Thursday, October 24, 2013

অশূন্য অমৃত

টুকরো টুকরো দ্বীপেরা ছড়িয়ে আছে। অসেতুসম্ভব সব দ্বীপেরা। মাঝে বয়ে গেছে বিচ্ছেদের আর বিষাদের নোনাপানি। অবিশ্বাস আর বেদনার নীল সমুদ্র। একদিন এইরকমই এক দ্বীপে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। মাঝে মাঝে গতজন্মস্মৃতির মতন মনে পড়ে বহুদিন আগে আমরা একটা মহাদেশে থাকতাম।

দিনগুলো কেমন ছিলো তখন? সোনালী, রূপালী, মেঘলা, রোদ্দুরে ঝলসানো, শুভ্র মেঘের ওড়না ওড়া সোনারঙের দিন--সবই ছিলো। নানারকম সব দিন। টুংটাং রুনরুন ঝমঝম করে তাদের নিজস্ব বাজনা বাজিয়ে চলে গেছে সেইসব দিনেরা। নিজের নিজের রঙে রাঙিয়ে দিয়ে গেছে স্মৃতিবেদনার অশূন্য অমৃতপাত্র।

তখন আমরা একটা মহাদেশে থাকতাম, ভাগ করে নিতাম সুখদুঃখের খুদকুঁড়ো। তখন আমরা একে অন্যের কথা মন দিয়ে শুনতাম, বুঝতাম ও। একইসঙ্গে বেরোতাম জল আনতে, ফল পাড়তে, মাটি চষতে। আমাদের আয়না ছিলো না, একে অন্যের চোখের আয়নায় নিজেদের দেখে নিতাম। কখনও বা স্বচ্ছ জলে নিজেদের মুখ দেখতাম বনফুলের মালা চূড়ায় পরে। তখন সবকিছু এত ঘোলা হয়ে যায় নি। তখন বাতাস অনেক নির্মল ছিলো, তখন জল অনেক জীবনময়ী ছিলো। তখন সব অন্নই পরমান্ন ছিলো।

দিনেরা চলে গেছে তাদের নিজের নিয়মে। গেছে কিন্তু সব এত ভেঙে দিয়ে গেল কেন? এত ভেঙে দিতেই কি চেয়েছিলো তারা? জগতের নিয়মই কী এই? মহাদেশ ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে যাবে টুকরো টুকরো দ্বীপ হয়ে? আর সেতু ও থাকবে না দ্বীপ থেকে দ্বীপে যাবার ? তবে প্লেট টেকটনিকের পন্ডিতেরা যে ভিন্ন কথা বলে? তারা যে বলে সব মিলেমিশে আবার এক হবে? সে কবে? কত কল্পকল্পান্ত পরে? কত অতল অন্ধকার পার হয়ে?

আমার অসেতু দ্বীপে বেলা পড়ে আসে, সূর্য নামে পাটে। সন্ধ্যার কমলা মেঘেরা রঙ হারাতে থাকে আস্তে আস্তে। শীতশিহরিত শীর্ণ নদীটি পার হয়ে ফিরে যাই আগুন-ওম্‌ ভরা গুহায়, ঘুমের মধ্যে সমর্পণ করি নিজেকে। স্বপ্নে ফিরে আসে পুরানো সব কথারা আবার। অবচেতনের জল সরিয়ে সরিয়ে ভেসে ওঠা মাছেরা-শত শত রুই, কাতলা, হাঙর, কুমীর, ডলফিন, তিমি, সিন্ধুঘোটকেরা।

বেশীদিন আগের কথা ও তো না! এরই মধ্যে গতজন্মস্মৃতির মতন সুদূর হয়ে গেলো সব? এত দ্রুত বিশ্বাস ভেঙে যায়? যেতে পারে? এত দ্রুত বন্ধুদের মুখ মুখোশের মতন খসে পড়ে? বেরিয়ে আসে আদিম হিংস্র জোটবদ্ধ আক্রমণকারীদের মুখ? ন্যায়-নীতি সব জলাঞ্জলি যায় এত সহজে? দলছুটকে সবাই মিলে পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে হত্যা করে দলবদ্ধেরা? একজনও থাকে না সেই যূথচ্যুতের পাশে দাঁড়াবার মতন? তার ন্যায্য কথা সব চাপা পড়ে যায় সম্মিলিত জান্তব চিৎকারে?

তবু নাকি বিশ্বাস হারাতে নেই, তবু নাকি আশা রাখতে হয়। সুপ্রাচীন পিতামহ মনে করিয়ে দিয়েছিলেন খুব কঠিন সময়ে। বারে বারে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তাই ঝড়ের রাতে কালির মতন কালো অন্ধকারে ছোটো ডিঙাখানি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম সব ছেড়ে, নইলে হয়তো বিশ্বাসটুকুও বাঁচাতে পারতাম না। ঝড়ের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে ক্লান্ত ডিঙাখান আমায় এখানে এনে আছড়ে ফেলেছিলো। পরদিন চেতনা ফিরে পেয়ে দেখেছিলাম পুবে ফরসা হয়ে আসছে, ছোট্টো দ্বীপে ভোর হচ্ছে।

তারপরে কেটে গেলো কতকাল,সে যে কতকাল! ভাঙা ডিঙা মেরামত করে এদিক ওদিক ভেসে ভেসে বেড়াই, টুকরো টুকরো দ্বীপগুলোর পাশ দিয়ে ভেসে যাই। আশায় থাকি হয়তো দেখবো কোনো "সবুজ ঘাসের দেশ" কোনো "দারুচিনি দ্বীপের ভিতর।" হয়তো দেখবো কোনো শান্ত বিশ্বাসের আদিগন্ত ভূমি, সোনার ফসল দুলছে যেখানে। বনফুলের মালা চূড়ায় পরে মেলায় যাচ্ছে তারা সবাই মিলে, বন্ধু বলে হাত বাড়াতে দ্বিধা নেই যাদের। আমার আশার তরী নিয়ে ঘুরে বেড়াই ঘাটে আঘাটায়, কিজানি কোথায় আছে সেই সাধের ভূমি!

মাঝে মাঝে কোথা থেকে জানি ভেসে আসে অদ্ভুত সুন্দর এক সুর, সে সুরে অসীম করুণা, বোধাতীত গরিমা। বুঝি বা নক্ষত্রের অক্ষরে তার স্বরলিপি লেখা! আমার ক্লান্ত আশা শক্তি ফিরে পায় সেই সুরে। সারাদিন ঘুরে ফিরে এসে যখন বসি তারাফোটা আকাশের নিচে, তখন কোনো অলীক নীলপাখির মতন কানে কানে কে বলে যায়, "আছে, আছে, আছে।"

আশার ডানায় ভর করে পাড়ি দিয়ে চলি অসেতুসম্ভব সময়ের সমুদ্র। আলোকের দূত বলে," পার আছে, পার আছে।" আমি পরম বিশ্বাসে তার হাতে হাত রেখে বলি, "জানি।"

*****

ইচ্ছে-বাতাস

কারা যেন কানের কাছে ফিসফিস করে ওঠে, শুনতে পাই অনেক গলার স্বর-- কোনোটা হাল্কা কচি স্বর, কোনোটা গম্ভীর জোরালো, কোনোটা মেয়েলী কোমল স্বর-প্রায় গানের মতন সুরেলা, কোনোটা দানা-দানা পুরুষালী স্বর, কোনোটা তীক্ষ্ণ চড়া স্বর, কোনোটা তরুপত্রে বাতাসের মর্মরের মতন নরম স্বর। ওরা বলে, "বলবে না আমাদের কথা?"

কাগজের উপরে কলম সরে সরে যেতে থাকে, অক্ষরের পর অক্ষর, শব্দের পর শব্দেরা উঠে আসতে থাকে, সেসব ঐ স্বরগুলোর গল্প। একসময় দেখি তাদের গল্পের একেকটা অংশ কখন পুরো বা অর্ধেক ফুটে উঠেছে কাগজের উপরে। তখন ঐ কুঁড়ির মতন ক্ষুদে ক্ষুদে শব্দগুলো কথা বলতে থাকে, অন্ধকার থেকে আলোর ফুলের মতন ফুটে উঠতে চায় তারা, তাই...

ইচ্ছে-বাতাস উড়ছে আমার বেভুল বাগান পথের বাঁকে

জাঁকজমকের উড়নতুবড়ি জ্বলতে জ্বলতে পুড়তে থাকে।

এই দ্যাখো এই তুলির টানে লেবুরঙের সকাল আঁকি-

এই দ্যাখো এই শিশির ফোঁটায় রাত্রিবিষাদ লুকিয়ে রাখি।

এই দ্যাখো সব মুছে দিলাম ঝড়বিকালের এক ঝাপটে

ঐ দ্যাখো সেই কাচপোকা টিপ বন্ধ ঘরের ঐ কপাটে।

কথার শেষে চুপকথামন একলা হয়ে উদাসচোখে

সাঁঝদিঘিটির আয়্নাজলে মুখ দেখতে অবাক ঝোঁকে।

আলতো হাতে দরজা ঠেলি সেই আমাদের সবুজ বাড়ি

মধ্যরাতের মেলগাড়িতে তারায় তারায় অবাক পাড়ি।

*******

সেইসব বসন্তদিন

সে অনেকদিন আগের কথা। দূর দক্ষিণের এক ছোট্টো সবুজ শহরে তখন থাকতাম। আপনদেশের মাঠের থেকে শিকড়সমেত উপড়ে নেওয়া একলা একটা গাছের মতন গিয়ে সেখানে যখন প্রথম নামলাম, তখন ঘোর শীত। গাছপালা বেশীরভাগই পাতাহীন বিবর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু চিরসবুজ পাইনেরা সবুজ করে রেখেছে শহরের আকাশরেখা। তারপরে প্রকৃতির অনিবার্য নিয়মে সূর্য সরে গেল উত্তরে, হয়তো কোনো দূর কাননের কুন্দকলি করুণ চোখে শেষ চাওয়া চেয়ে নিয়ে ঝরে গেল ধূলায়। শীত বিদায় নিল পুরোপুরি। কিশলয়বর্ণ জয়পতাকায় দিকদিগন্ত আচ্ছন্ন করে এসে পড়লো ঋতুরাজ বসন্ত।

বসন্ত এসে গেল, কিন্তু আমাদের রুটিনবাঁধা কাজকর্ম-নেটওয়ার্ক-ডেডলাইন-দূরভাষ-বাড়ী-আপিস দিয়ে আঁট করে বাঁধা জীবনে কিন্তু বিশেষ পরিবর্তন হল না। হরেক রকম ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি আর কম্পুটারে ঠাসা সব ঘর। গভীর রাতে সব বড়ো বড়ো আলো যখন নিভে যায়, তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সবুজ আলো জ্বলে নেভে জ্বলে নেভে জ্বলে নেভে। অন্ধকার ঘরে ভারী অদ্ভুত লাগে, আমার এক বন্ধু এদের ইলেকট্রনিক ফায়ারফ্লাই বলে। বৈদ্যুতিন জোনাকি। জ্বলে জ্বলে উঠে সবুজ আলো ছড়ায়।

চুপ করে শুয়ে থাকি রাত্রির ঘুমের জন্য, ঘুমের জলে ডুবে যাবার আগে বহুদূরে ফেলে আসা ঘরবাড়ী মাঠ বাগান ঝোপঝাড় সব মনে পড়ে, সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি জ্বলতো সন্ধ্যার পরের থেকে শুরু করে গভীর রাত্রি পর্যন্ত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উড়ন্ত আলো। মনে হতো আহা ওরা কেন সবাই একরঙের আলো দেয়? কেন কেউ নীল আলো, কেউ সবুজ আলো, কেউ বেগুনী আলো, কেউ লাল আলো দেয় না? ঘরের ওই সবুজ আলো দেওয়া বৈদ্যুতিজোনাকিরা জ্বলতো নিভতো জ্বলতো নিভতো, আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিতো।

মাঠবনবাগান তখন সবুজে সবুজ, ফুলে ফুলে ছয়লাপ চারিদিক। ঘাসফুলেদের বেগুনীহলদে পেরিয়ে গোলাপী আজেলিয়ার ঝাড়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়তো সোনালীরোদ। আজেলিয়ার ফুল গোলাপী, কমলা, লাল, সাদা-নানা রঙের হয়। আমার দোপাটির কথা মনে পড়তো, "তোমার নীলদোপাটি চোখ, তোমার শ্বেতদোপাটি হাসি..."। দক্ষিণের জোরালো হাওয়ায় আজেলিয়া ঝোপেরা এলোমেলো হয়ে হাসতো, ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে উড়তে থাকতো, রেণু ঝরতো পথের ধূলায়। পথের দু'পাশে ওক গাছেরা অজস্র নতুন সবুজ পাতায় ভরে গেছে তখন, শুধু তাই না, গাছ ভরে মঞ্জরী ধরেছে, রাস্তা ভরে গেছে সেই ঝরা মঞ্জরীতে।

স্প্রিং ব্রেকের ছুটি শুরু হলো তারপর, সপ্তাহখানেকের কিছু বেশী (আগের সপ্তাহের শনিরবি ধরে নিয়ে নয়দিন)। ব্রেকের আগের সেই শুক্রবারে যখন সব শুনশান হয়ে এলো, ধৈর্যশীল বাহনেরা যখন মালিকদের নিয়ে সব পাড়ি দিলো উত্তরে দক্ষিণে পুবে পশ্চিমে, খুব ইচ্ছে হলো বন্ধুকে নিয়ে হারিয়ে যাই নতুন বসন্তের সবুজ জঙ্গলে, তাঁবু খাটিয়ে রাত্রিযাপন করি, মধ্যরাত্রে ঘুম ভেঙে উঠে বেরিয়ে আসি বনজ্যোৎস্নায়, দেখি কথা কয়ে ওঠে কিনা রহস্যময় বনস্থলীর কোনো আত্মা, যেমন কইতো বহু বহু বছর আগে, যখন এদেশে শ্বেতকায়রা প্রবেশ করেনি, গোটা ভূখন্ড ছিলো লালমানুষদের, যারা পৃথিবীকে তাদের মা বলে জানতো, তারা শুনতে পেতো পাতার কুঁড়ি খোলার শব্দ, তারা শুনতে পেতো জলের ঘূর্ণীর শব্দ, তারা দেখতে পেতো অনেক অনেক দূর, বৃষ্টির পরে কেমন পরিষ্কার হয়ে যায় আকাশবাতাস-অনুভব করতো তারা। আমি কতকাল পরে এসেছি এখানে, ওরা তো আর নেই এখানে, হয়তো আছে কোনো রিজার্ভে, হয়তো ভুলে গেছে সবকিছু।

লালমানুষদের এখন সবাই বলে" ইন্ডিয়ান", আমিও আরেক ইন্ডিয়ান, বহুদূরের ইন্ডিয়া বলে দেশটির মানুষ, আমাদের বলে এশিয়ান, নেটীভ আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের থেকে আলাদা করার জন্য। কী অদ্ভুত, না? কলম্বাসের ভুলই "সত্য" হয়ে গেলো, সে কিনা ভেবেছিলো ইউরোপের থেকে ক্রমাগত পশ্চিমের দিকে জাহাজ চালিয়ে এসে ইন্ডিয়াতে পৌঁছেছে, কারণ পৃথিবী যে গোলকাকার! তীরে নেমে সে অধিবাসীদের ইন্ডিয়ান বলে স্থির করলো। বোঝো কান্ড! পৃথিবী যে কত বড়ো গোলক, হয়তো ঠিকঠাক জানতো না ওরা, জানলে হয়তো টাকাকড়ি যোগাড় করে পাড়ি দিতে পারতো না। পশ্চিমের পথে পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছাতে ওদের আরো বহুদিন চলতে হতো, ততদিনে সব ফুরিয়ে যেতো, খাবারদাবার, জল, সব। ঝড়টড় হলে তো আরো সোনায় সোহাগা। মাঝে বিরাট ঐ মহাদেশ না থাকলে কী হতো কেজানে!

উনি তো ইতিহাসে ঢুকে গেলেন, কিন্তু ওঁর ভুলটিও ইতিহাসে ঢুকে গেলো, আদি-অধিবাসীরা হয়ে গেলো ইন্ডিয়ান। কী গেরো! দ্বীপগুলো হয়ে গেলো ইন্ডিজ, পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বলে কোনোভাবে একটা রফা করেছে, কিন্তু এই লালমানুষদের বেলায় তাও করেনি। "রেড ইন্ডিয়ান" কথাটা শুনলে এরা ভুরু কপালে তুলে তাকায়! আবার জিজ্ঞেস করে,"হোয়াই আর ইউ সেইং রেড?"

যাকগে, হচ্ছিলো সেই বসন্তের ছুটিতে বেড়ানোর প্ল্যানের কথা। আমরা প্ল্যান করতে থাকি ক্যাম্পিং এর, নানারকম প্রস্তাব উঠতে থাকে,পড়তে থাকে, কখনো একমত হয়ে জোরালো হয়, কখনো দ্বিমত হয়ে ভেঙে পড়ে। প্ল্যান করে ক্লান্ত তৃপ্ত মনে চলে যাই যে যার বাড়ী।

*******

"বিজন ঘরে, নিশীথ রাতে আসবে যদি

আমি তাইতে কি ভয় মানি?

জানি বন্ধু জানি---

তোমার আছে তো হাতখানি...."

এয়ারকন্ডিশনারের হাল্কা চাপা শব্দের গুম গুম শোঁ শোঁ, অসংখ্য সবুজ জ্বলানেভা আলোর মধ্যে অনুভব করি তাকে, যে ছিলো অনেক অনেক অনেক দিন আগে, যে আছে এখনো, যে থাকবে আরো অনেক অনেক দিন পরেও। সে জানে আমাদের লক্ষ লক্ষ বছরের অতীত, জানে আমাদের কৃপণ বর্তমান, প্রতি মুহূর্তে পালিয়ে যাওয়া ক্ষণগুলির জন্য আমাদের দুঃখ ও অশ্রুকণিকা, জানে আমাদের প্রসারিত অনন্তস্পর্শী ভবিষ্যৎ। সভ্যতার এই পরতের পর পরত খোলসগুলো আমাদের ঢেকে রেখেছে পোশাকের মতন, ঘরের মতন, যানবাহনের মতন, ডেডলাইনের মতন,আরো আরো অনেক ছোটো-বড়ো কনস্ট্রেইন্ট আমাদের চোখের সামনের জিনিস চোখের থেকে মুছে দিয়েছে। আমাদের ব্যথিত আত্মা যখন কেঁদে ওঠে সেইসব হারানো জিনিসগুলোর জন্য, হারানো সম্পর্কগুলোর জন্য, তখন কোনো আশ্চর্য কৌশলে সে ছুঁয়ে ফেলে আমাদের ভিতরমন, আমাদের আত্মা, এমন করে ছোঁয় যেন ছিলোই সে আমাদের একদম ভেতরে, কোনো খোলোস না পেরিয়েই কেমন করে যেন পৌঁছে গেছে সেখানে।ঐ সেই ফ্ল্যাটল্যান্ডের উপর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ত্রিমাত্রিক আপেল যেমন সোজাসুজি পৌঁছে গেছিলো বৃত্তের কেন্দ্রে, পরিধি না পার হয়েই! ঠিক তেমনি করে।

নানা কারণে ক্যাম্পিং হলো না, এমনিই আমরা ঘুরতে গেলাম বাইসিক্ল ট্রেইল ধরে, বসন্তের সবুজ গাছগাছালি, সুরমুখর পাখপাখালি আমাদের অভ্যর্থনা করলো নীরবে সরবে। হরবোলা পাখির ডাক শুনতে শুনতে আমার হারানো দুপুরগুলো মনে পড়ছিল, মনে পড়ছিল শালিক চড়ুই কাক কোকিল সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে আমার দেশেও, উষ্ণদিনের মোহন আলোর ঝর্ণাধারা যখন চরাচর ধুইয়ে দেয় তখন তা তো ওদের ভিতর বাহিরও ধুইয়ে দিয়েছে। আমরা মানুষেরাই শুধু এত এত জালের পর জালে আটকানো।

অর্ধেক দিন ধরে ঘুরে ঘুরে বেশ ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত হয়ে শেষে গড়িয়ে-যাওয়া দুপুরে আমরা বিশ্রাম নিতে আর আহার গ্রহণ করতে বসি স্টেট পার্কের কৃত্রিম সরোবরের ধারে, পল্লবিত ওয়াটার ওকের ছায়ায়। আকাশ সেদিন এক্কেবারে নীল, দূরে চিল পাক খায়, হ্রদের জলে সরু পাতলা মোটরচালিত নৌকায় লোকেরা জলবিহার করছে, নৌকার অতি দ্রুতগতি আর পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে উল্টোমুখে বেরিয়ে যাওয়া হাওয়ার স্পর্শ নিশ্চয় ওদের খুব আনন্দ দিচ্ছে, ওরা চিৎকার করছে খুশীতে।

সকাল বেলাতেই দোকান থেকে খাবার দাবার কেনা হয়েছিলো, সেই সেদ্ধ টার্কীর ফালি আর চীজের ফালি মাঝখানে দেওয়া দুই স্লাইস পাউরুটিই অমৃত মনে হয়। ক্ষুধাই হলো সুধা, যদিও দেশের লুচি-আলুরদমের কথা মনে পড়ে যায়। সে যেন গতজন্মের স্বাদ, এত মধুর সেই স্মৃতি।

কচি সবুজ ঘাসের উপরে কাত শুয়ে পড়ি, ঘাসের সুড়সুড়ি লাগে কানে, বেশ লাগে।

"তোমার দেশ এত সুন্দর!" মুগ্ধ হয়ে বন্ধুকে বলি।

সে ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি বলে,"না না, এর চেয়ে অনেক অনেক সুন্দর জায়গা আছে, আছে রেড উডের বন, ওখানে পাঁচ হাজার বছরের পুরানো গাছ আছে, গত গ্রীষ্মে গেছিলাম, সে এক অদ্ভুত জিনিস। তুমি ঐ গাছ ছুঁলে মনে হবে টাইম মেশিনে চড়ে চলে গেছো সেই তত হাজার বছর আগে...মিশরে তখন পিরামিডগুলো তৈরী হচ্ছে।"

আমি হেসে ফেলি, পাছে এই দুটো গাছপালা ঘাসফুল পাখপাখালি দেখে একেই দেশের সেরা সৌন্দর্য ভেবে বসি, এই ভয়ে কেমন ব্যস্ত হয়ে আশ্চর্য সুন্দর জায়গার কথা বলছে! আরে, বিখ্যাত জায়গা তো আছেই, আশ্চর্য সব জিনিস তো আছেই পৃথিবীতে, কিন্তু তার জন্য এই হাতের ছোঁয়ার মধ্যের, এই বুকের কাছের, এই চোখের সম্মুখের অপরূপ আশ্চর্য সৌন্দর্য কি বৃথা হয়ে গেলো? অপরূপ এই জগৎ, জগতের প্রতিটি কোণাতেই অফুরন্ত আনন্দের উৎস লুকিয়ে আছে। নিজেদের বাঁধা জালগুলো ছিন্ন করতে পারলেই রূপকথার সোনার পালক আপনিই উড়ে এসে পড়ে হাতে, মাথায়, চোখেমুখে।

আমরা গল্প করতে থাকি, কোথা থেকে কোথায় চলে যায় গল্পের বিষয়বস্তু, ছোটোবেলার কথা, সেকেন্ডারি ইস্কুলের কথা, নানাসময়ের বেড়ানোর গল্প, এখনকার কাজের কথা ---সব মিলেমিশে জগাখিচুড়ী হয়ে যায় গল্পের মধ্যে।

বেলা পড়ে আসে, ঢলে পড়া সূর্যের কিরণে কোমলতা, পশ্চিমের মেঘগুলি আরেকটু পরেই অরুণরঙে রাঙা হয়ে সন্ধ্যাকে মায়াবতী করে তুলবে। আমরা ঘরে ফিরতে থাকি, ক্লান্ত দেহে, তৃপ্ত হৃদয়ে। একটি মুক্তির দিনের স্মৃতি অবিনশ্বর হয়ে থাকে মনের মণিকোঠায়।

Friday, April 19, 2013

অলৌকিক বৃষ্টিকণা

নীল একটা বৃষ্টিকণা, আকাশ থেকে তাকে দিঘিতে পড়তে দেখেই আমিও ঝাঁপ দিই। আস্তে আস্তে ডুব দিতে থাকি দিঘির ভিতরে, টুপটুপে নীল বৃষ্টিকণাটার সঙ্গে ডুবতে থাকি, ওটা মিলিয়ে যায় নি, অদ্ভুত একটা নীল রত্নের মতন আমার সামনে সামনে ঝিলিক দিতে দিতে ডুবছে, কোথা থেকে আলো পড়ছে ওর উপরে যে এত ঝিকমিক? চারপাশে সোনালী লাল কালো মাছেরা পাখা ঝটপটিয়ে সাঁতরায়, আমি ডুবতে থাকি, ডুবতে থাকি। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের জরুরী ব্যাপারটা একেবারেই যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। তারপরে একেক স্তরে দেখা দিতে থাকে ওরা, আকাশবাড়ির বারান্দায় ওদের আমি দেখেছিলাম। তখন ওরা হৈ হৈ করে বেঁচে ছিলো সেখানে। ওদের চিনতাম। সত্যি করে চিনতাম কি?

প্রথমে ঊষা। ও কবিতা লিখতো। অদ্ভুত কোমল আর উদাসী কবিতা। একজন বলেছিলো ওর কবিতা পড়লে অনেক পরিশ্রমের পর ঘরে ফিরে স্নান সেরে নরম বিছানায় শুয়ে থাকার অনুভূতি হয়। আমার অবশ্য ওর কবিতা পড়ে আশ্চর্য একটা ভোরবেলার কথা মনে হতো, শরৎকালের শিশির ঝলমল সোনা-রোদ্দুরমাখা নীল আকাশওয়ালা একটা ভোর, আশ্চর্য একটা হাওয়ায় সেখানে দুলছে একটা লতা, একটা মস্ত বাড়ীর থাম জড়িয়ে দোতলা তিনতলা পেরিয়ে একদম উপরের ব্যালকনিতে চলে এসেছে সেই লতা, শরৎসকালের অদ্ভুত নীল আকাশের মতন উজ্জ্বল নীল ফুলের গোছা দুলছে সেই লতায়।

আকাশবাড়ী তখন ছিলো শুধু লেখার জায়্গা, ছবি বা গান বা ভিডিও কিছুই তখন সেখানে আসতো না, সব কিছু কল্পনা করে নিতে হতো লেখা থেকে। ঊষার চেহারাও কল্পনা করে নিয়েছিলাম। মস্ত ঘের ওয়ালা রেশমের সাদা ঘাঘড়া আর গলায় ঝালর কুঁচি দেওয়া সাদা রেশমের থ্রী কোয়ার্টার হাতা জ্যাকেট পরে দাঁড়িয়ে আছে তিনতলার ব্যালকনিতে, সদ্য ওঠা সূর্যের আলো পড়েছে ওর সদ্যস্নাত মুখে আর পিঠের উপর মেলে রাখা ভেজা চুলে, ওর চোখের পক্ষ্মগুলোতে বিন্দু বিন্দু জল লেগে আছে তখনো। কেজানে কেন ওকে এইরকম কল্পনা করতাম! বাস্তবে সে কেমন ছিলো কেজানে! তাতে কী ই বা আসে যায়?

ওর উদাসী কোমল কবিতাগুলো থেকে এইরকমই একটা মূর্তির আভাস আসতো, ঐ তো ব্যালকনি থেকে সূর্যপ্রণাম সেরে সে এবার ফিরে যাচ্ছে লেখার টেবিলে, দেওয়ালজোড়া মস্ত ফ্রেঞ্চ-উইন্ডোর সামনে মস্ত মেহগিনি কাঠের টেবিল, তার উপরে একটা ঘন খয়েরী রঙের টেবিল ক্লথ, চারকোণে সাদা রেশম কাপড় বসিয়ে করা অ্যাপ্লিকের কাজ, ফুল পাতা নকশা। টেবিলের উপরে থাক দিয়ে সাজিয়ে রাখা বইপত্র আর ওর লেখার খাতা। থার্মোকলের কলমদান, নিপুণ গেলাস আকৃতিতে কাটা। তার মধ্য থেকে নীল কলম তুলে নিয়ে বাঁপাশের থাক থেকে কবিতা লেখার খাতা তুলে নিয়ে লিখতে শুরু করলো সে। এইরকম মনে হতো ওর লেখা দেখে। হয়তো এসব কিছুই না, আজকাল কে আর কাগজের উপরে কলম দিয়ে কবিতা লেখে? সেও হয়তো লিখতো না, সেও হয়তো তার টেবিলের উপরে রাখতো ছোটো ল্যাপটপ, কীবোর্ডে-আঙুলেই লিখতো, তুলে রাখতো ফাইলে বা ব্লগে, কেজানে! কিন্তু ওর কবিতাগুলো পড়লেই পুরানোদিনের সেই ঝরা শেফালি ভরা মাটি, কাশফুল দোলা মাঠ আর কীবোর্ডহীন সেই কাগজ কলমের দিন মনে পড়তো।

ডুবতে থাকি, পরের স্তরে ভেসে ওঠে আকাশবাড়ীর আরেকজনের মুখ। সুনন্দা। সে গল্প লিখতো, অদ্ভুত সব ফ্যান্টাসি। তার গল্পে চাঁদের আলোর ভিতর দিয়ে উড়ে নেমে আসতো দুধসাদা পক্ষীরাজ, আসলে সে মেয়ে-পক্ষীরাজ, পক্ষীরাণী ও বলা যায়। দুইপাশে তার দুই ডানা মেলা। মন্দুরার কিশোর পক্ষীরাজটির কাছে এসে সে বলতো, "অ্যাই ভোঁদু, দড়ি কাটতে পারিস না? চিবিয়ে কেটে ফ্যাল, তারপরে-- তুই তো উড়তে পারবি না, দৌড়ে পালাই চল ঝাঁঝার জঙ্গলে।"

আরো ডুবি, ডুবতে থাকি। দেখা দেয় ইমনের মুখ। সেও লিখতো, কল্পজগতের কথা। তার কথা ভাবতে গেলে কেবল তার গল্পের সেই অভিমানী কিশোরের কথাই মনে হয় যে জ্যোৎস্না থেকে পালাতে পালাতে চলে গেছিলো দীঘাইপাহাড়ে। চূড়ার কাছে এক গুহা, সেখানেই সে থাকতো। শুক্লপক্ষে বেরোতো না চাঁদ না ডোবা পর্যন্ত, কৃষ্ণপক্ষে কোনো কোনোদিন একটুখানি বেরোতো সাঁঝের বেলা, আকাশের কোণে চাঁদের গলুইটুকু দেখা দিলেই আবার গুহার ভিতরে সেঁধিয়ে যেত।

কিন্তু অমাবস্যায় সে সারারাত থাকতো খোলা আকাশের নিচে। আকাশ জুড়ে তারা ফুটফুট করতো, নতুন ফোটা খইয়ের মতন সব তারারা, আকাশটা যেন উপুড় করা কড়াই, সে কড়াই থেকে ছড়িয়ে পড়ছে কেবলি ছড়িয়ে পড়ছে তারার খই। সে হাত বাড়াতো খই নেবার জন্য।

অলৌকিক বৃষ্টিকণার মায়ায় দেখি অনন্ত সাদা খই ছড়ানো নীল মাঠের উপর দিয়ে হাঁটছে থাকে ইমন, দূরে কোথায় দূরে দিগন্ত, সেখানে উপুড় হয়ে পড়েছে সবুজ আকাশ। সেইদিকে চলেছে সে। পায়ে সুড়সুড়ি দেয় নীল আংটিদূর্বা, নীল চোরকাঁটা বিধে যায় পরণের কাপড়ে। মাঠের একপাশ দিয়ে বইছে লাল নদী, তার কিনারে বেগুণী বালিতে উঠে রোদ পোহাচ্ছে দুটো গোলাপী কাছিম। সবুজ আকাশে অলস ভাসছে ম্যাজেন্টা রঙের মেঘেরা। সবুজ আকাশ জুড়ে দুলতে থাকে কার যেন চকচকে নীল বিণুনী। এক থেকে দুই, দুই থেকে চার, চার থেকে আট, আট থেকে ষোলো ---জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে বিণুনীর সংখ্যা, বদলে যেতে থাকে রঙ, সোনালী লাল কমলা কালো বিণুনীরা পাক খুলে খুলে মিশে যেতে থাকে ম্যাজেন্টা মেঘে।

কাঁচকড়ার পুতুল বুকে চেপে সবুজ ফুটি ফুটি ফ্রক পরা বুন্টুলি এসে তাকে বলে, আমার ভালোনাম বিদ্যা, আগে ছিলো, কিন্তু আমি তো আর নেই। ঐ নীলকমলিনীর ঝাড়ের কাছে মাটির নিচে আমার ছাই আছে। আমি এখন যেখানে থাকি, সেখানে আকাশে একজোড়া কমলা চাঁদ, কমলা রঙের জ্যোৎস্না হয় সেখানে। তুমি দেখতে চাও?


ঐ যে যখন শব্দজব্দ মাথার ভিতর সাঁতার কাটে
ঘুমের ভিতর আস্তে আস্তে লালমাছেরা মারছে ঘাই
খাদের অত কাছে ঝুঁকে কিশোর যখন খুঁজছে গান-
তখনই কি সন্ধ্যে নামার মাঠের শেষের সে গড়খাই?
এবার আমার বোতামছেঁড়া শার্টে তোমার সূচের ফোড়
ফোড়ন কাটা শেষ না হতেই ফোড়ন পড়ে ঝাল কড়াই
পিটুলিগোলার আল্পনারা লুকিয়েছে কোন বইপাতায়
শেকড়বাকড় ধুয়ে নিয়ে জল বলেছে সাগরযাই।

Wednesday, November 16, 2011

গিরিব্রজ

জন্মনীড় ছেড়ে, চেনা মাঠ বন নদী পাহাড় ঝর্ণা সব কিছু ছেড়ে উড়াল দিয়েছিলাম, অচিন দেশের দিকে, জ্যোৎস্নাপালকের পাখিরা সেদিকে থাকে। জন্মজলের বিন্দুগুলো ঝরে পড়ে যাচ্ছিলো ডানা থেকে।

অনেকটা পথ ওড়া, নীচে কখনো ডাঙা কখনো জল। তারপরে পৌঁছাই, অচিনগাছে বাসা বাঁধি, ফল ঠোকরাই, খাই আর ভাবি কোথায় সেই জ্যোৎস্নাপালকের পাখিরা? চেনা-চেনা পাখিদের দেখি মাঝে মাঝে, ছোটো ছোটো দলবাঁধা ছাতারে, ওরা সবসময় দলবেঁধে থাকে আর খুনসুটি কি ঝগড়াঝাঁটি করে, ঠোকরায়। ওদের পালকে কেমন যেন দুঃখী ধূসর রঙ! আমি উড়ে পালাই অন্যদিকে।

তবু কেজানে কেন আর কিসের দায়ে বারে বারে ফিরে আসি উত্তরের পাহাড়ে! সব সুখদুখমন্থন করে সেই যে সুপ্রাচীন পাখি গেয়েছিলো নিদ্রাহারা গান, সেই গানের মায়াটানে। আমি সবকিছু এড়াই, তবু একে এড়াতে পারিনা কেন? দুঃখবালি মাখবো না বলে কত পথের আলাপ পথেই রেখে চলে গেছি, ভেতরের ওই অন্ধকার আমার চেনা বলে সেখানে যাই নি কখনো, সুকৌশলে এড়িয়ে গেছি আমন্ত্রণী হাসি। কিন্তু এই পাহাড় কেন ভুলতে পারিনা? কেন এখানে ফিরে আসি বারবার?

নিদ্রালু চোখে চুপ করে বসে থাকি নীলকদম্বের ডালে , বাতাসে ভেসে আসে সেই গান, প্রাচীন পাখি যে গান গেয়ে গিয়েছিলো কতযুগ আগে, কুলহারা সমুদ্রের মত সে গান, দিগন্তে নত হয়ে পড়া আকাশের হৃদয় থেকে ভেসে আসে সেই গান। আমি নড়তে চড়তে পারিনা, চুপ করে ঝিম হয়ে বসে থাকি যেন মহুয়াফুলের মধু পান করেছি আকন্ঠ।

বন্ধুরা বলে এই করেই নাকি আমি মরবো। ওই পাহাড় এক মস্ত ফাঁদ। ওই গানের মায়ায় ভুলিয়ে শিকারী বিঁধবে আমায় তীরে! আমি শুনি, বুঝি, কিন্তু কিছুই করতে পারিনা, যেই না সেই গানের রেশ শুনি বাতাসে, অমনি প্রাণপণে ডানা নাড়তে নাড়তে এসে পৌঁছাই পাহাড়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বসি নীলকদমের ডালে, তারপরে বুঁদ হয়ে যাই সেই গানে। কোথা দিয়ে যে প্রহরের পর প্রহর কেটে যায়, কোনো হুঁশ থাকে না আমার।

বন্ধুরা বলে, "ওসব মনের ভুল। আসলে কোনো গান নেই। ও মায়া, ও শুধুই মায়া। বাঁচতে চাস তো যাসনে আর ওখানে।"

আমি ওদের কথা শুনিনা, আমি তবু যাই, আমি যে শুনতে পাই গান! অকুল সমুদ্রের মত সে গান, দিগন্তে নত হয়ে পড়া আকাশের হৃদয় থেকে ভেসে আসে সেই গান- কী করে বলি ও সত্য নয়, মায়া?

একদিন পাহাড় থেকে ফিরছি ঘরে, বেশ রাত, দখিনা হাওয়া ঝুরুঝুরু করছে জারুলের ডালে ডালে, রক্তকাঞ্চনের পাতায় পাতায়। আকাশে ফালি চাঁদ বেশ পুরুষ্টু হয়ে উঠেছে, নারিকেলের পাতায় পাতায় পিছলে পড়ছে রুপোগলা আলো। হঠাৎ দেখা হলো এক চেনা পাখির সঙ্গে, আমি অবাক হলাম- সে একা! ওরা তো কখনো একা থাকে না!

সে কুশল সংবাদ জানতে চায়, আমিও জানতে চাই তার কুশলসংবাদ। আমরা কথা বলি পাশাপাশি উড়ে চলতে চলতে, অনেকক্ষণ কথা কই, অনেকটা পথ উড়ি পাশে পাশে, একসময় সে বিদায় চায়, অন্যপথে উড়ে যায় একা একা--আমি আবার ভাবি এ কেন একা ছিলো আজ? ওরা তো কখনো একা থাকে না!

তারপরে ভাবনাচিন্তা মুছে ফেলে টলটলে জলের দিঘির উপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে দেখি জলের ভিতরে চাঁদ! আমার মতন আরেক পাখিও উড়ে যাচ্ছে জলের ভিতর দিয়ে। জলের ভিতরে কি আরেক দেশ আছে? চেনাজানা সবকিছুই কি সেখানে আছে উল্টা হয়ে?

কনকনে একটা হাওয়া কোথা থেকে এসে আমায় ছুঁয়ে যায়! এখন তো এই হাওয়ার সময় নয়! এ তো সেই নিঠুর হাওয়া যা ধারালো ক্ষুরের মতন বনের সব পাতা ঝরিয়ে দেয়! এখন এ হাওয়া এলো কোথা থেকে? সেই অদ্ভুত অকাল শীতবাতাসের ঝাপটা চোখেমুখে নিয়ে ফিরে আসি বাসায়, কোমল আস্তরণের মাঝে সঁপে দিই নিজেকে, উষ্ণ পালকের মধ্যে মুখ গুঁজে চোখ বুজি। আধোঘুমে আধোজাগরণে ভাবি কোথায় থাকে সেই জ্যোৎস্নাপালকের পাখিরা?

কিন্তু ঘুম আসে না চট করে। চোখ মেলি। হাওয়া শন্‌শন্‌ করে বয়ে যায় বনের ভিতর দিয়ে, চাঁদের রূপালী আলো চিকমিক করে ঝোরার জলে, ঝুঁকে থাকা ফার্ণের পাতায় জলের বিন্দু লেগেছে, তাতেও ঝিকমিক করে জোছনা। আমার মনে পড়ে বহুদূর উষ্ণ দেশের বনকুঞ্জের কথা, তাতেও এমন জ্যোৎস্না পিছলে পড়তো শুক্লপক্ষ রাতে। ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে যাই।

দেখি এক আশ্চর্য গাছ, পাহাড়ের উপরে। মস্ত বড়ো সেই গাছের মাথা যেন হারিয়ে গেছে আকাশে। মেঘ ফুঁড়ে, আকাশ ফুঁড়ে কোথায় যে চলে গেছে কত উপরে কিছুই বুঝতে পারিনা। শিকড় তার নেমে গেছে কত নীচে মাটির কত গভীরে- তাই বা কেজানে! হয়তো চলে গেছে পাতালে, ঝিমঝিমে দুপুরের ঘুমঘুম বাসায় মায়ের ঘুমপাড়ানি গল্পে যে পাতালের রাজ্যের কথা শোনা যেতো। কেজানে!

গাছের এক ডালে ছিমছাম এক ছোট্টো বাসা। হেলাফেলার খড়কুটোকাটার বাসা না, অচেনা উদ্ভিদতন্তু দিয়ে বহু যত্নে বোনা বাসা, সোনালী তার দিয়ে মজবুত করে বাঁধা, ভিতরে নরম তুলোর আস্তরণ। সেই বাসায় বসে তাকাই আকাশের দিকে, খোলা আকাশ ছড়িয়ে আছে অনেক অনেক দূর, নীল আকাশে রোদ্দুর আর মেঘেরা লুকোচুরি খেলে। পাখির দল উড়ে যায় মাঝে মাঝে। ওদের কথাবার্তার টুকরো-টাকরা মাঝে সাঝে এসে পৌঁছায় আমার কাছে, কখনো বা বাতাসে উড়ে যায় অন্যদিকে।

উপরে তাকাই, গাছের শেষ মেলে না, নীচে তাকাই, গাছের শেষ মেলে না। এর মাঝখানে বসে থাকি সাধের বাসায় আমার, ভাবি এই বুঝি বাতাসে ডানা ভাসিয়ে ভাসিয়ে এলো জ্যোৎস্নাপালকের পাখি! ভাবতে না ভাবতেই মস্ত পুচ্ছে অজস্র ঝলমলে রঙ আর মস্ত দুই ডানায় রঙধনু ঝলকিয়ে উড়ে এসে নামলো এক অচিনপাখি! আকাশের বিদ্যুতের মতন তীব্রোজ্জ্বল তার রূপ, সমারোহ ধরে না।

সে পাশের ডালে বসে আমার দিকে চেয়ে হাসলো, বললো, "তুমি কোথাকার ? এখানে, এই গাছে আগে তো তোমায় দেখিনি!"

উত্তেজনায় ধকধক করে হৃৎপিন্ড, কোনোরকমে আমি বলি, " আমি তো এই সেদিন এলাম। আগে এখানে ছিলাম না তো! দেখবে কেমন করে? তুমি কে? তুমিই কি জ্যোৎস্নাপালকের পাখি?"

সে হাসে, নির্মেঘ আকাশে যেন বিদ্যুতের সমারোহ জাগে সে হাসিতে--- হাসি থামলে সে বলে, " আমি এইখানে থাকতাম। বেড়াতে গেছিলাম দূরের দেশে, ফিরে এসে তোমার বাসা দেখে অবাক হয়েছি।"

আমি অবাক, বলি," তুমি এইখানে থাকতে? কই, তোমার বাসা তো দেখিনি!"

সে বলে, "আমার তো বাসা নেই। আমি বাসা গড়ি না। গাছের ডালে থাকি আর আকাশে আকাশে উড়ে বেড়াই। বাসা গড়ে কী হবে?"

আমি বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো করে চেয়ে থাকি, সেই অদ্ভুত কনকনে ঘুম ভেঙে যায়। আহ, সব স্বপ্ন! এত স্পষ্ট স্বপ্ন ? অফুরান সেই গাছ, ঝলমলে সেই পাখি, সব স্বপ্ন? যাঃ।

ছলছলে রূপালী জ্যোৎস্না আরো তীব্র এখন, এর মধ্যেও যেন স্বপ্নাভা লেগে আছে। একা জেগে বসে থাকি বাসায়। সর্বচরাচর ঘুমিয়ে আছে, কী অসীম নিতল রহস্যে ভিজে আছে সবকিছু!

***

পাশের ডালে একটা বাসা, সেখানে থাকে এক ভিনদেশী পাখি। সে কথা বলে না বিশেষ, কতটুকুই বা দেখা হয় আমাদের! আমি উড়ে বেড়াই, খাবার খুঁজে বেড়াই, ঝুপ করে জলে পড়ি মাছ ধরার জন্য-বেশ স্নানও হয়ে যায়! নয়তো পাহাড়ে যাই, সেই অলৌকিক গানের পাহাড়! শুধু ফিরে আসি রাত্রের ঘুমটুকুর জন্য।

পাশের বাসার পাখির সঙ্গেও তাই তেমন আলাপ-পরিচয় হয় নাই। সেতো বেশী কথাও বলে না, নইলে হয়তো নিজেই এসে একফাঁকে বন্ধু হয়ে যেতো! অবশ্য আমি নিজেও যেতে পারতাম বৈকি! কিন্তু সে কিনা ভিনদেশী, হয়তো তার কথাও সহজে বুঝবো না! কী দরকার বাপু ঝামেলার! তারচেয়ে যেমন আছি, তেমনই থাকি! এইসব ভেবে ভেবে আর আলাপ-পরিচয় তেমন হয় নি! আজকের স্বপ্নভাঙা রাতে হঠাৎ মনে হলো বন্ধুত্ব থাকলে মন্দ হতো না!

নেশাধরানো জ্যোৎস্নায় ডুবে আছে সবদিক। আমি উপরে তাকাই, অফুরাণ আকাশে চাঁদের আলো ছাড়িয়ে আছে হাওয়াহাল্কা রুপোলী জরির ওড়নার মতন, ফুটকি ফুটকি কয়েকটা তারাও জ্বলছে। চাঁদনি রাতে বেশী তারা দেখা যায় না, যে রাতে চাঁদ থাকে না, সেই নেইচাঁদ রাতে আকাশে তারায় তারায় ঠাসাঠাসি লেগে যায়।

ভিনদেশী ডানা ঝাড়া দেয় ওর বাসায়, সেও জেগে গেছে। আমি ছোট্টো করে ডাক দিই।

"এই যে শুনছেন, আপনি কি জেগে আছেন?"

ঘুমঘুম গলায় সে বলে, "জেগে গেলাম, আপনিও জেগে যে!"

" আমি ঘুমিয়েছিলাম, ঘুম ভেঙে গেল। জেগে উঠে অবশ্য লাভই হলো। এমন জ্যোৎস্না!!! আপনি আগে দেখেছেন এমন আশ্চর্য জ্যোৎস্না? " আমি আবিষ্ট গলায় বলি।

সে উদাসীন গলায় বলে, " কত দেখেছি, খোলা মাঠের ধারে গাছে বাসা বেঁধে থাকতাম, সে গাঁয়ের মাঠের দুধেল জ্যোৎস্না দিকদিগন্ত ভাসিয়ে দিতো। এ আর এমন কী জ্যোৎস্না!"

আমি একটু ক্ষুব্ধ হই, বলি, "তাই নাকি? কোথায় সে গাঁ?"

এবারে ওর উদাসীন স্বরে দু:খ মিশে যায়, দক্ষিণের দিকে ডানা ছড়িয়ে দিয়ে সে বলে, "ওওওও ই দিকে। অনেক পাহাড়, বন, নদী, মাঠ, ঘাট, ঝর্ণা পার হয়ে ছিলো আমাদের গাঁ।"

" ছিলো? এখন আর নেই?"

" নাহ, সে গাঁ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বনে আগুন লাগলো তো! বিরাট দাবানল। সবাই পালিয়ে গেলো। আমরাও।"

আস্তে করে বলি, " আমি জানতাম না, মাফ করে দিন। আপনার দু:খ হবে জানলে আমি কখনো জিগ্গেস করতাম না।"

"নাহ, মাফ চাইবার কী আছে? আর, এতদিন পরে আজ আর দু:খ কিসের? ছিলো সেদিন দু:খ, যেদিন আমাদের সদ্য ডিমফোটা চারটি অসহায় শিশু আগুনে পুড়ে গেলো। ওদের মা চাইছিলো না ওদের ছেড়ে আসতে, কিন্তু ওরাই বললো নিজের শক্তি থাকতে কেন পুড়ে মরবে মা? পালাও। আমরা পরের বছরেই আবার তোমাদের ঘরে ফিরে আসবো নতুন হয়ে। "

আমি স্তব্ধ হয়ে যাই, চুপ করে চেয়ে থাকি ওর দিকে। সে একটুক্ষণ থেমে থাকে, তারপরে আস্তে আস্তে বলে, " ওদের মা পালিয়ে এসেছিলো আমার সঙ্গে, কিন্তু সন্তানশোক সইতে পারলো না, অসুখ হয়ে মরে গেলো। আমি বেঁচে রইলাম, একা একা। ভুলতে চেষ্টা করি, খাই দাই বেড়িয়ে বেড়াই, কিন্তু ভুলতে পারিনা। "

আমি কী বলবো বুঝতে পারিনা, এ কী ভয়ঙ্কর কাহিনী! আমার ইচ্ছে করে কিছু সান্ত্বনার কথা বলি ওকে, এমন কিছু যা ওই ভয়ানক দু:খের কিছুটা হলেও প্রশমন করে! কিন্তু কিছু বলতে পারিনা। বোবা হয়ে বসে থাকি। সব ভাষা যেন ভুলে গেছি, যেন কোনো বাক্য শব্দ কিছুই ছিলো না আমার কোনোদিন!

এমন সময়! ঠিক সেই মুহূর্তে! আকাশভরা জ্যোৎস্নাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন কাঁপিয়ে দিয়ে বেজে উঠলো সেই অলৌকিক সঙ্গীত! সেই সব সুখদুখমন্থন করা গান! নিদ্রাহারা, কুলহারা গান! সুপ্রাচীন অলীক পাখির সেই গান!

আমি কানখাড়া করি, সেও করে। শুনতে পেয়েছে, সেও শুনতে পেয়েছে! মায়া নয়, মায়া নয়! সে আমার দিকে তাকায়, বলে, " গান? কোথায় হচ্ছে? আপনি শুনতে পাচ্ছেন?"

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। বলি, " আমার এখনই যেতে হবে, ওই পাহাড়ে, ওখান থেকে ভালো শোনা যায়।"

সে বলে," আমিও যেতে চাই, আমাকে সঙ্গে নিন।"

আমরা দুজনে উড়াল দেই, জ্যোৎস্নাভরা আকাশ দিয়ে ভেসে চলি গীতপাহাড়ের দিকে, দু:খজল শিশিরের মতন ঝরে যায় আমাদের ডানা থেকে। আমাদের চারিপাশে উপরে নীচে ছড়িয়ে যেতে থাকে অনন্ত রাত্রির পালক, সীমাসংখ্যা পেরোনো পালকেরা, তার নরম ওমের মধ্যে নিজেদের সমর্পণ করে দিয়ে বসি নীলকদমের ডালে। আকাশ ভরে, বাতাস ভরে, জলস্থলের হৃদয় ভরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সেই অলৌকিক সুরের সুধা-- "বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা/ জাগে অসীম নভোমাঝে অনাদি সুর ......"

( শেষ )

ইচ্ছে-জলফড়িং

হেমন্তের দিন গুলোকে বিষাদবিধুর বলেন জ্ঞানীগুণীরা অনেকে। দিন ছোটো হয়ে যায়, আলো পাওয়ার সময়টুকু কমতে কমতে কমতে কমতে কেমন একটা মনকেমন রেখে যায়, বিরাট বিরাট গাছেদের সব সবুজ পাতাগুলো দেখতে দেখতে বাদামী লাল কমলা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে যেতে থাকে, ন্যাড়া গাছেরা নাঙ্গা সন্ন্যাসীর মতন স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকে উদাসীন নীল আকাশের নিচে। এমন সব দিনে মানুষের মন ও নাকি কেমন বিষাদনীল হয়ে যায়।

দরজাবন্ধ হয়ে যাওয়া ঘরের মতন লাগে মনটা। তাই নিয়েই আসি যাই ঘুরে বেড়াই, দৈনন্দিনের দাবী তো না মিটালে চলে না। নতুন কোনো লেখা আসে না কলমে, আসে না মনে, অন্যদের লেখাপত্তর পড়ি- এখনকার মানুষের লেখা, অনেক বছর আগের মানুষের লেখা, আগে যেসব লেখা পড়ে ভালো লেগেছে, আনন্দ হয়েছে সেসব লেখা। কিন্তু কিছুই যেন যায় না ভিতরে, ঝরে যাওয়া পাতাদের মতন ঝরে যায়, উড়ে যাওয়া হাঁসেদের ডানা থেকে ঝরে যাওয়া জলবিন্দুর মতন ঝরে যায়।

সেই অলৌকিক ইচ্ছেরা কই? ওরাই তো টান দিয়ে বার করতো বাইরে, ওরাই তো দেখাতো আলো দেখাতো ছায়া দেখাতো মেঘেরোদে জড়াজড়ি খেলা। সেই মেঘ সেই রোদ তো আছে, সেই আকাশও তো একই, তবে ইচ্ছের সেই পক্ষীরাজ কোথায়? সে কি আসে আর যায়, ধরা দেবে না?

এই তো একটা ইচ্ছে কেমন আলোয় ছায়ায়
খাতার পাতায় দু'এক টুকরো আঁচড় কাটায়-
সময়বেড়া টপকে গেছে সফেদ ঘোড়া
ঐ ওপাশেই ঝিণুকবাগান বর্ণচোরা,
এই তো আবার চোখ ঢেকে যায় বৃষ্টিধারায়
ইচ্ছেগুলো জলফড়িং এর সঙ্গে পালায়।

আবার দেখি রোদ পড়েছে ছিন্নপাতায়
বৃষ্টিধোয়া ছবির মাঠের রঙীন ছাতায়,
ঐ তো আসে দু'পাক খেয়ে ঝিলিকভ্রমর
কানের গোড়ায় স্পষ্ট শুনি গুঞ্জনস্বর
এই তো আবার চোখ ঢেকে যায় ঝড়ের ধূলায়
স্বপ্নদুপুর দুদ্দাড়িয়ে দৌড়ে পালায়।

***

Friday, March 11, 2011

মণিদীপা(১)

সেটা ছিলো ২০০৮ এর মে মাস। গ্রীষ্ম এসেছে বেশ জাঁকিয়ে। তপতপে দুপুরগুলো। সোনাগলানো রোদ যে আসলেই কী জিনিস তা বোঝা যায় বাইরে বেরুতে হলে। রোদ একেবারে সারা গায়ে চিড়বিড়িয়ে লাগে যেন সত্যিই গলন্ত ধাতু। এমন সুন্দর নীলকান্তমণিপ্রভ আকাশকেও তখন মনে হয় শত্রু, মনে হয় মেঘেরা এসে দখল করে নিক আকাশের ঐ নীল খিলান। এখানের লোকে অবশ্য কেয়ার করে না, ফুরফুরে হালকা জামাকাপড়ে ছেলেমেয়েরা ঘুরছে, ব্যস্ত সামার ক্যাম্পাস। রেগুলার স্টুডেন্টরা এসময় বেশী থাকেনা বলে স্পেশাল সামার স্টুডেন্টরা অনেক এসেছে।

লাইব্রেরীর ভিতরে চমৎকার ঠান্ডায় দেয়ালজোড়া ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর পাশে একটা নিরিবিলি বেঞ্চি দখল করে বইপত্রের গোছা আর ল্যাপটপ রেখে গুছিয়ে বসি। বাইরে বড় বড় ওক গাছের ছায়া আর রোদ্দুরে মিলমিশ হয়ে দিব্যি জটিল নকশা হয়েছে। মানুষের দল চলেছে, বাইরের শব্দ কিছু আসে না বলে নি:শব্দ চলচ্চিত্র মনে হয়। বাইরে দেখি ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনীদের তিনজনের দল চলেছে এখন, ক্লাসে যাচ্ছে নিশ্চয়। ওরা প্রত্যেক গ্রীষ্মে আসে। কাঁধ থেকে পায়ের গোড়ালি অবধি ঝোলাঝালা সাদা পোষাক, মাথায় কালো সিল্কের লম্বা ভেল। ওদের দেখে সহসা মনে পড়লো মণিদীপাকে।

মণিদীপার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিলো এইরকমই এক গ্রীষ্মে, বাংলার এক ছোটো শহরে। অসংখ্য কাজুবাদামের গাছে ঘেরা ছোট্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। সে ক্যাম্পাস তখন গ্রীষ্মকালীন ওয়ার্কশপের জন্য খোলা ছিলো কয়েক সপ্তাহ। তারপরেই গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হয়ে যাবে। গরম পড়েছিলো খুবই। তার উপরে জায়গাটাও রুখু লালমাটির দেশ।

সেইখানের ওয়ার্কশপেই মণিদীপার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। প্রথমবারের দেখাতেই বাকীদের থেকে ওকে অন্যরকম লাগে। ওর স্বাভাবিক পোশাকের উপরে একটি ঘীয়া রঙের রেশমের হালকা চাদর উর্ধাঙ্গে জড়ানো। ওর চুলগুলোও কেমন অন্যরকমভাবে চূড়া করে বাঁধা। প্রথম পরিচয় হয়েই তো আর জিজ্ঞেস করা যায় না কেন ঐ বিশেষ চাদর আর চুলবাঁধা, তাই অপেক্ষা করে রইলাম আলাপ আরো কিছুদূর গড়ানোর।

মণিদীপার সঙ্গে ওর বাবামা ও এসেছিলেন সে শহরে, ওরা সকলে উঠেছিল শহরের মাঝের যে বাজার তার পুবের দিকে এক হোটেলে। আমার হোটেলও ঐদিকেই ছিলো। সারাদিন চলতো ওয়ার্কশপ, সকাল থেকে শুরু হয়ে বিকেল অবধি, গোটাদিন। সেভাবেই তৈরী হয়ে আসতাম আমরা। কিন্তু একদিন ঝাঁ ঝাঁ রোদের দুপুরে হঠাৎ শুনি সেদিনের ওয়ার্কশপ বাতিল।

একটা রিকশা ঠিক করে আমি আর মণিদীপা ফিরে চললাম হোটেলের দিকে। দীর্ঘ পথ, ঐ দুপুর রোদে আরো দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। পথের পাশে পাশে কোথাও ছায়ামেলা গাছের সারি, কোথাও ধূ ধূ মাঠ।

রিকশা চলছে, আমরা দু'জনে টুকটাক কথা বলছি। তখন আমাদের বেশ ভালোরকম আলাপ-পরিচয় হয়ে গেছে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞেস করি ওর বিশেষ পোশাকের কারণ। মণিদীপা বলে যে ও এক বিশেষ ধর্ম গ্রহণ করেছে বলে ঐ চাদর পরতে হয় আর চুল চূড়া করে বাঁধতে হয়। এখনও ও বাড়ীতেই থাকে বাবামায়ের সঙ্গে, আর কিছুদিন পরে আশ্রমে চলে যাবে। আশ্রম নাকি ওদের পাড়াতেই। এখন ও স্কুলে চাকরি করছে, আশ্রমে গিয়ে থাকলেও সেই চাকরি করতে পারবে কিন্তু সংসারধর্ম আর করতে পারবে না। ও বলে, সংসার যাতে করতে না হয় তার জন্যই তো মনে ঈশ্বরপ্রীতি জেগেছে, সন্ন্যাস নেবার ইচ্ছা জেগেছে, বাবামা যে এই সামান্য কথাটা কেন বুঝতে চান না ও বোঝে না।

আমি চুপ করে শুনি। ধর্মের এত সবল রূপ আমি নিজেদের চেনা-পরিচিতের মধ্যে দেখিনি। ধর্মচর্চা প্রায় ব্যক্তিগত ছিল সেখানে। পরিচিত জনের মধ্যে বড়োজোর দেখেছি কোনো গুরুর কাছে বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে দীক্ষা নেওয়া আর গৃহী উপাসক হিসাবে তা পালন করা। একেবারে সংসার ছেড়ে আশ্রমে চলে যাবার মতন উচ্চকিত ধর্মচর্চা দেখিনি। শুনেছি কারুর কারুর বৈরাগ্য জাগার গল্প, সেও পুরানো কালের গল্প। কোনো বিশেষ কারণ নেই তবু কেন জানি মণিদীপার দিকে তাকিয়ে মনে হয় বৈরাগ্য নয়, কোনো গভীর অভিমান ওকে সংসার থেকে বিচ্যুত করে দিয়েছে। কী সেই অভিমান? কোনোদিন কি জানা যাবে? সামান্য সময়ের মধ্যে ওকে যতটুকু চিনেছি তাতে মনে হয়েছে মেয়েটা খুব চাপা, অন্তর্মুখী। ওর গভীর অভিমানের কথা উজার করার মতন উদার মন না পেলে ও কখনোই কাউকে বলবে না।

আমাদের কথাবার্তা অন্যদিকে ঘুরে যায় এবারে, মণিদীপার দাদা বিদেশে থাকে, সেখানেই স্ত্রীকেও নিয়ে গেছে। বিদেশেই তাদের নাকি সেটল করার ইচ্ছে, কিন্তু পরে কি হয় বলা যায় না। চাকরির উপরে নির্ভর, কোম্পানি যদি দেশে ফিরিয়ে আনে, তবে ফিরে আসতে হতেও পারে।

" দাদাবৌদি ফিরে এলেই ভালো, বাবামার তো বয়স হচ্ছে! আমি আশ্রমে চলে গেলে আর তো বেশী দেখাশোনা করতেও আসতে পারবো না। " মণিদীপা কেমন একটা অদ্ভুত গলায় বলে।

" তোমার বাবামা তোমার সন্ন্যাস নেওয়ার ব্যাপারে কি খুশীমনে মত দিয়েছেন?" আমি আর না থাকতে পেরে জিজ্ঞেস করে ফেলি।

" না। ওরা প্রথমে মত দিতেই চায় নি। পরে যখন বুঝতে পারলো আমার আর অন্য কোনো পথ নেই, আমার মন একেবারে প্রস্তুত, বাধা দিলে আমার মৃত্যু ছাড়া অন্য পরিণতি নেই, তখন বাধ্য হয়ে মত দিয়েছে। এখনো ওরা আশা করে কোনোদিন আমার মতি ফিরবে, আমি বিয়ে থা করে সংসার করবো। মানুষের আশা যে কী অদ্ভুত!"

"কিছু যদি মনে না করো মণিদীপা, সংসার করতে বাধা কি? সন্ন্যাস তো রইলোই, যখনই মনে হবে সংসারধর্ম কর্তব্যকর্ম শেষ হয়েছে, তখন যাবে সন্ন্যাসে। এখন মাবাবাকে দু:খ দিয়ে আশ্রমে চলে যাবে কেন? "

"বিয়ে? সংসার? না, কখনো না, কখনো না। " অদ্ভুত কাঠিন্যে শক্ত হয়ে উঠেছে শান্ত, কোমল মেয়েটির চোয়াল দু'খানা, হঠাৎ যেন কথাগুলো ধাতব হয়ে গেছে, চোখের মণিতে অন্যরকম আলো, মুখ পাঁশুটে হয়ে গেছে। মনে হয় আমার অনুমান সত্যি, হয়তো খুব জটিল কারণ আছে এসবের নেপথ্যে।

আমার খুব অপ্রস্তুত লাগে, দ্রুত কথা ঘুরিয়ে আমাদের ওয়ার্কশপের প্রসঙ্গে চলে আসি। ঘটমান বর্তমান আমাদের আর্ত অতীত আর অজানা ভবিষ্যৎ থেকে মুক্ত করে চেনা মাটিতে পা রাখতে সাহায্য করে।

পরেরদিন আমার চলে আসতে হয়েছিলো, আর কথা হয় নি। জানাও হয় নি কি ছিলো ওর ঐ তীব্র বিতৃষ্ণার নেপথ্যে। নানা কাজের ব্যস্ততায় আস্তে আস্তে ঘটনার স্মৃতি ফিকে হয়ে এসেছে। মণিদীপার কথা কিন্তু ভুলি নি।