Monday, June 2, 2014

মায়াময় সবুজ ট্রেন

অ্যামট্র্যাকের রেলওয়ে স্টেশানটি ছোটো, অপেক্ষমান যাত্রীসংখ্যা একদম হাতেগোনা, দুই সাদাচুল প্রৌঢ়া হাতে দুটি ব্যাগ,পরিপাটী গোছানো ঝোলা স্কার্ট আর টপ পরা,জিনস-টিশার্ট পরা নীলচোখ যুবতী পিঠে ব্যাকপ্যাক, একটি ছোট্টো পরিবার-মাবাবা আর দুটি ছেলেমেয়ে,অজস্র লটবহর সঙ্গে, একজন উদাসীন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক-একহাতে ছোট্টো একটি ব্যাগ আর আরেকহাতে একটি বই,আর এই পিঠে ব্যাকপ্যাক আর লাগেজ ব্যাগ হাতে আমি।

ভাবা যায়, দিনের মধ্যে এই একখানা ট্রেন, তার জন্য যাত্রী এখান থেকে মাত্র এই কজন? এদেশে ট্রেনের জনপ্রিয়তা যে একদমই নেই, তা স্টেশানে এলেই টের পাওয়া যায়। সকলেই নিজের নিজের গাড়ীতে চড়ে ঘোরে,তাই ইন্টারস্টেট রাস্তাগুলো অসাধারণ ভালো,মেইন্টেনান্সও তেমনি।সেই পথসমূহই সকলে ব্যবহার করে। খুব বেশী দূর যাবার দরকার হলে লোকে প্লেনে করে যায়।

অ্যামট্র্যাক এখনো কিছু কিছু ট্রেন চালায়, আস্তে আস্তে এগুলোও হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। তবু বাসের কিছুটা বেশী জনপ্রিয়তা আছে, গ্রেহাউন্ড বাস সার্ভিসে অনেক লোক দেশের রাজ্য থেকে রাজ্যান্তরে যায়।

আমাদের ছোটো শহর থেকে ট্রেনযাত্রাটি বেশ মনোরম, সকাল নটায় ট্রেনে উঠে পড়া, আস্তে আস্তে পুবের সবুজ বনভূমি আর ঢেউখেলানো পাহাড়ের ল্যান্ডস্কেপের মধ্য দিয়ে ছোটো ছোটো শহর ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে যায় ট্রেন।

পুবের রাজ্যের গন্তব্যশহরে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা নেমে পড়ে, ঘড়ি বদলে ফাস্ট করে নিতে হয় একঘন্টা, এপথে এলে এক টাইম জোন থেকে চলে আসতে হয় আরেক টাইমজোনে। প্রথমবার খুব মজা লেগেছিলো।

দুপুরবেলা পাশের সহযাত্রিণীর সঙ্গে গেলাম সাজানো ডাইনিংকারে,সেখানে খাবারের দাম এমনি জায়গার থেকে বেশী,কিন্তু খাবার ভালো। খেয়ে দেয়ে ফেরৎ এসে সিট এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম। এই ট্রেনের সিট ইনক্লাইনড করা যায়, ফুটরেস্টে পা রেখে আরামে ঘুমানো যায়। জানালার বাইরে বেলা পড়ে আসে, গ্রীষ্মের ঘন সবুজের উপরে পড়ন্ত রোদ্দুরের খেলা কাব্যময় হয়ে ওঠে। আস্তে আস্তে ছন্দময় দোলানিতে চোখদুটো জড়িয়ে আসে।

ট্রেনের দেশের মানুষ আমি। ট্রেন আমাদের শৈশব কৈশোর প্রথম যৌবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রেশমী সুতোর বুনুনির মতন। শীতের ভোরে ট্রেনের ভোঁ একরকম আর গ্রীষ্মের ভোরে আরেকরকম। মাঝরাত্রির দুরপাল্লার ট্রেনের হুইসেলের দ্রুতচ্ছন্দ চলে যাওয়া আরেকরকম। একটা সময় ছিলো, যখন আমরা কান পেতে থাকতাম,সকালের গাড়ীর শব্দের জন্য। বাড়ী থেকে কত দূরে রেলস্টেশান,তবু শোনা যেতো স্পষ্ট। তখন বাড়ীঘর অনেক অনেক কম ছিলো। সে আমাদের ছোটোবেলা।

ছোটো স্টেশানটি ছিলো আমাদের, দূরপাল্লার ট্রেনগুলো দাঁড়াতো না,এখনো দাঁড়ায় না। তবে এখন বড়ো হয়েছে প্লাটফর্ম, প্রতিদিনের লোকাল ট্রেনযাত্রীর সংখ্যা বেড়ে গেছে অনেক অনেক। সকলের যেতে হয় বড়ো শহরে,ট্রেন ছাড়া অন্য উপায় খুব একটা নেই সাধারণ লোকের কাছে। বাসের ব্যবস্থা ইদানীং আছে বটে, কিন্তু খুব সুবিধাজনক নয়।

শীতের ভোরে ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসা ট্রেনের আলো আস্তে আস্তে স্পষ্ট হতো,ছোটো স্টেশানের প্লাটফর্মে অসংখ্য মানুষ সোয়েটার মাফলার চাদরে আবৃত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো অপেক্ষায়-এনারা নিত্যযাত্রী।

লোকাল ট্রেনগুলো চলমান সমাজদর্পণ,প্রতি কামরায় নানা পেশার মানুষজন,প্রায় সকলেই চলেছেন কাজে,সকালের ট্রেনগুলোতে বিরাট বিরাট বস্তা,ঝুড়ি,দুধের বড়ো বড়ো ড্রামওলা অনেক লোকজনও থাকতো,এরা নিত্য এইসব দ্রব্যাদি শহরে পৌঁছে দেন। আর অবধারিত অসংখ্য হকার-ঝালমুড়ি,লজেন্স,ছোলাভাজা,বাদামভাজা, গয়না, পোষাক, মলম, থালাবাটি, ফলমূল তেলেভাজা-কি যে নেই সেই হকারদের পসরায়--তা বলা কঠিন। আর গানশোনানোর ছোটো ছোটো দল-এনারা খুব ভোরে থাকতেন না,একটু বেলা হলে উঠতেন।

স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে-হয়তো তাই হয়। হয়তো আস্তে আস্তে ফিরে আসে ছবি,দেশকালের দূরত্বে ধরা পড়ে সুন্দর হয়ে, যেসব ছোটোখাটো সুন্দর এড়িয়ে গেছিলো তা অনেক পরে স্মৃতি হাতড়ে পাওয়া যায়। কে যেন বলেছিলো, চলে যাওয়া বেলাকে ফিরে পেতে হয় শুধু স্মৃতির মধ্যেই, স্বপ্নের মধ্যেই।

"উঠে পড়ো,উঠে পড়ো,এসে গেছি,এসে গেছি। পৌঁছে গেছি। "-সহযাত্রিণী প্রৌঢ়া আস্তে আস্তে আমার কাঁধে হাত দিয়ে ডাকছেন। ঈশ, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নাকি?

চোখ থেকে ঘুম মুছে ফেলে সোজা হয়ে বসি, সিট খাড়া করে দিই। ট্রেনের গতি মন্দীভূত হচ্ছে, গন্তব্য শহরের বড়ো প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে আমাদের ট্রেন।কেমন যেন দূরপাল্লার ট্রেনের হাওড়া স্টেশানে ঢোকার সময়ের মতন একটা অনুভূতি হয়, আস্তে আস্তে ট্রেন থামে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য এগিয়ে আসে স্বয়ংক্রিয় চেয়ার, প্রথমে ওনারা নামেন, তারপরে আমরা আস্তে আস্তে নামি। নীট ইউনিফর্ম পরা গার্ড ট্রেনের পাশে হাসিমুখে হাত নেড়ে বিদায় দেন আমাদের।

সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দেখতে পাই অপেক্ষমান বন্ধুদের হাসিমুখ, আমাকে নিতে এসেছে ওরা। সহযাত্রিনী বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে শুভকামনা করে চলে যান নিজের পথে, আমি আমার শুভেচ্ছা দিয়ে দিই ওঁর সঙ্গে।

তারপরে বন্ধুদের সঙ্গে মিলনমুহূর্তের উষ্ণতা-তা বর্ণনা করতে পারি এমন শব্দ তো নেই আমার ঝুলিতে!অনূক্ত থাক তাই সেসব,ভাষাহীন ভাষা হয়ে পৌঁছাক সুধী পাঠকের হৃদয়ে।

ঐ দূরে,কুউউউ ঝিকঝিকঝিক করে চলেছে স্মৃতি ও স্বপ্নের মায়াময় সবুজ ট্রেন, সময় তাকে ধরতে পারেনি, ক্ষয় করতে পারেনি...কোনো এক ভালোবাসার স্টেশানে পৌঁছানোর জন্য একদিন সবাই ঐ ট্রেনে যাত্রী হয়েছিলাম, যাত্রী হবো আবারও,বারে বারে... সবুজ ধানের খেতের পাশ দিয়ে, কুলকুল বয়ে যাওয়া নদীর পাশ দিয়ে, ফার্নের পাতায় কুচোজল লেগে হীরার মতন জ্বলজ্বল করতে থাকা আলোছায়া বনভূমির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে ট্রেন...

কুউউউ...ঝিক্‌ঝিক্‌ করে....

জারুল

পথের দু'ধারে আর পার্কিং-লটের চারপাশ ঘিরে অসংখ্য জারুলগাছ। সাদা আর হাল্কা গোলাপী থোকা থোকা ফুলে ভরে উঠেছে। বেশীরভাগই সাদা। জোরালো হাওয়ায় খইয়ের মতন উড়ে যায় শত শত, হাজার হাজার ফুল।

একদিন মেঘ করে আসে,আকাশ ভরে জটামেলা মেঘ আর দূর সমুদ্র থেকে আসা পরাক্রান্ত হাওয়া---সেই হাওয়ায় ওড়ে অসংখ্য জারুল ফুল। মনে পড়ে যায় আমাদের পাড়ার মাঠের ধার ঘেঁষেও অমন জারুলগাছে ফুলের মঞ্জরী, মৌসুমীমেঘের নীচে ওড়াও উড়ছে জোরালো বাতাসে। আহা উড়ুক, উড়ুক ওরা, মৌসুমী হাওয়ায় আনন্দে উড়ুক। এখানে আমি হাঁটতে হাঁটতে থেমে পড়ে নীচু হই, হাত বাড়িয়ে কুড়িয়ে নিই উড়ে পড়া জারুলের হাল্কা পাপড়িগুলো, হাতের তালু থেকে উড়ে যায় ওরা সামান্য শ্বাসবাতাসে। এদিক ওদিক তাকাই,কেউ দেখলো না তো? এইবয়সী মানুষকে এরকম ছেলেমানুষী করতে দেখলে কি ভাববে কেজানে! ভোরবেলায় নির্জন অবশ্য চারিধার,লোকজন আসতে থাকবে আরেকটু বেলা হলে।

পরদিন বাদলশেষের সোনালী রোদ্দুরের সকাল, গাছগুলোর কাছ দিয়ে আসতে গেলেই শোনা যায় গুণ্‌গুণ্‌গুণ্‌-ভোমরার ডানার শব্দ-আরো কাছে গেলে দেখা যায় অসংখ্য চকচকে সোনালী পিঠওলা কালো ভ্রমর খুব ব্যস্ত মধু খেতে, ওদের ডানায় লেগে লেগে ঝরে পড়ে হলদে পরাগ, বাতাসে উড়ে যায় স্বর্ণরেণুর মতন।ওদের কাছ দিয়ে কেউ চলে যাচ্ছে এ হয়তো ওরা লক্ষ্যও করে না,এত ব্যস্ত! অদ্ভুত প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘাই দেয়, গোটা শীতকাল---যখন গাছপালা রিক্তপর্ণ হয়ে ধূসর তপস্বীর মতন পড়ে ছিলো শুকনো কাঠের মত হয়ে,তখন এরা, এই মৌমাছি ভোমরা--এরা কোথায় ছিলো?

ক্যাম্পাস বিস্তৃত হচ্ছে, নতুন নতুন সব বিল্ডিঙ তৈরী হচ্ছে। আহা সেই উজ্জল খয়েরীবুক সূর্যরঙের ফুলেঢাকা টিঁ-ই-ই-ই করে ডাকা পাখিদের মাঠখানা বুঝি আর রইবে না, দেখি বালি সিমেন্ট এইসব জমা করছে, বিরাট বিরাট রোবট আর্মওলা কন্সট্রাকশনের গাড়ী কেবলই মাটিখোঁড়ে, জঞ্জাল সরায় আর কংক্রীটের চৌকো চৌকো স্ল্যাব এনে জড়ো করে।

ঐ মাঠ যখনি পার হই দিনে বা রাতে,সকালে বা সন্ধ্যায় ---যখনি পার হই দেখি ঐ কখানা পাখিকে,গলা বেষ্টন করে দুখানা গোল কালো দাগওয়ালা ধূসর রঙের লম্বা লেজ ছোটো পাখি, অক্লান্ত দৌড়ে বেড়ায় ওরা মাটির উপর দিয়ে, ওড়ে খুব কম। টিঁ-ইঁ-ইঁ-ইঁ তীক্ষ্ণ চড়া স্বর এই পাখির ডাকে।আমার খুব অবাক লাগে,এই পাখি ঘুমায় কখন? ছোট্টোবেলার ছড়া কেন জানি মনে পড়ে এদের দেখে--"হাট্টিমাটিম্‌টিম্‌/ তারা মাঠে পাড়ে ডিম/তাদের খাড়া দুটো শিং/তারা হাট্টিমাটিম্‌টিম্‌।"

কে জানে এরা সেই হাট্টীমা পাখির কোনো দূরসম্পর্কের আত্মীয় কিনা! এই মাঠখানি ঘুচে গিয়ে কংক্রীটের স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে গেলে এরা কোথায় যাবে? টিঁ -ইঁ-ইঁ-ইঁ করে ডাকতে ডাকতে উড়ে চলে যাবে কোনো অভয়প্রান্তরে, যেখানে ওদের মাঠের বাসাখানি কেউ কেড়ে নেয় না?

বিভিন্ন প্রকৃতিবন্ধু ক্লাব, অর্গানাইজেশান এসব আছে এদেশে, তারা চেষ্টা করছে এইসব তৃণভূমি জলাভূমি বনাঞ্চল,বিশুদ্ধ নদীধারা এইসব বাঁচিয়ে রাখতে, মাঝে মাঝে ওরা দিয়ে যায় আবেদনপত্র, পোস্টে ও পাঠায়। কিন্তু কতটুকুই বা ওরাও করতে পারবে এই সর্বগ্রাসী লৌহসভ্যতার সঙ্গে লড়ে?

কত কত বন্য পশুপাখি চিরদিনের মতন লুপ্ত হয়ে গেছে দেশে দেশে-বামীর হাতের প্রদীপ শিখাটির মতন। কেজানে হয়তো কিছুই হারায় না,সবই রয়ে যায় কোথাও না কোথাও-কোনো নির্জন হৃদয়ের গভীর গোপণ কোনো কুঠুরিতে। ডোডো পাখি, সলিটেয়ার পাখি, নিনি হাঁস---সবই হয়তো রয়ে গেছে সেই অভয় দেশের সবুজ বনে,সোনালী বালুচরে,নীল সমুদ্রে।

একটা মকিং বার্ড সুর করে ডাকছে,এই পাখি একদম আমাদের দোয়েলের মতন দেখতে-কেন এত সুর করে ডাকে রিকিউ রিকিউ টীইন্না রিকিউ রিকিউ টিইন্না-দূর থেকে আরেকটা পাখি সাড়া দেয় ঠিক একই সুরে-কেবল মনে পড়ে যায় সব, অজস্র পাখির পৃথিবী ছিলো আমাদের শৈশবে বাল্যে কৈশোরে---মৌটুসী পাখিরা--মাথায় বাহারী ঝুঁটি ওদের, কী ব্যস্ত হয়ে পোকা খুঁজতো ঘাসবনে, মা-ডাহুক কী দ্রুত লিকলিকে সরু ঠ্যাং নিয়ে দৌড়ে যেতো সদ্যবোনা ধানচারাদের মধ্য দিয়ে,কদিন পরে ওর ক্ষুদে ক্ষুদে ছানাগুলো ওর পেছনে,বড়ো বড়ো শামুকখোল পাখি আসতো বর্ষার শস্যক্ষেত্রে, সবুজ টিয়ার ঝাঁক নামতো সবুজ বাগানে...আর সেসব নেই,অজস্র বাড়ীঘরে ইঁটকাঠের জঙ্গলে ঢেকে গেছে প্রায় সবটুকু সবুজ,ওরা কোথায় চলে গেছে!

একদিন কি মানুষ বুঝবে না, এইভাবে একাকী মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না শুধু সভ্যতার অহংকার নিয়ে, সে একা বিচ্ছিন্ন নয়, সে এইসবের-এই সবুজের, এই পাখিদের, এই আকাশের,এই বাতাসের... অজস্র গাড়ী চলে পথে পথে,অসংখ্য কলকারখানা ধোঁয়া উগড়ে দেয়, আরো আরো আরো, গরম হয়ে ওঠে পৃথিবীর বাতাবরণ, গরমে আইস ক্যাপ গলে যেতে থাকে পৃথিবীর মেরুতে, অনেক সাদা ভালুকের শব উঠে আসে ধীবরের জালে, অপুষ্ট ক্লান্ত মৃতদেহ সব...

প্রকৃতিবন্ধু সংগঠন থেকে আসা কার্ডটির উপর থেকে একটি সাদা মেরুভল্লুক আমার দিকে করুণ চোখে চেয়ে থাকে শুধু...আরেকটি কার্ডে মায়ের কোলের ওমে চুপ করে ঘুমিয়ে থাকা একটি সাদা শিশুভল্লুক। ওদের কোনোদিন দেখিনি আমি, কোনোদিন হয়তো দেখবোও না..."তবু আশা জেগে থাকে অয়ি অবন্ধনে/তবু আশা জেগে থাকে প্রাণের ক্রন্দনে..."

হাট্টিমা পাখিরা দৌড়ে বেড়ায় মাঠ জুড়ে, তীক্ষ্ণ চড়াসুরে টিঁ-ই-ই-ই-ই করে ডাকে, এখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে, আমি ঘরে ফিরে আসছি। কোথা থেকে একঝলক হাল্কা ফুলের গন্ধ ভেসে আসে, বেলফুলের গন্ধের মতন মনোরম...

কে যেন বলেছিলো, বাঁচো ও বাঁচতে দাও? কে যেন বলেছিলো প্রাণের চারণভূমিটি কেড়ে নিও না? কে যেন বলেছিলো রক্ষা করতে, যত্ন করতে, ভালোবাসতে? কে সে, কবে বলেছিলো? কিছুই মনে পড়ে না, আমি আনমনে পথ হাঁটি। তীক্ষ্ণ টিঁ-ই-ই-ই আছড়ে পড়ে কানের পর্দায়, মনের পর্দায় যায় কি?

নক্ষত্র সন্ধ্যা

স্টারপার্টি হবার কথা ছিলো এপ্রিলের শেষের দিকে, কোনো একটা সুন্দর সন্ধ্যাতে যখন আকাশ স্বচ্ছ-নির্মল, একেবারে পরিষ্কার। কিন্তু কী কারণে যেন পাল্টানো হলো সময়, আসলে সেমেস্টার শেষ হবার মুখে ব্যস্ততা খুবই বেশী থাকে, সমস্ত ফাইনাল টাইনাল ফাইনাল-গ্রেডিং গ্র্যাজুয়েশান অনুষ্ঠান ইত্যাদি সবই তো তখন! তখনের জন্য অপেক্ষা করলে হয়তো বাতিল হয়ে যেতে পারে,তাই ফেব্রুয়ারীতেই হলো স্টার পার্টি।

তরুণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উৎসাহের কমতি একেবারেই নেই। ঘরবন্দী গাড়ীবন্দী শহরবাসী ছেলেমেয়ে সব, এমন তারা দেখার সন্ধ্যা তেমনভাবে আসে কই ওদের? অ্যাস্ট্রোনোমির ক্লাসও তো ওরা করে ঘরের মধ্যে দিনের বেলা,কখনো কম্পুটারের সামনে সিমুলেশান, কখনো বা হাতে হাতে হিসেব করে করে গ্রাফের উপরে প্লট করা...ওরা কতবার জিজ্ঞাসা করতো বাইরে সত্যি সত্যি তারা দেখার কিছু সুযোগ আছে কিনা...এতদিনে এসেছে সেই সন্ধ্যা।

শহরে আলোক-দূষণ, বড়ো বড়ো পথবাতি আর বিজ্ঞাপণের আলো, বাড়ীর আলো, দোকানের আলো, গাড়ীর আলো হাজারো আলো আবিল করে রেখেছে সব। অপেক্ষাকৃত কম প্রভার তারাগুলোকে দেখতে দেয় না, নেবুলা আর গ্যালাক্সি তো দূরস্থান। তাই শহর ছাড়িয়ে দূরে চললাম আমরা। ছাত্রছাত্রীরা সব উৎসুক চোখ নরম মুখ আঠেরো/ উনিশ/ কুড়ির তরুণ-তরুণী---মেরী, জ্যাক, আমান্দা, অ্যাডাম, র‌্যান্ডাল, এলিজাবেথ, জো,সারা, ক্রিস, চার্লস, জেফ্রি আরো অনেকে ...তারা-চেনার সন্ধ্যায় ওরা কলকল করতে করতে চলেছিলো।

অ্যাস্ট্রোনমির প্রফেসরের নাম ক্রিস, ক্রিস্তোফার। উনি সুদূর উত্তরের রাজ্য উইসকনসিনের লোক,এখানকার মৃদু দক্ষিণী শীত দেখে উনি খুব হাসেন,বলেন শীত মানে হলো বরফের সাদা কম্বলের তলায় পড়ে থাকবে পৃথিবী,মাসের পর মাস।তবে না শীত! এখানে তো তোমরা আছো চিরবসন্তের দেশে!

তো,এখন ওনার গাড়ীটিকে অনুসরণ করে চলেছে সবকটা গাড়ী, নির্দিষ্ট জায়গায় থামা, তারপরে হাঁটুভর ঘাসপালা মাড়িয়ে দূরের দিকে চলা। প্রফেসর সেখানে একটি ফার্ম হাউসের ব্যাক ইয়ার্ডে দূরবীন বসিয়ে গেছেন বিকেলেই। সূর্য ডুবে গেছে যদিও, তবু অল্প আলো এখনো পশ্চিমদিকচক্রে ছড়িয়ে আছে কোমল হয়ে। আরেকটুক্ষণ, তারপরেই অন্ধকারে ঢেকে যাবে সব। তারারা ফুটবে, গ্রহেরা এখনই দেখা দিতে শুরু করেছে।

মনে পড়ছিলো সেই ক্যাট্রিনার পরের কথা, অগাস্টের সেই ঘূর্নীঝড়ের পরে যখন গোটা শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রইলো, তখনকার সেই কয়েকটি রাত্রি ছিলো অত্যন্ত বিরল সুযোগ, শহরের বুক থেকেই আলোকদূষণহীন ছায়াপথময় আকাশ দেখার। আলোর এত সূক্ষ্ম তারতম্য যে হতে পারে, রাত্রির আকাশের যে নিবিড় ঘননীল, তারমধ্যে মণিকণার মতন যে জ্বলে তারারা, হাওয়া-হাল্কা ওড়নার মতন যে নেবুলারা দেখা দেয়,দেখা দেয় গভীর মহাকাশের গ্যালাক্সি...ঐ নিবিড় রাত্রিনীল সকালের আলোয় কিভাবে দুধালো হয়ে ওঠে, তারারা মিলিয়ে যায়, গ্রহেরা থাকে, ঊষা জেগে ওঠে পুবে,সে আলোয় গ্রহেরা ডুবে যায়---সে কেবল তখন দেখতে পেয়েছিলাম।

আর একবার... জানুয়ারী মাসে শীতের সময় বনফায়ার হয়েছিলো শহর থেকে অনেক দূরে, এক বনাঞ্চলে---তখন দেখেছিলাম আকাশ ভরে তারায় তারায় ঠাসাঠাসি। দেখে দেখে মনে হতো ঐ যে স্পেস থেকে কি অপরূপই না দেখে ওরা!এখন অবশ্য স্পেস টেলিস্কোপ থেকে ছবি আসে,আমরাও দেখতে পারি, কিন্তু সেতো ইমেজ, মুখোমুখি দেখা তো নয়!

আর মনে পড়ে মাঠের ধারে বাড়ীটি আমাদের,গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় লোডশেডিং হয়ে গেলে উঠানে বেরিয়ে রাত আকাশের তারা চেনা...ঐভাবেই তো চেনা হয়েছিলো চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা, জ্যেষ্ঠাকে,চেনা হয়েছিলো সপ্তর্ষিমন্ডল,হেমন্তসন্ধ্যায় চেনা হয়েছিলো কালপুরুষ...সে কতকাল আগের কথা...

ক্যাট্রিনার সেই কয়েক নিষ্প্রদীপ রাত্রির পরে আবার আজ। মাঝে শুধু চোখ ধাঁধানো আলো আর আলোয় আবিল হয়ে থাকা অর্ধচেতন রাত্রির মালা।

আমরা দূরবীনের কাছে পৌঁছাই আস্তে আস্তে, আকাশে শীত রাত্রির উজল প্রহরী ওরায়ন মানে কালপুরুষ। কালপুরুষের কাঁধের লাল তারা বেটেলগিউস(আর্দ্রা) দেখিয়ে প্রফেসর ব্যখ্যা করেন যে এটি এক বয়স্ক রেড জায়ান্ট তারা, কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সব ফুয়েল ফুরিয়ে ফেলে বাইরের শেলের বহির্মুখী চাপে বেলুনের মতন ফুলে উঠেছে এত।আমাদের সূর্যও নাকি আরো চার থেকে পাঁচশো কোটি বছর পরে ঐরকম ফুলেফেঁপে বিরাট হয়ে যাবে, কাছের গ্রহট্রহগুলি সব গিলে নেবে।

ফোকাসে তারাটিকে আনার পরে সবাই এক এক করে আইপিসে চোখে দিয়ে দেখতে থাকে...কালপুরুষের পায়ের কাছেই রাত-আকাশের সবচেয়ে উজল তারা সিরিয়াস,আমরা লুব্ধক বলি যাকে,তাকে দেখাতে দেখাতে ব্যখ্যা করতে থাকেন প্রফেসর-কেমন লুব্ধকের সঙ্গী তারাটিকে দেখে প্রথমে বোঝা গেলো ফুয়েল-ফুরানো তারারা কিভাবে ঘন শ্বেতবামন তারায় পরিণত হয়...এসব দূরের গভীর মহাকাশের গল্প ছাড়িয়ে আস্তে আস্তে আমাদের সৌরমন্ডলে এসে পড়লেন তারপরে, উজল গ্রহদের দেখতে দেখতে কথায় কথায় উঠে আসলো এক্সট্রা-সোলার প্ল্যানেটদের কথা-আমাদের সূর্য ছাড়াও অন্যান্য নক্ষত্রের চারিপাশে গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে,একটা দুটো নয়,অনেক অনেক তারার কাছে-কিন্তু ওরা প্রাণী-বসবাসের উপযোগী কিনা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

ঐ অসীম ঘননীল তারাময় আকাশের দিকে চেয়ে সকলে কল্পনাপ্রবণ হয়ে ওঠে,কোথাও কোনো ভিন্ন নক্ষত্রের গ্রহমন্ডলীতে হয়তো আছে প্রাণ,হয়তো আছে আমাদের মতন জীব,হয়তো এমনি সন্ধ্যায় ওদের কোনো ছোট্টো দল এমনি করেই জল্পনা কল্পনা করছে এই মহাবিশ্বে তারা নিঃসঙ্গ কিনা তাই নিয়ে... এখানে আমরা,এতদূর থেকে কিছুতেই সাড়া দিয়ে উঠতে পারছি না...বন্ধু, আমরা আছি, আমরা আছি, আমরা আছি-ই-ই-ই-ই-...

অন্য শারদোৎসব

শিরশিরে শরতের ভোর। হাওয়ায় কোমল শীতভাব। নীলকান্তমণিপ্রভ আকাশ, ঘাসে ঘাসে চিকমিক করছে শিশির,পুবে রাজকীয় ভোর হচ্ছে। চারটে পাখির একটা ছোট্টো দল চক্র দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, ওদের ডানায় ঝকামক করছে নতুন ভোরের আলো।

এইসব সময়গুলোতে বাতাসে শিউলির নরম সুগন্ধের জন্য মন উতলা হয়, মাঠভরা নরম কাশগুচ্ছ দেখতে সাধ হয়। আমাদের দেশে শরৎ তো শুধু ক্যালেন্ডারে আসে না, সাদা মেঘের ছবি দেওয়া আকাশের নীল খামে পুজো-পুজো গন্ধের রোদ্দুরের অক্ষরে-শব্দে ভালোবাসার চিঠি হয়ে আসে। এমন সোনারোদের ওড়না জড়ানো নীলপ্রভ আকাশের নীচে আগমণীর গান যদি না থাকে, তাহলে কি আর মন মানে? ঐ পুজো পুজো গন্ধের রোদ্দুরে যে ছুটির নিশান আঁকা! কতকাল ধরে রক্তের মধ্যে যে মিশে গেছে "পুজোর ছুটি"।

এখানে পুজোর ছুটি বলে কোনো কথা নেই, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় অগাষ্টের শেষ সপ্তাহ থেকে। অক্টোবরে একেবারে যাকে বলে পুরোদমে চলা সময়, ভরভরন্ত সেমেস্টার।ছুটি হবে সে-এ-এই ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, তখন সেমেস্টার শেষ হবে।

তবু আছে অন্যরকম নানাধরনের উৎসব-আয়োজন। এমন টলটলে আলোয় পরিপূর্ণ সময় মানুষের হৃদয়ের কাছে আবেদন রাখবে না, তাই হয় নাকি? সমস্ত উত্তর গোলার্ধ জুড়েই যে এখন ভরা ফসলের গান, "শেষ ফলনের ফসল এবার কেটে লও, বাঁধো আঁটি...",ওদিকে দক্ষিণ গোলার্ধ সেজে উঠছে বসন্তের সবুজ কিশলয়ে।

এই সীজন হলো ফুটবল সীজন। এই ফুটবল আমাদের চেনা ফুটবল নয়, আমি বাঙালি মানুষ এই ফুটবলের আকৃতি দেখেই তো প্রথমে ঘাবড়ে গেছিলাম। আমাদের ফুটবল তো দিব্যি গোল, একেবারে গোলালো। এখানের ফুটবল হলো উপগোলকীয়, যেন অনেকটা বিরাট এক পটোলের মতন। ফুটবল এখানে শুধু খেলা নয়, একটা উৎসবের মতন। যেদিন ফুটবল হয়, সাধারনতঃ সপ্তাহান্তে হয়, সে এক সাজো সাজো অবস্থা।

শুক্রবার বিকেল থেকেই সব মোটর হোম এ করে সমর্থকের দল সপরিবারে এসে পৌঁছায় পতাকা টতাকা উড়িয়ে। এসে লাল নীল সাদা তাঁবু খাটিয়ে রান্না-বান্না(সাধারণ গ্রিল করা)করে এসে এক এলাহি কারবার। ফুটবল শুরুর আগে এই পিকনিক হলো মাস্ট, একে বলে টেইলগেটিং। এটা কালচারের অঙ্গ,সেদিন চেনা-অচেনা বন্ধুরা মিলে খাওয়াদাওয়া হবে,আনন্দ করা হবে, এ হলো ফুটবল-দর্শকের আবশ্যকীয় রীতি।

তবে খেলাটা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় নি, একবার বন্ধুদের অনুরোধে গেছিলাম দেখতে, গ্যালারিতে জমিয়ে বসলামও বন্ধুদের সঙ্গে। দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম, প্রায় মহাকাশযাত্রীর মতন পোষাক আর হেলমেট পরে অতগুলো খেলোয়াড় যে কি করছে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে, গ্যালারি থেকে দর্শকেরা যে কেন অমন মারাত্মক চিৎকার করছে, সে আর বোঝা সম্ভব হলো না। খেলার একেক পর্বের পরেই বিরতি,বিরাট বাজনার পার্টি ইয়া ইয়া ভেঁপু ড্রাম ইত্যাদি বাজাচ্ছে,মেয়েদের দল নাচ করছে-সে বিরাট উৎসব আর সেই উৎসবের স্পিরিট আমার মতন আউটসাইডারের পক্ষে লিখে বোঝাতে পারা অসম্ভব।

আমি শুধু বাইরে ঘুরতে ঘুরতে মুগ্ধ হয়ে দেখি নানারঙের তাঁবুতে ভরে গেছে সব মাঠগুলো, গাড়ীতে গাড়ীতে ছয়লাপ চারিদিক,সমর্থকেরা সব সপরিবারে তাদের প্রিয় দলের রঙের পোশাকে, কেউ কেউ মুখেও সেই রঙ করে নিয়েছেন, ছোট্টো ছোট্টো বাচ্চাদের সবচেয়ে সুন্দর লাগে রঙীন ঐসব পোশাকে। দেখি বিরাট বড়ো বিজ্ঞাপন বেলুনে উড়ছে এই খেলার কথা। আমি অবাক হয়ে মুগ্ধ চোখে এই অন্য শারদোৎসব দেখি। অচেনা অন্য পৃথিবীর উৎসব যেন এক, কিন্তু হৃদয়ের আনন্দের তরঙ্গমালা চেনা যায়।

মনে পড়ে যায় আমাদের দুর্গাপূজা, ঢাকের ঢ্যামকুড়কুড়,আর মাঠভরা মাথা-দোলানো কাশেরা, ভোরের বেলা শিউলিদের টুপটুপ ঝরে পড়া।

"ঢ্যামকুড় কুড় বাদ্যি বাজে/ ঢাকে পড়লো কাঠি/ যা দিবি মা তাই হবে আজ/ পরমান্নের বাটি..." মনে পড়ে যায় সেই সপ্তমীভোর, অষ্টমীসন্ধ্যার আলো ও কোলাহল ও ভীড়, পুজোর জামায় ছেলেপুলেরা, আর নবমীর নরম দিন, নবমীরাতে সেই "নবমী নিশি গো পোহায়ো না ধরি পায়/ তুই চলে গেলে মাগো উমা মোরে ছেড়ে যায়", দশমীর বিদায়-অশ্রু আর ঘরে ফিরে বিশ্ব-মাকে ঘরের মা করে পাওয়া।

এই তো পূজা, যা অনেক বড়ো, অনেক দূরের, যাকে এই সীমাবদ্ধ ক্ষুদ্র হৃদয়ে ধরতে পারা যায় না, অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য, শক্তি ও করুণার উৎস যে-তাকেই কাছে পাওয়ার আকুতি, তাকেই হৃদয়ে ধারণ করার আর্তি। তাই নয় কি?

উৎসবের বাঁশি তো তাই বলে, যে দূরের মানুষ, সে এলো কাছে, আকাশের মা মাটির মা হয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো, তারপরে ঘরের মা হয়ে এসে কোলে তুলে নিলো, বুকে জড়িয়ে নিলো। ঘাম ও ধুলা মুছে নিলো কোমল আঁচলে। তাই তো সবই সেদিন পরমান্ন হয়ে যায়, তুচ্ছ বলে আর সেদিন কোনোকিছুই থাকে না। "যা দিবি মা তাই হবে আজ পরমান্নের বাটি..."

আমাদের সহকার-শাখা ও মঙ্গলকলসের সঙ্গে কখন এই এদের পতাকা, তাঁবু, রঙীন বেশ, মুখে মাখা রঙ---সব এক হয়ে যায়, আনন্দের জ্যোৎস্না ভরে দেয় আকাশ ও সমুদ্রের মাঝখানের বিরাট দূরত্ব---"মগন করেছে মধ্যে তাহার আনন্দ পূর্ণিমা..."

কত দূরে প্রশান্ত অতলান্ত মহাসমুদ্র পার হয়ে আমার দেশ- গাঁয়েও তো উৎসবের বাঁশী বেজে উঠেছে.... লাল-নীল-সবুজ-হলুদ ঘুড়িতে পেটকাটি চাঁদিয়ালে মোমবাতি বগ্গায় ভরে গেছে বিশ্বকর্মা পূজার রোদ্দুরভরা দিনের নীল আকাশ...ঘুড়িতে ঘুড়িতে ঐ তো প্যাঁচ লেগে গেছে.... ঐ তো কারা সমস্বরে কোলাহল করে উঠছে ভোঁ ও ও ও কাট্টা....

Thursday, May 29, 2014

কাছে কাছে থাকি

নরম ফুরফুরে পালকের মতন উড়ে যায় না-পাঠানো চিঠিরা, অথবা টুকরো টুকরো হাল্কা মেঘের মতন। স্পর্শের মায়াটুকু শুধু রয়ে যায়, অকারণ বিষাদের মতন।
কত চিঠিই তো লেখা হয়েও পাঠানো হয় নি, কত চিঠি লেখাই হয় নি । শুধু স্বপ্নের ভিতরের শ্বেতপাথরের টেবিলের উপরে ভাঁজ ভাঁজ করে সাজিয়ে রাখা ওরা। সব না লেখা চিঠি, কবিতা, গল্প, না গাওয়া গানের কলি, না ফোটা ফুলেরা ---

তোকে ছেড়ে যাইনি কখনও
সবসময়েই কাছে কাছে থাকি,
একসাথেই কলাপাতায় সাজিয়ে দিই
চাট্টি গরম ভাত, এক হাতা মুসুর ডাল
একচিমটি লবণ, একটুকরো পাতিলেবু-
খেতে খেতে কত কথা হয়
হাসিকথা দুঃখকথা আনন্দকথা ব্যথাকথা
তবু তুই ভয় পাস আমি দূরে যাবো বলে?

সেই যে তোর বুকের মধ্যে লেবুপাতার গন্ধ ছিল-
আমি বলতাম তোর মধ্যে লেবুর বাগান বুঝি?
আছে সেই বাগান এখনও?
ঐ যে আমাদের সজনেগাছে থাকতো দুটি কাঠবেড়ালী?
সজনেতলায় দৌড়া-দৌড়ি খেলতো ঝিমদুপুরে?
ওরা কোথায় আজ?
ঐ যে টালির চালের ঘরে বাসা বানাতো দুই চড়াইপাখি?
আমরা ওদের নাম দিয়েছিলাম ইমন আর রূপসা?
ওরা কোথায় গেল?

আমি আজ পাহাড়ী নদীতীরে
তুই আজ দূর সমুদ্রের কিনারায়-
তবু কিন্তু কাছে কাছে থাকি আমরা।
ইমন রূপসা কাঠবেড়ালী লেবুর বাগান-
সবাই আছে আমাদের ঘিরে-
বাইরে নাই বা রইলো!
তোকে ছেড়ে যাইনি কখনও-
কাছে কাছেই আছি,
কাছে কাছেই থাকি।
চিরদিন।

Sunday, May 25, 2014

মেঘ-মানুষ

মনে পড়ে স্বপ্নের সেই মেঘমানুষকে, যে ভেদ মানতো না, বলতো পৃথিবী তার মা আর আকাশ তার পিতা, বলতো সে ভালোবাসে আলো, ভালোবাসে নদী যার মধ্যে কিনা পূর্বজ-পূর্বজাদের আশীর্বাদধারা বয়ে গেছে। বলতো, সে ভালোবাসে সবুজ গাছ, পশুপাখি। বলতো, সে ভালোবাসে অন্য মানুষদের। সে বলতো সে ঘৃণা করে নিষ্ঠুরতা আর ঘৃণাকে। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- কে তাকে রক্ষা করে? সে বলেছিল, কেউ না, জলের মধ্যে জল হয়ে ঝরে যায় সে। তার কাছে আরো কত কথা ছিলো জানার, কিন্তু ঘুম ভেঙে গেল যে!

জেগে উঠে মনে পড়ে আরেক মানুষকে, একদিন তাকে যুবক দেখেছিলাম, আজকে সে বুড়া হয়ে গেছে। তখনই তার চুল খুব পাতলা হয়ে গেছিল, এখন মাথাজোড়া মস্ত টাক। আমি খুঁজে বার করেছিলাম তার ম্যাট্রিকের সময় তোলা সাদাকালো ছবি, এক উজল চোখের কিশোর, যার মাথা ভর্তি চুল। সেই অমলকান্তি কিশোর অত বদলে গেছে? সময়ের মধ্যে পিছন ফিরে গিয়ে পিছনবাগে সাঁতার দিতে দিতে আর ফিরে পাওয়া যায় না সেই কিশোরকে?

অথবা সেই যুবককে যে ছোট্টো মেয়েটার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে রবিবারের সকালের বাজারে? এক অদ্ভুত ফলের বাজার বসেছে রেললাইনের উপরে, বাচ্চা মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ট্রেন এলে কী হবে? ফলওয়ালা হা হা করে হেসে বলে," ট্রেন আইলে চাপা পইড়া সবাই মইরা যামু, আবার ট্রেন চইলা গেলেই বাঁইচ্যা উঠমু! এইরম কইরাই তো রোজ রোজ আমরা মইরা যাই আর বাঁইচ্যা উঠি।"

আশেপাশের সবাই গলা ছেড়ে হেসে উঠেছে আর ভীষণ রকম কনফিউজড হয়ে গিয়ে মেয়েটা পাশে বাবার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলে, " তাই, বাবা?" হাঁটতে হাঁটতে ফলের বাজার পার হয়ে যায় তারা, মেয়েটাকে বাবা আশ্বস্ত করে, "এই লাইনে খুব ভোরে শুধু একবার মালগাড়ী যায়, সারাদিন আর কোনো গাড়ী যায় না।"

মেঘমানুষ বলে, "এ কী আশ্চর্য ব্যাপার! আকাশ, মাটি এসবও কি কেনাবেচা করা যায়? আমরা বুঝিনা! এই যে বিশুদ্ধ বাতাস বইছে- প্রাণের দীপগুলি জ্বালিয়ে রাখছে-এই যে স্নিগ্ধ জল কুলকুল করে বয়ে যায় রোদপোহানো পাথরের পাশ দিয়ে, আমাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখে এই জল-এসব তো আমাদের সম্পত্তি না। এগুলো কী করে কিনবে বা বেচবে কেউ? পৃথিবীর প্রত্যেকটা জায়গাই পবিত্র, পাইনের ঝিরিঝিরি পাতাগুলো, সব বালুকাতীর, বনের কুয়াশা, সব তৃণভূমি, সব কীটপতঙ্গ! এরা সকলেই আমাদের স্মৃতি আর অভিজ্ঞতায় পবিত্র।"

ঝড় এসেছে তা তো ভাবিনি তবু
জানালাটি খুলে চেয়ে দেখেছি-
বুক ভরে টেনে নিয়েছি বৃষ্টিগন্ধী হাওয়া,
ঐ হাওয়ার গন্ধ তোকে মনে পড়ায়।
খোলা চুলে মেখেছি সেই হাওয়ার আদর
চুপি চুপি কথার মতন কানের
লতিতে ছুঁয়েছে হাওয়ার হাত।

খুব বৃষ্টি হয়ে গেল সারাটা দুপুর
সঙ্গে ঝিলিক দেওয়া বিদ্যুৎ আর কড়কড়াৎ বাজ-
অঝোর বরিষণ চললো ঝরোঝর।
এখন বিকেল, বৃষ্টি থেমেছে কিছুক্ষণ আগে-
খোলা জানলা দিয়ে ভেসে আসে জুইঁফুল-গন্ধী হাওয়া,
বাগানের কুঁড়িগুলো ফুটেছে বৃষ্টির ছোঁয়ায়।

মাঠে পথে উঠোনে জমে থাকা জলে
মুখ দেখছে আকাশ-
দেখছে তার দ্রুত বদলে যেতে থাকা চেহারা,
বৃষ্টিশেষ মেঘেরা উড়ে যাচ্ছে,
আকাশ নীল হয়ে আসছে
আমার প্রিয় নীল রুমালটার মতন।
কবে হারিয়ে যাওয়া সেই রেশমী রুমাল-
শৈশবের কুসুম কুসুম গল্পগুলো জড়িয়ে নিয়ে
কোথায় চলে গিয়েছে নিরুদ্দেশের দেশে।
শুধু মনে আছে ওর রঙটা,
আকাশের মত নীল।
তোর মনে আছে কি
এইরকম বৃষ্টিশেষ বিকেলে
একদিন আমরা দেখেছিলাম ছোট্টো গর্তে
জমে থাকা জলে একজোড়া চড়াইয়ের কাকস্নান?
এখন আমি একাই দেখছি
উঠোনে জমা জলে স্নান করছে শুভ আর রূপসা
আমার টালির ঘরে বাসা বাঁধা চড়াই দুটির
ঐ দুটি নাম দিয়েছি।

*******

ভালোবাসার বাড়ী

ধূপছায়া রঙের পর্দার আড়ালে এসে দাঁড়ায় সে। তাই ওকে স্পষ্ট করে দেখতে পাই নি কোনোদিন। শুধু ওর সজল চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে অস্তসূর্যের আলোয়। মুখের বাকীটা ভালো করে বোঝা যায় না। কেন জানি মনে হয় ওর অল্প-স্ফীত ঠোঁটে, এলোমেলো হাওয়াওড়া চুলে, করুণ হাতের ছন্দে অচেনা অভিমানের আভাস থাকে। কেজানে! বোঝা যায় না ভালো করে কিছুই। ও যে কে, তাও বুঝতে পারিনা।

দূর দিগন্তে হীরকধূলি ওড়ে, অস্ত-আভায় জ্বলজ্বল করে উঠে ডুবে যায় নীল বনরেখায়। ধূপছায়া পর্দার ওপারেও নামে আঁধারের নীলধারা। ওর চেহারা মিলিয়ে যায় ঝিল্লীর রাত্রিস্বরে। ও তো কথা বলে না, তাই বুঝি না কেন আসে, কী বলতে চায়! নীরবতার কারুণ্য দিয়ে গড়া হিরন্ময় ভাষা ভুলে গেছি সেই কবে!

আমাদের একখানি বাড়ী ছিলো, বড়ো ভালোবাসার বাড়ী। তিলতিল করে গড়ে উঠতে দেখেছিলাম তাকে। বাড়ীটায় ছিলো এক খোলা বারান্দা। বারান্দা ঘিরে ছিলো কনকচাঁপা, শিউলি, দোপাটি, টগর, বকুল, মাধবীলতা, জুঁই, বেলী, চামেলীরা । সারাবছর জুড়ে ঘুরে ঘুরে গানের আসর বসতো সেই বারান্দায়। সুখের গান দুখের গান উঠতো ভালোবাসার মানুষগুলির হৃদয় থেকে। বাড়ী ঘিরে ছিলো অনেকখানি খোলা জায়গা। সেখানে ফল আর ফুলের গাছেরা বেড়ে উঠেছিলো নিজেদের মতন। বাড়ীর বড়দাদা কইতেন ফুলের কেয়ারী, লতার বাহারী দেওয়া সাজানো বাগান কৃত্রিম, তারচেয়ে গাছেরা বেড়ে উঠুক এমনি এমনি, পাখিরা উড়ে আসুক, উড়ে যাক। কথাটা সবার ভারী মনে ধরেছিলো।

তারপরে সময়ের ধারা বয়ে গেলো, দেখতে দেখতে কত চেনা অচেনা হয়ে গেল, কত পর হলো আপন, কত আপন সরে গেলো দূরে। বাড়ী ও বদলে গেলো কত! নিজের মতন বেড়ে ওঠা বাগানটাও বদলে গেলো। ক্ষুরের মতন ধারালো হাওয়া খসিয়ে দিলো কত নতুন ফোটা ফুলের পাপড়ি! বৃথা রক্তঝরানো যুদ্ধে হারিয়ে গেলো কত কাছেরজন। কত চেনামুখ একে একে হারিয়ে গেলো সেই হৃদয়নিংড়ানো সঙ্গীতসভা থেকে। অনেক বেদনাপ্রহর পার হয়ে একদিন আমারও পালা এলো, চলে যাবার পালা। একাকী স্টেশনে গিয়ে বিদায়ের ট্রেনে উঠে বসলাম। আর কি দেখা হবে? আর কি ফেরা হবে? এতদিনের এত টান কি সব মিথ্যা ছিলো? নাহলে কিছুই রইলো না কেন? সব ভোজবাজির মতন মিলিয়ে গেলো? নাকি মেলায় নি? কোথাও রয়ে গেছে গোপণে?

এলোমেলো ভাবনা জড়িয়ে যাচ্ছিলো রেশমী সুতার গোছার মতন। আশা-নিরাশার দোলা। কখনো জানালা আয়না হয়ে যায়, সরোবরতীরে নুয়ে পড়া মায়াবী নার্গিস ফুল দুলে ওঠে আয়নায়। চমকে উঠে মুখ ঢাকি--না না না না, এভাবে প্রতারিত কোরো না। আবার দেখি জানালা ফিরে এসেছে, বাইরে দূর দিগন্ত। কেউ সাথে নেই বলে মনে করেছিলাম কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চললো সেই ধূপছায়ালীন অভিমানী। কে সে? কেন তাকে চিনতে পারি না?

"মৃদু বৃষ্টির ভিতর দিয়ে
এগিয়ে চলেছে পথ পাহাড় উপত্যকা-
পিছনে গতজন্মের বাড়ী কখন ঝাপসা হয়ে গেছে।
কোন্‌ দূর সন্ধ্যানামা মাঠে,
এলোমেলো জলরঙ মেখে-
দাঁড়িয়ে আছে হয়তো বা!
কেজানে!


অবিশ্রান্ত লবণাক্ত বৃষ্টি -
আমার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে,
দূরের আশ্চর্য সূর্যাস্ত দেখতে দেয় না।
ক্রমে অন্ধকারে ঢেকে যায় বিশ্বচরাচর
এখন শুধু চাকার একঘেয়ে আওয়াজ-
রক্তস্পন্দিত হৃৎপিন্ডের শব্দের মতন
ধক্‌ ধক্‌ ধক্‌ ধক্‌ ধক্‌ ধক্‌ ধক্‌ ধক্‌ ধক্‌ ....

জানালা দিয়ে বাইরে চোখ ফেলি
বৃষ্টিমেঘজল‌ কখন পিছনে চলে গেছে
নি:সীম কালো আকাশে জ্বলছে
অগণন নক্ষত্রের অফুরাণ বিস্ময়।

তারাদের পাশ দিয়ে
উড়ে যেতে দেখি সেই পাখিকে-
ছায়াপথের হৃদয়ের দিকে উড়ে যায়
সেই শুভ্রডানার অলীক পাখি।
যেতে যেতে একবার ফিরে তাকায়।

আবার বৃষ্টি নামে ঝরঝর-
এবারে ভিতরের আকাশে।

***