স্টারপার্টি হবার কথা ছিলো এপ্রিলের শেষের দিকে, কোনো একটা সুন্দর সন্ধ্যাতে যখন আকাশ স্বচ্ছ-নির্মল, একেবারে পরিষ্কার। কিন্তু কী কারণে যেন পাল্টানো হলো সময়, আসলে সেমেস্টার শেষ হবার মুখে ব্যস্ততা খুবই বেশী থাকে, সমস্ত ফাইনাল টাইনাল ফাইনাল-গ্রেডিং গ্র্যাজুয়েশান অনুষ্ঠান ইত্যাদি সবই তো তখন! তখনের জন্য অপেক্ষা করলে হয়তো বাতিল হয়ে যেতে পারে,তাই ফেব্রুয়ারীতেই হলো স্টার পার্টি।
তরুণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উৎসাহের কমতি একেবারেই নেই। ঘরবন্দী গাড়ীবন্দী শহরবাসী ছেলেমেয়ে সব, এমন তারা দেখার সন্ধ্যা তেমনভাবে আসে কই ওদের? অ্যাস্ট্রোনোমির ক্লাসও তো ওরা করে ঘরের মধ্যে দিনের বেলা,কখনো কম্পুটারের সামনে সিমুলেশান, কখনো বা হাতে হাতে হিসেব করে করে গ্রাফের উপরে প্লট করা...ওরা কতবার জিজ্ঞাসা করতো বাইরে সত্যি সত্যি তারা দেখার কিছু সুযোগ আছে কিনা...এতদিনে এসেছে সেই সন্ধ্যা।
শহরে আলোক-দূষণ, বড়ো বড়ো পথবাতি আর বিজ্ঞাপণের আলো, বাড়ীর আলো, দোকানের আলো, গাড়ীর আলো হাজারো আলো আবিল করে রেখেছে সব। অপেক্ষাকৃত কম প্রভার তারাগুলোকে দেখতে দেয় না, নেবুলা আর গ্যালাক্সি তো দূরস্থান। তাই শহর ছাড়িয়ে দূরে চললাম আমরা। ছাত্রছাত্রীরা সব উৎসুক চোখ নরম মুখ আঠেরো/ উনিশ/ কুড়ির তরুণ-তরুণী---মেরী, জ্যাক, আমান্দা, অ্যাডাম, র্যান্ডাল, এলিজাবেথ, জো,সারা, ক্রিস, চার্লস, জেফ্রি আরো অনেকে ...তারা-চেনার সন্ধ্যায় ওরা কলকল করতে করতে চলেছিলো।
অ্যাস্ট্রোনমির প্রফেসরের নাম ক্রিস, ক্রিস্তোফার। উনি সুদূর উত্তরের রাজ্য উইসকনসিনের লোক,এখানকার মৃদু দক্ষিণী শীত দেখে উনি খুব হাসেন,বলেন শীত মানে হলো বরফের সাদা কম্বলের তলায় পড়ে থাকবে পৃথিবী,মাসের পর মাস।তবে না শীত! এখানে তো তোমরা আছো চিরবসন্তের দেশে!
তো,এখন ওনার গাড়ীটিকে অনুসরণ করে চলেছে সবকটা গাড়ী, নির্দিষ্ট জায়গায় থামা, তারপরে হাঁটুভর ঘাসপালা মাড়িয়ে দূরের দিকে চলা। প্রফেসর সেখানে একটি ফার্ম হাউসের ব্যাক ইয়ার্ডে দূরবীন বসিয়ে গেছেন বিকেলেই। সূর্য ডুবে গেছে যদিও, তবু অল্প আলো এখনো পশ্চিমদিকচক্রে ছড়িয়ে আছে কোমল হয়ে। আরেকটুক্ষণ, তারপরেই অন্ধকারে ঢেকে যাবে সব। তারারা ফুটবে, গ্রহেরা এখনই দেখা দিতে শুরু করেছে।
মনে পড়ছিলো সেই ক্যাট্রিনার পরের কথা, অগাস্টের সেই ঘূর্নীঝড়ের পরে যখন গোটা শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রইলো, তখনকার সেই কয়েকটি রাত্রি ছিলো অত্যন্ত বিরল সুযোগ, শহরের বুক থেকেই আলোকদূষণহীন ছায়াপথময় আকাশ দেখার। আলোর এত সূক্ষ্ম তারতম্য যে হতে পারে, রাত্রির আকাশের যে নিবিড় ঘননীল, তারমধ্যে মণিকণার মতন যে জ্বলে তারারা, হাওয়া-হাল্কা ওড়নার মতন যে নেবুলারা দেখা দেয়,দেখা দেয় গভীর মহাকাশের গ্যালাক্সি...ঐ নিবিড় রাত্রিনীল সকালের আলোয় কিভাবে দুধালো হয়ে ওঠে, তারারা মিলিয়ে যায়, গ্রহেরা থাকে, ঊষা জেগে ওঠে পুবে,সে আলোয় গ্রহেরা ডুবে যায়---সে কেবল তখন দেখতে পেয়েছিলাম।
আর একবার... জানুয়ারী মাসে শীতের সময় বনফায়ার হয়েছিলো শহর থেকে অনেক দূরে, এক বনাঞ্চলে---তখন দেখেছিলাম আকাশ ভরে তারায় তারায় ঠাসাঠাসি। দেখে দেখে মনে হতো ঐ যে স্পেস থেকে কি অপরূপই না দেখে ওরা!এখন অবশ্য স্পেস টেলিস্কোপ থেকে ছবি আসে,আমরাও দেখতে পারি, কিন্তু সেতো ইমেজ, মুখোমুখি দেখা তো নয়!
আর মনে পড়ে মাঠের ধারে বাড়ীটি আমাদের,গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় লোডশেডিং হয়ে গেলে উঠানে বেরিয়ে রাত আকাশের তারা চেনা...ঐভাবেই তো চেনা হয়েছিলো চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা, জ্যেষ্ঠাকে,চেনা হয়েছিলো সপ্তর্ষিমন্ডল,হেমন্তসন্ধ্যায় চেনা হয়েছিলো কালপুরুষ...সে কতকাল আগের কথা...
ক্যাট্রিনার সেই কয়েক নিষ্প্রদীপ রাত্রির পরে আবার আজ। মাঝে শুধু চোখ ধাঁধানো আলো আর আলোয় আবিল হয়ে থাকা অর্ধচেতন রাত্রির মালা।
আমরা দূরবীনের কাছে পৌঁছাই আস্তে আস্তে, আকাশে শীত রাত্রির উজল প্রহরী ওরায়ন মানে কালপুরুষ। কালপুরুষের কাঁধের লাল তারা বেটেলগিউস(আর্দ্রা) দেখিয়ে প্রফেসর ব্যখ্যা করেন যে এটি এক বয়স্ক রেড জায়ান্ট তারা, কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সব ফুয়েল ফুরিয়ে ফেলে বাইরের শেলের বহির্মুখী চাপে বেলুনের মতন ফুলে উঠেছে এত।আমাদের সূর্যও নাকি আরো চার থেকে পাঁচশো কোটি বছর পরে ঐরকম ফুলেফেঁপে বিরাট হয়ে যাবে, কাছের গ্রহট্রহগুলি সব গিলে নেবে।
ফোকাসে তারাটিকে আনার পরে সবাই এক এক করে আইপিসে চোখে দিয়ে দেখতে থাকে...কালপুরুষের পায়ের কাছেই রাত-আকাশের সবচেয়ে উজল তারা সিরিয়াস,আমরা লুব্ধক বলি যাকে,তাকে দেখাতে দেখাতে ব্যখ্যা করতে থাকেন প্রফেসর-কেমন লুব্ধকের সঙ্গী তারাটিকে দেখে প্রথমে বোঝা গেলো ফুয়েল-ফুরানো তারারা কিভাবে ঘন শ্বেতবামন তারায় পরিণত হয়...এসব দূরের গভীর মহাকাশের গল্প ছাড়িয়ে আস্তে আস্তে আমাদের সৌরমন্ডলে এসে পড়লেন তারপরে, উজল গ্রহদের দেখতে দেখতে কথায় কথায় উঠে আসলো এক্সট্রা-সোলার প্ল্যানেটদের কথা-আমাদের সূর্য ছাড়াও অন্যান্য নক্ষত্রের চারিপাশে গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে,একটা দুটো নয়,অনেক অনেক তারার কাছে-কিন্তু ওরা প্রাণী-বসবাসের উপযোগী কিনা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
ঐ অসীম ঘননীল তারাময় আকাশের দিকে চেয়ে সকলে কল্পনাপ্রবণ হয়ে ওঠে,কোথাও কোনো ভিন্ন নক্ষত্রের গ্রহমন্ডলীতে হয়তো আছে প্রাণ,হয়তো আছে আমাদের মতন জীব,হয়তো এমনি সন্ধ্যায় ওদের কোনো ছোট্টো দল এমনি করেই জল্পনা কল্পনা করছে এই মহাবিশ্বে তারা নিঃসঙ্গ কিনা তাই নিয়ে... এখানে আমরা,এতদূর থেকে কিছুতেই সাড়া দিয়ে উঠতে পারছি না...বন্ধু, আমরা আছি, আমরা আছি, আমরা আছি-ই-ই-ই-ই-...
Monday, June 2, 2014
অন্য শারদোৎসব
শিরশিরে শরতের ভোর। হাওয়ায় কোমল শীতভাব। নীলকান্তমণিপ্রভ আকাশ, ঘাসে ঘাসে চিকমিক করছে শিশির,পুবে রাজকীয় ভোর হচ্ছে। চারটে পাখির একটা ছোট্টো দল চক্র দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, ওদের ডানায় ঝকামক করছে নতুন ভোরের আলো।
এইসব সময়গুলোতে বাতাসে শিউলির নরম সুগন্ধের জন্য মন উতলা হয়, মাঠভরা নরম কাশগুচ্ছ দেখতে সাধ হয়। আমাদের দেশে শরৎ তো শুধু ক্যালেন্ডারে আসে না, সাদা মেঘের ছবি দেওয়া আকাশের নীল খামে পুজো-পুজো গন্ধের রোদ্দুরের অক্ষরে-শব্দে ভালোবাসার চিঠি হয়ে আসে। এমন সোনারোদের ওড়না জড়ানো নীলপ্রভ আকাশের নীচে আগমণীর গান যদি না থাকে, তাহলে কি আর মন মানে? ঐ পুজো পুজো গন্ধের রোদ্দুরে যে ছুটির নিশান আঁকা! কতকাল ধরে রক্তের মধ্যে যে মিশে গেছে "পুজোর ছুটি"।
এখানে পুজোর ছুটি বলে কোনো কথা নেই, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় অগাষ্টের শেষ সপ্তাহ থেকে। অক্টোবরে একেবারে যাকে বলে পুরোদমে চলা সময়, ভরভরন্ত সেমেস্টার।ছুটি হবে সে-এ-এই ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, তখন সেমেস্টার শেষ হবে।
তবু আছে অন্যরকম নানাধরনের উৎসব-আয়োজন। এমন টলটলে আলোয় পরিপূর্ণ সময় মানুষের হৃদয়ের কাছে আবেদন রাখবে না, তাই হয় নাকি? সমস্ত উত্তর গোলার্ধ জুড়েই যে এখন ভরা ফসলের গান, "শেষ ফলনের ফসল এবার কেটে লও, বাঁধো আঁটি...",ওদিকে দক্ষিণ গোলার্ধ সেজে উঠছে বসন্তের সবুজ কিশলয়ে।
এই সীজন হলো ফুটবল সীজন। এই ফুটবল আমাদের চেনা ফুটবল নয়, আমি বাঙালি মানুষ এই ফুটবলের আকৃতি দেখেই তো প্রথমে ঘাবড়ে গেছিলাম। আমাদের ফুটবল তো দিব্যি গোল, একেবারে গোলালো। এখানের ফুটবল হলো উপগোলকীয়, যেন অনেকটা বিরাট এক পটোলের মতন। ফুটবল এখানে শুধু খেলা নয়, একটা উৎসবের মতন। যেদিন ফুটবল হয়, সাধারনতঃ সপ্তাহান্তে হয়, সে এক সাজো সাজো অবস্থা।
শুক্রবার বিকেল থেকেই সব মোটর হোম এ করে সমর্থকের দল সপরিবারে এসে পৌঁছায় পতাকা টতাকা উড়িয়ে। এসে লাল নীল সাদা তাঁবু খাটিয়ে রান্না-বান্না(সাধারণ গ্রিল করা)করে এসে এক এলাহি কারবার। ফুটবল শুরুর আগে এই পিকনিক হলো মাস্ট, একে বলে টেইলগেটিং। এটা কালচারের অঙ্গ,সেদিন চেনা-অচেনা বন্ধুরা মিলে খাওয়াদাওয়া হবে,আনন্দ করা হবে, এ হলো ফুটবল-দর্শকের আবশ্যকীয় রীতি।
তবে খেলাটা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় নি, একবার বন্ধুদের অনুরোধে গেছিলাম দেখতে, গ্যালারিতে জমিয়ে বসলামও বন্ধুদের সঙ্গে। দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম, প্রায় মহাকাশযাত্রীর মতন পোষাক আর হেলমেট পরে অতগুলো খেলোয়াড় যে কি করছে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে, গ্যালারি থেকে দর্শকেরা যে কেন অমন মারাত্মক চিৎকার করছে, সে আর বোঝা সম্ভব হলো না। খেলার একেক পর্বের পরেই বিরতি,বিরাট বাজনার পার্টি ইয়া ইয়া ভেঁপু ড্রাম ইত্যাদি বাজাচ্ছে,মেয়েদের দল নাচ করছে-সে বিরাট উৎসব আর সেই উৎসবের স্পিরিট আমার মতন আউটসাইডারের পক্ষে লিখে বোঝাতে পারা অসম্ভব।
আমি শুধু বাইরে ঘুরতে ঘুরতে মুগ্ধ হয়ে দেখি নানারঙের তাঁবুতে ভরে গেছে সব মাঠগুলো, গাড়ীতে গাড়ীতে ছয়লাপ চারিদিক,সমর্থকেরা সব সপরিবারে তাদের প্রিয় দলের রঙের পোশাকে, কেউ কেউ মুখেও সেই রঙ করে নিয়েছেন, ছোট্টো ছোট্টো বাচ্চাদের সবচেয়ে সুন্দর লাগে রঙীন ঐসব পোশাকে। দেখি বিরাট বড়ো বিজ্ঞাপন বেলুনে উড়ছে এই খেলার কথা। আমি অবাক হয়ে মুগ্ধ চোখে এই অন্য শারদোৎসব দেখি। অচেনা অন্য পৃথিবীর উৎসব যেন এক, কিন্তু হৃদয়ের আনন্দের তরঙ্গমালা চেনা যায়।
মনে পড়ে যায় আমাদের দুর্গাপূজা, ঢাকের ঢ্যামকুড়কুড়,আর মাঠভরা মাথা-দোলানো কাশেরা, ভোরের বেলা শিউলিদের টুপটুপ ঝরে পড়া।
"ঢ্যামকুড় কুড় বাদ্যি বাজে/ ঢাকে পড়লো কাঠি/ যা দিবি মা তাই হবে আজ/ পরমান্নের বাটি..." মনে পড়ে যায় সেই সপ্তমীভোর, অষ্টমীসন্ধ্যার আলো ও কোলাহল ও ভীড়, পুজোর জামায় ছেলেপুলেরা, আর নবমীর নরম দিন, নবমীরাতে সেই "নবমী নিশি গো পোহায়ো না ধরি পায়/ তুই চলে গেলে মাগো উমা মোরে ছেড়ে যায়", দশমীর বিদায়-অশ্রু আর ঘরে ফিরে বিশ্ব-মাকে ঘরের মা করে পাওয়া।
এই তো পূজা, যা অনেক বড়ো, অনেক দূরের, যাকে এই সীমাবদ্ধ ক্ষুদ্র হৃদয়ে ধরতে পারা যায় না, অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য, শক্তি ও করুণার উৎস যে-তাকেই কাছে পাওয়ার আকুতি, তাকেই হৃদয়ে ধারণ করার আর্তি। তাই নয় কি?
উৎসবের বাঁশি তো তাই বলে, যে দূরের মানুষ, সে এলো কাছে, আকাশের মা মাটির মা হয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো, তারপরে ঘরের মা হয়ে এসে কোলে তুলে নিলো, বুকে জড়িয়ে নিলো। ঘাম ও ধুলা মুছে নিলো কোমল আঁচলে। তাই তো সবই সেদিন পরমান্ন হয়ে যায়, তুচ্ছ বলে আর সেদিন কোনোকিছুই থাকে না। "যা দিবি মা তাই হবে আজ পরমান্নের বাটি..."
আমাদের সহকার-শাখা ও মঙ্গলকলসের সঙ্গে কখন এই এদের পতাকা, তাঁবু, রঙীন বেশ, মুখে মাখা রঙ---সব এক হয়ে যায়, আনন্দের জ্যোৎস্না ভরে দেয় আকাশ ও সমুদ্রের মাঝখানের বিরাট দূরত্ব---"মগন করেছে মধ্যে তাহার আনন্দ পূর্ণিমা..."
কত দূরে প্রশান্ত অতলান্ত মহাসমুদ্র পার হয়ে আমার দেশ- গাঁয়েও তো উৎসবের বাঁশী বেজে উঠেছে.... লাল-নীল-সবুজ-হলুদ ঘুড়িতে পেটকাটি চাঁদিয়ালে মোমবাতি বগ্গায় ভরে গেছে বিশ্বকর্মা পূজার রোদ্দুরভরা দিনের নীল আকাশ...ঘুড়িতে ঘুড়িতে ঐ তো প্যাঁচ লেগে গেছে.... ঐ তো কারা সমস্বরে কোলাহল করে উঠছে ভোঁ ও ও ও কাট্টা....
এইসব সময়গুলোতে বাতাসে শিউলির নরম সুগন্ধের জন্য মন উতলা হয়, মাঠভরা নরম কাশগুচ্ছ দেখতে সাধ হয়। আমাদের দেশে শরৎ তো শুধু ক্যালেন্ডারে আসে না, সাদা মেঘের ছবি দেওয়া আকাশের নীল খামে পুজো-পুজো গন্ধের রোদ্দুরের অক্ষরে-শব্দে ভালোবাসার চিঠি হয়ে আসে। এমন সোনারোদের ওড়না জড়ানো নীলপ্রভ আকাশের নীচে আগমণীর গান যদি না থাকে, তাহলে কি আর মন মানে? ঐ পুজো পুজো গন্ধের রোদ্দুরে যে ছুটির নিশান আঁকা! কতকাল ধরে রক্তের মধ্যে যে মিশে গেছে "পুজোর ছুটি"।
এখানে পুজোর ছুটি বলে কোনো কথা নেই, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় অগাষ্টের শেষ সপ্তাহ থেকে। অক্টোবরে একেবারে যাকে বলে পুরোদমে চলা সময়, ভরভরন্ত সেমেস্টার।ছুটি হবে সে-এ-এই ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, তখন সেমেস্টার শেষ হবে।
তবু আছে অন্যরকম নানাধরনের উৎসব-আয়োজন। এমন টলটলে আলোয় পরিপূর্ণ সময় মানুষের হৃদয়ের কাছে আবেদন রাখবে না, তাই হয় নাকি? সমস্ত উত্তর গোলার্ধ জুড়েই যে এখন ভরা ফসলের গান, "শেষ ফলনের ফসল এবার কেটে লও, বাঁধো আঁটি...",ওদিকে দক্ষিণ গোলার্ধ সেজে উঠছে বসন্তের সবুজ কিশলয়ে।
এই সীজন হলো ফুটবল সীজন। এই ফুটবল আমাদের চেনা ফুটবল নয়, আমি বাঙালি মানুষ এই ফুটবলের আকৃতি দেখেই তো প্রথমে ঘাবড়ে গেছিলাম। আমাদের ফুটবল তো দিব্যি গোল, একেবারে গোলালো। এখানের ফুটবল হলো উপগোলকীয়, যেন অনেকটা বিরাট এক পটোলের মতন। ফুটবল এখানে শুধু খেলা নয়, একটা উৎসবের মতন। যেদিন ফুটবল হয়, সাধারনতঃ সপ্তাহান্তে হয়, সে এক সাজো সাজো অবস্থা।
শুক্রবার বিকেল থেকেই সব মোটর হোম এ করে সমর্থকের দল সপরিবারে এসে পৌঁছায় পতাকা টতাকা উড়িয়ে। এসে লাল নীল সাদা তাঁবু খাটিয়ে রান্না-বান্না(সাধারণ গ্রিল করা)করে এসে এক এলাহি কারবার। ফুটবল শুরুর আগে এই পিকনিক হলো মাস্ট, একে বলে টেইলগেটিং। এটা কালচারের অঙ্গ,সেদিন চেনা-অচেনা বন্ধুরা মিলে খাওয়াদাওয়া হবে,আনন্দ করা হবে, এ হলো ফুটবল-দর্শকের আবশ্যকীয় রীতি।
তবে খেলাটা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় নি, একবার বন্ধুদের অনুরোধে গেছিলাম দেখতে, গ্যালারিতে জমিয়ে বসলামও বন্ধুদের সঙ্গে। দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম, প্রায় মহাকাশযাত্রীর মতন পোষাক আর হেলমেট পরে অতগুলো খেলোয়াড় যে কি করছে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে, গ্যালারি থেকে দর্শকেরা যে কেন অমন মারাত্মক চিৎকার করছে, সে আর বোঝা সম্ভব হলো না। খেলার একেক পর্বের পরেই বিরতি,বিরাট বাজনার পার্টি ইয়া ইয়া ভেঁপু ড্রাম ইত্যাদি বাজাচ্ছে,মেয়েদের দল নাচ করছে-সে বিরাট উৎসব আর সেই উৎসবের স্পিরিট আমার মতন আউটসাইডারের পক্ষে লিখে বোঝাতে পারা অসম্ভব।
আমি শুধু বাইরে ঘুরতে ঘুরতে মুগ্ধ হয়ে দেখি নানারঙের তাঁবুতে ভরে গেছে সব মাঠগুলো, গাড়ীতে গাড়ীতে ছয়লাপ চারিদিক,সমর্থকেরা সব সপরিবারে তাদের প্রিয় দলের রঙের পোশাকে, কেউ কেউ মুখেও সেই রঙ করে নিয়েছেন, ছোট্টো ছোট্টো বাচ্চাদের সবচেয়ে সুন্দর লাগে রঙীন ঐসব পোশাকে। দেখি বিরাট বড়ো বিজ্ঞাপন বেলুনে উড়ছে এই খেলার কথা। আমি অবাক হয়ে মুগ্ধ চোখে এই অন্য শারদোৎসব দেখি। অচেনা অন্য পৃথিবীর উৎসব যেন এক, কিন্তু হৃদয়ের আনন্দের তরঙ্গমালা চেনা যায়।
মনে পড়ে যায় আমাদের দুর্গাপূজা, ঢাকের ঢ্যামকুড়কুড়,আর মাঠভরা মাথা-দোলানো কাশেরা, ভোরের বেলা শিউলিদের টুপটুপ ঝরে পড়া।
"ঢ্যামকুড় কুড় বাদ্যি বাজে/ ঢাকে পড়লো কাঠি/ যা দিবি মা তাই হবে আজ/ পরমান্নের বাটি..." মনে পড়ে যায় সেই সপ্তমীভোর, অষ্টমীসন্ধ্যার আলো ও কোলাহল ও ভীড়, পুজোর জামায় ছেলেপুলেরা, আর নবমীর নরম দিন, নবমীরাতে সেই "নবমী নিশি গো পোহায়ো না ধরি পায়/ তুই চলে গেলে মাগো উমা মোরে ছেড়ে যায়", দশমীর বিদায়-অশ্রু আর ঘরে ফিরে বিশ্ব-মাকে ঘরের মা করে পাওয়া।
এই তো পূজা, যা অনেক বড়ো, অনেক দূরের, যাকে এই সীমাবদ্ধ ক্ষুদ্র হৃদয়ে ধরতে পারা যায় না, অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য, শক্তি ও করুণার উৎস যে-তাকেই কাছে পাওয়ার আকুতি, তাকেই হৃদয়ে ধারণ করার আর্তি। তাই নয় কি?
উৎসবের বাঁশি তো তাই বলে, যে দূরের মানুষ, সে এলো কাছে, আকাশের মা মাটির মা হয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো, তারপরে ঘরের মা হয়ে এসে কোলে তুলে নিলো, বুকে জড়িয়ে নিলো। ঘাম ও ধুলা মুছে নিলো কোমল আঁচলে। তাই তো সবই সেদিন পরমান্ন হয়ে যায়, তুচ্ছ বলে আর সেদিন কোনোকিছুই থাকে না। "যা দিবি মা তাই হবে আজ পরমান্নের বাটি..."
আমাদের সহকার-শাখা ও মঙ্গলকলসের সঙ্গে কখন এই এদের পতাকা, তাঁবু, রঙীন বেশ, মুখে মাখা রঙ---সব এক হয়ে যায়, আনন্দের জ্যোৎস্না ভরে দেয় আকাশ ও সমুদ্রের মাঝখানের বিরাট দূরত্ব---"মগন করেছে মধ্যে তাহার আনন্দ পূর্ণিমা..."
কত দূরে প্রশান্ত অতলান্ত মহাসমুদ্র পার হয়ে আমার দেশ- গাঁয়েও তো উৎসবের বাঁশী বেজে উঠেছে.... লাল-নীল-সবুজ-হলুদ ঘুড়িতে পেটকাটি চাঁদিয়ালে মোমবাতি বগ্গায় ভরে গেছে বিশ্বকর্মা পূজার রোদ্দুরভরা দিনের নীল আকাশ...ঘুড়িতে ঘুড়িতে ঐ তো প্যাঁচ লেগে গেছে.... ঐ তো কারা সমস্বরে কোলাহল করে উঠছে ভোঁ ও ও ও কাট্টা....
Thursday, May 29, 2014
কাছে কাছে থাকি
নরম ফুরফুরে পালকের মতন উড়ে যায় না-পাঠানো চিঠিরা, অথবা টুকরো টুকরো হাল্কা মেঘের মতন। স্পর্শের মায়াটুকু শুধু রয়ে যায়, অকারণ বিষাদের মতন।
কত চিঠিই তো লেখা হয়েও পাঠানো হয় নি, কত চিঠি লেখাই হয় নি । শুধু স্বপ্নের ভিতরের শ্বেতপাথরের টেবিলের উপরে ভাঁজ ভাঁজ করে সাজিয়ে রাখা ওরা। সব না লেখা চিঠি, কবিতা, গল্প, না গাওয়া গানের কলি, না ফোটা ফুলেরা ---
তোকে ছেড়ে যাইনি কখনও
সবসময়েই কাছে কাছে থাকি,
একসাথেই কলাপাতায় সাজিয়ে দিই
চাট্টি গরম ভাত, এক হাতা মুসুর ডাল
একচিমটি লবণ, একটুকরো পাতিলেবু-
খেতে খেতে কত কথা হয়
হাসিকথা দুঃখকথা আনন্দকথা ব্যথাকথা
তবু তুই ভয় পাস আমি দূরে যাবো বলে?
সেই যে তোর বুকের মধ্যে লেবুপাতার গন্ধ ছিল-
আমি বলতাম তোর মধ্যে লেবুর বাগান বুঝি?
আছে সেই বাগান এখনও?
ঐ যে আমাদের সজনেগাছে থাকতো দুটি কাঠবেড়ালী?
সজনেতলায় দৌড়া-দৌড়ি খেলতো ঝিমদুপুরে?
ওরা কোথায় আজ?
ঐ যে টালির চালের ঘরে বাসা বানাতো দুই চড়াইপাখি?
আমরা ওদের নাম দিয়েছিলাম ইমন আর রূপসা?
ওরা কোথায় গেল?
আমি আজ পাহাড়ী নদীতীরে
তুই আজ দূর সমুদ্রের কিনারায়-
তবু কিন্তু কাছে কাছে থাকি আমরা।
ইমন রূপসা কাঠবেড়ালী লেবুর বাগান-
সবাই আছে আমাদের ঘিরে-
বাইরে নাই বা রইলো!
তোকে ছেড়ে যাইনি কখনও-
কাছে কাছেই আছি,
কাছে কাছেই থাকি।
চিরদিন।
কত চিঠিই তো লেখা হয়েও পাঠানো হয় নি, কত চিঠি লেখাই হয় নি । শুধু স্বপ্নের ভিতরের শ্বেতপাথরের টেবিলের উপরে ভাঁজ ভাঁজ করে সাজিয়ে রাখা ওরা। সব না লেখা চিঠি, কবিতা, গল্প, না গাওয়া গানের কলি, না ফোটা ফুলেরা ---
তোকে ছেড়ে যাইনি কখনও
সবসময়েই কাছে কাছে থাকি,
একসাথেই কলাপাতায় সাজিয়ে দিই
চাট্টি গরম ভাত, এক হাতা মুসুর ডাল
একচিমটি লবণ, একটুকরো পাতিলেবু-
খেতে খেতে কত কথা হয়
হাসিকথা দুঃখকথা আনন্দকথা ব্যথাকথা
তবু তুই ভয় পাস আমি দূরে যাবো বলে?
সেই যে তোর বুকের মধ্যে লেবুপাতার গন্ধ ছিল-
আমি বলতাম তোর মধ্যে লেবুর বাগান বুঝি?
আছে সেই বাগান এখনও?
ঐ যে আমাদের সজনেগাছে থাকতো দুটি কাঠবেড়ালী?
সজনেতলায় দৌড়া-দৌড়ি খেলতো ঝিমদুপুরে?
ওরা কোথায় আজ?
ঐ যে টালির চালের ঘরে বাসা বানাতো দুই চড়াইপাখি?
আমরা ওদের নাম দিয়েছিলাম ইমন আর রূপসা?
ওরা কোথায় গেল?
আমি আজ পাহাড়ী নদীতীরে
তুই আজ দূর সমুদ্রের কিনারায়-
তবু কিন্তু কাছে কাছে থাকি আমরা।
ইমন রূপসা কাঠবেড়ালী লেবুর বাগান-
সবাই আছে আমাদের ঘিরে-
বাইরে নাই বা রইলো!
তোকে ছেড়ে যাইনি কখনও-
কাছে কাছেই আছি,
কাছে কাছেই থাকি।
চিরদিন।
Sunday, May 25, 2014
মেঘ-মানুষ
মনে পড়ে স্বপ্নের সেই মেঘমানুষকে, যে ভেদ মানতো না, বলতো পৃথিবী তার মা আর আকাশ তার পিতা, বলতো সে ভালোবাসে আলো, ভালোবাসে নদী যার মধ্যে কিনা পূর্বজ-পূর্বজাদের আশীর্বাদধারা বয়ে গেছে। বলতো, সে ভালোবাসে সবুজ গাছ, পশুপাখি। বলতো, সে ভালোবাসে অন্য মানুষদের। সে বলতো সে ঘৃণা করে নিষ্ঠুরতা আর ঘৃণাকে। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- কে তাকে রক্ষা করে? সে বলেছিল, কেউ না, জলের মধ্যে জল হয়ে ঝরে যায় সে। তার কাছে আরো কত কথা ছিলো জানার, কিন্তু ঘুম ভেঙে গেল যে!
জেগে উঠে মনে পড়ে আরেক মানুষকে, একদিন তাকে যুবক দেখেছিলাম, আজকে সে বুড়া হয়ে গেছে। তখনই তার চুল খুব পাতলা হয়ে গেছিল, এখন মাথাজোড়া মস্ত টাক। আমি খুঁজে বার করেছিলাম তার ম্যাট্রিকের সময় তোলা সাদাকালো ছবি, এক উজল চোখের কিশোর, যার মাথা ভর্তি চুল। সেই অমলকান্তি কিশোর অত বদলে গেছে? সময়ের মধ্যে পিছন ফিরে গিয়ে পিছনবাগে সাঁতার দিতে দিতে আর ফিরে পাওয়া যায় না সেই কিশোরকে?
অথবা সেই যুবককে যে ছোট্টো মেয়েটার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে রবিবারের সকালের বাজারে? এক অদ্ভুত ফলের বাজার বসেছে রেললাইনের উপরে, বাচ্চা মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ট্রেন এলে কী হবে? ফলওয়ালা হা হা করে হেসে বলে," ট্রেন আইলে চাপা পইড়া সবাই মইরা যামু, আবার ট্রেন চইলা গেলেই বাঁইচ্যা উঠমু! এইরম কইরাই তো রোজ রোজ আমরা মইরা যাই আর বাঁইচ্যা উঠি।"
আশেপাশের সবাই গলা ছেড়ে হেসে উঠেছে আর ভীষণ রকম কনফিউজড হয়ে গিয়ে মেয়েটা পাশে বাবার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলে, " তাই, বাবা?" হাঁটতে হাঁটতে ফলের বাজার পার হয়ে যায় তারা, মেয়েটাকে বাবা আশ্বস্ত করে, "এই লাইনে খুব ভোরে শুধু একবার মালগাড়ী যায়, সারাদিন আর কোনো গাড়ী যায় না।"
মেঘমানুষ বলে, "এ কী আশ্চর্য ব্যাপার! আকাশ, মাটি এসবও কি কেনাবেচা করা যায়? আমরা বুঝিনা! এই যে বিশুদ্ধ বাতাস বইছে- প্রাণের দীপগুলি জ্বালিয়ে রাখছে-এই যে স্নিগ্ধ জল কুলকুল করে বয়ে যায় রোদপোহানো পাথরের পাশ দিয়ে, আমাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখে এই জল-এসব তো আমাদের সম্পত্তি না। এগুলো কী করে কিনবে বা বেচবে কেউ? পৃথিবীর প্রত্যেকটা জায়গাই পবিত্র, পাইনের ঝিরিঝিরি পাতাগুলো, সব বালুকাতীর, বনের কুয়াশা, সব তৃণভূমি, সব কীটপতঙ্গ! এরা সকলেই আমাদের স্মৃতি আর অভিজ্ঞতায় পবিত্র।"
ঝড় এসেছে তা তো ভাবিনি তবু
জানালাটি খুলে চেয়ে দেখেছি-
বুক ভরে টেনে নিয়েছি বৃষ্টিগন্ধী হাওয়া,
ঐ হাওয়ার গন্ধ তোকে মনে পড়ায়।
খোলা চুলে মেখেছি সেই হাওয়ার আদর
চুপি চুপি কথার মতন কানের
লতিতে ছুঁয়েছে হাওয়ার হাত।
খুব বৃষ্টি হয়ে গেল সারাটা দুপুর
সঙ্গে ঝিলিক দেওয়া বিদ্যুৎ আর কড়কড়াৎ বাজ-
অঝোর বরিষণ চললো ঝরোঝর।
এখন বিকেল, বৃষ্টি থেমেছে কিছুক্ষণ আগে-
খোলা জানলা দিয়ে ভেসে আসে জুইঁফুল-গন্ধী হাওয়া,
বাগানের কুঁড়িগুলো ফুটেছে বৃষ্টির ছোঁয়ায়।
মাঠে পথে উঠোনে জমে থাকা জলে
মুখ দেখছে আকাশ-
দেখছে তার দ্রুত বদলে যেতে থাকা চেহারা,
বৃষ্টিশেষ মেঘেরা উড়ে যাচ্ছে,
আকাশ নীল হয়ে আসছে
আমার প্রিয় নীল রুমালটার মতন।
কবে হারিয়ে যাওয়া সেই রেশমী রুমাল-
শৈশবের কুসুম কুসুম গল্পগুলো জড়িয়ে নিয়ে
কোথায় চলে গিয়েছে নিরুদ্দেশের দেশে।
শুধু মনে আছে ওর রঙটা,
আকাশের মত নীল।
তোর মনে আছে কি
এইরকম বৃষ্টিশেষ বিকেলে
একদিন আমরা দেখেছিলাম ছোট্টো গর্তে
জমে থাকা জলে একজোড়া চড়াইয়ের কাকস্নান?
এখন আমি একাই দেখছি
উঠোনে জমা জলে স্নান করছে শুভ আর রূপসা
আমার টালির ঘরে বাসা বাঁধা চড়াই দুটির
ঐ দুটি নাম দিয়েছি।
*******
জেগে উঠে মনে পড়ে আরেক মানুষকে, একদিন তাকে যুবক দেখেছিলাম, আজকে সে বুড়া হয়ে গেছে। তখনই তার চুল খুব পাতলা হয়ে গেছিল, এখন মাথাজোড়া মস্ত টাক। আমি খুঁজে বার করেছিলাম তার ম্যাট্রিকের সময় তোলা সাদাকালো ছবি, এক উজল চোখের কিশোর, যার মাথা ভর্তি চুল। সেই অমলকান্তি কিশোর অত বদলে গেছে? সময়ের মধ্যে পিছন ফিরে গিয়ে পিছনবাগে সাঁতার দিতে দিতে আর ফিরে পাওয়া যায় না সেই কিশোরকে?
অথবা সেই যুবককে যে ছোট্টো মেয়েটার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে রবিবারের সকালের বাজারে? এক অদ্ভুত ফলের বাজার বসেছে রেললাইনের উপরে, বাচ্চা মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ট্রেন এলে কী হবে? ফলওয়ালা হা হা করে হেসে বলে," ট্রেন আইলে চাপা পইড়া সবাই মইরা যামু, আবার ট্রেন চইলা গেলেই বাঁইচ্যা উঠমু! এইরম কইরাই তো রোজ রোজ আমরা মইরা যাই আর বাঁইচ্যা উঠি।"
আশেপাশের সবাই গলা ছেড়ে হেসে উঠেছে আর ভীষণ রকম কনফিউজড হয়ে গিয়ে মেয়েটা পাশে বাবার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলে, " তাই, বাবা?" হাঁটতে হাঁটতে ফলের বাজার পার হয়ে যায় তারা, মেয়েটাকে বাবা আশ্বস্ত করে, "এই লাইনে খুব ভোরে শুধু একবার মালগাড়ী যায়, সারাদিন আর কোনো গাড়ী যায় না।"
মেঘমানুষ বলে, "এ কী আশ্চর্য ব্যাপার! আকাশ, মাটি এসবও কি কেনাবেচা করা যায়? আমরা বুঝিনা! এই যে বিশুদ্ধ বাতাস বইছে- প্রাণের দীপগুলি জ্বালিয়ে রাখছে-এই যে স্নিগ্ধ জল কুলকুল করে বয়ে যায় রোদপোহানো পাথরের পাশ দিয়ে, আমাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখে এই জল-এসব তো আমাদের সম্পত্তি না। এগুলো কী করে কিনবে বা বেচবে কেউ? পৃথিবীর প্রত্যেকটা জায়গাই পবিত্র, পাইনের ঝিরিঝিরি পাতাগুলো, সব বালুকাতীর, বনের কুয়াশা, সব তৃণভূমি, সব কীটপতঙ্গ! এরা সকলেই আমাদের স্মৃতি আর অভিজ্ঞতায় পবিত্র।"
ঝড় এসেছে তা তো ভাবিনি তবু
জানালাটি খুলে চেয়ে দেখেছি-
বুক ভরে টেনে নিয়েছি বৃষ্টিগন্ধী হাওয়া,
ঐ হাওয়ার গন্ধ তোকে মনে পড়ায়।
খোলা চুলে মেখেছি সেই হাওয়ার আদর
চুপি চুপি কথার মতন কানের
লতিতে ছুঁয়েছে হাওয়ার হাত।
খুব বৃষ্টি হয়ে গেল সারাটা দুপুর
সঙ্গে ঝিলিক দেওয়া বিদ্যুৎ আর কড়কড়াৎ বাজ-
অঝোর বরিষণ চললো ঝরোঝর।
এখন বিকেল, বৃষ্টি থেমেছে কিছুক্ষণ আগে-
খোলা জানলা দিয়ে ভেসে আসে জুইঁফুল-গন্ধী হাওয়া,
বাগানের কুঁড়িগুলো ফুটেছে বৃষ্টির ছোঁয়ায়।
মাঠে পথে উঠোনে জমে থাকা জলে
মুখ দেখছে আকাশ-
দেখছে তার দ্রুত বদলে যেতে থাকা চেহারা,
বৃষ্টিশেষ মেঘেরা উড়ে যাচ্ছে,
আকাশ নীল হয়ে আসছে
আমার প্রিয় নীল রুমালটার মতন।
কবে হারিয়ে যাওয়া সেই রেশমী রুমাল-
শৈশবের কুসুম কুসুম গল্পগুলো জড়িয়ে নিয়ে
কোথায় চলে গিয়েছে নিরুদ্দেশের দেশে।
শুধু মনে আছে ওর রঙটা,
আকাশের মত নীল।
তোর মনে আছে কি
এইরকম বৃষ্টিশেষ বিকেলে
একদিন আমরা দেখেছিলাম ছোট্টো গর্তে
জমে থাকা জলে একজোড়া চড়াইয়ের কাকস্নান?
এখন আমি একাই দেখছি
উঠোনে জমা জলে স্নান করছে শুভ আর রূপসা
আমার টালির ঘরে বাসা বাঁধা চড়াই দুটির
ঐ দুটি নাম দিয়েছি।
*******
ভালোবাসার বাড়ী
ধূপছায়া রঙের পর্দার আড়ালে এসে দাঁড়ায় সে। তাই ওকে স্পষ্ট করে দেখতে পাই নি কোনোদিন। শুধু ওর সজল চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে অস্তসূর্যের আলোয়। মুখের বাকীটা ভালো করে বোঝা যায় না। কেন জানি মনে হয় ওর অল্প-স্ফীত ঠোঁটে, এলোমেলো হাওয়াওড়া চুলে, করুণ হাতের ছন্দে অচেনা অভিমানের আভাস থাকে। কেজানে! বোঝা যায় না ভালো করে কিছুই। ও যে কে, তাও বুঝতে পারিনা।
দূর দিগন্তে হীরকধূলি ওড়ে, অস্ত-আভায় জ্বলজ্বল করে উঠে ডুবে যায় নীল বনরেখায়। ধূপছায়া পর্দার ওপারেও নামে আঁধারের নীলধারা। ওর চেহারা মিলিয়ে যায় ঝিল্লীর রাত্রিস্বরে। ও তো কথা বলে না, তাই বুঝি না কেন আসে, কী বলতে চায়! নীরবতার কারুণ্য দিয়ে গড়া হিরন্ময় ভাষা ভুলে গেছি সেই কবে!
আমাদের একখানি বাড়ী ছিলো, বড়ো ভালোবাসার বাড়ী। তিলতিল করে গড়ে উঠতে দেখেছিলাম তাকে। বাড়ীটায় ছিলো এক খোলা বারান্দা। বারান্দা ঘিরে ছিলো কনকচাঁপা, শিউলি, দোপাটি, টগর, বকুল, মাধবীলতা, জুঁই, বেলী, চামেলীরা । সারাবছর জুড়ে ঘুরে ঘুরে গানের আসর বসতো সেই বারান্দায়। সুখের গান দুখের গান উঠতো ভালোবাসার মানুষগুলির হৃদয় থেকে। বাড়ী ঘিরে ছিলো অনেকখানি খোলা জায়গা। সেখানে ফল আর ফুলের গাছেরা বেড়ে উঠেছিলো নিজেদের মতন। বাড়ীর বড়দাদা কইতেন ফুলের কেয়ারী, লতার বাহারী দেওয়া সাজানো বাগান কৃত্রিম, তারচেয়ে গাছেরা বেড়ে উঠুক এমনি এমনি, পাখিরা উড়ে আসুক, উড়ে যাক। কথাটা সবার ভারী মনে ধরেছিলো।
তারপরে সময়ের ধারা বয়ে গেলো, দেখতে দেখতে কত চেনা অচেনা হয়ে গেল, কত পর হলো আপন, কত আপন সরে গেলো দূরে। বাড়ী ও বদলে গেলো কত! নিজের মতন বেড়ে ওঠা বাগানটাও বদলে গেলো। ক্ষুরের মতন ধারালো হাওয়া খসিয়ে দিলো কত নতুন ফোটা ফুলের পাপড়ি! বৃথা রক্তঝরানো যুদ্ধে হারিয়ে গেলো কত কাছেরজন। কত চেনামুখ একে একে হারিয়ে গেলো সেই হৃদয়নিংড়ানো সঙ্গীতসভা থেকে। অনেক বেদনাপ্রহর পার হয়ে একদিন আমারও পালা এলো, চলে যাবার পালা। একাকী স্টেশনে গিয়ে বিদায়ের ট্রেনে উঠে বসলাম। আর কি দেখা হবে? আর কি ফেরা হবে? এতদিনের এত টান কি সব মিথ্যা ছিলো? নাহলে কিছুই রইলো না কেন? সব ভোজবাজির মতন মিলিয়ে গেলো? নাকি মেলায় নি? কোথাও রয়ে গেছে গোপণে?
এলোমেলো ভাবনা জড়িয়ে যাচ্ছিলো রেশমী সুতার গোছার মতন। আশা-নিরাশার দোলা। কখনো জানালা আয়না হয়ে যায়, সরোবরতীরে নুয়ে পড়া মায়াবী নার্গিস ফুল দুলে ওঠে আয়নায়। চমকে উঠে মুখ ঢাকি--না না না না, এভাবে প্রতারিত কোরো না। আবার দেখি জানালা ফিরে এসেছে, বাইরে দূর দিগন্ত। কেউ সাথে নেই বলে মনে করেছিলাম কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চললো সেই ধূপছায়ালীন অভিমানী। কে সে? কেন তাকে চিনতে পারি না?
"মৃদু বৃষ্টির ভিতর দিয়ে
এগিয়ে চলেছে পথ পাহাড় উপত্যকা-
পিছনে গতজন্মের বাড়ী কখন ঝাপসা হয়ে গেছে।
কোন্ দূর সন্ধ্যানামা মাঠে,
এলোমেলো জলরঙ মেখে-
দাঁড়িয়ে আছে হয়তো বা!
কেজানে!
অবিশ্রান্ত লবণাক্ত বৃষ্টি -
আমার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে,
দূরের আশ্চর্য সূর্যাস্ত দেখতে দেয় না।
ক্রমে অন্ধকারে ঢেকে যায় বিশ্বচরাচর
এখন শুধু চাকার একঘেয়ে আওয়াজ-
রক্তস্পন্দিত হৃৎপিন্ডের শব্দের মতন
ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ....
জানালা দিয়ে বাইরে চোখ ফেলি
বৃষ্টিমেঘজল কখন পিছনে চলে গেছে
নি:সীম কালো আকাশে জ্বলছে
অগণন নক্ষত্রের অফুরাণ বিস্ময়।
তারাদের পাশ দিয়ে
উড়ে যেতে দেখি সেই পাখিকে-
ছায়াপথের হৃদয়ের দিকে উড়ে যায়
সেই শুভ্রডানার অলীক পাখি।
যেতে যেতে একবার ফিরে তাকায়।
আবার বৃষ্টি নামে ঝরঝর-
এবারে ভিতরের আকাশে।
***
দূর দিগন্তে হীরকধূলি ওড়ে, অস্ত-আভায় জ্বলজ্বল করে উঠে ডুবে যায় নীল বনরেখায়। ধূপছায়া পর্দার ওপারেও নামে আঁধারের নীলধারা। ওর চেহারা মিলিয়ে যায় ঝিল্লীর রাত্রিস্বরে। ও তো কথা বলে না, তাই বুঝি না কেন আসে, কী বলতে চায়! নীরবতার কারুণ্য দিয়ে গড়া হিরন্ময় ভাষা ভুলে গেছি সেই কবে!
আমাদের একখানি বাড়ী ছিলো, বড়ো ভালোবাসার বাড়ী। তিলতিল করে গড়ে উঠতে দেখেছিলাম তাকে। বাড়ীটায় ছিলো এক খোলা বারান্দা। বারান্দা ঘিরে ছিলো কনকচাঁপা, শিউলি, দোপাটি, টগর, বকুল, মাধবীলতা, জুঁই, বেলী, চামেলীরা । সারাবছর জুড়ে ঘুরে ঘুরে গানের আসর বসতো সেই বারান্দায়। সুখের গান দুখের গান উঠতো ভালোবাসার মানুষগুলির হৃদয় থেকে। বাড়ী ঘিরে ছিলো অনেকখানি খোলা জায়গা। সেখানে ফল আর ফুলের গাছেরা বেড়ে উঠেছিলো নিজেদের মতন। বাড়ীর বড়দাদা কইতেন ফুলের কেয়ারী, লতার বাহারী দেওয়া সাজানো বাগান কৃত্রিম, তারচেয়ে গাছেরা বেড়ে উঠুক এমনি এমনি, পাখিরা উড়ে আসুক, উড়ে যাক। কথাটা সবার ভারী মনে ধরেছিলো।
তারপরে সময়ের ধারা বয়ে গেলো, দেখতে দেখতে কত চেনা অচেনা হয়ে গেল, কত পর হলো আপন, কত আপন সরে গেলো দূরে। বাড়ী ও বদলে গেলো কত! নিজের মতন বেড়ে ওঠা বাগানটাও বদলে গেলো। ক্ষুরের মতন ধারালো হাওয়া খসিয়ে দিলো কত নতুন ফোটা ফুলের পাপড়ি! বৃথা রক্তঝরানো যুদ্ধে হারিয়ে গেলো কত কাছেরজন। কত চেনামুখ একে একে হারিয়ে গেলো সেই হৃদয়নিংড়ানো সঙ্গীতসভা থেকে। অনেক বেদনাপ্রহর পার হয়ে একদিন আমারও পালা এলো, চলে যাবার পালা। একাকী স্টেশনে গিয়ে বিদায়ের ট্রেনে উঠে বসলাম। আর কি দেখা হবে? আর কি ফেরা হবে? এতদিনের এত টান কি সব মিথ্যা ছিলো? নাহলে কিছুই রইলো না কেন? সব ভোজবাজির মতন মিলিয়ে গেলো? নাকি মেলায় নি? কোথাও রয়ে গেছে গোপণে?
এলোমেলো ভাবনা জড়িয়ে যাচ্ছিলো রেশমী সুতার গোছার মতন। আশা-নিরাশার দোলা। কখনো জানালা আয়না হয়ে যায়, সরোবরতীরে নুয়ে পড়া মায়াবী নার্গিস ফুল দুলে ওঠে আয়নায়। চমকে উঠে মুখ ঢাকি--না না না না, এভাবে প্রতারিত কোরো না। আবার দেখি জানালা ফিরে এসেছে, বাইরে দূর দিগন্ত। কেউ সাথে নেই বলে মনে করেছিলাম কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চললো সেই ধূপছায়ালীন অভিমানী। কে সে? কেন তাকে চিনতে পারি না?
"মৃদু বৃষ্টির ভিতর দিয়ে
এগিয়ে চলেছে পথ পাহাড় উপত্যকা-
পিছনে গতজন্মের বাড়ী কখন ঝাপসা হয়ে গেছে।
কোন্ দূর সন্ধ্যানামা মাঠে,
এলোমেলো জলরঙ মেখে-
দাঁড়িয়ে আছে হয়তো বা!
কেজানে!
অবিশ্রান্ত লবণাক্ত বৃষ্টি -
আমার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে,
দূরের আশ্চর্য সূর্যাস্ত দেখতে দেয় না।
ক্রমে অন্ধকারে ঢেকে যায় বিশ্বচরাচর
এখন শুধু চাকার একঘেয়ে আওয়াজ-
রক্তস্পন্দিত হৃৎপিন্ডের শব্দের মতন
ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ ....
জানালা দিয়ে বাইরে চোখ ফেলি
বৃষ্টিমেঘজল কখন পিছনে চলে গেছে
নি:সীম কালো আকাশে জ্বলছে
অগণন নক্ষত্রের অফুরাণ বিস্ময়।
তারাদের পাশ দিয়ে
উড়ে যেতে দেখি সেই পাখিকে-
ছায়াপথের হৃদয়ের দিকে উড়ে যায়
সেই শুভ্রডানার অলীক পাখি।
যেতে যেতে একবার ফিরে তাকায়।
আবার বৃষ্টি নামে ঝরঝর-
এবারে ভিতরের আকাশে।
***
অন্তর্লীন
মেঘগুলো একটু আগে গোলাপী ছিলো,এখন সোনালী কমলা। ওই দূরে নীল জলরেখার থেকে লাফ দিয়ে ওঠে ঝকমকে সূর্য। ফেনামাখা ঢেউগুলো আসছে আর আসছে,ভেঙে পড়ছে পায়ের কাছে। দুধসাদা ফেনার রঙ লালচেসোনালী লাগে। আকাশটা পালিশ করা নীলাপাথরের মতন নীল!
আজকে কী ঝকমকে দিন! বেশ গরম হবে দুপুরটা। আমার চিকনবেলার দেশে এমন দিন আসতো শুধু শরতের সকালে, কাশফুল দোলা ভরা মাঠের উপর দিয়ে ভেসে আসতো ঢাকের বোল-ঢ্যাম কুড়কুড় বাদ বাজে ঢাকে পড়লো কাঠি/যা দিবি মা তাই হবে আজ পরমান্নের বাটি..... কে বলতো এই ছড়া? কোথায় পড়েছিলাম ?
সূর্যের উপর মেঘ ভেসে এসে হাল্কা ছায়া পড়ে, আমার আধো স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে ভেসে আসে তার মুখ। চিলেকোঠার পাশে ছাদের উপরে আমরা দুটিতে খেলছি-পুজোর ছুটির প্রথম দিন-এমনই ছায়া পড়ে এলো আমাদের উপরে, ওর মুখ মেঘলা হয়ে গেলো-যা:,বৃষ্টি হবে নাকি রে সুমী?ও শরতের দিনে বৃষ্টি ভালোবাসতো না একদম। আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি হেসে উঠলাম-না:, এতো আবছায়া! জোর হাওয়ায় মেঘ উড়ে গেল, আমাদের মুখে আবার আলো! সে কবেকার পুজোর ছুটির কথা? মনে হয় যেন এই সেদিন!
লাউমাচায় ফুল ফুটেছে। আমরা নরম নরম লাউপাতা তুলছি, মা বলেছে তুলতে, কিজানি রাঁধতে লাগবে। মাচায় একপাশে ডালপালায় লুকানো একটা ছোট্টো বাসা। কী পাখির বাসা রে? টুনটুনির নাকি? আরেকটু কাছে গিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি চকচকে পুঁতির মতন চোখ মেলে আমাদের দেখছে মা-পাখি। আমরা সরে আসি, ওদের ভয় পাইয়ে দেবো কেন শুধু শুধু? কবের কথা? বহুদিন হয়ে গেলো?তারপরে কি সবুজহলুদনীললাল সেইসব ওম-ওম দিনগুলো চলে গেলো ওই উড়ে যাওয়া মেঘেদের মতন? এ কোথায় আমি? এখানে কি আমার থাকার কথা ছিলো?
লাল হয়ে যাওয়া ওর শার্ট, চোখ বন্ধ! চুলগুলোতে ওই লাল জমাট বেঁধে গেছে। না না না, আমি মনে করতে চাই না। তবু ভুলে যাওয়া সন্ধ্যার আকাশে একটা কাটা ঘুড়ি ভেসে যায়, আস্তে আস্তে আরো আরো দূরে, ওই অনেক দূরের সাঁঝতারার দিকে। আমিও আসছি শরণ্য, ফাঁকি দিয়ে কতদূরে যাবি তুই?দেখি, কখন ধরতে পারি।
চোখ মেলি, একঝাঁক সমুদ্রপাখি উড়ছে, ঢেউয়ের উপরে উপরে। একবার এক সমুদ্রতীরের শহরে দেখেছিলাম দলবেঁধে ওড়ার সময় ওরা কেমন প্যাটার্ন তৈরী করে। অজস্র পাখি ঝাঁক বেধে উড়ছে-কখনো গোল ছাতার মতন হয়ে যাচ্ছে, কখনো মস্ত বাটির মতন, কখনো অচেনা কোনো আকার! সেইবা কবেকার কথা?
পায়ের কাছে গড়িয়ে আসে একটা লাল বল, কার বল? হাতে তুলে নিয়ে তাকাই এদিক ওদিক, একটা ছোট্টো মেয়ে,কুঁচি দেওয়া ফ্রকের ঝালর উড়ছে হাওয়ায়, দৌড়ে এসে সে আমার কাছে দাঁড়ায়, বলটা চায়, বলটা ওর। পুতুল-পুতুল মুখের মেয়েটা, মাথার ঝামর-ঝামর বাদামী চুলে লালনীল পুঁতির সাজ। ওর দিকে বলটা বাড়িয়ে দিই, জিজ্ঞেস করি, "তোমার নাম কী?" সে বলে,"রিমা।" গলা শুনে কাকে যেন মনে পড়ে। বল নিয়ে চলে যাবার আগে সে বলে সে মায়ের সঙ্গে এখানে এসেছে, ওই কটেজে আছে। সুন্দর একটা ঝিনুকের খোলা সে দেখায় আমায়, কুড়িয়ে পেয়েছে।
মাত্র এই মাসটাই বাইরে আসার অবস্থা থাকবে, পরের মাসে কী হয় কেজানে। তাই প্রত্যেকটা দিনকে নিংড়ে নিতে চাই সবটুকু আলো, হাওয়া,জল, আগুন সমেত। ওই আকাশের নীলটুকু মায়া-অঞ্জনের মতন পরে নিতে পারলে কেমন হতো? আহা জীবন, জীবন, জীবন-কী মধুর এই বেঁচে থাকার স্বল্প সময়টুকু! আহা শরণ্য , আমি স্বার্থপর, তোর সময় আরো কত কম ছিলো! তুই কি জানতে পেরেছিলি?তাই অমন সবসময়ে অস্থির হয়ে থাকতিস? আর দেরি নেই, আমাকে নিয়ে যাবে যে জাহাজ, তার পাল ও দেখা দিয়েছে দিগন্তরেখার উপরে। এসো, এসো, তাড়াতাড়ি এসো।
আহা শরণ্য, তুই এখনো সেই কিশোরটিই তো আছিস, আমার চুলে ধূসরতা, আমার মুখে সময়ের কাটাকুটি! সব খসে যাবে, আর সময় আমাকে ধরতে পারবে না। সাগরবেলায় ঢেউ আসে ঢেউ যায়। অবিস্মরণীয় সূক্ষ কারুকাজ বুনে যায় বালিতে-কে বা তাদের দ্যাখে? হয়তো কেউ দ্যাখে!
একলা ঘুড়িটা ভেসে যাচ্ছে সন্ধ্যাতারার দিকে, নিচে কত শত শঙ্খ বেজে উঠেছে, শঙ্খধ্বনি ঘরে ডেকে বলছে-" ফেরার সাথীর সঙ্গ নে।" হ্যাঁ, আসছি,আসছি তো! এই তো এলাম বলে। আর একটুখানি শুধু। "হে মোর সন্ধ্যা, যাহা কিছু ছিলো সাথে/রাখিনু তোমার অঞ্চলতলে ঢাকি/আঁধারের সাথী, তোমার করুণ হাতে/ বাঁধিয়া দিলেম আমার হাতের রাখী।"
(শেষ)
আজকে কী ঝকমকে দিন! বেশ গরম হবে দুপুরটা। আমার চিকনবেলার দেশে এমন দিন আসতো শুধু শরতের সকালে, কাশফুল দোলা ভরা মাঠের উপর দিয়ে ভেসে আসতো ঢাকের বোল-ঢ্যাম কুড়কুড় বাদ বাজে ঢাকে পড়লো কাঠি/যা দিবি মা তাই হবে আজ পরমান্নের বাটি..... কে বলতো এই ছড়া? কোথায় পড়েছিলাম ?
সূর্যের উপর মেঘ ভেসে এসে হাল্কা ছায়া পড়ে, আমার আধো স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে ভেসে আসে তার মুখ। চিলেকোঠার পাশে ছাদের উপরে আমরা দুটিতে খেলছি-পুজোর ছুটির প্রথম দিন-এমনই ছায়া পড়ে এলো আমাদের উপরে, ওর মুখ মেঘলা হয়ে গেলো-যা:,বৃষ্টি হবে নাকি রে সুমী?ও শরতের দিনে বৃষ্টি ভালোবাসতো না একদম। আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি হেসে উঠলাম-না:, এতো আবছায়া! জোর হাওয়ায় মেঘ উড়ে গেল, আমাদের মুখে আবার আলো! সে কবেকার পুজোর ছুটির কথা? মনে হয় যেন এই সেদিন!
লাউমাচায় ফুল ফুটেছে। আমরা নরম নরম লাউপাতা তুলছি, মা বলেছে তুলতে, কিজানি রাঁধতে লাগবে। মাচায় একপাশে ডালপালায় লুকানো একটা ছোট্টো বাসা। কী পাখির বাসা রে? টুনটুনির নাকি? আরেকটু কাছে গিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি চকচকে পুঁতির মতন চোখ মেলে আমাদের দেখছে মা-পাখি। আমরা সরে আসি, ওদের ভয় পাইয়ে দেবো কেন শুধু শুধু? কবের কথা? বহুদিন হয়ে গেলো?তারপরে কি সবুজহলুদনীললাল সেইসব ওম-ওম দিনগুলো চলে গেলো ওই উড়ে যাওয়া মেঘেদের মতন? এ কোথায় আমি? এখানে কি আমার থাকার কথা ছিলো?
লাল হয়ে যাওয়া ওর শার্ট, চোখ বন্ধ! চুলগুলোতে ওই লাল জমাট বেঁধে গেছে। না না না, আমি মনে করতে চাই না। তবু ভুলে যাওয়া সন্ধ্যার আকাশে একটা কাটা ঘুড়ি ভেসে যায়, আস্তে আস্তে আরো আরো দূরে, ওই অনেক দূরের সাঁঝতারার দিকে। আমিও আসছি শরণ্য, ফাঁকি দিয়ে কতদূরে যাবি তুই?দেখি, কখন ধরতে পারি।
চোখ মেলি, একঝাঁক সমুদ্রপাখি উড়ছে, ঢেউয়ের উপরে উপরে। একবার এক সমুদ্রতীরের শহরে দেখেছিলাম দলবেঁধে ওড়ার সময় ওরা কেমন প্যাটার্ন তৈরী করে। অজস্র পাখি ঝাঁক বেধে উড়ছে-কখনো গোল ছাতার মতন হয়ে যাচ্ছে, কখনো মস্ত বাটির মতন, কখনো অচেনা কোনো আকার! সেইবা কবেকার কথা?
পায়ের কাছে গড়িয়ে আসে একটা লাল বল, কার বল? হাতে তুলে নিয়ে তাকাই এদিক ওদিক, একটা ছোট্টো মেয়ে,কুঁচি দেওয়া ফ্রকের ঝালর উড়ছে হাওয়ায়, দৌড়ে এসে সে আমার কাছে দাঁড়ায়, বলটা চায়, বলটা ওর। পুতুল-পুতুল মুখের মেয়েটা, মাথার ঝামর-ঝামর বাদামী চুলে লালনীল পুঁতির সাজ। ওর দিকে বলটা বাড়িয়ে দিই, জিজ্ঞেস করি, "তোমার নাম কী?" সে বলে,"রিমা।" গলা শুনে কাকে যেন মনে পড়ে। বল নিয়ে চলে যাবার আগে সে বলে সে মায়ের সঙ্গে এখানে এসেছে, ওই কটেজে আছে। সুন্দর একটা ঝিনুকের খোলা সে দেখায় আমায়, কুড়িয়ে পেয়েছে।
মাত্র এই মাসটাই বাইরে আসার অবস্থা থাকবে, পরের মাসে কী হয় কেজানে। তাই প্রত্যেকটা দিনকে নিংড়ে নিতে চাই সবটুকু আলো, হাওয়া,জল, আগুন সমেত। ওই আকাশের নীলটুকু মায়া-অঞ্জনের মতন পরে নিতে পারলে কেমন হতো? আহা জীবন, জীবন, জীবন-কী মধুর এই বেঁচে থাকার স্বল্প সময়টুকু! আহা শরণ্য , আমি স্বার্থপর, তোর সময় আরো কত কম ছিলো! তুই কি জানতে পেরেছিলি?তাই অমন সবসময়ে অস্থির হয়ে থাকতিস? আর দেরি নেই, আমাকে নিয়ে যাবে যে জাহাজ, তার পাল ও দেখা দিয়েছে দিগন্তরেখার উপরে। এসো, এসো, তাড়াতাড়ি এসো।
আহা শরণ্য, তুই এখনো সেই কিশোরটিই তো আছিস, আমার চুলে ধূসরতা, আমার মুখে সময়ের কাটাকুটি! সব খসে যাবে, আর সময় আমাকে ধরতে পারবে না। সাগরবেলায় ঢেউ আসে ঢেউ যায়। অবিস্মরণীয় সূক্ষ কারুকাজ বুনে যায় বালিতে-কে বা তাদের দ্যাখে? হয়তো কেউ দ্যাখে!
একলা ঘুড়িটা ভেসে যাচ্ছে সন্ধ্যাতারার দিকে, নিচে কত শত শঙ্খ বেজে উঠেছে, শঙ্খধ্বনি ঘরে ডেকে বলছে-" ফেরার সাথীর সঙ্গ নে।" হ্যাঁ, আসছি,আসছি তো! এই তো এলাম বলে। আর একটুখানি শুধু। "হে মোর সন্ধ্যা, যাহা কিছু ছিলো সাথে/রাখিনু তোমার অঞ্চলতলে ঢাকি/আঁধারের সাথী, তোমার করুণ হাতে/ বাঁধিয়া দিলেম আমার হাতের রাখী।"
(শেষ)
রণজয়
আকাশটা কী তীব্র নীল! সাদা কাপড় ঘষা দিলে যেন নীল রঙ উঠে আসবে! একটুকরো মেঘ কোথাও নেই। হেমন্তের আকাশে শিরশিরে শীত, পুরানো পাতারা ঝরে যাচ্ছে। এমনই অভিমানী হেমন্তের দিন ছিলো সেদিন। রণোর চলে যাবার দিন।
প্রিয়তোষ চুপ করে বসে থাকে বারান্দায়, সে এরকমই বসে থাকতো ও দেরি করে এলে যাতে হাতে নাতে ধরতে পারে। পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়েছে সূর্য, বেলা ফুরিয়ে এলো। চশমাটা ঝাপসা হয়ে গেছে, সে চশমা খুলে মুছতে থাকে। নির্মলা চা নিয়ে আসে, প্রিয়তোষ চেয়ে থাকে ফাঁকা চোখে। আরো কার যেন আসার কথা ছিলো?
"চলো ভিতরে চলো, এখানে ঠান্ডায় আর থেকো না। চলো।" কে বলছে? নির্মলা? হ্যাঁ নির্মলাই তো! প্রিয়তোষ আর কার গলা শোনার জন্য কান খাড়া করে ছিলো?সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? মাঝে মাঝে সে কেন রণোর গলা শুনতে পায়?
রণো কুন্ঠিত গলায় আস্তে আস্তে বলছে,"ফিরতে দেরি হয়ে গেলো বাবা। মাফ করে দাও। সারাদিন কিছু খাই নি, খুব ক্লান্ত। আজকে কিছু বোলো না।"
ঠোঁট নড়ে প্রিয়তোষের, "আয় খোকা, তোর জন্য মিষ্টি এনেছি। কিছু বলবো নারে, আয়। তোর মা মিষ্টি বেড়ে দেবে আমাদের, একসাথে খাবো, আয়।"
রণজয় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, একপাও এগিয়ে আসে না। প্রিয়তোষ এগিয়ে যায়, বলে,"কীরে কী হলো? সত্যি সত্যি দিচ্ছি। আর তোকে কখনো কিছু বলবো না খোকা। তুই কাছে আয়। ভয় পাস না। কিছু বলবো না তোকে।"
রণজয় অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,বলে,"আমি চলে যাচ্ছি বাবা, মাকে বোলো আমি তোমাদের সবাইকে ভালোবাসতাম। ভাইকে আর বোনকেও বোলো। তোমাদের সাথে থাকতে আমার খুব ইচ্ছে ছিলো। যদি আমায় ওরকম না করতে! তোমরা তো আমায় দেখতে পারোনা, ভাইবোনদের সাথে আমায় খেলতে দাও না। ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি। তোমরা ভালো থেকো।"
মিলিয়ে গেল রণজয়, প্রিয়তোষ চিৎকার করে উঠতে চায়, গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না। তারপরে শোনে,"কী হলো তোমার? স্বপ্ন দেখেছ? বোবায় ধরেছে? উঠে বসো, উঠে বসো।" নির্মলার গলা। ও:, স্বপ্ন! সব স্বপ্ন! স্বপ্ন এত স্পষ্ট হয়?
প্রিয়তোষ উঠে বসে, গলা শুকিয়ে কাঠ। জল চায়। জল এনে দেয় নির্মলা। জল খেয়ে সে বলে,"স্পষ্ট দেখলাম খোকাকে। আমি মিষ্টি খাওয়াতে চাই, ও আসে না, ভয় পায়। তারপরে চলে গেল।"
প্রিয়তোষের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ে, সে বলে,"আমাকে এত স্বপ্নে দেখা দেয় কেন বলোতো? আমি কত কষ্ট দিয়েছি বেচারাকে। তোমার ওকে মনে পড়ে না? তুমি ওকে স্বপ্নে দেখোনা? তুমি যদি ছোটো দুটোর মত ওকেও একটু আগলে রাখতে .....তাহলে হয়তো আমি ওকে বোকার মতন ওভাবে.... তুমি ওর নামে কত নালিশ করতে, আর আমিও ওকে ...ওহ, কীভাবে মারতাম..আহ, কিছু বলতো না শেষদিকে, আমার সামনে কাঁদতোও না। ওর ভাইবোনে কত আবদার করতো পুজোর সময় জামাটামার জন্য, ও কিছু চাইতো না। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম কিছু বিশেষ জামাটামা ওর চাই কিনা, কেমন আস্তে আস্তে বলেছিলো -"তোমার যা ইচ্ছা তাই দিও।" কেমন করে প্রণাম করতো দশমীর দিন, পায়ের পাতায় মাথা ছুঁয়ে। আমরা ওকে বুঝতে পারিনি নির্মলা...."
নির্মলা কেঁদে বলে, "তুমি এমন কোরোনা। কেন শুধু নিজের উপরে সব নিচ্ছ? আমার দোষও তো কিছু কম না। মা হয়ে ওকে কষ্টের দিকে ঠেলে দিতাম। ছোটন আর মিতিনকে একবার নাকি বলেছিলো ওর কেউ নেই। আমরা নাকি ওকে অনাথ-আশ্রম থেকে এনেছিলাম। যেইসব সন্ধ্যেবেলা শাস্তি দিতে, সেইসব রাতে খেতে দিতে তুমি বারণ করতে বলে কত রাতে ওকে খেতে দেই নি। কিছু বলতো না, চাইতোও না খেতে। মিতিন নাকি একবার লুকিয়ে খাবার নিয়ে দিয়েছিলো, ও নেয় নি, বলেছিলো বাবা তোকে বকবে বোন।" নির্মলা চোখে আঁচল দেয়।
প্রিয়তোষ বলে,"মনটা শান্তি পায় না। চলো রণোর নামে কোথাও কিছু দিয়ে আসি আমরা।"
নির্মলা বলে,"দিও। এখন ঘুমাও। যদি ছোটন মিতিন শোনে তুমি ঘুমাতে পারোনা, ওরা দু:খ পাবে। মিতিন বলছিলো রণো ওকে ছবি এঁকে দিতো আর ছোটনকেও দিতো। তুমি ওদের সঙ্গে খেলতে বারণ করেছিলে বলে খেলতো না ও। তারপরে তো ..... মিতিন বলছিলো, ওর সঙ্গে খেলা করতে ওদের খুব ইচ্ছে করতো। বলছিলো দাদা একা বলেই তো আমরা এসেছিলাম মা, ওর খেলার সাথী কেউ ছিলো না কিনা! এবারে আমরাও চলে যাই তাহলে?"
প্রিয়তোষ চমকে ওঠে, "এইসব বলে ওরা? তুমি ওদের বুঝিয়ে বোলো। ওদের তো কোনোদিন আমরা কিছু কষ্ট দেই নি! কোনোদিন ওদের কিছু বলবো না। চলো সবাই মিলে দূরে কোথাও বেড়াতে যাই, রণোর নামে কোথাও কিছু দিয়ে আসি।"
"আচ্ছা, তাই হবে। এখন তুমি ঘুমাও তো দেখি।"
প্রিয়তোষ শুয়ে পড়ে, চোখ বন্ধ করতেই নীল আকাশভরা সোনালী আলো, তার মধ্যে রণজয়ের অভিমানী মুখ ফুটে ওঠে, কী যেন সে বলে।
প্রিয়তোষ বিড়বিড় করে,"আহা তুই আলোর ছেলে, ভালোবেসে এসেছিলি আমার ঘরে, রাখতে পারলাম না হতভাগ্য আমি। কষ্ট পেয়ে ফিরে গেলি। মাফও চাইতে সময় পেলাম না। একদিন তো দেখা হবে, সেদিন মাফ চাইবো। মাফ করে দিস খোকা সেদিন। করবি না? "
আকাশভরা আলোয় বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে ওঠে দুটি অভিমানী চোখ, তাতে শিশিরের মতন অশ্রু, টপটপ করে ঝরে পড়তে থাকে প্রিয়তোষের বন্ধ চোখের পাতার উপরে। কানে আসে সেই শেষ মন্ত্র, "মধুবাতা ঋতায়তে/ মধুক্ষরন্তি সিন্ধব:/ মাধ্বীর্ণ সন্তোষধী...."
ওই মধুময় বাতাসের সঙ্গে সে মিশে গেছে। সে আলোর ঘরে ফিরে গেছে।
(শেষ)
প্রিয়তোষ চুপ করে বসে থাকে বারান্দায়, সে এরকমই বসে থাকতো ও দেরি করে এলে যাতে হাতে নাতে ধরতে পারে। পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়েছে সূর্য, বেলা ফুরিয়ে এলো। চশমাটা ঝাপসা হয়ে গেছে, সে চশমা খুলে মুছতে থাকে। নির্মলা চা নিয়ে আসে, প্রিয়তোষ চেয়ে থাকে ফাঁকা চোখে। আরো কার যেন আসার কথা ছিলো?
"চলো ভিতরে চলো, এখানে ঠান্ডায় আর থেকো না। চলো।" কে বলছে? নির্মলা? হ্যাঁ নির্মলাই তো! প্রিয়তোষ আর কার গলা শোনার জন্য কান খাড়া করে ছিলো?সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? মাঝে মাঝে সে কেন রণোর গলা শুনতে পায়?
রণো কুন্ঠিত গলায় আস্তে আস্তে বলছে,"ফিরতে দেরি হয়ে গেলো বাবা। মাফ করে দাও। সারাদিন কিছু খাই নি, খুব ক্লান্ত। আজকে কিছু বোলো না।"
ঠোঁট নড়ে প্রিয়তোষের, "আয় খোকা, তোর জন্য মিষ্টি এনেছি। কিছু বলবো নারে, আয়। তোর মা মিষ্টি বেড়ে দেবে আমাদের, একসাথে খাবো, আয়।"
রণজয় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, একপাও এগিয়ে আসে না। প্রিয়তোষ এগিয়ে যায়, বলে,"কীরে কী হলো? সত্যি সত্যি দিচ্ছি। আর তোকে কখনো কিছু বলবো না খোকা। তুই কাছে আয়। ভয় পাস না। কিছু বলবো না তোকে।"
রণজয় অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,বলে,"আমি চলে যাচ্ছি বাবা, মাকে বোলো আমি তোমাদের সবাইকে ভালোবাসতাম। ভাইকে আর বোনকেও বোলো। তোমাদের সাথে থাকতে আমার খুব ইচ্ছে ছিলো। যদি আমায় ওরকম না করতে! তোমরা তো আমায় দেখতে পারোনা, ভাইবোনদের সাথে আমায় খেলতে দাও না। ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি। তোমরা ভালো থেকো।"
মিলিয়ে গেল রণজয়, প্রিয়তোষ চিৎকার করে উঠতে চায়, গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না। তারপরে শোনে,"কী হলো তোমার? স্বপ্ন দেখেছ? বোবায় ধরেছে? উঠে বসো, উঠে বসো।" নির্মলার গলা। ও:, স্বপ্ন! সব স্বপ্ন! স্বপ্ন এত স্পষ্ট হয়?
প্রিয়তোষ উঠে বসে, গলা শুকিয়ে কাঠ। জল চায়। জল এনে দেয় নির্মলা। জল খেয়ে সে বলে,"স্পষ্ট দেখলাম খোকাকে। আমি মিষ্টি খাওয়াতে চাই, ও আসে না, ভয় পায়। তারপরে চলে গেল।"
প্রিয়তোষের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ে, সে বলে,"আমাকে এত স্বপ্নে দেখা দেয় কেন বলোতো? আমি কত কষ্ট দিয়েছি বেচারাকে। তোমার ওকে মনে পড়ে না? তুমি ওকে স্বপ্নে দেখোনা? তুমি যদি ছোটো দুটোর মত ওকেও একটু আগলে রাখতে .....তাহলে হয়তো আমি ওকে বোকার মতন ওভাবে.... তুমি ওর নামে কত নালিশ করতে, আর আমিও ওকে ...ওহ, কীভাবে মারতাম..আহ, কিছু বলতো না শেষদিকে, আমার সামনে কাঁদতোও না। ওর ভাইবোনে কত আবদার করতো পুজোর সময় জামাটামার জন্য, ও কিছু চাইতো না। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম কিছু বিশেষ জামাটামা ওর চাই কিনা, কেমন আস্তে আস্তে বলেছিলো -"তোমার যা ইচ্ছা তাই দিও।" কেমন করে প্রণাম করতো দশমীর দিন, পায়ের পাতায় মাথা ছুঁয়ে। আমরা ওকে বুঝতে পারিনি নির্মলা...."
নির্মলা কেঁদে বলে, "তুমি এমন কোরোনা। কেন শুধু নিজের উপরে সব নিচ্ছ? আমার দোষও তো কিছু কম না। মা হয়ে ওকে কষ্টের দিকে ঠেলে দিতাম। ছোটন আর মিতিনকে একবার নাকি বলেছিলো ওর কেউ নেই। আমরা নাকি ওকে অনাথ-আশ্রম থেকে এনেছিলাম। যেইসব সন্ধ্যেবেলা শাস্তি দিতে, সেইসব রাতে খেতে দিতে তুমি বারণ করতে বলে কত রাতে ওকে খেতে দেই নি। কিছু বলতো না, চাইতোও না খেতে। মিতিন নাকি একবার লুকিয়ে খাবার নিয়ে দিয়েছিলো, ও নেয় নি, বলেছিলো বাবা তোকে বকবে বোন।" নির্মলা চোখে আঁচল দেয়।
প্রিয়তোষ বলে,"মনটা শান্তি পায় না। চলো রণোর নামে কোথাও কিছু দিয়ে আসি আমরা।"
নির্মলা বলে,"দিও। এখন ঘুমাও। যদি ছোটন মিতিন শোনে তুমি ঘুমাতে পারোনা, ওরা দু:খ পাবে। মিতিন বলছিলো রণো ওকে ছবি এঁকে দিতো আর ছোটনকেও দিতো। তুমি ওদের সঙ্গে খেলতে বারণ করেছিলে বলে খেলতো না ও। তারপরে তো ..... মিতিন বলছিলো, ওর সঙ্গে খেলা করতে ওদের খুব ইচ্ছে করতো। বলছিলো দাদা একা বলেই তো আমরা এসেছিলাম মা, ওর খেলার সাথী কেউ ছিলো না কিনা! এবারে আমরাও চলে যাই তাহলে?"
প্রিয়তোষ চমকে ওঠে, "এইসব বলে ওরা? তুমি ওদের বুঝিয়ে বোলো। ওদের তো কোনোদিন আমরা কিছু কষ্ট দেই নি! কোনোদিন ওদের কিছু বলবো না। চলো সবাই মিলে দূরে কোথাও বেড়াতে যাই, রণোর নামে কোথাও কিছু দিয়ে আসি।"
"আচ্ছা, তাই হবে। এখন তুমি ঘুমাও তো দেখি।"
প্রিয়তোষ শুয়ে পড়ে, চোখ বন্ধ করতেই নীল আকাশভরা সোনালী আলো, তার মধ্যে রণজয়ের অভিমানী মুখ ফুটে ওঠে, কী যেন সে বলে।
প্রিয়তোষ বিড়বিড় করে,"আহা তুই আলোর ছেলে, ভালোবেসে এসেছিলি আমার ঘরে, রাখতে পারলাম না হতভাগ্য আমি। কষ্ট পেয়ে ফিরে গেলি। মাফও চাইতে সময় পেলাম না। একদিন তো দেখা হবে, সেদিন মাফ চাইবো। মাফ করে দিস খোকা সেদিন। করবি না? "
আকাশভরা আলোয় বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে ওঠে দুটি অভিমানী চোখ, তাতে শিশিরের মতন অশ্রু, টপটপ করে ঝরে পড়তে থাকে প্রিয়তোষের বন্ধ চোখের পাতার উপরে। কানে আসে সেই শেষ মন্ত্র, "মধুবাতা ঋতায়তে/ মধুক্ষরন্তি সিন্ধব:/ মাধ্বীর্ণ সন্তোষধী...."
ওই মধুময় বাতাসের সঙ্গে সে মিশে গেছে। সে আলোর ঘরে ফিরে গেছে।
(শেষ)
Subscribe to:
Posts (Atom)
