এগিয়ে গেলাম। আমাদের হাতের শুদ্ধ বৃক্ষশাখায় তাকে আনবোই আনবোই আনবোই আমরা।
সে এলো, দক্ষিণাগ্নি হয়ে জ্বলে উঠলো অগ্নিমন্দিরে, যজ্ঞস্থলীতে। আমরা সমিধ ও ঘৃত দ্বারা উপাসনা অব্যহত রাখলাম। সে প্রদীপ হয়ে দূর করে দিলো অন্ধকার, প্রথমে বাইরের, ক্রমে ধীরে ধীরে অভ্যন্তরের।
কিন্তু শুদ্ধশীল, শেষ পর্যন্ত এ কোথায় এলাম? মঞ্জরিত বোধি দেখতে প্রার্থনা করেছিলাম আমরা,আলোর তরু, পরম আলো।
তাই কি দেখলাম? হে আলোর ঈশ্বর, এ কি দেখলাম?
দিগন্ত হইতে দিগন্ত পর্যন্ত মহা বালুরাশি। মহাবিস্তৃত মরুভূ। এই মরুতে শ্বেতবালুকা। এই নির্জন মরুতেই আমাদের অগ্নিবৃক্ষ পাতাল ও গভীর অতল হইতে উত্থিত হইয়া সপ্তস্বর্গ লেহিতে জিহ্বা প্রসারিত করিল। রোষরক্তিম প্রলয়মেঘের ছত্রাককুন্ডলী দেখিয়া আমাদের চেতনা স্থবির হইয়া গেলো। অসহনীয় উত্তপে মরুবালুকা স্ফটিক হইয়া গেলো।
সুদূর অতীতের সেই প্রথমাগ্নির পবিত্রলগ্নে যে অন্ধকার জলীয় দানব আমাদের অগ্নিসম্মুখে ভয়হীন হইতে দেখিয়া অভিশাপ দিয়াছিলো, প্রচন্ড নিষ্ঠুর বাধা দিয়াছিলো, সে উচ্চন্ড হাসিতে হাসিতে সহসা কান্নায় শতধা হইয়া গেলো। মিহিন বৃষ্টি নামিলো আকাশ হইতে।
জ্বলিয়া উঠিলো প্রলয় অগ্নিবৃক্ষ বারে বারে,উত্তরে দক্ষিণে, পুবে পশ্চিমে। অসংখ্য সমুদ্রবেলা স্ফটিক হইয়া গেলো। অসংখ্য মরু অপেক্ষা করিতে লাগিলো স্ফটিক হইবে বলিয়া।
অনন্ত জীবনের ঝর্ণার রক্তিম উত্স আবিষ্কার করিতে চাহিয়াছিলো যে ধীবরী, তাহার পথ নির্দেশক নক্ষত্র শত টুকরায় ভাঙিয়া জলরাশির নিম্নে ডুবিয়া গেলো। অগ্নিবৃক্ষ থামিলো না, ক্রমশ আরো আরো সবুজ গ্রাস করিতে লাগিলো ক্ষুধার্ত ব্যয়ত আননে। বারে বারে তাহার নির্মম করোটিচিহ্নিত পতাকা জ্বলিয়া উঠিলো সাগরে ভূধরে দ্বীপে দ্বীপান্তরে।
5
শুদ্ধশীল, সুদূর কপোতকূট গিরিবাস হইতে কবে অসিবে সেই শ্বেতপক্ষী, ডানায় নতুন আলো লইয়া? আমাদের মুক্ত করিবে অন্তহীন মৃত্যু হইতে?
পর্বতারোহণে ক্লান্তি আমার দু'পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে শৈবালের মতন। শুদ্ধশীল হাত বাড়িয়ে আমার হাতটি ধরলেন। ঘন্টার শব্দ শান্ত হয়ে গিয়েছে, পর্বতে নতুন সূর্যের অলো ঝলমল করছে। একটি অফুরান চুম্বনের মধ্যে মিলে যেতে যেতে আমরা অনুভব করলাম, অগ্নি, জল, মৃত্তিকা,শিলারাশি, অনিল ও ব্যোম, বিঘূর্নিত মথিত আলোড়িত হতে হতেও এক এক একই।
অভ্যন্তরে সেই শুদ্ধ অগ্নির তাপ অনুভবই আমাদের শেষ সসংজ্ঞ স্মৃতি।
Sunday, April 19, 2009
রোদ্দুরমহল
সকালের কোমল নীল আকাশ থেকে হাল্কা বাতাস বেয়ে টুসটুসে কমলাসোনালী আলোর দানা ঝরে পড়ে টুপটাপ। আমলকী গাছের ছায়ায় জংলাপ্রিন্টের শাড়ীর মতন রোদ্দুর, তুরতুর করে শিশিরভেজা আলোছায়ার উপর দিয়ে দৌড়ে যায় কাঠবিড়ালি, ভোমরা গভীর গুঞ্জন করে উড়ে বেড়ায় আমের বোলে বোলে, শীত ফুরিয়ে আবার এলো নতুন প্রাণের দিন।
এইসব দিনগুলোতে অনুরাধার মনকেমন করে, উনুন ধরাতে ধরাতে, আনাজ কুটতে কুটতে, রাঁধতে রাঁধতে মনে পড়ে কতদিন সেই তাড়াহুড়া নেই, তখন অভি আর অঝোরা স্কুলে যেতো, ওদের বাবা যেতো অফিসে-সকালগুলোয তখন অনুরাধার নি:শ্বাস ফেলার সময় থাকতো না। এদিক থেকে অভি-"মা, কোথায় রাখলে জুতো?" ওদিকে থেকে অঝোরা, "মা, সেফটিপিনগুলো রাখো কোথায়, দরকারের সময় কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না!" অনুরাধা তো একজন, দশজন তো না, কতদিক সামলাবে সে? তবু সে না গেলে কিছুই খুঁজে পেতো না কেউ, না ছেলেমেয়ে না তাদের বাবা-কেউ ই কিছু খুঁজে পেতো না। অনুরাধা তরকারির কড়াই আগুন থেকে নামিয়ে দৌড়ে গিয়ে খুঁজে দিয়ে ফিরে আসার সময় বলতো "দুই আঙুলের বেশী কেন দেখ না তোমরা?" কোথায় গেলো সেইসব দিন?
রান্নাঘরের জানালার বাইরে রোদ্দুরছায়ার খেলা চলতো এরকমই। মনকেমন করা বসন্তদিনগুলো এসেছে আর চলে গেছে, কাজের ভীড়ে ওদের দিকে চোখ পড়লেও মনে আসন দেবার সময় ছিলো না। সকলে ইস্কুলে আপিসে চলে গেলে আস্তে আস্তে বাড়ীটা শান্ত হয়ে আসতো। তবু ঘরদোর ধুয়েমুছে কাপড় কাচাকুচি সব করে স্নানটান সেরে উঠতে উঠতে বেলা হয়ে যেতো অনেক। পুজো দেওয়া সেরে দুপুরের খাওয়া খেতে খেতে আরো দেরি। চুল শুকাতে ছাদে গিয়ে চোখে পড়তো চারিদিকে গাছে গাছে নতুন পাতা, সজনের ফুল ছাদ থেকে হাত বাড়িয়েই পাড়তো সে, অঝোরা সজনেফুলের বড়া খেতে ভালোবাসতো, বিকালে সে ফিরলে ভেজে দিতো বেসন দিয়ে।
তার সব কিছু ভাবনা ছিলো সংসারকে ঘিরে-প্রিয়জনেদের ভালোলাগা না লাগা নিয়ে। নিজের মনের মধ্যে যে ফুলগুলো ফুটতো, মনের বাগানের মাটিতেই ঝরে গেছে তারা, কাব্যমালায় গাঁথা হয় নি তাদের। অঝোরা বা অভি বা তাদের বাবা-কেউ কি জানতো অনুরাধা ডাইরি লিখতো একসময়? কবিতাও কিছু সে লিখেছিলো বিয়ের আগে, মামারবাড়ী থেকে আনা সুটকেসের মধ্যে কাপড়ের রাশির নীচে রয়ে গেছে আজও তাদের হলদে হয়ে যাওয়া পাতা। কেউ কি কোনোদিন খুঁজে পাবে তাদের?
বুকের কাছের সন্তানেরা কত দূরে আজ! একজন দূর সাগরপাড়ে নিজের মতো আছে, অন্যজন হাজার মাইল দূরে পাহাড়ী শহরে চলে গেছে চাকরি নিয়ে। যাক, যাক, জীবনের প্রয়োজনে মানুষকে তো চলে যেতেই হয়, তাদের কেন আটকাতে চাওয়া?
স্বামী এখন রিটায়ার করে অবসরজীবন যাপন করতে করতে পরিকল্পনা করছে একবার গ্রামে নিজেদের ভিটেমাটি যেখানে ছিলো দেখতে যাবে। অনুরাধা ও যাবে সাথে। কিন্তু তার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি নেই, অতি শৈশবে সে পিতৃহীনা হয়, তখনই গ্রাম ছেড়ে মা-দিদিমা-দাদামশায়ের সংগে চলে এসেছিলো, গ্রামের স্মৃতি তার কাছে গতজন্মের মতন আবছা।
কি যেন নাম ছিলো নদীটার? তেরাই না ভোগাই? গাঁয়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ক্ষীণাঙ্গী নদীটি বর্ষায় প্রমত্তা হয়ে উঠতো, তখন তাকে দেখে কে বলবে বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল পার হয়ে তারা পাঠশালে যেতো? সেখানে ফিরে গেলে কি কিছু মনে পড়বে অনুরাধার? সেইসব চলে যাওয়া বেলা সব, সেই সব শৈশবদিন? সেইসব ব্রতকথা---মাঘমন্ডল সোনার কুন্ডল?
(Cont.)
এইসব দিনগুলোতে অনুরাধার মনকেমন করে, উনুন ধরাতে ধরাতে, আনাজ কুটতে কুটতে, রাঁধতে রাঁধতে মনে পড়ে কতদিন সেই তাড়াহুড়া নেই, তখন অভি আর অঝোরা স্কুলে যেতো, ওদের বাবা যেতো অফিসে-সকালগুলোয তখন অনুরাধার নি:শ্বাস ফেলার সময় থাকতো না। এদিক থেকে অভি-"মা, কোথায় রাখলে জুতো?" ওদিকে থেকে অঝোরা, "মা, সেফটিপিনগুলো রাখো কোথায়, দরকারের সময় কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না!" অনুরাধা তো একজন, দশজন তো না, কতদিক সামলাবে সে? তবু সে না গেলে কিছুই খুঁজে পেতো না কেউ, না ছেলেমেয়ে না তাদের বাবা-কেউ ই কিছু খুঁজে পেতো না। অনুরাধা তরকারির কড়াই আগুন থেকে নামিয়ে দৌড়ে গিয়ে খুঁজে দিয়ে ফিরে আসার সময় বলতো "দুই আঙুলের বেশী কেন দেখ না তোমরা?" কোথায় গেলো সেইসব দিন?
রান্নাঘরের জানালার বাইরে রোদ্দুরছায়ার খেলা চলতো এরকমই। মনকেমন করা বসন্তদিনগুলো এসেছে আর চলে গেছে, কাজের ভীড়ে ওদের দিকে চোখ পড়লেও মনে আসন দেবার সময় ছিলো না। সকলে ইস্কুলে আপিসে চলে গেলে আস্তে আস্তে বাড়ীটা শান্ত হয়ে আসতো। তবু ঘরদোর ধুয়েমুছে কাপড় কাচাকুচি সব করে স্নানটান সেরে উঠতে উঠতে বেলা হয়ে যেতো অনেক। পুজো দেওয়া সেরে দুপুরের খাওয়া খেতে খেতে আরো দেরি। চুল শুকাতে ছাদে গিয়ে চোখে পড়তো চারিদিকে গাছে গাছে নতুন পাতা, সজনের ফুল ছাদ থেকে হাত বাড়িয়েই পাড়তো সে, অঝোরা সজনেফুলের বড়া খেতে ভালোবাসতো, বিকালে সে ফিরলে ভেজে দিতো বেসন দিয়ে।
তার সব কিছু ভাবনা ছিলো সংসারকে ঘিরে-প্রিয়জনেদের ভালোলাগা না লাগা নিয়ে। নিজের মনের মধ্যে যে ফুলগুলো ফুটতো, মনের বাগানের মাটিতেই ঝরে গেছে তারা, কাব্যমালায় গাঁথা হয় নি তাদের। অঝোরা বা অভি বা তাদের বাবা-কেউ কি জানতো অনুরাধা ডাইরি লিখতো একসময়? কবিতাও কিছু সে লিখেছিলো বিয়ের আগে, মামারবাড়ী থেকে আনা সুটকেসের মধ্যে কাপড়ের রাশির নীচে রয়ে গেছে আজও তাদের হলদে হয়ে যাওয়া পাতা। কেউ কি কোনোদিন খুঁজে পাবে তাদের?
বুকের কাছের সন্তানেরা কত দূরে আজ! একজন দূর সাগরপাড়ে নিজের মতো আছে, অন্যজন হাজার মাইল দূরে পাহাড়ী শহরে চলে গেছে চাকরি নিয়ে। যাক, যাক, জীবনের প্রয়োজনে মানুষকে তো চলে যেতেই হয়, তাদের কেন আটকাতে চাওয়া?
স্বামী এখন রিটায়ার করে অবসরজীবন যাপন করতে করতে পরিকল্পনা করছে একবার গ্রামে নিজেদের ভিটেমাটি যেখানে ছিলো দেখতে যাবে। অনুরাধা ও যাবে সাথে। কিন্তু তার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি নেই, অতি শৈশবে সে পিতৃহীনা হয়, তখনই গ্রাম ছেড়ে মা-দিদিমা-দাদামশায়ের সংগে চলে এসেছিলো, গ্রামের স্মৃতি তার কাছে গতজন্মের মতন আবছা।
কি যেন নাম ছিলো নদীটার? তেরাই না ভোগাই? গাঁয়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ক্ষীণাঙ্গী নদীটি বর্ষায় প্রমত্তা হয়ে উঠতো, তখন তাকে দেখে কে বলবে বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল পার হয়ে তারা পাঠশালে যেতো? সেখানে ফিরে গেলে কি কিছু মনে পড়বে অনুরাধার? সেইসব চলে যাওয়া বেলা সব, সেই সব শৈশবদিন? সেইসব ব্রতকথা---মাঘমন্ডল সোনার কুন্ডল?
(Cont.)
Sunday, March 8, 2009
জন্মজমিন
ওরে বাবা, ওরা !! ওরা!!!!
তিয়া আর তিশা গল্প শোনে বুড়ামানুষটার কাছে বসে, ঐ দূরে নীল-সবুজ গাছের রেখা টানা গাঁয়ের সীমা, তার বাইরে তারা দেখেছে বাজারের কাছে ইস্টিশান আর সেইখানে আসে লক্করঝক্কর ট্রেন। সেই ট্রেনে চেপে বাবাকাকারা রোজ যায় কাজে। তারা ইস্কুলে যায় রিকশা করে, সে ইস্কুল গাঁয়েই। কখনো কখনো তারা বাজারের কাছের বাসে চড়ার জায়গা থেকে বাসে উঠে বেড়াতে যায় মামাবাড়ি।
কিন্তু এইসবের বাইরে অনেক দূরে, অনেকবার ট্রেন বাস নৌকাবদল করে যাওয়া যায় এত দূরে নাকি ছিলো তাদের দেশ। বুড়ামানুষটা বলে সেই দেশ থেকে তারা সবাই চলে আসলো নৌকা বাস ট্রেনে করে। তিয়াতিশারা তখন জন্মায় নি। চলে আসলো তাদের মাবাপদাদাপরদাদারা।
চলে আসলো কেন? বড় বড় চোখ করে জানতে চায় তিয়া। বুড়ামানুষটা চোখেমুখে ভয় ফুটিয়ে বলে,"ওরে বাবা, ওরা!" ওরা কারা?
তিয়াতিশারা ঠিক মতন বুঝতে পারে না। শোনে ওরা নাকি খুব ভয়ানক, ওরা নাকি ধারালো অস্তর নিয়ে ছুটে আসতো অদ্ভুত সব শব্দ বলতে বলতে,ওরা নাকি কত মানুষ মেরে ফেলেছে, দাউদাউ আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘরবাড়ী। তিয়া ভাবে তাহলে কি ওরা মানুষ নয়, অন্যকিছু? তাদের ভয়েই কি মানুষেরা পালিয়ে আসছিলো? মনের চোখে সে দেখে দলে দলে মানুষ খালিপায়ে দৌড়ে দৌড়ে পালাচ্ছে,ছোটোদের নরম হাতগুলো বড়দের গিঁঠেপড়া হাতের মধ্যে আটকে আছে,যত জোরে সাধ্য ততজোরেই তারা দৌড়ায়। চারিদিকে ভয়ের ছবি। ওদের পিছনে যারা তাড়া করে আসছে সেই "ওরা"দের মনে মনে দেখার চেষ্টা করে ভয়ে ভয়ে থেমে যায় সে। ওরে বাবা, ওরা!! দরকার নেই দেখে।
তিয়ারা বড় হয় আস্তে আস্তে, গাছগাছালির গন্ডীটানা গাঁয়ের ইস্কুল আর তাদের ধরে রাখতে পারে না। আগে যে ট্রেনে তারা বাবাকাকাদের রোজ যেতে দেখতো, তাদের সেই ট্রেনেই চড়ে রোজ যেতে হয় তিন স্টেশান পার হয়ে।
(Cont.)
তিয়া আর তিশা গল্প শোনে বুড়ামানুষটার কাছে বসে, ঐ দূরে নীল-সবুজ গাছের রেখা টানা গাঁয়ের সীমা, তার বাইরে তারা দেখেছে বাজারের কাছে ইস্টিশান আর সেইখানে আসে লক্করঝক্কর ট্রেন। সেই ট্রেনে চেপে বাবাকাকারা রোজ যায় কাজে। তারা ইস্কুলে যায় রিকশা করে, সে ইস্কুল গাঁয়েই। কখনো কখনো তারা বাজারের কাছের বাসে চড়ার জায়গা থেকে বাসে উঠে বেড়াতে যায় মামাবাড়ি।
কিন্তু এইসবের বাইরে অনেক দূরে, অনেকবার ট্রেন বাস নৌকাবদল করে যাওয়া যায় এত দূরে নাকি ছিলো তাদের দেশ। বুড়ামানুষটা বলে সেই দেশ থেকে তারা সবাই চলে আসলো নৌকা বাস ট্রেনে করে। তিয়াতিশারা তখন জন্মায় নি। চলে আসলো তাদের মাবাপদাদাপরদাদারা।
চলে আসলো কেন? বড় বড় চোখ করে জানতে চায় তিয়া। বুড়ামানুষটা চোখেমুখে ভয় ফুটিয়ে বলে,"ওরে বাবা, ওরা!" ওরা কারা?
তিয়াতিশারা ঠিক মতন বুঝতে পারে না। শোনে ওরা নাকি খুব ভয়ানক, ওরা নাকি ধারালো অস্তর নিয়ে ছুটে আসতো অদ্ভুত সব শব্দ বলতে বলতে,ওরা নাকি কত মানুষ মেরে ফেলেছে, দাউদাউ আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘরবাড়ী। তিয়া ভাবে তাহলে কি ওরা মানুষ নয়, অন্যকিছু? তাদের ভয়েই কি মানুষেরা পালিয়ে আসছিলো? মনের চোখে সে দেখে দলে দলে মানুষ খালিপায়ে দৌড়ে দৌড়ে পালাচ্ছে,ছোটোদের নরম হাতগুলো বড়দের গিঁঠেপড়া হাতের মধ্যে আটকে আছে,যত জোরে সাধ্য ততজোরেই তারা দৌড়ায়। চারিদিকে ভয়ের ছবি। ওদের পিছনে যারা তাড়া করে আসছে সেই "ওরা"দের মনে মনে দেখার চেষ্টা করে ভয়ে ভয়ে থেমে যায় সে। ওরে বাবা, ওরা!! দরকার নেই দেখে।
তিয়ারা বড় হয় আস্তে আস্তে, গাছগাছালির গন্ডীটানা গাঁয়ের ইস্কুল আর তাদের ধরে রাখতে পারে না। আগে যে ট্রেনে তারা বাবাকাকাদের রোজ যেতে দেখতো, তাদের সেই ট্রেনেই চড়ে রোজ যেতে হয় তিন স্টেশান পার হয়ে।
(Cont.)
Thursday, October 2, 2008
The World of Particles
Ours is a very very large universe but what is it made of? It is made of very very small particles called elementary particles. What does hold them together to form large structures? The interaction between them.
There are four fundamental interactions between the particles. All of the interactions between them is due to the gauge bosons, the small exchange particles who participate in the interaction process. These exchange particles are virtual, they cannot be detected directly, only their existence could be deduced indirectly from the behaviour of the interacting elementary particles.
There are limited numbera of elementary particles.There are quarks of six flavors-up,down,strage,charm,bottom and top. There are six different types of light elementary particles called leptons, they are electron,electron-neutriono,muon,mu-neutrino,tau and tau-neutrino.These six quarks and six leptons along with their anti-particles are the building blocks of all the structures of our universe.
Four fundamental interactions are : Strong, Electromagnetic,Weak and Gravitational. Strong interaction is the strongest of all but its range is very very small, it can act within the size of a proton. Only quarks can feel this interaction and this is due to the exchange of gluons.
There are four fundamental interactions between the particles. All of the interactions between them is due to the gauge bosons, the small exchange particles who participate in the interaction process. These exchange particles are virtual, they cannot be detected directly, only their existence could be deduced indirectly from the behaviour of the interacting elementary particles.
There are limited numbera of elementary particles.There are quarks of six flavors-up,down,strage,charm,bottom and top. There are six different types of light elementary particles called leptons, they are electron,electron-neutriono,muon,mu-neutrino,tau and tau-neutrino.These six quarks and six leptons along with their anti-particles are the building blocks of all the structures of our universe.
Four fundamental interactions are : Strong, Electromagnetic,Weak and Gravitational. Strong interaction is the strongest of all but its range is very very small, it can act within the size of a proton. Only quarks can feel this interaction and this is due to the exchange of gluons.
Subscribe to:
Posts (Atom)
